Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
শোধ
শোধ

লক্ষ্মী যে নবাসনে ফিরে এসেছে, সেটা বিলাসী ছাড়া আর কেউ জানত না। বিলাসী লক্ষ্মীর পিসতুতো বোন, আবার বন্ধুও বটে, একই গ্রামের বাসিন্দা। পিঠোপিঠি বয়স দুজনের। জ্ঞান হওয়া থেকেই দুজনে দুজনের গায়ে গায়ে লেপ্টে থেকেছে। অভিমান, চুলোচুলি-ঝগড়া, আবার গলা-জড়াজড়ি ভাব — এসবের মধ্যে দিয়েই কখন যে ডাগর হয়েছে দুজনে, টেরই পায়নি নিজেরা। এরপর একদিন লক্ষ্মী গ্রাম ছেড়েছে, বিলাসীকে ছেড়েছে — সে কত দিন আগের কথা, মনেও পড়ে না বিলাসীর। এত দিনে লক্ষ্মীর মুখটাই মুছে যেতে বসেছে ওর স্মৃতি থেকে। সেই লক্ষ্মীকে যে আবার কোনো দিন দেখতে পাবে, এমন ভরসা ছিল না ওর। তাই সেদিন ভোরের আধো-অন্ধকারে খিড়কির পুকুরঘাটে লক্ষ্মীকে দেখে প্রথমটায় চিনতে পারেনি বিলাসী, চমকে উঠেছিল।

আকাশে আগুন ধরার অনেক আগে বিছানা ছাড়ে বিলাসী। চোখে তখনও রাতঘুমের একটা রেশ থাকেই। সেই অবস্থাতেই গোরুর জাবনা মাখে প্রথমে। তারপর ঝাঁটপাট দিয়ে বাসি কাপড়েই প্রাতঃকৃত্য সেরে পুকুরে গোটা কতক ডুব মারতেই আগুন ধরে আকাশে। বিলাসীও অতঃপর রান্নাঘরের তোলা উনুনে কাঠ-কুটো জড় করে আগুন ধরাতে তৎপর হয়। জ্বরজ্বালায় নেহাত কাবু হয়ে না পড়লে এই রুটিনের বদল হয় না।

সেদিনও বিলাসীর দিন শুরু হয়েছিল এরকম অভ্যস্ত ছন্দেই। কিন্তু পুকুরে যাওয়ার জন্য খিড়কি দরজা খুলতেই সেই ছন্দ ভেঙে চুরমার! পুকুরের দক্ষিণেই পালেদের ইঁটখোলার এলাকা শুরু। তার সেই অদ্ভুত জ্যামিতির শেষে আদিগন্ত ধানক্ষেত। তার পরে নাকি একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে, বিলাসী কখনও যায়নি সেখানে। সেই দিকে চেয়ে, ঘাটের ভাঙাচোরা চাতালে কে যেন বসে আছে, বিলাসী চমকে উঠেছিল।

ভূতপ্রেতে বিলাসীর ভয় নেই কোনো কালেই; রাত-বিরেতে বন-জঙ্গল ঠেঙিয়েছে বিস্তর। বিলাসীর যত ভয় চোর-ডাকাতের। সেই ভয় ভোরবেলার আধো-অন্ধকারে যেন পেয়ে বসে ওকে। আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে ঘাটে যে বসে আছে, প্রথম দর্শনে তাকে তো মেয়েমানুষ বলেই মনে হয়। অন্তত বসার ভঙ্গি দেখে অন্য কিছু মনে হওয়ার যো নেই। তবু বিলাসীর সন্দেহ যায় না। চোর-ডাকাতদের নানা রকম ছল-চাতুরি থাকে। এও সেরকম কোনো ছল কি না, কে জানে! মেয়েমানুষ পাঠিয়ে গৃহস্থের বাড়িতে ঢোকার কৌশল জেনে নিতে চায় হয়তো! এমন ভাবনা মনে আসতেই বিলাসী আতঙ্কে অসাড়। গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না, পায়ে যেন বিশ মণি পাথরের ভার।

বেশ কয়েকটা অবশ মুহূর্ত কাটার পর ঘাটের মূর্তিই ফেরে বিলাসীর দিকে। এরপর ওর অবাক হওয়ার পালা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মূর্তির দিকে চেয়ে থাকে বিলাসী। একটা টলটলে মুখে যেন ক্লান্তি মেশানো তৃপ্তির ছাপ — সমস্ত মুখটায় লেগে আছে টইটম্বুর লাবণ্য। দুই ভ্রুর মাঝখানে একটা কুমকুমের সামান্য ধেবড়ে যাওয়া টিপ, সে লাবণ্যকেই যেন বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। হ্যাঁ, মেয়েমানুষই বটে, বিলাসী একটু আশ্বস্ত হয়, অন্তত এক্ষুনি ছোরা-ছুরি নিয়ে খুনখারাপি করবে না বলেই মনে হয় বিলাসীর।

মাথার কাপড় খসে পড়ায় চোখে পড়ে মেয়েটির মসৃণ গ্রীবা, চিবুক আর চোয়ালের সঙ্গে তার অনবদ্য সামঞ্জস্য, আর চোখের তারার গভীর থেকে উঠে আসা একটা পাগল করা চাহনি। বিলাসী একটু একটু করে ফিরে পায় নিজেকে, আর ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ক্রমশ জানান দিতে থাকে — এই মেয়ে আর যাই হোক, খুনে বদমাশ নয়। মেয়েটিই কথা বলে প্রথমে, "বিলাসী, আমি লক্ষ্মী রে!"

