Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
দানবের গল্প, দেবতার রাজনীতি
দানবের গল্প, দেবতার রাজনীতি

মহিষাসুর — এই নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পৌরাণিক কাহিনি। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মহিষ; ভয়ঙ্কর শক্তিশালী, দেবতাদের অজেয় প্রতিপক্ষ। দেবী দুর্গার হাতে তাঁর বধই হলো শুভশক্তির জয় আর অশুভশক্তির পরাজয়। অন্তত, এতদিন ধরে আমরা তাই শুনে আসছি। কিন্তু সমাজতত্ত্বের চোখে এই গল্পটা এত সরল নয়। মহিষাসুর আসলে কেবল এক পৌরাণিক দানব নন; তিনি ক্ষমতার রাজনীতি, পরিচয়ের সংঘর্ষ, শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাসের প্রতীক।

পৌরাণিক কাহিনি আর ক্ষমতার ইতিহাস
প্রাচীন ভারতীয় পুরাণে দেব-দানব সংঘর্ষ বারবার এসেছে। দেবতারা শৃঙ্খলার প্রতিনিধি, দানবরা বিশৃঙ্খলার। দেবতারা আলো, দানবরা অন্ধকার। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটা আসলে এক ক্ষমতার বর্ণনা। ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা সবসময় জ্ঞান তৈরি করে, আর সেই জ্ঞান দিয়ে সমাজকে সাজায়। পুরাণে মহিষাসুরকে দানব বলা হলো কারণ তিনি দেবতাদের কাঠামোর বাইরে দাঁড়ানো এক শক্তি। তাঁর 'অন্যতা'কে (Otherness) চিহ্নিত করেই তৈরি হলো দেবীর ন্যায়যুদ্ধের কাহিনি।

অর্থাৎ, মহিষাসুর ছিলেন শত্রু বলেই তিনি 'অশুভ'। কিন্তু কে ঠিক করবে কে শুভ আর কে অশুভ? এটাই সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন। ক্ষমতাধর গোষ্ঠী নিজেদের মূল্যবোধকে 'শুভ' বলে চিহ্নিত করে, আর অন্যকে করে 'অশুভ'। ফলে মহিষাসুর আসলে সেই excluded identity — যিনি দেবসভার রাজনীতির বাইরে ছিলেন।

সাবঅল্টার্ন কণ্ঠস্বর
পোস্টকলোনিয়াল আলোচনায় গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'Can the Subaltern Speak?'-এ যুক্তি দিয়েছিলেন — সাবঅল্টার্নরা কথা বললেও তাদের কণ্ঠস্বর মূলধারার কাঠামোতে পৌঁছানোর আগেই বিকৃত বা দমন হয়ে যায়। এই কথাটিই মহিষাসুরের ক্ষেত্রেও সত্যি। পুরাণে তাঁর নিজের কোনো বক্তব্য নেই। দেবতারা তাঁকে দানব বললেন, তাই তিনি দানব। তাঁর মৃত্যুই হলো দেবী মহিমার প্রতীক।

কিন্তু লোকসংস্কৃতিতে দেখা যায় অন্য ছবি। মধ্য ভারতের বহু উপজাতি অঞ্চলে মহিষাসুরকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। তাঁকে কৃষির দেবতা বলা হয়, যিনি মহিষের মতো শ্রম আর উর্বরতার প্রতীক। অর্থাৎ, যাঁকে পুরাণে দানব বলা হলো, সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি জীবনের রক্ষক। এই দ্বৈত চিত্রই সমাজতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামসি ও হেজিমনি
অ্যান্টোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, সমাজে ক্ষমতা কেবল জোর করে টিকে থাকে না, বরং সাংস্কৃতিক হেজিমনির মাধ্যমে টিকে থাকে। অর্থাৎ, শাসক গোষ্ঠী নিজেদের ধারণা, ধর্ম, পুরাণ দিয়ে সমাজকে এমনভাবে সাজায়, যাতে মানুষ নিজেরাই শোষণ মেনে নেয়।

মহিষাসুরের কাহিনি আসলে এই সাংস্কৃতিক হেজিমনিরই উদাহরণ। দেব-দানব লড়াইয়ের গল্পে দেবতাদের জয় হলো 'স্বাভাবিক', দানবদের পরাজয় হলো 'ন্যায়সঙ্গত' — এমন বার্তা যুগ যুগ ধরে পৌঁছে গেল। ফলে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিজেদের ইতিহাস ভুলে গেল, দেবীকে পূজা করতে লাগল, অথচ দেবীর হাতে নিহত হলো তাদেরই প্রতীক।

মহিষাসুর : 'অন্য' পরিচয়ের প্রতীক
সমাজতত্ত্বে 'Other' মানে সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যাকে প্রান্তিক করে রাখা হয়। মহিষাসুর সেই 'অন্য'বা have nots। দেবতাদের সভা তাঁকে শত্রু বানাল, সমাজ তাঁকে দানব বলে মেনে নিল। তাঁর মৃত্যু হলো সভ্যতার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবে তিনি কি সত্যিই অশুভ ছিলেন, নাকি অসুর ছিল অন্য কোনো সমাজের প্রতিনিধি?

