কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
কাঁচ ও কায়ার দূরত্ব
অশোক নন্দন
রাস্তার ওপাশে ওই হলদেটে চারকোণা আলো,
আমার জানলার আয়নায় ঠিকরে পড়ে রোজ।
পর্দার আলগা ভাঁজে এক টুকরো সংসার —
ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ,
কয়েকটা আধচেনা স্বর,
আর একটা ছায়া,
যে একা বই পড়ে ঘাড় নিচু করে।
আমি দেখি।
আমার দেখার ভেতর কোনো দাবি নেই,
ঠিক যেমন সাদা পর্দার ওপারে কোনো প্রবেশপথ নেই।
মাঝে ওই কয়েক হাত হাওয়া
আর এক চিলতে কাঁচ,
যেন দুই ভিন্ন গ্রহের মাঝখানে অলঙ্ঘ্য মহাকাশ।
ওর হাসির শব্দ এপাশে আসে না,
আমার দীর্ঘশ্বাস ওপাশে যায় না।
আমি শুধু এক মুগ্ধ দর্শক,
বিপ্রতীপ জীবনের সাক্ষী;
ওর ড্রয়িংরুমের গাছটার বেড়ে ওঠা দেখি,
দেখি বিষণ্ণ বিকেলে ওর আলো নেভানোর ভঙ্গি।
অথচ ওর ব্যক্তিগত অন্ধকারে
আমার কোনো অধিকার নেই,
আমি কেবল এক চিরস্থায়ী বাইরের মানুষ।
আজ রাতে হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় পর্দাটা সরে গেল,
আর ঠিক তখনই খেয়াল করলাম,
রাস্তার ওদিকের অন্য এক জানলায় —
অন্ধকারে স্থির হয়ে বসে আছে
অচেনা কোনো এক অবয়ব।
এক নিস্পলক দৃষ্টি
আমায় বিঁধছে গভীর নিস্তব্ধতায়;
মুহূর্তে বুঝলাম,
আমিও কারো কাছে এক নিষিদ্ধ দৃশ্য মাত্র —
কারো জানলার ওপাশে
আমিও আজ বন্দি এক অন্য জীবন।
আশীর্বাদ
ত্রিকূটনাথ অঘোরী
এক খন্ড পৃষ্ঠায় যেন আঁকিবুঁকি কেটেছে;
ভূপৃষ্ঠের নদী পুকুর খালবিল এভাবেই ছুটে গেছে।
প্রকৃতির যৌবনের মাতাল রূপে বিভোর,
তরু কান্তার যেন যৌনতায়নিস্তব্ধ হয়ে আছে।
দর্শক গগনের অঝোর ক্রন্দন ধারা নিয়ত সিক্ত করে,
কিছু স্মৃতি মুছে দেয়;
যেন ভুল শব্দের বানান।
কান্তার পথে নির্ভীক চন্দ্রিমা একাকী নৃত্য করে,
জোয়ার ভাটায় রূপক ছলে;
তরুলতা আর গুল্ম পেতে রাখে কান।
প্রকৃতি মিলনের নন্দ পরিহাসে অশান্ত ভানু লুটোপুটি খায়
লজ্জার আনাচে কানাচে;
পাগল হয়ে ওঠে নিসর্গ।
কলকল ধারা ছলছল হারা আবেগী নির্ঝরিণী,
ফুরুফুরু সমীরে উরু উরু মহীরুহ পল্লব নাচে;
কাঁপে অনন্ত কাঁপে ভূস্বর্গ।
ঝুরুঝুরু পরশে আগ্নেয়গিরি বরষে গুরুগুরু শব্দের লাজে,
রাঙা পর্বত শৃঙ্গের সাজে;
বেদনার আর্তনাদ শুনতে চাও।
দুরু দুরু বুকে সুরাসুর সুখে আত্মহারা প্রাণীকুল,
জন্ম মৃত্যুর চাদরে ঢাকা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে;
যত অবান্তর ইচ্ছা সাজাও।
ঝিকিমিকি তারা মিটিমিটি হাসে অমাবস্যার রাতে,
ধিকিধিকি জ্বলে অশান্ত অভিমানী চন্দ্রিমা;
আদিত্য অভিসার আলিঙ্গনে।
বিন্দু বিন্দু বরিষ ধারা হিন্দু সিন্ধু সরিৎ এ ঝরা,
রবি চন্দ্র মিলন বেলায় যেন নাচে তালে তালে;
কল্লোলিনীর হৃদয় অঙ্গনে।
একাকী নির্জন নিহারিকার অগুন্তি স্রোতে ভেসে,
অজুত সাংখ্য দর্শনে হেসে হেসে কথা বলে;
উলঙ্গ কালপুরুষ দোতারা হাতে —
বিজলীর তরঙ্গে ছলকে ছলকে ওঠে তোমার মঞ্চ;
পবন দাপটে বাগিচায় ঝরে পড়ে পুষ্পবৃষ্টি,
আমি ঘুমিয়ে পড়ি গভীর রাতে।
ঢুলুঢুলু আননে স্বপ্নের কাননে আপনারে ভুলি;
গহীন নিদ্রায় কে যেন গোধূলির আলো মেখে,
বিস্তৃর্ণ জলধির পরে —
এক পক্ষ কৃষ্ণ নামে ষোল সূর্যের বাঁধন খুলে;
দ্বি পক্ষ শুক্লা নামে ডাক শুনে রাধিকা বলে,
হরে কৃষ্ণ হরে রাম রাম রাম হরে...