লক্ষ্মী! আগন্তুকের এই অতর্কিত ঘোষণায় বিলাসী হকচকিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে এমন খবর এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে বিলাসী অনেকক্ষণ অভিভূত হয়ে থাকে, কাকভোরে এই পুকুরধারে লক্ষ্মী কোথা থেকে আসবে, ভেবে পায় না। লক্ষ্মীর চেহারাটা মনে করার চেষ্টায় ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে ভাবে, লক্ষ্মী তো এমন ছিল না! তারই মতো একটা আধফরসা মেয়ে ছিল লক্ষ্মী। সেই মেয়ে কী করে এমনধারা হতে পারে! বিলাসীর মুখে কথা জোগায় না।

"কি ভাবছিস বল তো!" আগন্তুকের কথায় সম্বিত ফেরে বিলাসীর। বিলাসী তখন ভাবনার অতলে ডুব দিয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছে যদি তুলে আনতে পারে স্মৃতির একটা পরিচিত খণ্ড, যা দিয়ে সনাক্ত করতে পারে, মিলিয়ে দেখতে পারে নিজের আবাল্যের সঙ্গীকে। কিছুতেই পারে না। নিজেকে খুব অসহায় লাগে বিলাসীর। এ যদি লক্ষ্মী হয়, তাহলে মানতেই হবে, ছোটোবেলার সেই মেয়েটা পালটে গেছে ভীষণভাবে, শহুরে একটা চিকন সূক্ষ্মতা ওকে মুড়ে দিয়েছে একধরনের চাপা উজ্জ্বলতায়। অবশ্য সময়ও তো কম যায়নি, বারো-তেরোটা বছর!

"চিনতে পারছিস না!" বিলাসীর চেতনা ধরে নাড়া দেয় কথাগুলো। "তুই কিন্তু বদলাসনি, বিলাসী! আমি তোকে দেখেই চিনেছি।"
"না, মানে তুমি... ঠিক!"
"দূর, মুখপুড়ি! তুমি, তুমি আবার কী আদিখ্যেতা লো! এই দ্যাখ।" ঘাটের সিঁড়িতে ডান পা ছড়িয়ে ফস করে কাপড়টা উরু পর্যন্ত তুলে ধরে মেয়েটি। বিলাসী দেখে মেয়ের সোনা রঙ উরুতে কালো রঙের একটা তারার মতো জরুল। দেখতে দেখতে ভাবে, লক্ষ্মীটা সুন্দরী হয়েছে বটে!
"পেত্যয় হয়েছে তো?"

বিলাসী এতক্ষণে স্বস্তির হাসি হাসে। লক্ষ্মীর ইচ্ছে করে ছোটোবেলায় জামরুলতলার খেলুড়েদের মতো বিলাসীকে একবার জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। কিন্তু মাঝের তেরোটা বছর তার আর বিলাসীর মধ্যে একটা দুরতিক্রম্য পাঁচিল তুলে রাখে। বিলাসীর জীবন না হয় বদলায়নি খুব বেশি, কিন্তু তার নিজের জীবন তো এই এক যুগে মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়েছে, সেই দূরত্ব কে ঘোচাবে!

বিলাসীও ভাবছিল, এত দিন বাদে লক্ষ্মীকে কাছে পেয়ে আদর করবে খুব। কিন্তু লক্ষ্মী যে জেলফেরত আসামি, সে কথা মনে পড়তেই একটা সংকোচ ওকে আড়ষ্ট করে তোলে। বিলাসী বুঝে উঠতে পারে না, ওর কী করা উচিত। তখনই লক্ষ্মীর কথা কানে আসে, "কি রে, ঘরে যেতে বলবি না!"

কী বলবে, ভেবে পায় না বিলাসী। একদিকে লক্ষ্মীর গায়ে জেলফেরত আসামির তকমা, অন্যদিকে এতগুলো বছর পরেও বিলাসী ভুলতে পারে না, লক্ষ্মী তার বোন, এক সময়ের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু। একটা সাময়িক দোদুল্যমানতা। তারপরই ওর মনে হয়, খোলা জায়গায় দাঁড়ানোর চেয়ে ঘরের ভিতরে যাওয়া বেশি নিরাপদ, পাড়া-প্রতিবেশীর নজর এড়ানো যায় তাতে। কথাটা মনে হতেই চমক ভাঙে বিলাসীর। বলে ওঠে, "হ্যাঁ, দাঁড়া। দুটো ডুব গেলে নিই আগে।"

লক্ষ্মীর স্বভাব-চরিত্র কেমন আছে, কে জানে! বিলাসী ভেবে পায় না, এত সুন্দরী হল কী করে মেয়েটা। বারো-তেরো বছরের অন্ধকার সরিয়ে দেখা কি সহজ কথা! এই সব ভাবনার ভিড়ে একটা কথা তবু বারবার উঁকি দিয়ে যায় মনে, লক্ষ্মী কি আদৌ কোনো ক্ষতি করতে পারে ওর! এর জবাব নিজেই নিজেকে দেয় বিলাসী, আশ্বস্ত করে এই ব'লে যে, কখনও না, লক্ষ্মী তার অনিষ্ট করতে পারে না কিছুতেই। এক যুগ আগে যা ঘটেছিল, সেই ঘটনায় লক্ষ্মীর অপরাধ হোক বা না হোক, এই সময়ের মধ্যে লক্ষ্মীর অগ্নিশুদ্ধি হয়েছে অবশ্যই। অন্তত বিলাসীর মন বলছে তাই।

লক্ষ্মীর সাজা হয়েছিল বারো বহরের জেল। জেল থেকে হয়তো ছাড়া পেয়েছে সদ্য, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই জেনে ওর কাছে এসেছে আশ্রয় চাইতে। যার সঙ্গে যতই আত্মীয়তা থাকুক, সবকিছু জেনে, জেলফেরত মেয়েকে কে আর ঘরে তুলবে স্বেচ্ছায়।

লক্ষ্মী জানত, বিলাসী ফেলতে পারবে না তাকে। এখন বিলাসীও জানে, কোল পেতে একটু আশ্রয় দেওয়ার কেউ নেই লক্ষ্মীর। একটা তরল অনুভব ভেজাতে থাকে বিলাসীকে। তারই আশৈশব সাথি ঘটনাচক্রে আজ নিরাশ্রয়; বিলাসী কষ্ট পায় মনে।

