ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের জীবন-নির্বাহের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর ব্যবহার প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করছে, সে আমাদের ইচ্ছানুসারে হোক বা আমাদের অজান্তেই। স্বভাবতই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারের সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতার প্রবণতা। সমাজের কোনো অংশকেই সম্ভবত এর থেকে বাদ রাখা যাবে না — সে সমাজের শিশু, ছাত্র, যুবসমাজ থেকে শুরু করে সমাজের প্রবীণতম অংশ পর্যন্ত। চ্যাটবট, ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, কনটেন্ট জেনারেশন টুলস প্রভৃতি নানা প্রযুক্তির সাহায্যে গুগল সার্চ থেকে শুরু করে মোবাইলের স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট, এমনকি লেখালেখি, ছবি আঁকা কিংবা বিভিন্ন রকমের প্রজেক্ট তৈরিতেও AI-নির্ভরতা ক্রমশই বেড়ে চলেছে।
এই প্রেক্ষিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে আসছে তা হলো — এগিয়ে চলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ওপর এই নির্ভরশীলতা কতটা সঙ্গত। এবং ওয়াকিবহাল মহলের কাছে এটি একটি বেশ চিন্তার বিষয় যে সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অর্থাৎ ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ, ব্যবহার ও তার প্রতি নির্ভরশীলতা ঠিক কতটা যুক্তিসঙ্গত।
এই প্রসঙ্গে যে প্রশ্নটি প্রাথমিকভাবে উঠে আসে তা হলো — শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োজনীয়তা কী বা কতটা। এর উত্তর খুঁজতে গেলে পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করতে হবে —
▪ প্রথমত, AI-কে বিষয় বা সাবজেক্ট হিসাবে শিক্ষার্থীদের মূল পাঠক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে করে তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারে। যাকে সাধারণভাবে AI Literacy বলা হয়।
▪ দ্বিতীয়ত, AI দিয়ে বা AI-এর সাহায্যে পড়াশোনা করা — যাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায় শিক্ষার্থীদের পঠন-পদ্ধতিকে আরও সহজ ও দ্রুত করা যায়। যাকে বলা হয় AI-Assisted Learning।
বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুসারে বলা যেতে পারে, AI Literacy-এর অঙ্গ হিসাবে ইতিমধ্যেই বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোথাও স্কিল সাবজেক্ট বা ইলেক্টিভ সাবজেক্ট হিসাবে, কোথাও স্কিল মডিউল হিসাবে, আবার কোথাও মূল পাঠ্যসূচির অংশ হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। কোথাও কোথাও আবার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আলাদা একটি মডিউল হিসাবে পরীক্ষামূলকভাবে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। AI Literacy-এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের কেবল AI কীভাবে কাজ করে, কীভাবে বানানো হয় ও তার ব্যবহারিক দিকই শেখানো হয় না — AI ব্যবহারের নৈতিক দিকগুলোও শেখানো হয়।
তবে সেদিক থেকে AI-Assisted Learning বা এই প্রক্রিয়াটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন পড়াশোনার পদ্ধতিতে সার্বিকভাবে ও পরিকাঠামোগতভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহারের দিক থেকে এখনও কিছুটা পিছিয়ে আছে বলা যায়। এক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনীয় AI টুল ব্যবহার করে নিজেদের পড়াশোনা আরও সহজ করা, দ্রুত বোঝা, সারাংশ তৈরি, অনুশীলনী প্রস্তুত করা ইত্যাদির কাজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। যদিও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই ক্লাসরুমে AI টুল ইন্টিগ্রেশন, AI-নির্ভর রিসার্চ টুল, একাডেমিক রাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ইত্যাদির ব্যবহার শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
AI-Assisted Learning-এর ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, শিক্ষাব্যবস্থায় AI দিয়ে পড়াশোনা করা শেখানোর চেয়ে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে তাদের শিক্ষার প্রয়োজনে AI-কে ব্যবহার করতে শেখার ব্যাপারে অনেকটাই এগিয়ে আছে। তবে এটিও অনস্বীকার্য যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বপূর্ণ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার শেখানোর কাজ শুরু করেছে।
এক্ষেত্রে আরও একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — AI যদি শিক্ষার্থীর সঙ্গী হয়, তাহলে তার শিক্ষক ও অভিভাবকেরও ন্যূনতম AI Literacy থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ওয়াকিবহাল মহলের মতে, অভিভাবক ও শিক্ষকরা যদি নিজেরা AI বোঝেন, তবেই তারা তাদের সন্তানদের ও শিক্ষার্থীদের AI-এর দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহার শেখাতে পারবেন। এই ব্যাপারে শিক্ষক ও অভিভাবকরা AI গাইডেন্স নিয়ে তৈরি বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সাহায্য নিতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায় — আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির এক আশীর্বাদ। শিক্ষার্থীদের এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে — নিজেদের মনন ও চিন্তাশীলতা বজায় রেখে সততার সঙ্গে AI-কে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, ভরসা হিসেবে নয়। তবেই AI শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। যদিও ওয়াকিবহাল মহলের মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে সার্বিক ও পরিপূর্ণ রূপে প্রয়োগ করতে গেলে কিছু বিষয়ে — যেমন ডেটা গোপনীয়তা, বয়সসীমা ও নৈতিকতার নিরাপত্তা — আরও সুরক্ষিত ও সুনিশ্চিত করতে হবে।