'ধুরন্ধর' ছবিটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে “প্রোপাগান্ডা” বলে সমালোচনা করেছিলেন। সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ছবির পরিচালক আদিত্য ধর জানান, তিনি এইসব সমালোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না। তাঁর মতে, “Indian audience is actually very, very smart.” ভারতীয় দর্শক নিজেই বুঝতে পারেন কোন ছবি প্রোপাগান্ডা, আর কোন ছবির উদ্দেশ্য সৎ।
এর পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি গ্রাফিক ভাইরাল হতে শুরু করে। সেখানে আদিত্য ধরের এই বক্তব্যের পাশে বসানো হয় সত্যজিৎ রায়ের ১৯৮৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারের মন্তব্য — “Indian audience is fairly backward.”
৩৭ বছর আগে করা একটি মন্তব্য আজকের বিশ্বায়িত, ইন্টারনেট-চালিত প্রজন্মের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য, সেই নিয়ে সুস্থ আলোচনা হতেই পারত। কিন্তু ভাইরাল পোস্টগুলোর উদ্দেশ্য ছিল অন্য। তুলনা করা হচ্ছিল দুই পরিচালকের দেশপ্রেম, দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিভার। আর এই ন্যারেটিভটা ছড়িয়ে পড়ল ঠিক এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত — অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুদিন থেকে জন্মদিনের মধ্যবর্তী সময়জুড়ে।
পোস্টগুলোর নিচে বহু মন্তব্যে দেখা গেল — আদিত্য ধর “দেশপ্রেমিক”, আর সত্যজিৎ রায় নাকি বিদেশিদের সামনে ভারতকে “গরিব ভিখারির দেশ” হিসেবে তুলে ধরতেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারের লোভে। এবং বাঙালিকে কেন “আত্মবিস্মৃত জাতি” বলা হয় সেটা প্রমান করতে বাঙালি ছেলেমেয়েরাই মন্তব্যগুলো করছিলো।
পথের পাঁচালী-তে দারিদ্র্য আছে — কারণ সেই বাস্তবতা ছিল। কিন্তু ছবিটির কেন্দ্রে দারিদ্র্য নয়; কেন্দ্রে আছে শৈশব, কৌতূহল, সম্পর্ক, হারিয়ে ফেলা, নীরবতা আর সময়ের প্রবাহ। পশ্চিমা দর্শক হয়তো সেখানে দারিদ্র্য দেখেছে, কিন্তু সত্যজিৎ রায় সেখানে মানুষ দেখিয়েছেন।
আর এখানেই মিম-সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একজন আইকনের প্রকৃত প্রতিভাকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে। কারণ সত্যজিতের ‘নায়ক’, ‘চারুলতা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘জলসাঘর’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ বা ‘ঘরে বাইরে’ — এই ছবিগুলোর কোনটাই “বিদেশিদের দেখানোর জন্য গরিব ভারত” নয়। সেখানে আছে মানুষের অহংকার, শূন্যতা, শ্রেণিগত পতন, শহুরে বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের ভাঙন।
আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় অধিকাংশ অধিকাংশ কালচারাল ওপিনিয়ন বা সাংস্কৃতিক মতামত পুরো কাজ দেখে তৈরি হয় না। সেগুলো তৈরি হয় মিম, রিলস, কোট কার্ডস, সাক্ষাৎকার থেকে কেটে নেওয়া আউট-অফ-কনটেক্সট লাইন এবং অ্যালগরিদম-ফ্রেন্ডলি ন্যারেটিভ দিয়ে। ফলে একজন শিল্পীকে তাঁর পুরো ফিল্মোগ্রাফি দিয়ে বিচার করা হয় না; বরং বিচার করা হয় একটি সুবিধাজনক প্রতীক বা কনভেনিয়েন্ট সিম্বল হিসেবে। পাশাপাশি, এখন সাংস্কৃতিক আলোচনাতেও রাজনৈতিক তকমা লাগানোর একটা প্রচেষ্টা চলে। ফলে, একজন পরিচালককে 'দেশপ্রেমিক' প্রমাণ করতে অন্য কোনো শিল্পীকে 'দেশদ্রোহী' বানিয়ে দেওয়া সহজ হয়ে পড়েছে।
কিন্তু আইরনি আরও গভীর। যে মানুষটিকে আজ “পুরনো”, “বোরিং” বা “বিদেশিদের খুশি করা পরিচালক” বলে খারিজ করার চেষ্টা করা হলো, সেই মানুষটিই একসময় এমন এক সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, যা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ অন্যভাবে লেখা হতো।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন "দ্য এলিয়েন" নামে একটি কল্পবিজ্ঞান চিত্রনাট্য। গল্পে ছিল এক রহস্যময় বন্ধুভাবাপন্ন ভিনগ্রহের প্রাণী, যে পৃথিবীতে এসে এক শিশুর সঙ্গে ইমোশনাল বন্ড তৈরি করে। সেটি চিরাচরিত কোনো মনস্টার এলিয়েন ছিল না; বরং এক কৌতূহলী, শান্ত এবং প্রায় শিশুর মতো এক সত্তা।
