উফফফ, একে আর্থিক বছরের শেষ সময়। অফিসে সারাদিন ঘাড় গুঁজে পড়ে থেকেই বসের মুখঝামটার অন্ত নেই, তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ক্রমাগত এসেই চলেছে বিগবস — থুড়ি মার — ফোন। উৎপলের মুঠোফোনটা ক্রমাগত কেঁপেই চলেছে। হলদিয়াতে বাবার কাজের জায়গায় আবার কিছু হল না তো?
ফোনটা উৎপল ধরেই ফেলে।
“হ্যাঁ মা, বল।”
ওদিক থেকে ভেসে আসে মায়ের গলা, “বুবুন, তোর পিষুণ ফোন করেছিল। পিসির বাতের ব্যথাটা আবার বেড়েছে। তুই অফিস থেকে মেসে ফেরার পথে একবার হাতিবাগানে পিসির বাড়ি হয়ে পিসিকে দেখে যাস। জানি তোর অসুবিধা হবে, কিন্তু কী করা যাবে বল। অল্প বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর তো উনি একা হাতে চাকরির পয়সায় ভাইবোনদের মানুষ করা, সংসারের সব দায়িত্ব সামলেছেন। বৈশাখ পড়লে এক রবিবার আমি আর তোর বাবাও একদিন যাব পিসিকে দেখতে। প্রাতিপক্ষকে বলে দিয়েছি আমি আর তোর পিসি মিলে। এতবার করে বলা সত্ত্বেও তো ফটোটাও দেখলি না, এখন অন্তত একবার ফটোটা দেখিস। সঙ্গে কথা-বার্তাও বলতে থাক। আগে তো বোঝাপড়াটা ভীষণ দরকার।”
মায়ের কথাগুলি যেন কানে ঢুকেও ঢোকে না উৎপলের। এই চৈত্র সেলের ভিড়ে হাতিবাগান নামটা শুনলেই শুয়ে জোয়ার আসে উৎপলের, আঁতকে ওঠে সে। ঢোক গিলে বলে, “আচ্ছা যাব, তুমি আর পিসি মিলে ছবি দেখেছ, তাই হবে। আমি এখন ফোনটা রাখি।”
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ সকল কাজকর্ম ছেড়ে অফিস থেকে বেরোয় উৎপল। চৈত্রের সেলের ঠেলায়, বঙ্গ ললনাদের ভিড়ে রাস্তায় পা ফেলাই মুশকিল। কিন্তু যেতে তো হবেই, কথা যখন দিয়েছে। একে তো কাজের খাড়া, তার ওপর কলকাতায় একা থাকার কারণে মাতৃদেবী বিয়ে দিয়ে তাকে সংসারী করে তুলতে চাইছেন।
মার কথা মতো পিসিও মনে মনে পাত্রী ঠিক করে ফেলেছেন। তার মানে আজ রথ দেখা ও কলা বেচা — অর্থাৎ পিসিকে দেখা ও পাত্রী দেখা। জীবনে প্রেম-ট্রেম তো কিছুই হল না। ভালই হল, মা-পিসিরাই পাত্রী খোঁজার দায়িত্বটা নিক, তাহলে হ্যাপাও কম হবে।
এইসব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে ক্যাব থেকে নামতেই কানে আসে হকারের কণ্ঠস্বর — “সেল, সেল, যা নেবেন সব কিছু অর্ধেক দামে!”
