Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
উনিশশো ছেচল্লিশ
উনিশশো ছেচল্লিশ


গরুর গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকালেন সূর্যপ্রতিম। মাটির রাস্তা, তালখেজুরের ছায়া। গৌড়বঙ্গ। একটা শিহরণ হলো। কিন্তু মনটা কেমন যেন দমে গেল। একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম। তিনিও গাঁয়েরই লোক, তবে শহর মৌলভীবাজার কাছাকাছি। বাংলার গ্রামীণ বাড়িগুলোর ছাঁদ আলাদা। প্রকৃতি, মাটির গন্ধ আলাদা। এটা নদিয়া জেলা। বাড়িগুলোর পেছনে পুকুর, নুয়ে পড়া গাছপালায় সবুজ আঁধার। বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে এসে পড়েছেন তিনি। লম্বা রেলযাত্রা, তারপর কিছু হাঁটা পথ, কিছু গরুর গাড়ি। তিনি এসেছেন শ্রীহট্টের মৌলভীবাজার থেকে। যেখানে এলেন, সে নদিয়া জেলার এক প্রান্তিক গ্রাম। শ্রীহট্টের ভূমি উচ্চাবচ, আবহাওয়ায় আর্দ্রতা। এ সমভূমি, হাওয়া বইছে শুকনো। এখন মার্চ মাস। কিন্তু বেশ গরম। শুকনো হাওয়ায় ধুলো উড়ছে।

দুজন লোক আসছে। একজনের কাঁধে লাঙল, আরেকজন খাটো ধুতি ও গেঞ্জি পরনে, মাথায় ছাতা। সূর্যপ্রতিমের কানে এলো এরা বলাবলি করছে — "বিদেশি লোক মনে হচ্ছে, কী বলিস? নতুন ইশকুলের মাস্টার হতে পারে। গতকাল জমিদার মশাইকে বলতে শুনেছি, একজন নতুন মাস্টারমশাই আসছেন অনেক দূর থেকে, সেই সুদূর আসাম। মনে হচ্ছে ইনিই।"

সূর্যপ্রতিম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "নমস্কার। আমি বাইরে থেকে এসেছি, এখানে নতুন, কিছুই চিনি না। এখানে জমিদার বাড়িটা কোথায় আছে, যদি একটু বলে দেন, তাহলে বড্ড উপকার হয়। জমিদার শ্রী সূর্যনারায়ণ রায়।"

"হুঁই দিকে যেতে হবে গো, মশাই।"

লাঙল কাঁধে লোকটা কোনদিকে যে আঙুল দেখাল, ঠিক বোঝা গেল না। ধুতি পরা লোকটি তাঁর আপাদমস্তক জরিপ করছে। বড় ক্লান্ত লাগছে সূর্যপ্রতিমের। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, "ঠিক বুঝতে পারিনি।"

খাটো ধুতি পরা লোকটি লাঙল-কাঁধেকে বলল, "তুই যা, আমি ইনিকে পৌঁছে দিয়ে আসি। আসুন মশাই, আমার ছাতার নীচে আসুন। একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছেন। দিন সুটকেসটা আমাকে দিন।"

সূর্যপ্রতিম কুণ্ঠিত হয়ে বলেন, "না না, এ আমি নিয়ে যেতে পারব।"
"আরে মশাই, দিন তো! মনে হচ্ছে বিদেশি লোক। কোথা থেকে আসা হচ্ছে, মশাই?"

লোকটি প্রায় জোর করেই সুটকেস হাতে তুলে নিল।

"আসছি শ্রীহট্ট থেকে। এখানে একটা ইশকুল খুলেছেন জমিদারমশাই, সে ইশকুলের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছি।"
"নমস্কার, মাস্টারমশাই। আমার নাম অধিরাজ বাড়ুজ্জে। আমি জমিদারের সেরেস্তাদার। খুব ভালো, মশাই, নতুন ইশকুলের শিক্ষক হয়ে এসেছেন। কিন্তু মশাই, আপনার ভারি কষ্ট হবে। যুদ্ধ গেল, দুর্ভিক্ষ এলো। মানুষ কীভাবে না খেতে পেয়ে মরলো — উফফ — সেও চোখে দেখার ছিল! আপনাদের ওদিকে কি দুর্ভিক্ষের প্রকোপ পড়েনি?"

