সব কটি অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
শেষ অধ্যায়
➖ কিরে এবার কী নিয়ে আলোচনা করবি?
সবজান্তা দাদার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, “মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বা ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ নিয়ে।”
➖ এরকম অভিজ্ঞতা কাদের হয়?
➖ সেই ব্যক্তির, যিনি ক্লিনিক্যালি মারা যান (বা প্রকৃত মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান) এবং পুনরুজ্জীবিত হন। প্রায়শই, সেই ব্যক্তি অসাধারণ, এমনকি অস্বাভাবিক, মৃত্যু পরবর্তী এক জীবনের কথা বলেন। ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ শব্দটা ১৯৭০ সালের সময় একজন আমেরিকান চিকিৎসক ডাঃ রেমন্ড মুডি ব্যবহার করেছিলেন। তার চিকিৎসার অধীনে থাকা রোগীরা এই রকম অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল।
➖ বুঝলাম, তা তারা ঠিক কি ধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে?
➖ বেশিরভাগ মানুষ যাদের ‘এন ডি ই’ হয়েছে তারা প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাদের মনে হয়েছে যে শরীর ছেড়ে একটা সত্তা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। নিজের শরীরের উপরে ভেসে থাকার অনুভূতি লাভ হয়েছে তাঁদের নিচে পড়ে থাকা শরীরটাকে তাকিয়ে দেখতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তারা।
➖ ব্যাস এইটুকুই?
➖ না, না। ওই সব মানুষেরা জানিয়েছেন ওই মুহূর্তে সবকিছু থেকে প্রায় উদাসীন বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি হয়েছে তাঁদের। মনে হয়েছে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে। সুখ বা আনন্দ অনুভব করছেন। এক দীর্ঘ, আলোকিত সুড়ঙ্গ বা পথ দিয়ে যাচ্ছেন এটাও মনে হয়েছে ওদের।
➖ নিজের শরীর ছাড়া আর কিছু দেখার কথা বলেছেন নাকি ওরা?
➖ বলেছেন তো। একাধিক অশরীরী অবয়ব নাকি দেখেছেন ওরা। যাদের ভিতর অচেনা মানুষ ছাড়াও মৃত বন্ধু বা আত্মীয় এবং নানান মহাপুরুষদের দেখা গিয়েছে । ওই অবয়বদের আকার প্রকার উজ্জ্বল এবং পরনে সাদা পোশাক।
➖ কিছু শুনতে পাননি?
➖ অবশ্যই পেয়েছেন আর সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্পিরিট ওয়ার্ল্ড’ বা আত্মাদের জগত থেকে তাদের কাছে ভেসে এসেছে এক কন্ঠস্বর। যে কণ্ঠ জানিয়েছে, ওই মানুষটার এখনও মরার সময় হয়নি, তাই তাকে আবার পার্থিব জগতেই ফিরে যেতে হবে।
➖ বুঝলাম। এবার বল তোর নিজের এবিষয়ে কি মতামত?
➖ দাদা, প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ যারাই ‘এন ডি ই’ অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তারাই বলেছেন যে, তাদের কাছে এটা ইতিবাচকভাবে জীবনকে নতুন করে শুরু করার উদ্যম বলেই মনে হয়েছে। অধিকাংশই এরপর থেকে মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার ব্যপারটাকেই মন থেকে মুছে ফেলেন। মৃত্যুর পরেও ‘বেঁচে’ থাকা যাবে এই বিশ্বাস গড়ে ওঠে তাদের মনে। অনেকেই বেশি মাত্রায় ধার্মিক হয়ে যান। নিজ নিজ বিশ্বাসের ‘ঈশ্বর বা মহান শক্তি’র প্রতি তাদের ভরসা বেড়ে যায়। একটু বেশি পরিমাণ সৎ হয়ে যান।
➖ আর এসব কিছুই একটা সমাজ পরিচালকরা চেয়েছিলেন, এটাই বলবি নিশ্চয়।
“অবশ্যই।
➖ এন ডি ই নিয়ে বিরোধীরা তদন্ত করেননি?
➖ না করে ছাড়বে বলে তোমার মনে হয়। এই তত্বের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো, যারা এন ডি ই অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, সেই সমস্ত মানুষদের কাছে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, যা প্রমাণ করে যে, উনি ঠিক কী অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন!
➖ আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এর উত্তর পাওয়া খুব একটা মুস্কিল নয়। মানুষকে যদি কোনও একটা বিষয়ে ছোটো থেকে একদমই অবগত না করানো হয়, তাহলে কোনোদিনই সে সেই বিষয়ে কোন কিছু চিন্তা করতে পারবে না। বেশির ভাগ মানুষ বিশেষ করে কিছু বিশেষ ধর্মের সূত্রে ছোটো থেকেই শোনে এক অন্ধকার পথ পার হয়ে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে যেতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই একটা রূপকল্প মনে মনে তৈরি হয়েই থাকে যে, সেই পথের শেষে আলো থাকবে। আর আমাদের অদ্ভুত মস্তিষ্ক কী অসাধারণ সব গল্প বানাতে পারে তার প্রমাণ তো দাদা আমাদের দেখা অদ্ভুত কিম্ভুত সব স্বপ্ন।
➖ এর অর্থ তাহলে একটাই দাঁড়াচ্ছে। যতক্ষণ না কেউ সত্যি সত্যিই মারা যাবে এবং দু একদিন পরে ফিরে আসবে–ততদিন অবধি এই এন ডি ই-এর ব্যাপারটা সম্ভবত একটা অমীমাংসিত রহস্য হয়েই থেকে যাবে।
➖ কিন্তু দাদা তার সঙ্গেই কিন্তু সত্যিটা কতটা আমাদের সামনে আসবে সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। কারণ, এর ফলে সভ্যতার ভিত নড়ে যাওয়ার সম্ভবনাও থাকবে। ঠিক যেমনটা ঘটবে সত্যিই কোনোদিন ঈশ্বরের ‘বাস্তব’ প্রমাণ পাওয়া গেলে!