অনেক গবেষক বলেন, মহিষাসুর ছিলেন আসলে এক উপজাতি গোষ্ঠীর নায়ক। আর্য দেবতাদের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর পরাজয়ই পুরাণে দানব বধ হয়ে উঠল। ফলে মহিষাসুর এর সাথে লড়াই আসলে সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের প্রতীক — আধিপত্যশীল গোষ্ঠী বনাম প্রান্তিক সমাজ সমাজের দ্বন্দ্ব।

আধুনিক রাজনীতি আর মহিষাসুর
আজও এই প্রতীক নিয়ে লড়াই চলছে। ভারতের বহু অঞ্চলে 'মহিষাসুর শহীদ দিবস' পালিত হয়। সেখানে বলা হয়, দুর্গার হাতে মহিষাসুরের মৃত্যু আসলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর আর্য শাসনের প্রতীকী সহিংসতা। অন্যদিকে মূলধারার সমাজ এটাকে ধর্মবিরোধী বলে নিন্দা করে।

অর্থাৎ, মহিষাসুর আজও জীবন্ত এক রাজনৈতিক চরিত্র। তিনি শুধু পুরাণের দানব নন, তিনি জাতপাতের রাজনীতি, পরিচয়ের লড়াই, ইতিহাসের বিকল্প পাঠের প্রতীক।

সাহিত্য-শিল্পে মহিষাসুর
বাংলা সাহিত্যে সরাসরি মহিষাসুর খুব কম এসেছে, কিন্তু দমন আর বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে তাঁর ছায়া দেখা যায়। মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে যে বিদ্রোহী আদিবাসী চরিত্ররা উঠে আসে, তারা আসলে আধুনিক মহিষাসুর। তাদের কণ্ঠস্বরও প্রান্তিক, যাদের মূলধারা সবসময় দমন করে।

আধুনিক শিল্পকলায়ও দেখা যায় মহিষাসুরের পুনরাবিষ্কার। অনেক প্যান্ডেল শিল্পী এখন প্রতিমা গড়েন এমনভাবে, যেখানে মহিষাসুরও মানবিক। তাঁর চোখে ভয় নয়, প্রতিবাদ। দেবী আর দানবের দ্বন্দ্ব তখন হয়ে ওঠে সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রতীক।

ফুকো ও ক্ষমতার ছায়া
ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে, আর তার প্রতিরোধ ও সর্বত্র। মহিষাসুরের কাহিনি সেই তত্ত্বের নিখুঁত উদাহরণ। দেবীরা একত্রিত হয়ে শক্তির জন্ম দিলেন, দেবতারা দিলেন অস্ত্র, আর মহিষাসুর হলেন ক্ষমতার প্রতিরোধী চরিত্র। কিন্তু তাঁর প্রতিরোধ ইতিহাসে 'অশুভ' নামে খারিজ হয়ে গেল।

আজকের সমাজতত্ত্ব তাই বলে, আমাদের পুরাণ পড়তে হবে নতুন চোখে। দেবী মানেই শুভ, দানব মানেই অশুভ — এই বাইনারি ভেঙে দিতে হবে। মহিষাসুরকে দেখতে হবে এক excluded identity হিসেবে, যিনি অন্যায়ভাবে ইতিহাসে দানব হয়ে গেছেন।

অন্যের চোখে আলো
মহিষাসুর আসলে এক সমাজতাত্ত্বিক রূপক। তিনি সেই কৃষক, যাঁর শ্রমে জমি উর্বর, অথচ ইতিহাসে তাঁর নাম নেই। তিনি সেই প্রান্তিক মানুষ, যিনি রাজনীতির বাইরে। তিনি সেই excluded voice, যাকে বলা হয়েছে — 'দানব।'

কিন্তু নদীর জলে প্রতিমার ছায়া ভেসে ওঠে যখন, আমরা কি দেখি না মহিষাসুরের চোখও? সেখানে ভয় নেই, আছে প্রতিবাদ। দেবী দুর্গার হাতে তাঁর মৃত্যু আমাদের শেখায়, ক্ষমতার কাহিনি সবসময় একতরফা।

গবেষক দের মতে — সাবঅল্টার্নরা কথা বললে ও প্রায়শই তাদের কণ্ঠস্বর মূলধারার কাঠামো কে বিকৃত করে ফেলে। মহিষাসুর সেই দমিত কণ্ঠের প্রতীক। তাঁর মৃত্যু ইতিহাসে মহিমান্বিত, কিন্তু তাঁর বেঁচে থাকা তাই লোকায়ত সংস্কৃতিতে বিদ্যমান।

হয়তো সত্যিটা অন্য। হয়তো মহিষাসুরও এক দেবতা, যিনি হেরে গিয়েছিলেন রাজনীতির খেলায়। সমাজতত্ত্ব তাই বলে — ইতিহাসের প্রতিটি দানবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক প্রান্তিক মানুষের গল্প।

দুর্গা ও মহিষাসুরের লড়াই তাই কেবল পৌরাণিক নয়, বরং আমাদের আজকে সমাজের প্রতিচ্ছবি। যেখানে আজও ক্ষমতা আর প্রতিরোধ, কেন্দ্র আর প্রান্ত, শুভ আর অশুভের দ্বন্দ্ব চলছে। আর মহিষাসুর সেই দ্বন্দ্বের চিরন্তন প্রতীক — যিনি হয়তো দানব নন, বরং 'অন্য' এক মানুষ, যাঁর কথা ইতিহাস শোনেনি।

তাই মনে হয় হয়তো কোনো রাতে নদীর জলে প্রতিমার ছায়া ডুবে যাবে,লাল রক্তের গভীর রঙে সাদার শূন্যতায়, নীল অন্ধকারে, সব মিলিয়ে এক আলোয় জমা হয়ে যাবে — তখন দেখা যাবে মহিষাসুরের চোখে এক নতুন সূর্যের উদয়।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.3 4 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top