"যে ঝরে পড়ে অকাল বসন্তে, সে ফুল নয়, অমর তার গন্ধ।। জ্ঞান যেখানে দীপ্যমান আলো, সেখানে তুমি জ্বেলে গেলে প্রদীপ, চব্বিশ ভাষার অধিপতি তুমি, বাঙালির কপোলে গৌরবের চিহ্ন, ইম্পেরিয়াল সভায় উঠেছিলে তুমি, বিদ্যার আসনে ভারতবর্ষের গর্ব।। অল্প বয়সে অশেষ, কত বই করিলে অনুবাদ।। আজও জাতির শ্রদ্ধায় জ্বলে, তোমারই নাম হরিনাথ।।"
— সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
বঙ্গীয় নবজাগরণ ও উনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে কলকাতা মহানগরী বিশ্বচেতনার অন্যতম কেন্দ্রস্থল রূপে পরিগণিত হয়েছিল। এই সময়ে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বঙ্গীয় মনীষার একটি স্থায়ী উত্থান লক্ষ্য করা যায়, যার ফলে অসাধারণ প্রতিভা ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী বেশ কয়েকজন মনীষী ও পণ্ডিত বঙ্গসমাজে এবং বিশ্বস্তরে খ্যাতি লাভ করেন।
এদের মধ্যে অবিস্মরণীয় প্রতিভা ও বহুভাষাজ্ঞানের অধিকারী হরিনাথ দের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কর্মজীবন যতটা সংক্ষিপ্ত, ততটাই গভীর ও প্রভাবশালী। তাঁর কৃতিত্ব শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এক বিস্ময় হিসাবে স্বীকৃত।
শিক্ষা ও ভাষাজ্ঞান
হরিনাথ দে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৭ সালে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে। তাঁর শিক্ষার সূচনা কলকাতা শহরে, এবং তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর কৌতূহল ছিল অপরিসীম। তিনি প্রায় ৩৫টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন — যার মধ্যে ছিল পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফার্সি, জার্মান, সংস্কৃত, ইতালীয়, হিব্রু প্রভৃতি।
তিনি প্রতিটি ভাষা যে শুধু পড়তে পারতেন তাই নয়, বরং সেই ভাষায় অনুবাদ ও গবেষণাও করতে পারতেন। তাঁর ভাষাজ্ঞান তাঁকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার শক্তি দিয়েছিল।
মনন, প্রভাব ও নবজাগরণের চেতনা
হরিনাথ দের কর্মকাণ্ড ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজে এক নবজাগরণের বার্তা বহন করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে জ্ঞানের জগতে ভারতীয়রাও পাশ্চাত্যের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে। স্বল্প আয়ু সত্ত্বেও তিনি যে পরিমাণ গবেষণা, অনুবাদ ও সৃষ্টিকর্ম করেছেন, তা এক বিস্ময়কর উদাহরণ।
বাঙালি মনীষার ইতিহাসে হরিনাথ দের উত্থান ও পতন, আগমন ও বিদায় এতটাই স্বল্প সময়কালের মধ্যে ঘটেছিল যে ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমিকায় তাঁর প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর সম্বন্ধে অসংখ্য ভ্রান্তিপূর্ণ কিংবদন্তির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি প্রাচ্যবিদ্যায় বাঙালি মনীষার অন্যতম প্রধান প্রতিভূ ছিলেন।
সমসাময়িক মনীষী ও তুলনা
তাঁর সমকালে ড. সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, স্বল্পজীবী অনুবাদক রবীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ নবজাগরণকালীন বঙ্গীয় মনীষার প্রতীক ছিলেন। হরিনাথ দে এদের সকলের থেকে আলাদা — কারণ তাঁর অসামান্য ভাষাজ্ঞান ও ভাষাগত অনুসন্ধিৎসার দ্বারাই বাংলায় ভাষা-চর্চা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ও প্রেসিডেন্সি কলেজের চত্বরে সেই যুগে বাঙালি যে বিশ্ববীক্ষা ও জ্ঞান-চর্চার দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে বিশ্বজনীন স্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিল, হরিনাথ দে তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হন।