➖ তোর কাছে কোনও বিখ্যাত মানুষের এরকম অভিজ্ঞতার গল্প আছে?
➖ আছে। অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলর। ১৯৬১ সালের মার্চ মাস, ‘ক্লিওপেট্রা’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন সময়ে উনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। অবস্থা চিন্তাজনক হয়ে যায়। মাঝে মাঝেই কোমায় চলে যাচ্ছিলেন। এক সময় হৃদপিণ্ড থেমেও যায়। ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ যাকে বলে। অবশ্য ডাক্তারদের চেষ্টায় তাকে আবার বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়। পরে হাসপাতালের জন্য ফান্ড রেইজিং প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার সময় উনি নিজের এন ডি ই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। জানান, তার দেহ থেকে বেরিয়ে আসা একটা সত্তা প্রথমে ভেসে থাকে তার শরীরের ওপর, তারপর একটা লম্বা সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। অনেক দূরে একটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছিল। এই সময়ে একটা কন্ঠস্বর শোনা যায়, যে নির্দেশ দেয় নিজের শরীরে ফিরে যাওয়ার।
➖ অর্থাৎ সেই থোড় বড়ি খারা গল্প...” মুচকি হাসলেন সবজান্তা দাদা।
➖ একটু অন্য রকম গল্প বলেছেন কিছু মৃত্যুপথ যাত্রী মানুষ। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে এক বা একাধিক অশরীরীকে তাঁদের আশেপাশে দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। একে বলা হয় ‘ডেথবেড ভিশন’।
➖ আরে ১৯২৬ সালে স্যার উইলিয়াম ব্যারেট ওই একই নামে একটা বই প্রকাশ করেছিলেন না?
➖ একদম করেছিলেন। ওখানে উনি এরক্ম অনেক ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন। যেখানে মৃত ব্যক্তি মরার আগের মুহূর্তে মৃত আত্মীয়দের দেখা পেয়েছে। যারা নাকি এসেছিল মৃত্যু পরবর্তী জগতে যাওয়ার পথে সাহায্য করার জন্য।
➖ এই সূত্রে বুঝলি আমার মনে পড়ল ১৯৫১ সালে প্যারাসাইকোলজি ফাউন্ডেশন এর সহায়তায় ডাক্তার কার্লিস ওসিস ৫০০০ ডাক্তার এবং ৫০০০ নার্সদের কাছে থেকে মৃত্যুর সময়ে তাদের অধীনে থাকা রোগীদের কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন। তার এই গবেষণার নাম ‘ডেথবেড অবজার্ভেশনস বাই ফিজিশিয়ান অ্যান্ড নার্সেস’। সেখান থেকে উনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, মৃত ব্যক্তিরা ওই মুহূর্তে স্বাভাবিক চেতনার জগতেই থাকেন এবং মৃতদের আবির্ভাব ‘প্রত্যক্ষ’ করেন। এই সময় তারা যাদের দেখা পান তারা বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন। আবার এমন অনেকে হাজির হন যারা মারা গিয়েছেন সে খবর তারা পাননি।
আমি বললাম, “আচ্ছা, এগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে মৃত্যুর পরেও আত্মার বেঁচে থাকার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ বলেই বিবেচনা করা যায় তাই না?”
➖ প্রশ্নটার উত্তর পাওয়ার জন্যই কি করলি? বলেই ফ্যাল কি বলতে চাইছিস।
➖ আরও প্রশ্ন করতে চাইছি। যেমন ধরো শুধুমাত্র মরার সময়েই এই ভূতুড়ে আত্মীয়দের আগমন ঘটে কেন? অন্যান্য সময়ে কেন তারা আসে না গল্পগাছা করার জন্য?
➖ এর উত্তর তো শুধুমাত্র বিশ্বাসের উপর টিকে আছে ভাই। কখনও কখনও, এটাও শোনা যায় শুধু যিনি মারা যাচ্ছেন সেই ব্যক্তিই একা ভূ্তের দেখা পান না। এমন অসংখ্য ঘটনার খবর পাওয়া গেছে মৃত্যুকালীন সময়ে উপস্থিত মানুষেরাও নাকি এরকম অশরীরী সত্তাদের দেখা পেয়েছেন। এর কতটা গল্প, কতটা সত্যি বা কতটা বিভ্রম বা মনের কল্পনা তার উত্তর পাওয়া অসম্ভব। সবটাই ওই ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু…’।
মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতার সময় সত্যিও কেউ আলোকিত সুড়ঙ্গের দেখা পেয়েছে কিনা? ভুতুড়ে বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে তেঁনারা নেমে আসেন কিনা বা জানালায় সত্যি তেঁনারা রূপ পরিগ্রহ করেন কিনা, এর যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর নেই? কিন্তু বিশ্বাসীদের কাছে এগুলোই তেঁনাদের অস্ত্বিতের প্রমান। আর গল্প লেখকদের কাছে মানুষকে ভয় দেখানোর আদর্শ মালমশলা।
ভূতের কিংবদন্তি হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সঙ্গে রয়েছে এবং আরও হাজার হাজার বছর ধরে থাকবে। যতদিন মানব সমাজ ও সভ্যতা থাকবে আমার মনে হয় আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক ততদিন অবধি বর্তমান থাকবে। খেতে পাক না পাক, মানুষের কাজ থাকুক বা না থাকুক, মানুষ ভূত দেখতেই থাকবে।
শেষ অধ্যায় উপভোগ করেছেন?
সব কটি অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।