"ভাবছিস তো, ঘাড়ে এসে পড়লুম কি না!" এ কথায় সম্বিত ফেরে বিলাসীর। সত্যিই তো ভাবছিল বিলাসী, ঠিক এরকম না হলেও, খানিকটা এরকম তো বটেই। একটা নিস্তরঙ্গ জীবনে হুট করে কেউ এসে পড়লে ভাবতে হয় বৈকি, বিশেষ দীর্ঘ অদর্শনের ফলে যখন তার প্রকৃতি, তার রুচির হদিশ জানা থাকে না। গ্রামদেশে বিলাসীর মতো একজন নারীর দীর্ঘ দিনযাপনের সূত্রে, আপনা থেকেই জীবন নির্বাহ করার যে একান্ত নিজস্ব চলন তৈরি হয়ে যায়, তার মধ্যে একটা বেখাপ্পা স্বর লাগলে পুরো গানটাই নষ্ট হয়ে যায়, সে যতই মিষ্টি হোক তার আওয়াজ। লক্ষ্মী বোধহয় সে কথাই বলতে চেয়েছে। অবশ্য তার পরেই আশ্বস্ত করার মতো সুরে বলেছে, "ভাবিস না, তোর কাছে আমি পাকাপাকি থাকতে আসিনি। দুদিনের জন্য এসেছি। আবার একদিন ভুস করে উবে যাব ঠিক!"
"তাহলে এলি কেন?"
"তোকে দেখতে। কত দিন তোকে দেখিনি বল তো! মন কেমন করছিল তোর জন্য।"
"জানলি কী করে যে আমি এই নবাসনেই আছি! শ্বশুরবাড়িতেও তো চলে গিয়ে থাকতে পারতাম!"
"নিতাই কামারের ছোট ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।"
"কোথায়!"
"সদরের জেলে। কার সঙ্গে যেন জালিয়াতি করে জেল খাটছিল। একদিন বিকেলে দেখা তার সঙ্গে, সেও বললে।"
"জেলখানায় ছেলেদের আলাদা জায়গা নেই!"
"আছে তো, জাল দিয়ে ঘেরা! কিন্তু বিকেলবেলা যখন ঘর থেকে ছাড়ে, তখন জালের ফাঁক দিয়ে পরস্পরে দেখা হয়। ওর কাছেই শুনলুম, ছেলে বিয়েছিস। তারপর কপাল পুড়িয়ে এখানেই এসে উঠেছিস।"
"হ্যাঁ, বাবা চলে যেতে ভিটেটাও নষ্ট হতে বসেছিল। আর শ্বশুরবাড়িতেও ভরসা করার মতো কেউ ছিল না। তাই ভাবলাম, অন্য আত্মীয়দের কাছে পরগাছা হয়ে থাকার চেয়ে বাবার ভিটেয় ওঠাই ভালো। পিতৃপুরুষের ভিটে বাঁচবে, আর ছেলেটাও কুড়িয়ে বাড়িয়ে মানুষ হয়ে যাবে ঠিক।"
"ও হ্যাঁ, তাকে দেখছি না তো! কোথায় সে?"
"বোনের বাড়ি, দেউলপুরে। ইস্কুলের ছুটি চলছে, মাসির কাছে আদর খেতে গেছে।"
"আর তুই একলা বসে ভিটে আগলাচ্ছিস ভূতের মতো!" বিলাসী হাসে। ওর মনে হয়, লক্ষ্মী শুধু চেহারা নয়, মনের দিক থেকেও বদলে গেছে অনেক। মেয়েদের ত্যাগ না থাকলে যে সংসার বাঁচে না, সে কথাটা ভুলেই গেছে ও। এটা কি শহরবাসের ফল, বিলাসী বুঝে উঠতে পারে না।

পুকুরে ডুব দিয়ে এসে লক্ষ্মী ভিজে কাপড় বদলানোর সময়ে ভাতের ফ্যান ঝরাতে ঝরাতে বিলাসীর চোখ পড়ল ওর ওপর। হালকা পালিশ করা সোনা দেখতে যেমন হয়, ঠিক তেমনি একটা চাপা উজ্জ্বলতা যেন বুলানো আছে লক্ষ্মীর পিঠ, বুকে। আদুর গায়ে সেই উজ্জ্বলতা খোলতাই লাগে আরও; কোথা থেকে যে এত রূপ পেল লক্ষ্মী, বিলাসীর জানতে ইচ্ছে করে। জেলখানায় তো মানুষ ছিবড়ে হয় শুনেছে, সেখানে তো এমনটা হওয়ার কথা নয়! তাহলে কি অন্যভাবে জীবনযাপন করত লক্ষ্মী! জেল থেকে পালিয়েছিল নাকি! সে তো আরও সাংঘাতিক ব্যাপার! জেলপালানো কয়েদিকে ঘরে তুলে বিপদে পড়বে না তো! বিলাসীকে নিয়ে যদি টানাটানি করে পুলিশে, ছেলেটা যে ভেসে যাবে তার! এরকম ভাবনায় অস্থির হল বিলাসী, অন্যমনস্ক হল। সেই অবস্থায় ফ্যান ঝরাতে ঝরাতে ও খেয়ালই করেনি যে হাঁড়ির ঢাকনা সরে গিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ভাতের দানাও বেরিয়ে যাচ্ছে অনর্গল ধারায়। ছ্যাঁচাবেড়ার গা থেকে শুকনো কাপড় পাড়তে গিয়ে লক্ষ্মীর চোখে পড়ে দৃশ্যটা। হৈহৈ করে ওঠে ও, "আরে মুখপুড়ি, হাঁড়ির দিকে তাকা। দ্যাখ, কত ভাত নষ্ট হল!"

