মানবসভ্যতার ইতিহাসে যৌন পেশা সবচেয়ে প্রাচীন পেশাগুলির মধ্যে একটি। নানা সময়ে নানা সভ্যতায় যৌন পেশা কখনও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, কখনও ঘৃণ্য ও অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে এই পেশা নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, আইন এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন ভিন্ন। একদিকে যৌনকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে সমাজের অংশ হলেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা বঞ্চিত। অন্যদিকে যৌনকর্মী আন্দোলন এই অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রীস, রোম এবং ভারতীয় সভ্যতায় যৌন পেশার নানা দিক ছিল। ভারতের প্রাচীন যুগে দেবদাসী প্রথা, মন্দিরের নর্তকী বা রাজসভায় গায়িকা-নর্তকী — এরা সকলেই প্রকারান্তরে যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন সমাজে তাঁরা সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ ছিলেন। কিন্তু মধ্যযুগে ও ঔপনিবেশিক যুগে এদের অবস্থান নীচে নেমে আসে। ব্রিটিশ শাসনামলে যৌনকর্মীরা "ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডেলো"-তে নিয়ন্ত্রিত ছিল, আবার স্থানীয় সমাজে তারা ছিল অবহেলিত।
বর্তমান বিশ্বে যৌন পেশার আইনি স্বীকৃতি
আজকের বিশ্বে যৌন পেশা নিয়ে আইন ভিন্ন ভিন্ন। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড বা নেভাডার কিছু অংশে যৌন পেশা বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত। এসব দেশে যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্য ও শ্রমিক অধিকার পান। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্য, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফ্রিকার বহু দেশে যৌন পেশা আংশিক বৈধ হলেও দালালি বা প্রকাশ্যে বেচাকেনা নিষিদ্ধ। কিছু দেশে যেমন ইরান বা সৌদি আরব—সেখানে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং কঠোর শাস্তিযোগ্য।
যৌন পেশার সামাজিক স্বীকৃতি ও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি
যৌন পেশাকে সমাজে সাধারণত অপরাধ, অসভ্যতা বা নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে যৌনকর্মীরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন। তাঁদের সন্তানরা স্কুলে বৈষম্যের শিকার হয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়েন, আবাসনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য দেখা দেয়। আবার সমাজের একাংশ মনে করে যৌন পেশাকে স্বাভাবিক শ্রমের মর্যাদা দিলে স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। বিশ্বের নানা দেশে যৌনকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন প্রকল্প ও আইনি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুরুষ যৌনকর্মীদের অবস্থান
যৌন পেশা নিয়ে আলোচনায় প্রায়শই নারী যৌনকর্মীর কথাই বেশি আসে। কিন্তু পুরুষ যৌনকর্মীরাও বিশ্বে বিপুল সংখ্যায় আছেন। অনেক দেশে পুরুষ যৌনকর্মীরা মূলত নারী বা সমকামী পুরুষ গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের পেশা নিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি আরও সীমিত। আইন ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও তাঁদের জন্য নীতিমালা কম। সমাজে তাঁরা দ্বিগুণ কলঙ্কের শিকার — একদিকে যৌন পেশা, অন্যদিকে যৌন পরিচয়ের কারণে।
যৌনকর্মী আন্দোলন
গত কয়েক দশকে যৌনকর্মীরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার নানা দেশে যৌনকর্মীদের সংগঠন গড়ে উঠেছে। ভারতেও 'দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি' পশ্চিমবঙ্গে যৌনকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সঞ্চয়ের প্রকল্প চালাচ্ছে। তারা দাবি করছে যৌন পেশাকে শ্রমের স্বীকৃতি দিতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন দিতে হবে, সন্তানদের জন্য নিরাপদ স্কুল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা — সবখানেই যৌনকর্মীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানবাধিকার
যৌনকর্মীরা প্রায়শই সামাজিকভাবে একঘরে। অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অনেকে তাঁদের পরিচয় গোপন করেন। এই বিচ্ছিন্নতা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি বলছে, যৌনকর্মীরা এক ধরনের 'অদৃশ্য শ্রমিক' যাদের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে। জাতিসংঘের এইচআইভি/এইডস সংস্থা ইউএনএইডস (UNAIDS) বলেছে, যৌন পেশাকে বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনলে এইচআইভি প্রতিরোধ সহজ হবে এবং সহিংসতা কমবে।
বৈধতা বনাম অপরাধীকরণ: বিতর্ক
বিশ্বে যৌন পেশা নিয়ে দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে কিছু দেশ যৌন পেশাকে বৈধ ঘোষণা করে নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করেছে। অন্যদিকে অনেক দেশ যৌন পেশাকে অপরাধ হিসেবে দেখে। সমালোচকরা বলেন, বৈধকরণ করলে মানবপাচার বাড়তে পারে। কিন্তু সমর্থকরা বলেন, বৈধ কাঠামো না থাকলে যৌনকর্মীরা পুলিশের হয়রানি, দালালদের শোষণ আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
নতুন প্রেক্ষাপট: অনলাইন যৌন কাজ
ডিজিটাল প্রযুক্তি যৌন পেশাকে নতুন রূপ দিয়েছে। এখন বহু যৌনকর্মী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন, ওয়েবক্যাম সেবা বা ইরোটিক কনটেন্ট তৈরি করছেন। এর ফলে তাঁরা শারীরিক ঝুঁকি কমিয়ে আয়ের পথ খুঁজছেন। তবে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিও আইনগত জটিলতা, সাইবার অপরাধ এবং গোপনীয়তা ভঙ্গের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
মানুষের দৃষ্টিকোণ: নৈতিকতা বনাম বাস্তবতা
যৌন পেশা নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে। অনেকের মতে এটি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে আঘাত করে। আবার অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন যৌনকর্মীরা সমাজে একটি বাস্তব প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। অর্থনৈতিক প্রয়োজন, লিঙ্গ বৈষম্য, দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা — এসব কারণেই অনেকে যৌন পেশায় আসেন। তাই এই বাস্তবতা মেনে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
শিশু ও কিশোর যৌনকর্মী
বিশ্বের বহু দেশে শিশু বা কিশোরদের যৌন কাজে নিযুক্ত করা হয়, যা মানবপাচারের অংশ। এই প্রবণতা সবচেয়ে ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই বিষয়ে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। শিশু যৌনকর্মীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও শিক্ষার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে দৌলতদিয়া, কুমিল্লা, টাঙ্গাইলসহ বহু স্থানে যৌনপল্লি রয়েছে। ভারতের সোনাগাছি (কলকাতা), কামাঠিপুরা (মুম্বাই), গ্বালিয়র, পুনে — এইসব স্থানে দীর্ঘদিন ধরে যৌনকর্মীদের বসবাস। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলি স্বাস্থ্য, এইচআইভি সচেতনতা এবং আর্থিক সঞ্চয়ের প্রকল্প চালু করেছে। তবে সামাজিক কলঙ্ক এখনো কমেনি।
উপসংহার
যৌন পেশার ইতিহাসে যেমন রয়েছে প্রাচীন আচার ও আভিজাত্য, তেমনি রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক অবহেলা। বর্তমান বিশ্বে যৌন পেশা নিয়ে আইনি স্বীকৃতি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা — সবকিছুর মধ্যে বৈষম্য ও দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। যৌনকর্মীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে হলে তাঁদের অধিকারকে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বৈধ কাঠামো, স্বাস্থ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষার সুযোগ, এবং সমাজে মর্যাদা — এইসব নিশ্চিত হলে যৌন পেশা নিয়ে কুসংস্কার অনেকটাই কমে আসবে।