শুধু গল্প নয়, সত্যজিৎ রায় নিজেই সেই এলিয়েন চরিত্রটির স্কেচ এঁকেছিলেন। বড় মাথা, সরু শরীর, অদ্ভুত অথচ মানবিক অভিব্যক্তি — আজকের পপ কালচারে “ফ্রেন্ডলি এলিয়েন” বলতে যে ভিজ্যুয়াল আর্কেটাইপ মাথায় আসে, তার সঙ্গে সেই স্কেচের মিল অস্বীকার করা কঠিন। এমনকি আজ সামাজিক মাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত ভিনগ্রহের প্রাণীর ইমোটিকনগুলোর দিকে তাকালেও সেই একই বড়-মাথা, বড়-চোখের নকশার ছাপ চোখে পড়ে। 👽
সত্যজিতের চিত্রনাট্যটি আন্তর্জাতিক প্রযোজনার উদ্দেশ্যে হলিউডে ঘুরেছিল। বিখ্যাত অভিনেতা পিটার সেলার্সের নামও জড়িয়েছিল এই প্রজেক্টের সঙ্গে। কিন্তু নানা জটিলতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং স্ক্রিপ্ট হাতবদল হওয়ার গোলমালে ছবিটি আর তৈরি হয়নি। পরে সত্যজিৎ রায় অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁর স্ক্রিপ্ট হলিউডে বিভিন্ন মানুষের হাতে ঘুরেছে, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত কপিটি সেখানে অদ্ভুত ভাবে হারিয়ে যায়।
১৯৮২ সালে মুক্তি পায় স্টিভেন স্পিলবার্গের ব্লকবাস্টার ই.টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল — বন্ধুভাবাপন্ন এলিয়েন, এক শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ, ইমোশনাল কানেকশন, মানবিক সায়েন্স ফিকশন। শুধু গল্প নয়, ই.টি.-র চেহারার সঙ্গেও সত্যজিতের স্কেচের আশ্চর্য মিল — বড় মাথা, সরু শরীর, বিশাল চোখ।
এই মিলগুলো বহু মানুষ লক্ষ্য করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় নিজেও এই নিয়ে তাঁর হতাশা প্রকাশ করেছিলেন, যদিও স্টিভেন স্পিলবার্গ কখনও সরাসরি এই প্রভাবের কথা স্বীকার করেননি।
অবশ্য এখানে কোনো কনস্পিরেসি থিওরি বানানোর প্রয়োজন নেই। শিল্পে প্রভাব, ওভারল্যাপ বা কাকতালীয় ঘটনা — সবই হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যখন আমরা সায়েন্স ফিকশনের বৈশ্বিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলি, তখন কতজন জানি যে কলকাতার এক বাঙালি পরিচালক হলিউডের বহু আগে এমন এক মানবিক এলিয়েনের ন্যারেটিভ কল্পনা করেছিলেন?
সমস্যাটা হয়তো এখানেই। আমরা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে মতামত দিই খুব সহজেই। কিন্তু তাঁকে পড়ি কতটা? তাঁর সিনেমা দেখি কতটা? আর তাঁকে বুঝি কতটা?
যে মানুষটি ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যিনি ডিটেক্টিভ ফিকশন লিখেছেন, সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন, টাইপোগ্রাফি ডিজাইন করেছেন, মিউজিক কম্পোজ করেছেন, এমনকি যুগের চেয়ে কয়েক দশক এগিয়ে থাকা সায়েন্স ফিকশন কনসেপ্ট কল্পনা করেছেন — তাঁকে এখন অনেকেই শুধু “পথের পাঁচালীতে গরিব দেখানো পরিচালক” হিসেবেই চেনে।
এবং সেই সীমিত ধারণার ভিত্তিতেই তাঁকে বিচার করার দুঃসাহস দেখায়!
দ্রষ্টব্য: লেখায় ব্যবহৃত স্কেচগুলি সত্যজিৎ রায়ের আঁকা। ইলাস্ট্রেশনটি তিনি তাঁর ছোটগল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ এবং চরিত্র নকশাটি ‘দ্য এলিয়েন’-এর জন্য এঁকেছিলেন। বাঙালি নেটওয়ার্ক এবং উদ্যোগ ওয়েব ম্যাগাজিন উক্ত ছবিগুলির কোনো স্বত্ব দাবি করে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি এ এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে এম বি এ ডিগ্রির অধিকারী বিনীতা পন্ডিত তাঁর স্কুলজীবন থেকেই পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত। কন্সালটেন্সি, মিডিয়া, এডুকেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন কোম্পানির তিনি ডিরেক্টর। ভালোবাসেন পরিবারের সাথে ট্যুরে যেতে। সুইজারল্যান্ড থেকে কাশ্মীর, ঘোরা আছে প্রায় সারা পৃথিবী।