লক্ষ্মীর মনে হয়, তাকে আশ্রয় দিয়ে বিলাসীর বোধহয় বিড়ম্বনার শেষ নেই। কাপড়চোপড় সামলে দাওয়ায় উঠে বিলাসীর সামনে বসে সমস্যার গভীরতা যাচাই করার জন্যই কথাটা পাড়ে লক্ষ্মী, "এসে পড়ে তোর ঝঞ্ঝাট বাড়িয়ে দিলুম, না রে!"
"না না, তা কেন হবে?" বিলাসী তাড়াতাড়ি বলে ওঠে।
"যতই বলিস, আমি জানি রে। এমনিতেই জেলফেরত মানুষকে গ্রামের লোক ভালো চোখে দেখে না, তার ওপর আমি মেয়েমানুষ, তায় খুনের আসামি! আমাকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে তুই যে নিজের বিপদ ডেকেছিস, তাতে সন্দেহ নেই। তবে চিন্তা নেই, বেশিদিন জ্বালাব না তোকে। বেশি লোক টের পাবার আগেই কেটে পড়ব।"
"আমি ও নিয়ে ভাবি না। এদিকটা গাঁয়ের একটেরে, লোকজনের আনাগোনা কম। তাই সহজে চোখে পড়ার ভয় নেই। আর পড়লেও, এত দিন পর তোর নতুন চেহারায় কেউ যে তোকে চিনে ফেলবে, সে সম্ভাবনাও কম। আমি ভাবছি অন্য কথা।"
"কি কথা রে!"
"ভাবছি, তুই এত সুন্দরী হলি কী করে!"
"হিংসে হচ্ছে?"
"দূর হ'! হিংসে হবে কেন? আমার যা আছে, তাতেই আমি খুশি। জীবনে কিছু তো বাকি নেই পেতে! আমি শুধু বুঝতে পারছি না, এত রূপের জৌলুশ কি তুই টের পাস নিজে?"
"কেন পাব না! আয়নার সামনে দাঁড়ালেই টের পাই। এ জৌলুশ তো আমার নিজের হাতে তৈরি করা!"
"ভয় করে না?"
"কিসের ভয়?"
"এই ধর, লোভী লোকজন যদি তোর ওপর চড়াও হয়!"
"হলে হবে," তাচ্ছিল্যের সুরে বলে লক্ষ্মী, "তবে এসব লোকজনকে ঠেকানোর কায়দা আমার জানা আছে।"
"জেলের জীবন তো মানুষকে ছিবড়ে করে দেয় শুনেছি! তার ওপর আবার এত বছরের কয়েদ! কিন্তু তোর তো হিসেব দেখি উলটো!"
"উলটো হয়েই কাল হয়েছে রে, বিলাসী।"
"মানে!"
"মানে, সে অনেক কথা। তোকে বলব পরে। আজ বরং একটা অন্য কথা বলি। আমি শুধু তোর সঙ্গে দেখা করতেই আসিনি রে, আমার একটা অন্য কাজও আছে এখানে।"
"অন্য কাজ!" বিলাসী অবাক হয়।
"হ্যাঁ রে, সেটাই আমার আসল কাজ। যত দিন না সে কাজ শেষ হচ্ছে, তত দিন তোর ঘাড়ে ভর করেই থাকব। কয়েকটা দিনের ব্যাপার, তোর অসুবিধে হবে না তো!" একটু অন্যরকম স্বরে, ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে কথাগুলো এমনভাবে বলল লক্ষ্মী, যেন প্রত্যেকটা শব্দের ফলাফল সম্পর্কে ও নিশ্চিত।

এই কথাগুলোর উত্তরে কী বলা উচিত, ভেবে পেল না বিলাসী। সামান্য কালক্ষেপের পর অস্ফুটে বলল, "কি যে বলিস!" এই কথোপকথনের সূত্রে বিলাসী আবিষ্কার করল, লক্ষ্মীর সত্ত্বায় জুড়ে গেছে আর একটা মানবিক উপাদান, যার নাম ব্যক্তিত্ব, যার সামনে মাথা না নামিয়ে উপায় নেই।

খাওয়াদাওয়া সেরে দুজনে গড়াচ্ছিল একটু। ততক্ষণে পুরোপুরি না হলেও, ভোরবেলা খিড়কি দরজা খুলে লক্ষ্মীকে দেখে যেরকম চমক লেগেছিল বিলাসীর, তার রেশ অনেকটাই হালকা হয়ে এসেছে। দুপুরের ঘুঘু-ডাকা নৈঃশব্দ্যের অবকাশে বিলাসী সেটা টের পাচ্ছিল একটু একটু করে। রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে বলা লক্ষ্মীর কথাগুলোর তাৎপর্য ঠিকঠাক বুঝতে না পারলেও লক্ষ্মীর ওপর থেকে রহস্যের ঢাকনাটা ক্রমাগত সরে যাচ্ছে বলে বোধ হচ্ছিল বিলাসীর। লক্ষ্মী জেল খাটতে পারে, বদলে যেতে পারে, কিন্তু ওর ভেতরকার মেয়েটা যে মরেনি, ঘুমের মধ্যেও নিজেকে আগলানো দেখে মনে হল বিলাসীর।

নয় নয় করে সংসারের অনেকগুলো ঝড় সামলেছে বিলাসীও; বাবা, মা, স্বামীর মৃত্যু দেখেছে চোখের ওপর। খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্য, খানিকটা অভাবের একটা অনিশ্চিত স্রোতে নৌকা বেয়েছে অনেক দিন। অতএব, মনের আবেগ-উচ্ছ্বাসের ওপর মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণ এখন ওর আয়ত্তে। তা সত্ত্বেও ছেলেবেলার সাথীকে পেয়ে ওর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল জামরুলতলায়, যেখানে শৈশব-কৈশোরে মান-অভিমানের বিস্তর আদান-প্রদান ঘটেছে এককালে। ইচ্ছে করছিল গলা-জড়াজড়ি করে দোলনায় দুলতে, বকুলফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথতে। কিন্তু এসবের কিছুই যে এখন আর সম্ভব নয়, তা বুঝে বুকের মধ্যে একটা অস্বস্তি টের পাচ্ছিল বিলাসী। এর ওপরেও তবু নিজের সাংসারিক বোধ যে লক্ষ্মীকে চেনাতে ভুল করেনি, সেই বিশ্বাসে লক্ষ্মীর কপালে যত্নে ঠোঁট ছোঁয়াল বিলাসী। কিন্তু আসলে কি ও ঠিক চিনেছিল লক্ষ্মীকে! একমাত্র সময় বলতে পারে সে কথা।

ভাতঘুম দিয়ে উঠে আলস্য ভেঙে আচমকাই লক্ষ্মী জিজ্ঞেস করল বিলাসীকে, "হ্যাঁ রে, পবনের কী খবর?"