নতুন দিনের আলো
তীর্থঙ্কর
আমার সূর্য ওঠা সকাল, নতুন দিনের আলো।
অনেক বৃষ্টি পরে, শীতের সকাল এলো।
ঝাপসা গাছপালা, কুয়াশায় ঢেকে দিল।
অনেক দিনের পরে শীতের সকাল এলো।
বৃষ্টি ভেজা মনে, হারানো যত আশা।
শীতের দিনে নতুন করে, বাঁধুক নতুন বাসা।
কুয়াশা কেটে উঠবে রোদ, জ্বলবে নতুন আলো।
সবটুকু বাধা পেড়িয়ে এবার, ঘুচুক মনের কালো।
বৃষ্টি গেলো বানভাসি করে, ভেঙ্গে দিয়ে যত খেলা।
এই রোদ এই মেঘের মত, জীবন যুদ্ধের মেলা।
তোমার আমার দূরত্ব যাক, মুছে যাক যত ধুলো।
অনেক দিনের পরে জাগুক, নতুন স্বপ্ন গুলো।
টুনটুনি আজো ডাকে
মধুসূদন চক্রবর্ত্তী
বারান্দায় খেলতো খুকু রোজ সকাল হলে
টুনটুনিটা বসতো এসে পাশের গোলাপ ডালে,
মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে চিড়িক চিড়িক করে,
খেলা ভুলে অবাক চোখে দেখতো খুকু তারে।
বাবা বলতো, "বন্ধু তোমার, রোজ এসে ডাকে,
লুকোচুরি খেলে বেড়ায় ওই যে পাতার ফাঁকে"।
ইস্কুলে ভর্তি হোলো খুকু, খেলা উঠলো লাটে,
সকাল হলেই তাকে এখন মন দিতে হয় পাঠে।
নানারকম পড়ার মাঝে খেলার সময় নাই,
টুনটুনির কথা সবসময়ে মনে পড়ে না তাই।
ধীরে ধীরে উঠলো খুকু অনেক বড়ো হয়ে,
মনের মতো পাত্র দেখে বাবা দিলে বিয়ে।
টুনটুনিটা আজো ডাকে সেই চিড়িক চিড়িক,
চেয়ারে বসে বাবা শোনে চোখ করে চিকচিক।
হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা ফেরেনা তো আর!
সব খুকুই যে বড়ো হয়ে গড়ে তোলে সংসার।।
লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক। সাহিত্যে বরাবর আগ্রহী, কবিতা লিখতে ভালোবাসেন। ছাত্রজীবনে লেখার এতটাই শখ ছিল যে যে, স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার জন্য সহপাঠীদের লেখাগুলিও তিনিই লিখে দিতেন। জীবন বীমা নিগমে চাকরির ব্যস্ততার কারণে পরবর্তীকালে তাঁকে লেখালেখির জগৎ থেকে সরে আসতে হয়েছিল। অবসর গ্রহণের পর সেই জগতে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
প্রায়শ্চিত্তের ঘাটে
আভা সরকার মণ্ডল
খুব ইচ্ছে হঠাৎই একদিন গাছ হয়ে যাব।
স্বপ্ন এবং আশার স্তূপাকার শবদেহের উপর
সহনশীলতা, ক্ষমা, পরোপকার
ইত্যাদি শব্দগুলো বিছিয়ে রেখে
শেষ চিতাটি সাজিয়ে যাবো নিজের জন্য।
দমবন্ধ পৃথিবীর শেষ গাছটির
মৃতদেহ সৎকার অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য
সেদিন হয়তো অবশিষ্ট থাকবে না একটিও মানুষ!
