ক্যালেন্ডারে কিছুদিন আগেই চলে গেল ২১শে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ভাষা শহীদ দিবস। আর তারপরে ১৫ই এপ্রিল, আমাদের নববর্ষ — অর্থাৎ বাঙালিদের একান্ত আপন পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩! বছরের কিছু বিশেষ দিনে আজকাল হুজুগে বাঙালি জাতির বাংলা-প্রীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ওই বিশেষ দিনগুলোতে নিজেকে একেবারে খাঁটি বঙ্গসন্তান প্রতিপন্ন করার আদেখলামোটা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়!
পয়লা বৈশাখ — তার প্রকৃত উদ্দেশ্য আর উদযাপন তো কবেই ভুলে মেরে দিয়েছে খেলা, মেলা আর উৎসবে মেতে থাকা শিক্ষিত, সফিস্টিকেটেড মধ্যবিত্ত বাঙালি! এই নববর্ষের প্রাক্কালে রইল কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
পয়লা বৈশাখ বা বাঙালি নববর্ষের সূচনা সৌর পঞ্জিকা থেকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য পয়লা বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি পর্যন্ত মীন রাশিতে অবস্থান করেন। আর তার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে সূর্যের শূন্য (০) ডিগ্রিতে, অর্থাৎ মেষ রাশিতে প্রবেশের দিনকে বাংলা বছরের প্রথম দিন ধরা হয়।
আবার কিছু ঐতিহাসিকের মতে, মুঘল সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সন হিসেবে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৩ হিজরি) এই প্রথা চালু করেন, যা পরে হালখাতা নামে এক ব্যবসায়িক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। এটি মূলত বসন্তের ফসলের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি বর্ষপঞ্জি। সম্রাট আকবর হিজরি চন্দ্রবর্ষের পরিবর্তে কৃষকদের সুবিধার্থে এই সূর্যভিত্তিক “ফসলি সন” চালু করেন, যা বৈশাখ থেকে শুরু হয়। এখন পৃথিবীব্যাপী বাঙালিদের কাছে এ এক বিশেষ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
নিজের হাতে সেই মাছ কেটে রান্না করতেন মায়েরা। স্নানের শেষে পাটভাঙা লালপেড়ে শাড়ি পরে ঠাকুরপুজোর পর প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় নিজ হাতে এঁকে দিতেন সিঁদুরের ফোঁটা। উলুধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজের মধ্য দিয়ে সূচনা হতো এক নতুন বছরের। বড়দের প্রণাম করে আর সমবয়সীদের সঙ্গে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হতো বাঙালির নতুন বছর।
এর পাশাপাশি বাংলার দোকানে দোকানে চলত (বা এখনও চলে) “হালখাতা” উৎসব। পুরোনো খাজনা বা বাকি পরিশোধ করে নতুন বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা হিসাবের যে নতুন খাতা খোলেন, তাই হলো আদতে হালখাতা। এদিন সকাল থেকে দোকানে দোকানে আয়োজন হয় সিদ্ধিদাতা গণেশ আর দেবী লক্ষ্মীর পুজোর। সাধারণত এই দিন কোনো দোকানেই বিশেষ বিকিকিনি হতো না।
বিকেল হলেই এককালে নতুন জামাকাপড় পরে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাঙালি বাবা-মায়েরা বেরিয়ে পড়তেন দোকানে দোকানে হালখাতা করার উদ্দেশ্যে। দোকানিরা ক্রেতাদের হাতে তুলে দিতেন মিষ্টির প্যাকেট, বাংলার ক্যালেন্ডার, কখনও বা সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটখাটো উপহার। হইহই করে কেটে যেত বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব।
আজকাল দোকানে দোকানে গিয়ে হালখাতা পালনের চল অনেকটাই কমে গেছে। সকাল থেকে বাড়ি বাড়ি পুজো, মাছ, সবজি, ফলপাকুড় আনা, প্রণাম, মিষ্টিমুখ — এসবের জায়গায় ফোনের সোশ্যাল মিডিয়াতেই দেখা যায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের বন্যা। রঙিন ছবি আর একটা করে মেসেজ — ব্যাস, হয়ে যায় শুভেচ্ছা জানানো। সঙ্গে থাকে মানানসই কোটেশন বা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অংশ — “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো!”
আর একটু বেলা হলেই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি পরিবারের নববর্ষ উদযাপনের ভিড় দেখা যায় শপিং মল বা নামিদামি বাঙালি রেস্তোরাঁর বাইরে। স্পেশাল বাঙালি থালির আলাদা চাহিদা থাকে এই দিন। সেজেগুজে পাটভাঙা নতুন শাড়ি, পাজামা-পাঞ্জাবি পরে “ট্র্যাডিশনাল” পোশাকে সেজে বাঙালি পরিবার ছোটে সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস, সোনার বাংলা, ভূতের রাজা দিল বর, তেরো পার্বণ — নামিদামি সব বাঙালি রেস্তোরাঁয়।
হাত চেটে চেটে খাওয়া হয় সুক্তো, পোস্তর বড়া, ভেটকি পাতুরি, চিংড়ি দিয়ে কচুর শাক, মোচার ঘণ্ট — সেই সব সুস্বাদু বাঙালি রান্না, যা এককালে ঘরোয়া আইটেম হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এই উন্নয়নের যুগে এদের স্থান হয়েছে স্পেশাল দিনের স্পেশাল আইটেম হিসেবে।
মন ভরে খাওয়াদাওয়া করে আমপোড়ার শরবত বা লস্যি খেয়ে বাড়িমুখো হন এই পরিবারগুলি — আবার পরের দিন সকাল থেকেই, “আমার ছেলের / মেয়ের বেঙ্গলিটা ঠিক আসে না” বলার জন্য! শুরু হয় আবার সেই নিত্যদিনের রোজনামচা।
সময় বদলায়, তাই আধুনিক কর্মব্যস্ততার যুগে সব পুরোনো বাঙালি রীতিনীতি একদম অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়তো সব পরিবারে সম্ভব হয় না। কিন্তু বছরের কিছু বিশেষ দিনে হঠাৎ করে নিজের বাঙালি সত্তাকে নিয়ে সচেতন হয়ে উঠে নিজেকে খাঁটি বাঙালি প্রমাণ করার অপচেষ্টা করা, আর দিন ফুরোলেই আবার যে কে সেই — পুরোনো ছন্দের জীবনে ফিরে গিয়ে “বেঙ্গলি কালচার ভীষণ ব্যাকডেটেড” বলে নাক সিঁটকানো — এই অদ্ভুত চক্রে এসে আটকে গেছে বাঙালির জীবন।
ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে একবার ভিটেমাটি ছেড়ে অনেক কষ্টে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে এসে আজকের শিক্ষিত বঙ্গসন্তানদের ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। তাঁদের আত্মত্যাগ, তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেই ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সামনে নতুন করে নিজের পরিচয় তৈরি করেছে আজকের শিক্ষিত বাঙালিরা।
আধুনিকতার নামে নিজেদের সমস্ত প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতিনীতি, সমস্ত বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দ্বিতীয়বার নিজেদের ছিন্নমূল করে না তোলাই ভালো। নিজেদের এবং নবপ্রজন্মকে দ্রুত কৃত্রিম আধুনিকতার মোড়ক থেকে বার করে শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে না আনতে পারলে, খুব ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে সামনে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।