প্রশ্নটা এতটাই আকস্মিক যে তৎক্ষণাৎ কথা জোগাল না বিলাসীর মুখে। এরপর পবনের সঙ্গে লক্ষ্মীর সম্পর্কের সূত্রটা ধরতে পেরে দ্বিধান্বিত এবং অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল, "ভালো।"
"ভালো মানে!" বিলাসীর সংক্ষিপ্ত জবাবে সন্তুষ্ট হয় না লক্ষ্মী।
"ভালো মানে, দিব্যি আছে," এতক্ষণে যুতসই শব্দগুলো আয়ত্ত করতে পেরেছে বিলাসী। "বাপের ইঁটখোলাটা হাতে পেয়ে দেদার কাঁচা টাকা কামাচ্ছে, ওড়াচ্ছেও বিস্তর হৈহুল্লোড় করে, বন্ধু-বান্ধব জুটিয়ে ফুর্তি করে।"

বিলাসী জানে, এই উত্তরে লক্ষ্মীর সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। পবনের কারসাজিতেই লক্ষ্মীর হাজতবাস। কাজেই পবনের বাড়বাড়ন্ত ওর ভালো লাগার কথা নয়। তবু এই কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না লক্ষ্মী। এতে একটু অবাকই হয় বিলাসী। যদিও এই ক'বছরে পবনের সবকিছু যে রমরমিয়ে চলেছে, তা-ও নয়। অনেক অন্ধকারও জমেছে ওর জীবনে। সেই খবরে লক্ষ্মী খুশি হবে ভেবে বিলাসী আরও বলে, "উড়নচণ্ডে জীবনযাপন দেখে বাপটা বেঁচে থাকতে থাকতেই পবনের ঘাড়ে একটা রুগ্ন বউ চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তাকে নিয়ে পবন নিত্যই জেরবার।"

কথাগুলো শুনে একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে বিলাসীর দিকে চাইল লক্ষ্মী। তারপর হিসহিস করে বলল, "পবনকে এবার শেষ করে দেব আমি।"

একি সাংঘাতিক কথা, বিলাসী ভাবে! ওর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। খুনখারাপি করবে নাকি! বিলাসীর মনে হয়, এ মেয়েছেলে সেটাও পারে হয়তো। আহত কণ্ঠস্বরে কোনো রকমে বলে, "মানে!"
"মানেটাই তো সকালে তোকে বলার চেষ্টা করছিলাম। ওইটাই আমার এখানকার কাজ, পবনকে শেষ করে দেওয়া।"

সেই ভোরবেলা থেকে এতক্ষণে যে নৈকট্য তৈরি হয়েছিল দুই সখীর ভিতর, সেটা এখন মিথ্যে মনে হচ্ছে বিলাসীর। লক্ষ্মী যেন অচেনা কোনো দূর গ্রহের জীব! মনে মনে সেই দূরত্বটা কষে নিয়ে প্রায় রুদ্ধস্বরে বিলাসী বলে, "সে তো খুনখারাপি!"
"দূর পাগলি," লক্ষ্মী একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় বিলাসীর দিকে। "খুনের আসামি হয়ে জেল খেটেছি ঠিকই, কিন্তু আমি খুন করতে পারি বলে মনে হয় তোর!"
"না। কিন্তু...!"

খুন লক্ষ্মী করেনি, বিলাসী জানে। শুধু বিলাসী কেন, গাঁয়ের সবাই জানে। কেবল পবনের বাপের টাকার জোরের কাছে হেরে লক্ষ্মীকে জেল খাটতে হয়েছে। কিন্তু জেলজীবনের পর এখন লক্ষ্মীর মনোভাব কীভাবে বদলেছে, সেটা বিলাসী আন্দাজ করতে পারে না। জেলখানায় গিয়ে অনেক ভালোমানুষও পালটে যায় বলে শুনেছে বিলাসী। লক্ষ্মীও যে পাল্টায়নি, এই বিকেলের কথাবার্তায় তার নিশ্চয়তা কোথায়!

"মানুষকে শেষ করতে গেলে খুন করা ছাড়াও আরও অনেক রাস্তা আছে," লক্ষ্মী বলে।

রাস্তা তো আছেই, সেই রকম রাস্তাতেই লক্ষ্মীর ওপর শোধ তুলতে চেয়েছিল পবন। দিনরাত ঘুরঘুর করত লক্ষ্মীর পিছুনে। মেয়েটা তখন কচি বাঁশের ডগার মতো চিকন শ্যামল। সুবিধে করতে পারত না ভোলার ভয়ে, ভোলা লক্ষ্মীর দাদা। পবনের বাপের সঙ্গে ভোলার কাজিয়া বেধেছিল জমিজিরেত নিয়ে। বে-আইনি ভাবে ইঁটখোলার এলাকা বাড়িয়ে লক্ষ্মীদের ক্ষেতের ধার অবধি টেনে নিয়ে এসেছিল পবনের বাপ, নিতাই পাল। ইঁটখোলার তাপে ফসল নষ্ট হচ্ছিল বলে ভোলা সদর কোর্টে মামলা ঠুকেছিল নিতাই পালের নামে। মামলার গতি সুবিধের নয় বুঝতে পেরে নিতাই গুন্ডা লাগায় ভোলার পিছুনে। উদ্দেশ্য ছিল মারধর করে ভয় দেখিয়ে ভোলাকে দিয়ে মামলা তুলিয়ে নেওয়া। এসব ঘটনা বিলাসীর বিয়ের আগের। ভোলা মামলা তোলেনি।

লক্ষ্মীকে পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই দেখে পবন ভিড়েছিল গুন্ডাদের দলে, যদি এই সুযোগে মেয়েটার ওপর শোধ নেওয়া যায় কোনোভাবে। নিয়েও ছিল, আর পয়সার জোরে লক্ষ্মীর সারা জীবনটা বরবাদ করে দিয়েছিল পবন আর নিতাই। বিলাসী এটুকুই জানত, কিন্তু মামলার খুঁটিনাটি জানত না বলে পবনদের কৌশল বুঝে উঠতে পারেনি অনেক দিন। তাছাড়া নিজের সাংসারিক ব্যস্ততা সামলে এসব খবর জোগাড় করাও সহজ ছিল না তার পক্ষে। তবু পবন আর তার বাপের শয়তানির কথা যতটুকু লোকমুখে শুনেছিল, ততটুকু ভুলতে পারেনি এখনও। আর ও নিজেই যখন ভুলতে পারেনি, তখন সবটুকু জেনে লক্ষ্মী ভুলবে কী করে! লক্ষ্মীর ক্রোধে তাই অন্যায় দেখতে পায় না বিলাসী। তবু লক্ষ্মীর রাস্তাটার হদিশ না পেয়ে একটা অস্বস্তিতে ভোগে, বুকের ভিতর একটা আশঙ্কা গুরগুর করতে থাকে।

"কি ভাবছিস?" বিলাসীকে চুপচাপ দেখে জিজ্ঞেস করে লক্ষ্মী।
"ভাবছি, আবার কোন সর্বনাশের রাস্তায় পা বাড়াতে যাচ্ছিস!"
"নতুন করে আর কোন সর্বনাশ হবে রে আমার! দাদার খুনের মামলায় সদরে যেদিন আমার সাজার রায় বেরোল, সেদিনই তো আমার সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে গেছে রে!"