আমি গাছ-জন্ম ছুঁয়ে ধুয়ে নেবো।
পূর্বজন্মের অপরাধ প্রার্থনা থাকবে —
সব মরে যাওয়া মানুষ,
নব জন্মে গাছ হোক —
আর গাছেরা মানুষ!
প্রায়শ্চিত্তের ঘাটে এসে
একবার অন্ততঃ দেখা হোক তাদের...
আজ আমি অনেক
আসারুল সেখ
জানো তো,
আজ আমি অনেক।
ওই যে দেখছ রাতের অন্ধকারে
গলির মোড়ে ল্যাম্পপোস্টের নীচে
একটা ছায়া একা দাঁড়িয়ে আছে —
ওটা আমি।
ওই যে দেখছ বিছানার কোণে শুয়ে
নীরবে সাফল্যের স্বপ্ন বুনছে —
ওটাও আমি।
রাস্তায় বের হলে যাকে দেখো
ভবঘুরের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে
উদ্দেশ্যহীন হাঁটছে —
সে-ও আমি।
ফাল্গুন-চৈত্রের ঝড়ে আম-লিচুর মুকুলের মতো
হঠাৎ ঝরে যাওয়া ছেলেটা —
সেও আমি।
তাই বলছি —
আমি একা নই,
আমার ভেতরে অনেক আমি বেঁচে আছে।
আজ আমি অনেক।
বহুদূর আমি একা
প্রসূন ব্যানার্জী
পৃথিবীর অবিশ্রান্ত কোলাহল থেকে বহুদূর
মহাশূন্যের সুনীল গভীরে পাড়ি দিতে
দুচোখ হয়েছে ভার,
তার আগে ঘন মেঘ তার বৃষ্টি ঝরিয়েছে অঝোরে,
অগাধ-অতল গহনে ভাসতে গিয়ে
পিছুটেনে ধরেছে দুঃখী হৃদয়ের মর্মে গাঁথা ভালোবাসা,
বলেছে, এজগতের জীব একা একা বাঁচতে পারেনি কোনোদিন।
পরিবার আছে,পরিজন আছে,
আছে কত প্রেম জীবনকে ঘিরে,
তবু এক অমোঘ মহাজাগতিক শূন্যতায় ছেয়েেছে অন্তর!
পায়নি মন যা ছিল একান্ত পাওয়া,
সময় হয়নি বন্ধু একসাথে পথ চলবার,
অসময়ের অসমতলে দাঁড়িয়ে
নিজেকে মনে হয় শুধু অর্বাচীন!
তাই...
হারিয়ে যাব সুদূর অপারে অচেনা ঠিকানায় —
অসীম দিগন্তের কোলে অথবা পাতালগহ্বরে,
নয়তো আকাশগর্ভে উড়ে যাব রঙীন ফানুসের মতো।
নিভবে আলো,ঘনাবে রাত গুরুতর;
নিঃশব্দ অনুভবে ডুববে পৃথিবী বেশ কিছুক্ষণ!
যদি ফিরে আসি
তপন কুমার দেবনাথ
গুনে গুনে তুলে রেখেছি আমার দোষ ত্রুটিগুলো।
যাবার আগে
কয়েক ফোঁটা অনুশোচনা রেখে যাবো
আমার আগামী প্রজন্মের জন্য।
যদি তারা শোধরাতে পারে
আমার দোষ ত্রুটিগুলো দেখে,
তাদের জীবনে না ঘটার অঙ্গীকার নিয়ে...
আমার ভুল,
আমারই ভুল,
দোষারোপ কাওকে করবো না কোনোদিন।
শুধু রেখে যাওয়া অনুশোচনায়
আমার আগামী প্রজন্মেরা যদি একটু শুধরে যায় —
এই আশায় বুক বাঁধবো
যদি ফিরে আসি আবার এই জনসমাগমে!
