১
গ্রামটার নাম কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু মুখে কেউ বলে না। মানুষ নাম বললে জায়গাটা বাস্তব হয়ে যায় — এই ভয়েই হয়তো ওরা নামটা এড়িয়ে যায়।
শহর থেকে নামতে হয় শেষ বাসস্টপে। তারপর মাটির রাস্তা। দু’পাশে ধানক্ষেত। সন্ধে নামলেই বাতাসে কেমন একটা কাঁচা গন্ধ — পচা পাতা, ভেজা মাটি আর পুরোনো জলের। গ্রামে ঢোকার মুখে একটা বটগাছ। লোকেরা বলে, রাত হলে ওই গাছের নিচে দাঁড়ানো ছায়াগুলো গাছের না। আমি তখন এসব বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি — সব কিছুর ব্যাখ্যা থাকে।
আমার নাম অনিরুদ্ধ সেন। কলেজে সমাজবিদ্যা পড়ি। গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাস নিয়ে গবেষণা করছি। আর সেই গবেষণাই আমাকে এই গ্রামে এনেছে।
২
প্রথম দিন সব স্বাভাবিকই ছিল। লোকজন কথা বলেছে, চা খাওয়ানো হয়েছে, থাকার ঘর দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িটা পুরোনো স্কুলঘরের পাশে। এক সময় প্রধান শিক্ষকের ছিল। এখন ফাঁকা। রাত দশটার পর গ্রাম যেন নিঃশ্বাস আটকে রাখে। কুকুর ডাকে না। ব্যাঙ থেমে যায়। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দও কেমন অদ্ভুতভাবে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আসে।
রাত তখন আনুমানিক দেড়টা। আমি ঘুমোচ্ছিলাম। হঠাৎ শুনলাম — "অনিরুদ্ধ..."
ঘুম ভেঙে গেল। গলাটা চেনা। অত্যন্ত চেনা। আমার মায়ের গলা। আমি উঠে বসলাম। হৃদপিণ্ড এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে। মা তো শহরে, এখানে নেই!
আবার ডাক এল — "অনিরুদ্ধ... দরজাটা খুলে দে।" গলায় ঠিক সেই আবেগ — যেটা মা ব্যবহার করে যখন আমি অসুস্থ থাকি। আমি বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এক পা এগোলাম। ঠিক তখন মনে পড়ল গ্রামের লোকেদের কথা — "নিশি ডাক শুধু নাম ধরে ডাকে।"
আমি থেমে গেলাম।
৩
পরদিন সকালে গ্রামবাসীদের বললাম। কেউ অবাক হল না। এক বৃদ্ধ বললেন, "প্রথম ডাক মানেই শেষ নয়।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "শেষ মানে?"
তিনি চুপ করে গেলেন।
গ্রামে একজনই খোলাখুলি কথা বললেন — মৃণাল কাকু। তিনি বললেন, "নিশি কোনো ভূত না।"
আমি অবাক! "তাহলে?"
"ওটা একটা ছায়া। মানুষেরই তৈরি। চল্লিশ বছর আগে গ্রামের এক নারী — কমলা। স্বামী মারা যাওয়ার পর সবাই তাকে অপয়া ভাবত। এক রাতে গ্রামের লোকেরা তাকে জঙ্গলে ফেলে আসে। সে চিৎকার করেছিল। নাম ধরে ডেকেছিল। কেউ যায়নি।"
মৃণাল কাকু আরও বললেন, "মানুষ মরলে শরীর মরে। ডাকটা থেকে যায়। সেই ডাকটাই নিশি।"
৪
সেই রাতেই আবার ডাক। এবার আমার বাবার গলায় — "বাবা... বাইরে আয়।"
আমি জানালা দিয়ে তাকালাম। বাইরে কেউ নেই। কিন্তু ডাকটা একদম দরজার সামনে।
সকালে দরজার সামনে কাদা। একজোড়া পায়ের ছাপ আমার দরজার সামনে এসে থেমেছে।
আমি পালাতে পারতাম। কিন্তু গবেষক মন বলল — এটা শেষ না করলে ছাড়বে না। আমি মৃণাল কাকুকে বললাম, "আজ রাতে সব শেষ করব।"
তিনি বললেন, "ডাক শোনো। উত্তর দিও না।"
রাত তিনটে। ডাক এল — "অনিরুদ্ধ..."
আমি জানালা দিয়ে তাকালাম। বাইরে দাঁড়িয়ে আমি নিজেই! একই মুখ। একই ভঙ্গি। —"আমি তুই।"
আমি ফিসফিস করে বললাম, "ও কী চায়?"
মৃণাল কাকু বললেন, "একটা উত্তর।"
ছায়াটা দরজায় হাত রাখল।
বলল, "একবার বল — ‘কে?’"
আমি চুপ।
একসাথে হঠাৎ ছায়াটা চিৎকার করল। সব মানুষের গলা একসাথে — "আমরা সবাই।"
হ্যারিকেন নিভে গেল। অন্ধকার। নিশ্চুপ।
ভোরে দরজা খুলে দেখি মাটিতে লেখা — "ডাক শুনলে যাবি।"
আমি সেদিনই গ্রাম ছেড়েছিলাম। কিন্তু নিশি ডাক ছাড়েনি।
আজও গভীর রাতে, ঘুমের ঠিক আগে — কেউ আমার নাম ধরে ডাকে। আমি জানি, একদিন ভুল করে উত্তর দেব।
লেখক একজন কৌতূহলী পর্যবেক্ষক, যিনি গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাস, মানুষের ভয়, স্মৃতি ও নীরবতার মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখায় বাস্তব ও কল্পনার সীমা ধীরে মুছে যায়। সহজ ভাষা, ধীর গতি ও গল্পের আবহে তিনি পাঠককে অচেনা অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করান, যেখানে প্রশ্নের চেয়ে অনুভূতিই বেশি শক্তিশালী।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।