তা-ও বটে, বিলাসী ভাবে। মামলায় পবনের বাপ দেদার পয়সা ঢেলে, সাক্ষী-সাবুদ কিনে পবনকে বাঁচিয়েছিল। এটা বিলাসী জানত। কিন্তু কোন কায়দায় জলজ্যান্ত মিথ্যেটা সত্যি হয়ে গেল, সেটা জানার সুযোগ হয়নি ওর। কাজেই লক্ষ্মী যখন প্রসঙ্গ তুললই, তখন মামলার আগাপাশতলা শোনার ভারী কৌতূহল হল বিলাসীর।

"ভোলাদাকে যে পবনের দলবল খুন করেছে, এটা তো সবাই জানত।"
"জজসাহেব বাদে।"
"তার মানে!"
"মানে আর কিছুই নয়, জজসাহেবরা তো কান দিয়ে দেখে। উকিলরা সাক্ষী-সাবুদের জেরায় কোর্টে যা প্রমাণ করে দেয়, তার ওপরেই রায় দেয় জজসাহেব। পবনের বাপ জাঁদরেল উকিল দিয়েছিল পবনের হয়ে। সেই উকিলের একতরফা সওয়ালে আমার জেল হল আর পবন বেকসুর। ওই উকিল কোর্টে জানায়, পবনের সঙ্গে প্রেম করার জন্য দাদা নাকি আমায় মারধর করে, আর সেই আক্রোশেই আমি নাকি খুন করি দাদাকে।"
"কিন্তু কেউ একবারও বলল না যে কথাটা ডাহা মিথ্যে, খুনটা করেছে পবনের দলবল!"
"কে বলবে? কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে অমন ডাকসাইটে উকিলের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যি কথাটা বলবে! তাছাড়া, সাক্ষী তলব না হলে আগ বাড়িয়ে কেউ বলতে যাবে কেন? আমার তো উকিলই ছিল না, কে তলব করবে?"
"অশ্বিনী মাতাল তো সাক্ষী দিয়েছিল।"
"হ্যাঁ, ও-ই তো প্রধান সাক্ষী।"
"কি বলেছিল হারামীটা?"
"কি আর বলবে! আসলে আমি বা দাদা, কেউই ধরতে পারিনি পবনের শয়তানিটা। বাপের পরামর্শে দাদাকে উড়ো চিঠি দিয়ে পবন জানায়, বড়লোকের ছেলে বলে আমি নাকি পবনের পিছুনে ছুটছি। দাদাকে সাবধান করে আমাকে সামলাতে বলে। এই নিয়ে একদিন বিকালে দাদা আমায় বকাঝকা করেছিল খুব। অশ্বিনী সেটা শুনতে পায়, পবনকে লাগায়। তখনই পবন ঠিক করে দাদাকে খুন করে এক ঢিলে দুই পাখি মারবে; দাদাকে সরানো হবে মামলা থেকে, আর আমাকেও জব্দ করা হবে।"
"নিতাই পাল যে গুন্ডা লাগিয়েছিল, ভোলাদা তো জানত সে কথা!"
"জানত। কিন্তু ভাবতে পারেনি, বাড়ি এসে চড়াও হবে গুন্ডাগুলো। আমিও বুঝতে পারিনি কিছু।"
"ভোলাদা যে খুন হয়েছে, সেটা অশ্বিনী জানল কী করে?"
"পবনই শিখিয়ে-পড়িয়ে পাঠিয়েছিল ওকে। সাড়া না পেয়ে গোয়ালঘরে খোঁজ করতে গিয়ে দেখি, রক্তের স্রোত বইছে দাদার শরীর থেকে। ঠিক রাখতে পারিনি নিজেকে। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই দাদার ওপর। রক্তে ভিজে গিয়েছিল আমার কাপড়চোপড়। টের পাইনি। ওই অবস্থায় পুলিশ এসে আমাকে দেখে।"
"পুলিশ খবর পেল কী করে?"
"আরে, পুলিশকে আগে থেকেই পয়সাকড়ি খাইয়ে রেখেছিল পবনের বাপ। অশ্বিনীকে বলা ছিল, ও-ই গিয়ে ডেকে আনে পুলিশকে। দাদার সঙ্গে আমার ঝগড়ার কথা জানায়।"
"শয়তান!" বিলাসী বলে। "তারপর!"
"তারপর আর কী! নিতাই পালের খেল; থানার দারোগা, মাতাল অশ্বিনী আর দু-একটা সাজানো সাক্ষী, ব্যস। উড়ো চিঠিটা অবশ্য প্রমাণ হিসেবে পুলিশ পেয়ে গিয়েছিল, দাদার বাকসো থেকে।"
"ইস!"

"যাকগে," লক্ষ্মী বলে, "ওসব ছাড়। যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। এখন পবনকে আমার চাই, একবার ডেকে দিতে পারিস হারামীটাকে?"
"ডাকলে কি আসবে? এখন তার বিরাট রমরমা; লোকলস্কর, গাড়ি, ব্যবসা..."
"আসবে, আসবে," লক্ষ্মী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, "আমার কথা বললে ঠিক চলে আসবে। গিয়ে বল না একবার, আমি ডাকছি। তারপরেও যদি না আসে, তখন তো অন্য রাস্তা নিতেই হবে।"

লক্ষ্মীর এই আত্মবিশ্বাসকে ফেলতে পারল না বিলাসী। সন্ধে পার করে ইঁটখোলায় গিয়ে লক্ষ্মীর কথাটা বলতেই চমকে উঠল পবন, চোখ এড়াল না বিলাসীর। তবে বাবুলোক তো, ভাঙল না লোকজনের সামনে, দিব্যি হজম করে গেল সবটা। এমনকি এটাও বলল না, দেখা করতে আসবে কি না।