সূর্যপ্রতিম বললেন, "ওভাবে পড়েনি। তবে জিনিসপত্রের দাম তো আকাশছোঁয়া।"
অধিরাজ বলল, "ইয়ে, মাস্টারমশাই, থাকবেন কোথায়? কিছু ঠিক করেছেন?"
"নাহ! এই তো এলাম। কিছুই চিনি না।"
"সে ভাবনা নেই। জমিদার মশাই ঠিক ব্যবস্থা করে দেবেন। উনি উনার স্বর্গগত পিতার আচরণ পাননি। কলকাতা কলেজে লেখাপড়া করেছেন। এখানে এসে তো ইশকুল খুললেন। কত ভালো কাজ — পড়ার জন্যে দূরদূরান্তে এখানের কাউকে যেতে হবে না। তাছাড়া তিনি সবাইকে পড়ার অধিকার দিয়েছেন, মশাই — এটা ভাবা যায়! হাড়ি-মুচি-ডোম সবাই পড়বে! এ নিয়ে গাঁয়ের কিছু মানুষ কতো কথা বলছে, মশাই। জমিদার মশাই ওসব গায়ে মাখেন না। বলেন — 'গাঁয়ের মানুষ তো! ওসব কিছু কিছু বলবেই। একসময় বলা ছেড়ে দেবে।'"

কথা বলতে বলতে জমিদারবাড়ি এসে গেল। গ্রামবাংলার জমিদার বাড়ি দেখার একটা শখ ছিল তাঁর। বিশাল ফটক, চণ্ডীমণ্ডপ। জাফরি কাটা জানালা, টানা লম্বা বারান্দা, সারি সারি ঘর। আসামের ঘরবাড়ি থেকে একেবারেই আলাদা। জমিদারমশাই সূর্যনারায়ণের ব্যবহার তাঁকে মুগ্ধ করল। সূর্যনারায়ণ হেসে বললেন, "আমার এখানেই থাকবেন, মাস্টারমশাই। এই বিদেশবিভুঁইয়ে হাত পুড়িয়ে রেঁধে খেতে হবে না। আপনি পাদপ্রদীপে আলো জ্বালাবেন, আর আমি হবো তার নীচের ছায়া। আপনি আলো চলবেন আগে, আমি ছায়া হয়ে পেছনে পেছনে।"

সূর্যপ্রতিম হেসে বললেন, "ছায়া অগ্রগামিনী।"

খুশি হয়ে জমিদারমশাই তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, "দুজনের নামের আগে সূর্য। জ্বলবে জ্বলবে, আলো জ্বলবে।"

তারপর বললেন, "বসুন, মাস্টারমশাই। আরেকজন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, তার নাম অরুণোদয় — বুঝুন এবার। আর একজন দপ্তরি, তার নাম তপন। আপনি এসে গেছেন, এখন সলতে পাকানোর কাজ শুরু হলো।"

অধিরাজ বাড়ুজ্জে বিনীতভাবে, হাতজোড় করে বলল, "জমিদার মশাই, মাস্টারমশাই-এর খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা কি হবে? অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এলেন।"

সূর্যনারায়ণ বললেন, "তাই তো। ইনি এখানেই থাকবেন। দক্ষিণের ঘরটা খুলে দিন। সব সাফসুতরো আছে কিনা একটু দেখে নিতে বলুন ওদের। আর ভেতরে লোক পাঠান — খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হোক।"


"পাতোপেন্নাম, মাস্টারমশাই।"

সূর্যপ্রতিম দেখলেন, এক রোগাপটকা লোক কাঁধে লাঙল নিয়ে দাঁড়িয়ে।

"আজ পাঠশালে পাঠাব কি পটকাকে?"
"আজ তো রোববার। আগামীকাল পাঠিও। তুমি কোন মাঠে চললে?"
"ঐ পশ্চিমের মাঠে, মাস্টারমশাই।"
"বেশ চলো, আমিও সাথে যাই।"
"আপনি যাবেন?" — অবাক হয়ে লোকটা তাকায়।
"আমার তো কোনও কাজ নেই আজ। চলো যাই।"
"গড় করি, মাস্টারমশাই।"
সূর্যপ্রতিম হেসে বলেন — "গড় করতে হবে না। চলো।"

বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। ধূ ধূ হাওয়া, তবে শুকনো হাওয়া। বৃষ্টি হয়নি বেশ কিছুদিন। রুক্ষ মাটি। চাষির গরু রাখা আছে। লোকটা বলল, "লাঙল বদল করতি গিইচিলাম, বাবু।"

"জমিটা কার?"
"জমিদারমশাই-এর, বাবু। আমি ক্ষেতমজুর।"
"কি নাম তোমার?"
"এজ্ঞে, নিতাই বাগদি।"

সূর্যপ্রতিম দেখলেন, নিতাই লাঙল জুতে নিয়ে চাষ করতে শুরু করল। "হুই হুই হুরর…" — না, মাটি তেমন রুক্ষ নয়। একটু ভেজা আছে ভেতর থেকে। বড় বড় মাটির ঢেলা উঠে আসছে। সূর্যপ্রতিমের মনে পড়ে গেল দেশবাড়ির কথা। এমন সময় ছোট কাকা মাঠে যেতেন হিরুকে নিয়ে।