নীরব প্রত্যাশা
পাগল দার্শনিক
সন্ধ্যে নামার আগে বারান্দার প্রান্তে এসে দাঁড়াই,
পুরনো লালটেরা টবটাকে ছুঁয়ে যায় হাওয়া,
ঘরের কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা আমার ছায়া
এখন আর প্রশ্ন করে না কিছু।
যদি স্মৃতির চৌকাঠে বসে,
ভাঙা পাথরে কখনো উঁকি মারে —
আগুনরাঙা কোনো দিন,
তবুও আমি চুপ থাকি।
শুকনো তুলসীর টবেও তো এখনো আসে ফাল্গুন,
কিন্তু আমি আর জল দিই না,
আমি আর চিঠি লিখি না কারো নামে,
আমি আর চোখ রাখি না সন্ধ্যার মুখে।
হাত কাঁপে, তবুও চশমার কাচ মুছি —
কারণ অভ্যেসটা এখনও যায়নি;
ঠিক যেমন জীবনটা যায়নি,
শুধু চলে গেছে যাবার মতো করেই।
আমি পরি না নতুন পাঞ্জাবি,
আমি জড়াই না আতরভেজা চাদর,
আমি খুঁজি না পুরনো রেকর্ডের সুর...
আমি জানি, প্রত্যাশা যদি নিরবধি হয় —
তবে ত্যাগটাই তার সবচেয়ে নিঃশব্দ পূর্ণতা।
লেখক সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব অনুভূতির ভুবন, যেখানে জীবনদর্শন, প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনা এক অনন্য মেলবন্ধনে ধরা দেয়। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী হলেও অন্তর্লোকে তিনি নিরন্তর এক সাধক-লেখক। তাঁর ছদ্মনাম “পাগল দার্শনিক”— যা তাঁর সাহিত্যচিন্তারই প্রতিফলন: প্রশ্নমুখর, অনুভবনির্ভর এবং অস্তিত্বসন্ধানী।
মনের কথা
গোবিন্দ মোদক
মনের কথা মনেই থাকুক বলতে আছে মানা,
শোনার মতোও কেউ নেইকো সবারই তা জানা।
মনের কথা মনেই থাকে ভোরবেলাকার ক্ষণে,
কোন লাভ নেই সেই কথাটা বলবে জনে জনে!
মনের কথা সংগোপনে — সকালবেলার হাওয়ায়,
সত্যিকারের সুহৃদ যে জন আছে পরম পাওয়ায়।
মনের কথা লুকিয়ে থাকে অলস দুপুরবেলায়,
জীবন মৃত্যু হাতেই নিয়েসত্যি আজব খেলায়।
মনের কথা ক্লান্ত পথিক শেষ বিকেলের আলোয়,
একলা তুমি ঘাটের পারে ভাবনা মন্দ-ভালোয়।
মনের কথা মনেই থাকুককান্না-রাতের ভিড়ে,
সুজন যদি হও গো তুমিদেখাই হৃদয় চিরে।
লেখক ‘কথা কোলাজ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক, জন্ম নদীয়া জেলায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম ডিগ্রিধারী এই প্রচারবিমুখ, আত্মমগ্ন মানুষটি ছোটবেলা থেকেই কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, উপন্যাস এবং ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা ও গল্প লিখে চলেছেন। নানা বিষয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি লেখা দেশ-বিদেশের অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
কাশবন
বাবলু পাঁজা
ভাই ফোঁটাতে যাওয়ার সময় ছোট্ট নদীর বুকে,
দেখে ছিলাম তোমার ছবি হাসছো পরম সুখে!
নদীর ঘাটে আমার দিদি পথ দেখছে দুঃখে,
আমায় দেখে সুখের ছবি ভাসলো যে তার মুখে!
তুমি ভাসলে আমার মনেগাছের ছায়ার মতো,
তোমার সাথে হাসছিলো সব নদীর বুকে যতো!
বাতাস দুলে দুহাত তুলে হৃদয় দিলে ভরে,
তোমার মতো দিদির হাসি বিঁধলো হৃদির পরে!
আজকে বসে অনেক দূরে দেখছি জীবনটাকে,
কালকে যদি নাইবা থাকি; বলবো এসব কাকে?