সবকিছু শুনে লক্ষ্মী হাসল। বলল, "ওর বাবা আসবে, না হলে আমি তো ভূত হয়ে চাপব ওর ঘাড়ে! ওকে আসতেই হবে, আজ রাত্তিরেই। সজাগ থাকিস, বিলাসী।"

মাঝরাত্তির পার করে খিড়কির দরজায় টোকা পড়তেই লাফিয়ে উঠল বিলাসী, "এসেছে।" ওর হাত ধরে বসিয়ে দিতে দিতে লক্ষ্মী বলল, "আমি দেখছি, তুই পাশের ঘরে যা।"

কথাবার্তা শুনে ফেলার মতো অবাঞ্ছিত কেউ কাছাকাছির মধ্যে নেই ধরে নিয়ে দুজনের কেউই নিচু গলায় কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছিল না। সুতরাং পাশের ঘর থেকে দরমার ফাঁক দিয়ে প্রায় সমস্ত কথোপকথনটাই শুনতে পাচ্ছিল বিলাসী, আর শুনতে শুনতে ভাবছিল, কী সাহসটাই না হয়েছে লক্ষ্মীর! পবনের মতো লোককে বলে কী না, "আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই!"

বউ ছাড়া আরও দু-দশটা মেয়েছেলে পবন ঘেঁটেছে, কিন্তু সেই পোড় খাওয়া পবনও চমকে উঠেছিল লক্ষ্মীর কথা শুনে, "কি বলছ কী!"

কত রকম রঙ্গই না শিখেছে লক্ষ্মী, বিলাসী অবাক হয়ে দেখছিল দরমার ফাঁকে চোখ রেখে। পবনকে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে লক্ষ্মী গলা জড়াল পবনের, "ঠিকই বলছি। জানো, জেলে বসে আমি অনেক ভেবেছি। আর তো কেউ নেই আমার। তাছাড়া তুমি তো একসময়ে আমাকে চাইতে। চাইতে না, বলো! আমি ঠিক করেছি, তোমাকেই বিয়ে করব। কী বলো! আমাকে পছন্দ নয় তোমার?"
"কিন্তু এখন যে আমার বউ আছে, লক্ষ্মী!" কাতর স্বরে বলে পবন।
"সাধুপুরুষ নাকি! সরিয়ে দাও। পারবে না?"
"হ্যাঁ। কিন্তু... না, মানে...!"
"জেল খেটেছি বলে ঘেন্না কর আমাকে? সে তো খেটেছি তো তোমাকে বাঁচানোর জন্য!"
"সে সব কথা এখন থাক।"
"থাকবে কেন, পবনদা? এখন আমার হাতেও পয়সা আছে গো, আমিও উকিল লাগিয়ে মামলা চালু করতে পারি নতুন করে। তখন কী করবে?" বিলাসী ভাবে, মোক্ষম প্যাঁচ কষেছে বটে মেয়েটা!

পবনের গলায় অনুনয়ের সুর, "আমি এসবের থেকে সরে এসেছি, লক্ষ্মী। আমি এখন ব্যবসা করি, বড় বড় লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করি। সবাই জানে আমি সমাজের একজন মান্যগণ্য লোক। আমাকে তুমি ছেড়ে দাও, লক্ষ্মী! তোমার কী চাই বল, আমি দেব। শুধু আমাকে তুমি মামলা-মোকদ্দমার মধ্যে জড়িও না।"

পিছন থেকে ফস করে একটা আনকোরা মদের বোতল বের করে লক্ষ্মী বলে, "এটার থেকেও সরে এসেছ নাকি!"
"ইয়ে, মানে মদ তো একটু-আধটু খেতেই হয় বড় মানুষদের সঙ্গে বসলে। তবে ওইটুকুই, বাড়াবাড়ি চলে না।"
"কেন গো, বউয়ের ভয়ে! বউকে তুমি ভয় করো?"
"না না, তা নয়।"
"পবনদা, যেরকম ছুরি দিয়ে দাদাকে খুন করেছিলে তোমরা, সেরকম ছুরি একটা আমার সঙ্গেও আছে।" এ পর্যন্ত শুনে শিউরে ওঠে বিলাসী, কী সাংঘাতিক! কী বলে কী মেয়েটা!
"জেল খাটা আমার কাছে এখন আর নতুন কিছু নয়। তোমাকে মেরে আমি আবার জেলে যেতে পারি," লক্ষ্মী বলে চলে। "ভেবে দেখ, আমার কথা শুনবে কি না! বউটাকে সরিয়ে আমাকে বিয়ে করবে কি না!"
"খুন তো আমিও তোমাকে করতে পারি," পবন সোজা হয়ে বসে।
"অত সোজা নয়। আর তাছাড়া খুন হলে তো আমার জ্বালা জুড়োয়! আমার জন্য কাঁদার কেউ নেই। তোমার কিন্তু অনেক পিছুটান! তবে আমি খুন হওয়ার আগে তোমার সর্বনাশ করে ছাড়ব।"
"পাগলামি কোরো না। চাইলেই কি সঙ্গে সঙ্গে সব করা যায়!" পবন চাপা গলায় বলে।
"কবে করা যাবে, বলো তো?"
"কবে মানে, বললুম তো, সময় লাগবে।"
"তত দিন আমি কী করব!"
"সে জন্য তো আমি আছি," পবন আশ্বাস দেয়। "কি সুন্দর দেখতে হয়েছো মাইরি! খুব ইচ্ছে করছে আজকের রাতটা তোমার সঙ্গে গা-ঘষাঘষি করে কাটাতে।"

বিলাসী এই অবস্থায় দুজনের কারওকেই দেখতে পাচ্ছিল না। তবে এটা বেশ বুঝেছিল যে পবন লক্ষ্মীর ডাক ফেরাতে পারবে না। লক্ষ্মী যে রকম সুন্দরী হয়েছে, তা-তে পবনের নিজেকে সামলানো মুশকিল হবে। লক্ষ্মী হল দাউদাউ করে জ্বলা আগুন, তার সামনে পবন তো একটা তুচ্ছ মাছিও নয়। লক্ষ্মীর আগুনে পবনের পুড়ে মরার দৃশ্যটা দেখবে ভেবেছিল, কিন্তু দু-চোখে ঘুম জড়িয়ে বিলাসীকে বসে থাকতে দিল না। এরপর কখন পবন চলে গেছে, কিছুই মালুম হয়নি ওর।

ভোরবেলা খিড়কি পুকুরে স্নানে যাওয়ার সময়ে বিলাসী দেখল, সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে, জলের কিনার ঘেঁষে বসে আছে লক্ষ্মী। না দাঁড়িয়ে গোটা চারেক ডুব দিয়ে উঠে যাওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করল, "তুই মদ খাস!"