গবেষণা ও পুনর্মূল্যায়নের প্রচেষ্টা
হরিনাথ দে সম্পর্কে প্রামাণ্য গবেষণার সূত্রপাত এককভাবে প্রাক্তন সাংবাদিক ও গবেষক শ্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় হয়। হরিনাথের মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম ব্যক্তি যিনি বহু কষ্টসাধ্য গবেষণার মাধ্যমে বিস্মৃত তথ্য সামনে এনে “ভাষা পথিক হরিনাথ দে” নামক দূর্লভ গ্রন্থটি রচনা করেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হরিনাথ-অন্বেষায় গবেষককুলের পথিকৃৎ — যিনি পরে হরিনাথের কয়েকটি রচনা ও লেখার সম্পাদনা করেন এবং National Book Trust-এর জন্য তাঁর জীবনী প্রণয়ন করেন।
এরপর হরিনাথ দে সম্পর্কে আর একজন ছিলেন যিনি বছরের পর বছর গভীর গবেষণার মাধ্যমে, বিস্মৃত ও অপব্যাখ্যায় জর্জরিত এই বাঙালি মহাজ্ঞানীকে সঠিক মহিমায় উদ্ভাসিত করতে সচেষ্ট ছিলেন — তিনি হরিনাথ দে-বিশেষজ্ঞ ড. প্রতাপ মুখোপাধ্যায়।
কর্কট রোগাক্রান্ত শরীরেও তিনি একের পর এক গ্রন্থ রচনা করেন এবং আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে এই উপেক্ষিত মহামনীষীর প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্বের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। তাঁর রচিত “বহুভাষাবিদ হরিনাথ দে — নানা প্রসঙ্গ” ও “ভাষাচার্য হরিনাথ দে পত্রাবলী” ইত্যাদি গ্রন্থ প্রায় চল্লিশ বছরের অক্লান্ত অনুসন্ধান ও গবেষণার ফল।
অর্জন ও কর্মজীবনের বিস্ময়
তিনি মাত্র ৩৪ বছরে ৩৫টি ভাষায় জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতের প্রথম আই.ই.এস. (Indian Educational Service) কর্মকর্তা, কেমব্রিজের Tripos-প্রাপ্ত অসাধারণ স্কলার এবং মোট পাঁচটি বিষয়ে এম.এ. (সবক’টি প্রথম বিভাগে)। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি হুগলি কলেজের প্রিন্সিপাল হন।
ল্যাটিন ও গ্রীক কাব্য রচনায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরস্কৃত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশে তিনি তুলনামূলক ভাষা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। একইসাথে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি, ল্যাটিন ও গ্রীক পড়াতেন। তৎকালীন ইংরেজি বিভাগের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন তিনি।
এর পাশাপাশি তাঁর মানবপ্রেম ও ছাত্র-স্নেহ কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছেছিল — যা বিদ্যাসাগরের অতিমানবিক দয়া ও করুণার সমতুল্য।
শেষ অধ্যায় ও বিস্মৃত প্রতিভা
এই মনীষীকে আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতি মনে রাখেনি। তাঁর শেষ কর্মক্ষেত্র ছিল ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (বর্তমান ন্যাশনাল লাইব্রেরি)-র প্রধান গ্রন্থাগারিক পদ। তাঁর পদগ্রহণ উপলক্ষে স্বয়ং লর্ড কার্জন মন্তব্য করেছিলেন — “The right man has come to the right place.”
কিন্তু দূর্ভাগ্য ও ষড়যন্ত্রের শিকার এই মানুষটিকে স্বার্থপর, আত্মসর্বস্ব বাঙালি জাতি ভুলে থেকেছে। আজও তাঁর অসামান্য অবদানের কোনো যথাযথ স্মারক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষককক্ষে নেই; অসংখ্য অধ্যাপকের ছবির মাঝে তিনি অনুপস্থিত। একই অবস্থা প্রেসিডেন্সি কলেজেও — সেখানেও তাঁর প্রতিকৃতি অনুপস্থিত।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আগে হরিনাথ দে-র যথাযথ জীবন সম্পর্কে কেউ উৎসাহী ছিলেন না; প্রায় সবাই মুখ ফিরিয়ে থেকেছে।