সেজো দিদি যখন যাবে তোমার নদীর বাঁকে,
সেই হাসিটি দিও তাকেতোমার ঝাঁকে ঝাঁকে!
বড়ো মনের মানুষ তিনি অর্থ না থাক বেশি,
খাতির দিয়ে করে সবে তোমার মতো খুশি!
লেখক কোলাঘাটের কাঁচারোলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ইষ্ট তাঁর মা প্রমীলা। পিতা-মাতা উভয়েই চাষি ছিলেন; ফলে নিজের হাতে চাষের বাস্তব অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি জীবনের পথে সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশে তিনি জীবনকে বহুবর্ণ ও বৈচিত্র্যময়ভাবে চিনেছেন। কর্মজীবনে তিনি কর্পোরেট জগতের এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ডিজিটাল ও সাইবার প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম নকশা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। নিজেকে তিনি একজন দার্শনিক মননের মানুষ বলে মনে করেন — এই শরীরে তিনি এক শক্তিমাত্র। সব ধর্মের মানবিক দিককে তিনি শ্রদ্ধা ও গ্রহণ করেন।
উদাস পথিক
ড. বরুণ রায়
ধূসর ধুলোর আঁচল পেতে মরীচিকা ঘেরা পথ,
ছুটছে মানুষ, ছুটছে সময় — অন্ধ মনোরথ।
মাঠের ফাটলে রোদের দহন, মেঘেরা আজ আড়ি,
কৃষক চোখে শ্রাবণ ধারা, শূন্য ভাতের হাঁড়ি।
সোনার ধানে মরচে ধরে সস্তা দরের চাপে,
ক্ষুধার আগুন জ্বলছে ঘরে,হাড়ের কঙ্কাল কাঁপে।
বিলাসবহুল অট্টালিকা গগন ছুঁতে চায়,
তারই তলে স্বপ্নগুলো ধুঁকছে যন্ত্রণায়।
একদিকে আজ ভোগের নেশা, হীরে-জহরৎ,
অন্যপাশে লড়াই চলে—বাঁচাই মূল শপথ।
নিত্যপণ্যের বাজারে আজ আগুন লেগেছে ভারী,
রিকশাওয়ালা ক্লান্ত বড়, টানছে অভাবের হাঁড়ি।
মধ্যবিত্তের স্বপ্নগুলো পকেটেই আজ বন্দি,
উচ্চবিত্ত হাসছে বসে — কষছে নতুন ফন্দি।
স্বার্থপরতার বিষাক্ত গ্রাসে সমাজ হলো খন্ড,
পরের ব্যাথায় কাঁদে না কেউ — সবই তো পাষন্ড।
সবাই চলে আপন পথে, উদাস পথিক বেশে,
মনুষ্যত্ব হারিয়ে আজ ডুবছে নিরুদ্দেশে।
হে উদাস পথিক!
থমকে দাঁড়াও, ফেরাও তোমার মুখ,
পরের তরে বিলিয়ে দাও যৎসামান্য সুখ।
অর্থের ঐ পাহাড় যেন আড়াল না হয় আলো,
একটু মানুষ হয়ে তবেই পৃথিবীকে বাসো ভালো।
আমাদের সন্তান
সীমা সাহা
সেই সেযুগে অন্নপূর্ণা মঙ্গলে —
ঈশ্বরী পাটনি চেয়েছিলেন দেবী অন্নপূর্ণার নিকটে —
আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে।
এইযুগের পিতামাতারা অন্যরকম ভাবে —
আমার সন্তান যেনো চড়ে মার্সিডিজ,
ভ্রমণ করে যেনো লন্ডন প্যারিস।
দুধে ভাতে নয়,পায় যেনো পিৎজা-প্যাটিস।
বড় বড় স্বপ্ন বাস্তব করিস।