লক্ষ্মী উঠে দাঁড়িয়ে বিলাসীর মুখের কাছে মুখ এনে হাঁ করল, "নে, শুঁকে দেখ।"
লক্ষ্মীর মুখে গত রাতে চিবোনো পানের গন্ধ পেল বিলাসী। বলল, "তবে যে মদের বোতল বার করলি!"

"তা'তেই মদ খাওয়া হয়ে গেল! আসার সময়ে পালপুকুরের দোকান থেকে কিনে এনেছি," লক্ষ্মী জানায়, "পবনের কথা ভেবেই কিনে রেখেছিলাম।"
"কি সাংঘাতিক মেয়েছেলে রে তুই!" বিলাসী না বলে পারে না। ঘাট থেকে একসঙ্গে দুজনে ফিরতে ফিরতে বিলাসী জিজ্ঞেস করে, "আর কী কী করেছেন মহারানি?"

লক্ষ্মী মুখটিপে হাসে, "দু-বছরের সাজা মকুব হয়েছিল আমার। জেল থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে কী করে জানি কলকাতা পৌঁছে গেলুম। বৃত্তান্ত শুনে কেউ ঠাঁই দিতে চায় না। জেল খাটার কয়েকটা পয়সা শেষ হতে আর কতক্ষণ! শেষে মুড়ি কিনতে গিয়ে একজনের সঙ্গে দেখা। আমাকে বললে, গতর খাটাতে পারবে? আমাকে নিয়ে গেল এক বড়লোকের বাড়ি। বহাল হলুম সেখানে। কত্তার ফাইফরমাশ খাটতুম আর রাত্তিরে শুতে যাওয়ার আগে আমাকে খানিক ধামসাত মিনসেটা। বলত, নাকি খুব সুখ হয় আমাকে ধামসালে। ট্যাকা-পয়সাও দেদার দিয়েছে লোকটা। আমার কাপড়জামা, গয়না, সবই তো ওর দেওয়া। এবার বুঝলি কিছু?"

দাঁড়িয়ে পড়ে বিলাসী, "তুই বেবুশ্যে হলি শেষকালে!"
"কি করি বল! বাপ-দাদা নেই মাথার ওপর, আত্মীয়-স্বজন ঘরে নেবে না। বে-থাও হবে না কোনো দিন। মরতে তো পারি না! ওদিকে পেটে তো দিতে হবে কিছু। জেলের ভাত খেয়ে গতরটা শাঁসে জলে হয়েছিল বলে বাবুর ভারী পছন্দ ছিল আমাকে। নানারকম ক্রিম, পাউডার কিনে দিয়ে বলত, মেখে ফরসা হ' লক্ষ্মী। তা হলুম যে, সে তো দেখতেই পাচ্ছিস!"
"ভালোই তো ছিলিস, গাঁয়ে ফিরলি কেন, মুখপুড়ি?"
"পবনের জন্য। কাল রাতে ওকে দিইছি শেষ করে।"
"শেষ করে দিয়েছিস, কী করে!" বিলাসী কৌতূহল চাপতে পারে না।
"দু-বোতল মদ গিলে হারামীটা যখন মাতাল হল, তখন আমি ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে পালপাড়ায় ওদের বাড়িতে ওর বউয়ের কোলে ফেলে দিয়ে এসেছি। সঙ্গে, ওর পাঞ্জাবিতে ভরে দিয়েছি আমার একটা ভেতরের জামা আর সিঁদুর কৌটো। পবন রাজি না হলে কী হয়, ওর বউকে বলে এয়েছি, আজ আমাদের বিয়ে।"
"তুই এসব করলি!"

"এ আর কী এমন! খুন তো করিনি! অবশ্য খুনটা পবনই করবে। ফিরতে ফিরতে শুনতে পেয়েছি, ওর বউটা উদোম চেল্লাচ্ছে আর গালাগাল দিচ্ছে পবনকে। তারপর বউটা একবার বিভৎস চেঁচিয়ে উঠে চুপ করে গেল হঠাৎ। আমি আর দাঁড়াইনি। খুনটা হয়তো করেই ফেলল পবন।"

বিকেলে ভাতঘুম দিয়ে উঠে লক্ষ্মী যখন আড়মোড়া ভাঙছিল, বিলাসী ছুটতে ছুটতে এসে ঘরে ঢুকে বলল, "লক্ষ্মী, তুই পালা।"
লক্ষ্মী বিলাসীর চোখে চোখ রেখে স্থির হয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর কেটে কেটে বলল, "পালাবো কেন?"
"পবন সত্যিই বউটাকে খুন করেছে। পুলিশ এয়েছিল পবনকে খুঁজতে, পবন ফেরার। এরপর যদি পবনের খোঁজখবর করতে এখানে আসে!"

লক্ষ্মী রহস্যের হাসি হেসে বলল, "যাঃ! পবনের সঙ্গে আমার যোগাযোগের একমাত্র সাক্ষীই তো মরে গেল, আমার কথা আর কে বলবে পুলিশকে? তবে হ্যাঁ, তোর ঘাড়ে আর চেপে থাকব না, আজই চলে যাব, আমার কাজ তো শেষ!"
"কোথায় যাবি?"
"কেন, যেখান থেকে এলুম, সেই কলকাতায়, বেবুশ্যেদের পাড়ায়।"




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের আষাঢ় সংখ্যাটি প্রকাশিত হবে ২৫ জুন, ২০২৬। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ২০ জুনের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মান। বিস্তারিত তথ্য এবং লেখা পাঠানোর ডিজিটাল ফর্ম ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত বা বিশ্লেষণ Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত বা বিশ্লেষণ Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top