বাজখাঁই গলার আওয়াজে চমকে উঠে উৎপল দেখে এক সুবেশী তরুণী। নাটোরের বনলতা সেনের মতো চোখ দুটো যেন এখন বাঘিনীর মতো জ্বলছে। উৎপলের কানে যেন কেউ গেয়ে উঠল — “ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে।”
“সরি, বুঝতে পারিনি। আমার জন্যই যখন আপনার পোশাকটা নষ্ট হয়েছে, তার মাশুল তো আমাকেই দিতে হবে। আমি কিছু টাকা দিচ্ছি, এইরকম আরেকটা কুর্তি কিনে নেবেন,” উৎপল বলে ওঠে।
মুচকি হেসে তরুণীটি বলে, “রাখুন রাখুন আপনার টাকা। সিগারেটটা একটু কম খাবেন। আপনার মা-পিসিরা সহ্য করলেও বিয়ের পর বউ সহ্য করবে বলে মনে হয় না। চলি।”
কথাগুলি শেষ করে চোখের পলক পড়ার আগেই উৎপলের বুকে তির বিঁধিয়ে উধাও হয়ে যায় মেয়েটি। মনে মনে উৎপল বলে ওঠে — “হলে মন্দ হত না। জীবনে প্রেম-ট্রেম তো আর করা হল না, প্রথম প্রেম যাও বা এল কিন্তু চোখের নিমিষে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল।”
সম্বিৎ ফিরে পেতেই উৎপলের মনে হল, অদ্ভুত তো! মেয়েটি কিসের বিয়ের কথা বলল? ওর মাথায় কি গণ্ডগোল আছে, নাকি অন্য কারোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ওকে কথাগুলি বলে গেল?
এইসকল এলোমেলো ভাবনাকে সঙ্গে করে পিসির বাড়ি পৌঁছতেই পিসি গরম গরম রসগোল্লা ও একটি ছবি হাতে ওর সামনে এসে দাঁড়ান। বলেন, “দেখ, তোর পাত্রী আরোহী রায়। ফোন নম্বর আছে, আজই কথা বলে প্রাথমিক আলাপটা সেরে ফেল। ভালই হবে তাহলে।”
একটা রসগোল্লা মুখে দিয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে উৎপল। কাকে দেখছে ও! এ তো আজকেই চৈত্র সেলে দেখা সেই শ্রীমতী ভয়ঙ্করী। শেষ পর্যন্ত আর কপালেই জুটবে। মনের ভিতর যে সানাই, কাঁসর, ঘণ্টা সব একসাথে বেজে চলেছে! বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে ও।
পিষুণ ইজিচেয়ার থেকে বলেন, “কিরে, বিষম খেলি? বুকব্যথা করছে নাকি?”
রাস্তায় আসতে আসতে উৎপল ভাবে, মেয়েটি তার ছবি আগেই দেখে রেখেছিল, তাই তার সঙ্গে এইরকম হেঁয়ালি করল। সবটাই উৎপলের কাছে এখন পরিষ্কার।
নম্বর তো ছিলই, সাহসে ভর করে রাতে ফোনটা করেই ফেলল। ওপর প্রান্ত থেকে রিনরিনে সুমিষ্ট স্বরে ভেসে এল, “হ্যাঁ উৎপলবাবু, বলুন।”
“ও, আমার ফোন নম্বরটা বুঝি আগেই আপনার কাছে ছিল?”
“আমার মা আর আপনার পিসিমা ছোটবেলার বন্ধু। মাকে দিয়ে আজকেই পিসি ফোন নম্বরটা পাঠিয়েছেন। তবে আমাকে পছন্দ না হলে বলে দিতে পারেন।”
এদিক থেকে উৎপল বলে ওঠে, “প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে — থুড়ি — চৈত্র সেলের মাঝে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”
আদুরে গলায় আরোহী বলে ওঠে, “অসভ্য! এবার ঘুমান।”
সবুজ সংকেত পেয়ে গেছে উৎপল। ও জানে, প্রতিটা পুরুষ মানুষকেই কখনও না কখনও অসভ্য হতেই হয় তার প্রেয়সীর কাছে। নাহলে সম্পর্কটা, প্রেমটা যে ঠিকমতো জমে না।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
এই সংখ্যায় প্রযোজ্য নিয়ম
একজন পাঠক এই সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই প্রতিক্রিয়া এই সংখ্যার অন্য কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা। দ্রষ্টব্য: আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যা থেকে এই নিয়ম আরও সহজ ও উদার করা হয়েছে।