বাবার শ্রমের মূল্য প্রাইভেট কলেজ নিলো,
প্লেসমেন্ট পেলেই স্বপ্ন পূরণ হলো।
বিদেশ যেতে পারলেই বাবা মা আরো খুশি,
সবাইকে বলা যাবে সন্তান প্রবাসী।
বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে রাজি,
সন্তান তবু হোক প্রবাসী।
শেষ জীবনে নাই বা থাকলো সাথে,
ভিডিও কলে দেখা ও কথাতো হবে।
ঝরে পড়া পাতা
মহিবুল জাজবত
ছেলেটার জীবন ছিল
ঠিক জঙ্গলের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা
শুকনো পাতার মতো।
কেউ তার নাম জানত না,
কেউ জানত না তার গল্প।
হাওয়া এলে নড়ে যেত,
বৃষ্টি এলে ভিজত,
কিন্তু কেউ কুড়িয়ে নিত না।
গরিব হওয়াটা তার সবচেয়ে বড় দোষ ছিল না,
দোষ ছিল — সে অভ্যস্ত ছিল পড়ে থাকতে।
ঠিক তখনই মেয়েটা এল।
সে এল শহরের আলো থেকে,
শব্দ থেকে,
পছন্দের প্রাচুর্য থেকে।
তার চোখে ছেলেটার জীবন ছিল এক ধরনের কৌতূহল —
একটা ভিন্নতা, যেটা ছুঁয়ে দেখা যায়,
কিন্তু বোঝার দায় নেই।
মেয়েটা প্রথমে পাতাগুলো কুড়িয়ে নিল।
একটা একটা করে।
ছেলেটার কথা, ভয়, লজ্জা, না-পাওয়া —
সব এক জায়গায় রাখতে শুরু করল।
ছেলেটা অবাক হয়েছিল।
ঝরে পড়া পাতারও যে কেউ যত্ন নিতে পারে,
সে তা জানত না।
মেয়েটা বলত,
“তুমি আলাদা।”
এই শব্দটা ছেলেটার জীবনে নতুন ছিল।
সে বুঝতে পারেনি —
‘আলাদা’ কখনো কখনো ভালোবাসা নয়,
কখনো কখনো তা শুধু দূরত্বের আরেক নাম।
ধীরে ধীরে ছেলেটা অভ্যস্ত হয়ে গেল।
নিজের দিন, নিজের রাত, নিজের দুর্বলতা —
সব কিছু ভাগ করতে শিখল।
পাতা যেমন বাতাসের দিক ভুলে যায়,
ছেলেটাও তেমন করে নিজের সীমা ভুলে গেল।
কিন্তু মেয়েটার ভালোবাসা ছিল সংগ্রাহকের মতো।
সে কুড়িয়েছিল,
কিন্তু কোনোদিন ভাবেনি —
পাতা জ্বলতে জানে।
একদিন হঠাৎ করেই আগুন এল।
আগুনটা কোনো চিৎকার নিয়ে আসেনি।
এসেছিল নীরবতায়।
বার্তা বন্ধ হলো।
কথা ছোট হলো।
যত্ন অজুহাতে রূপ নিল।
ছেলেটা প্রশ্ন করতে শুরু করল।
কারণ প্রশ্ন ছাড়া তার আর কিছু ছিল না।
মেয়েটা তখন মিথ্যার আশ্রয় নিল —
কখনো সময়ের,
কখনো পরিস্থিতির,
কখনো ছেলেটার চরিত্রের।
একসময় মেয়েটা বলল,
“তুমি খুব বেশি আশা করো।”
আরেকদিন বলল,
“তুমি আমাকে চেপে ধরছ।”
ছেলেটা বুঝতে পারল না —
যে মানুষটাকে সে নিজের সবটা দিয়েছিল,
সে মানুষটাই আজ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে।
পাতাগুলো তখন জ্বলছে।
কিন্তু আগুনটা মেয়েটা দেখছে না —
সে তো আগেই জঙ্গল ছেড়ে চলে গেছে।
অনেকদিন ছেলেটা নিজের ছাই ঘেঁটে দেখেছে।
কোথায় ভুল হলো?
গরিব হওয়াটাই কি ভুল?
নাকি বিশ্বাস করাটাই?
