আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রতিদিন প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের কিছু না কিছু বলতে বলা হচ্ছে। কেউ সরাসরি বলে না, কিন্তু পরিবেশটাই এমন হয়ে উঠেছে যে চুপ থাকা যেন অস্বস্তিকর। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সামনে অসংখ্য ঘটনা এনে রাখে, আর আমরা তার সামনে দাঁড়িয়ে যেন বাধ্য হই কিছু বলতে। এই বলার ভেতরেই একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে — আমি যা বলছি, তা কি ভেবে বলা, না কি তা কেবল মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া? এই পার্থক্যটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটা ভিডিও ভাইরাল হল, একটি খবর ছড়িয়ে পড়ল, কিংবা কারও ব্যক্তিগত জীবনের কোনো অংশ হঠাৎ করে জনসমক্ষে চলে এল। আমরা খুব দ্রুত সেই ঘটনার বিচার করে ফেলি। এই দ্রুততার মধ্যে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। মনে হয় — আমি দেরি করিনি, আমি উপস্থিত ছিলাম, আমি বলেছি। কিন্তু এই বলার ভেতরে কি সত্যিই বোঝা থাকে?
অনেক সময় থাকে না।
কারণ বোঝার জন্য সময় লাগে, আর সময় নেওয়ার অভ্যাস আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আমরা পুরো ঘটনাটা জানার আগেই মন্তব্য করে ফেলি। একটি ছবির ভেতরের গল্প না জেনেই তার অর্থ দাঁড় করাই। এই যে অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে মতামত তৈরি করা — এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা ভাবি আমরা মতামত দিচ্ছি, কিন্তু আসলে আমরা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি।
এই প্রতিক্রিয়ার ভেতরে আবেগ বেশি থাকে, যুক্তি কম থাকে। রাগ, সহানুভূতি, হতাশা — এইসব অনুভূতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে যায়। অনুভূতি খারাপ কিছু নয়, বরং প্রয়োজনীয়। কিন্তু অনুভূতি যখন একমাত্র চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন মতামত ভারসাম্য হারায়। এই ভারসাম্য হারানোর পেছনে আরেকটা কারণ আছে — আমাদের দেখা ও না দেখা।
এই আংশিকতা আমাদের চিন্তাকে সংকুচিত করে। আমরা মনে করি আমরা স্বাধীনভাবে ভাবছি, কিন্তু অনেক সময় আমাদের ভাবনা তৈরি হচ্ছে সেই সীমিত তথ্যের ভেতরেই। এর ফলে ভিন্ন মত আমাদের কাছে অস্বস্তিকর লাগে। আমরা শুনতে চাই না, আমরা মানতে চাই না, আমরা শুধু নিজের মতটাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
এই জায়গায় এসে মতামত আর চিন্তার জায়গা থাকে না, তা হয়ে ওঠে অবস্থান। আমরা যেন নিজেদেরকে প্রমাণ করতে চাই আমরা কোন দলে আছি। এই পরিচয়ের ভেতরে যুক্তির জায়গা ছোট হয়ে আসে। প্রশ্ন করার জায়গা কমে যায়। সন্দেহের জায়গা হারিয়ে যায়। ফলে মতামত দৃঢ় হয়, কিন্তু গভীর হয় না।
আরেকটা জিনিস খুব স্পষ্ট — আমরা ক্রমশ নীরব থাকার ক্ষমতা হারাচ্ছি। চুপ করে থাকা, একটু ভেবে নেওয়া, কিছু না বলা — এইগুলো যেন আমাদের কাছে দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। অথচ অনেক সময় চুপ থাকাটাই সবচেয়ে দায়িত্বশীল কাজ। যখন আমরা জানি না, যখন আমরা নিশ্চিত নই, তখন না বলাটাও একটা অবস্থান। কিন্তু এই অবস্থান নিতে আমরা ভয় পাই। আমরা ভাবি — আমি যদি এখন না বলি, তাহলে আমি পিছিয়ে পড়ব, আমি গুরুত্ব হারাব। এই ভয় আমাদেরকে তাড়াহুড়ো করতে বাধ্য করে। আমরা এমন অনেক কথা বলি, যা হয়তো আমরা নিজেরাও পুরোপুরি বিশ্বাস করি না।
এই তাড়াহুড়োর ভেতরে একটা ব্যক্তিগত দিকও আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা শুধু মতামত দিই না, আমরা নিজেদেরও তৈরি করি। আমরা চাই আমাদের একটা পরিচয় থাকুক — সচেতন, স্পষ্টভাষী, যুক্তিনিষ্ঠ। কিন্তু এই পরিচয় তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা সেই গভীরতার জায়গাটাকে অবহেলা করি, যেখান থেকে সত্যিকারের মতামত আসে। ফলে আমরা মতামত দি, কিন্তু সবসময় ভাবি না।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সংলাপের। আমরা কথা বলি, কিন্তু শুনি না। আমরা জবাব দিই, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করি না। ফলে আলোচনার জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। মতের ভিন্নতা থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিন্নতার সঙ্গে সহাবস্থান করার ক্ষমতাটাই কমে যাচ্ছে। এটা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
তবুও এই পুরো ছবিটা একেবারে হতাশার নয়। এই একই জায়গায় অনেক মানুষ সচেতনভাবে ভাবছেন, প্রশ্ন তুলছেন, নিজেদের মতকে নতুন করে গড়ছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হচ্ছে, অনেক চেপে রাখা অভিজ্ঞতা সামনে আসছে। এই সম্ভাবনাটা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে হলে আমাদের কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে। আমাদের শিখতে হবে থামতে। কোনো কিছু দেখেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে, একটু সময় নিতে। আমাদের শিখতে হবে তথ্য যাচাই করতে। যা দেখছি, তা সত্যি কিনা, তা বোঝার চেষ্টা করতে। আমাদের শিখতে হবে ভিন্ন মতকে শুনতে — তাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য নয়, তাকে বোঝার জন্য।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের শিখতে হবে নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে।
আমরা সব জানি না, সব বুঝি না। এই সত্যিটা স্বীকার করলেই আমাদের মতামত আরও সৎ হয়ে ওঠে। তখন আমরা বলার আগে ভাবি, বিচার করার আগে বুঝতে চাই। মতামত তখন আর কেবল শব্দ থাকে না, তা হয়ে ওঠে চিন্তার প্রকাশ।
শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটা খুব ব্যক্তিগত।
এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে পারাটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কণ্ঠ দিয়েছে, কিন্তু সেই কণ্ঠকে অর্থপূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা চাইলে এই জায়গাটাকে কেবল প্রতিক্রিয়ার মঞ্চ বানাতে পারি, আবার চাইলে এটাকে সচেতনতার ক্ষেত্রও করে তুলতে পারি।
পছন্দটা আমাদের। আর সেই পছন্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের ভবিষ্যৎ।
লেখকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বর্ধমান শহরে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁক। শব্দকে তিনি কেবল প্রকাশের বাহন নয়, মনে করেন আশ্রয় — ভেতরের আলো ও অন্ধকারকে নীরবে প্রকাশ করার এক মাধ্যম। পদার্থবিদ্যায় অধ্যয়ন ও এমবিএ (সিস্টেমস) সম্পন্ন করার পর গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্প, তথ্যের অধিকার আইন ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিষ্ঠ উন্নয়ন আধিকারিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়-অধীন মহাবিদ্যালয়সমূহের ভারপ্রাপ্ত পরিদর্শক। এই বহুমাত্রিক প্রশাসনিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি এক নীরব শব্দসংগ্রাহক — যিনি কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার স্থাপত্য খুঁজে ফেরেন।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।