তারপর একদিন সে বুঝল —
কিছু মানুষ আসে,
ভালোবাসার নামে নয়,
ক্ষমতার পরীক্ষা নিতে।
মেয়েটা ছেলেটাকে ভাঙতে আসেনি ইচ্ছে করে,
সে শুধু বুঝতে চেয়েছিল —
সে কতটা ভাঙতে পারে।
ছেলেটা এখন আর পাতা নয়।
আগুন তাকে পুড়িয়ে শেষ করেনি,
বরং শেখিয়েছে —
নিজের জায়গা কোথায়।
জঙ্গলে আজও পাতা ঝরে পড়ে।
কিন্তু সে জানে —
সব পাতা আগুনের জন্য নয়।
কিছু পাতা নীরবে মাটিতে মিশে
নতুন গাছের জন্ম দেয়।
লেখক রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ইউজিসি নেট ও ডব্লিউবি সেট উত্তীর্ণ একজন স্বাধীন গবেষক। তিনি একজন প্রকাশিত কবি ও How to Destroy Your Life শীর্ষক আত্মোন্নয়নমূলক গ্রন্থের লেখক। তাঁর হিন্দি ও উর্দু কবিতায় ভালোবাসা, হারানো ও মানবিক সহনশীলতার সুর প্রতিধ্বনিত হয়, এবং সেগুলি ভারতের বিভিন্ন জাতীয় সংকলনে স্থান পেয়েছে। লেখালেখির জগতে তিনি ‘মোহিবুল জজবাত’ নামেই পরিচিত।
প্রাণস্পন্দন
স্বপন চক্রবর্তী
যেখানে শব্দরা এসে থেমে যায়
কোনো স্মৃতির আঙিনা পরে,
যেখানে নীরবতা শেষে কথা বলে
কোনো মেঘবালিকার দুয়ারে,
যেখানে সতত শোনা যায়
কোনো জীবনের মধুভাষ,
সেখানে শুভ্র পঙক্তি ছন্দে
কাব্যের অধিবাস।
ভালবাসো? না কি কাব্য পাঠেতে
ভাবো সময়ের অপচয়!
কবিতা যাদের মনকে টানে না,
তারা নির্মম অতিশয়।
কবিতা মানে তো শব্দ মিছিলে
প্রানস্পন্দন সম,
যে মানুষ বলে কবিতা পড়ি না,
সে নির্গুণতম।
কবিতা মানে তো জীবনের গান,
কবিতা মানে তো প্রাণ,
কবিতা মানে তো আগুনের শিখা,
প্রতিবাদে অম্লান।
কবিতা কখনো ভোরের শিশির,
কখনো বা রবিকর,
কখনো বা সে রাতের আকাশে
তারার অধীশ্বর।
শব্দ বুননে ছন্দ চয়নে
কবিতাই অমৃত,
কবিতা সত্য, কবিতা নিত্য
নয় কভু অনৃত।
ভাষার প্রাচীর ভেঙে খানখান,
কবিতা স্বপ্নময়,
সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের পথে
কবিতাই সৃঞ্জয়।
ছন্দের সুরে মুক্ত আকাশ,
মুক্ত করে সে চেতনা,
কবিতা মানেই অশুভের নাশ,
শান্তির মুর্ছনা।
এস সবে করি কাব্যের আজি
মধুর জয়ধ্বনি,
কবিতা মানেই ছন্দমালিকা,
জীবনের আগমনী।
মানুষে মানুষে বৈরিতা আর
হিংসা, অসূয়া, দ্বেষ,
কবিতার টানে যাক দূরে সব,
হোক মৈত্রীর উন্মেষ।
জাগুক কলম, জাগুক কবিতা,
সংযত হোক বিশ্ব,
নয় হানাহানি, ধ্বংস, যুদ্ধ
মানবতা আজ নিঃস্ব।
কবিতার আজি খুব প্রয়োজন
প্রতিটি মানব চিত্তে,
মানুষে মানুষে হোক সখ্য
তাছন্দের মহানৃত্যে।
এই ধরিত্রী এবে ধন্য হউক
কবিতার জয়গানে,
লক্ষ আকুল মনের বিকাশ
ঘটুক শব্দ চয়নে।
যুদ্ধ নয় শান্তিই হোক
এই ধরণীর কাম্য,
কবিতা আনুক বসুন্ধরায়
নৈতিক ভারসাম্য।
মানুষের প্রাণ নীরস গদ্য,
নয় মোটে রসসিক্ত,
তাই তো আজিকে বসুন্ধরা
বিদ্বেষ-বিষে রিক্ত।
আজি নববর্ষে করি আহ্বান
আপামর সুধীজনে,
কবিতা পড়ুন কবিতা পড়ান
বিশ্ব পরিত্রাণে।