নিতাই চাষ করতে করতেই বলে, "মাস্টারমশাই গো! দেবলগড়ের নাম শুনেছেন?"
"হ্যাঁ। শুনেছি।"
"হোথায় নাকি ভূতের রাজ্যি।"
"ভূতের রাজ্যি? কেন?"
"ঐ যে গো, চাষিরা যখন মাটি চষে, তখন নাকি ঘটি, বাটি, থালা-বাসন এসব বেরোয়। সবাই বলে — ওখানে ভূত আছে।"

সূর্যপ্রতিম হেসে উঠলেন। দেবলগড়ের কথা অরুণোদয় তাঁকে বলেছে। অরুণ ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তাঁকে নিয়ে একবার যাবে বলেছে অরুণ ঐ দেবলগড়ে।

"তুমি কি গেছ ওখানে, নিতাই?"
"আমি? আমি কেন যাবো গো, জেনেশুনে ভূতের রাজ্যিতে!"
"ভয় পেও না, নিতাই। ভূত নয়। এখন কাজ করছ, একদিন তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব।"


একটি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে সূর্যপ্রতিম আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলেন। আশাই করেননি নিযুক্তিপত্র এসে যাবে। নিযুক্তিপত্র আসার পর আরেকটি কাজের ভালো প্রস্তাব এসেছিল। ত্রিপুরার রাজবাড়ির এক পারিবারিক সদস্যের ছেলেকে পড়াতে হবে। ভালো মাইনে দেবে। এরা মৌলভীবাজার শহরে থাকে। ছেলেটি এক ভালো ইশকুলে পড়ে। সুলোচনা বারবার নিষেধ করেছিলেন এত দূরে আসতে। কিন্তু সেই যে গৌড়বঙ্গের গ্রামবাংলা দেখার প্রবল ইচ্ছে, তা-ই তাকে টেনে এনেছে এই বাংলায়। এখান থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবল ধারা সারা দেশে প্লাবন সৃষ্টি করেছে। এখান থেকেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবধারা বাংলার নবজাগরণের জন্ম দিয়েছিল।

সুতরাং স্ত্রী সুলোচনাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন — "একবার তো যাই। ওখানে গিয়ে যদি দেখি তোমাদের নিয়ে যাওয়ার সুবিধে রয়েছে, তবে অচিরেই এসে নিয়ে যাবো তোমাদের সবাইকে।"

কিন্তু এ প্রান্তিক গাঁ। যাতায়াতের অসুবিধে তো আছেই, তার ওপর পরিবার নিয়ে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা বেশ কঠিন হবে।

সুলোচনার ও সূর্যপ্রতিমের এক ছেলে, এক মেয়ে। শ্রীহট্টের গাঁয়ে একান্নবর্তী বাড়ি। কাকা-জ্যাঠা, কাকিমা-জ্যাঠাইমাদের নিয়ে বিপুল সংসার। সুতরাং চিন্তার কিছুই নেই — সেজন্যেই এখানে চলে আসা।

হ্যাঁ, জমিদারমশাইয়ের ব্যবহার ভালো। মাঝেমধ্যে বলেন — "দেশের হালচাল কেমন, মাস্টারমশাই? ইংরাজ কি দেশ ছেড়ে চলে যাবে? যুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু মিত্রশক্তি-অক্ষশক্তি করে গোটা পৃথিবীকে শ্মশান করে দিল! জিনিসপত্রের এই অগ্নিমূল্য। বাংলায় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়ে গেল — সে চোখে দেখার নয়। আমি তখন কলকাতায় প্রেসিডেন্সিতে পড়ছি। উফফ — না খেতে খেতে মানুষ কেমন কঙ্কাল হয়ে যায়, সে আপনি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না। এখনও কিন্তু গ্রামবাংলা তা থেকে মুক্তি পায়নি।"

দেশের পরিস্থিতি সত্যিই বড় টালমাটাল। সূর্যপ্রতিম শিক্ষক হবার জন্যে নর্মাল পাশ করেছেন। কিন্তু চাকুরি কোথায়?

জমিদার সূর্যনারায়ণ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পড়াশোনা সম্পন্ন না করেই তাঁকে ফিরতে হলো বাড়ি — বাবা সৌরনারায়ণের হঠাৎ মৃত্যুতে বাড়ি ফিরে জমিদারির দায়িত্ব নিতে হলো। এসে গ্রামে ইশকুল খুললেন। জমিদারমশাইয়ের নামেই ইশকুল — 'সূর্যনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়'। আপাতত প্রাথমিক পর্যন্ত; ধীরে এইটি উচ্চ বিদ্যালয় হবে। পড়তে পারবে সবাই। এতে যেন জাতপাতের ভেদাভেদ না থাকে। এ নিয়ে উচ্চবর্গের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে রোজ, তবু চলছেন, আর চালিয়েও যাচ্ছেন। তবে পূর্বতন পারিবারিক সংস্কৃতিটি তো বহাল রেখেছেন, আবার তার সাথে নতুন কিছুও যোগ করেছেন।

লম্বা বারান্দায় সাধারণজনের বৈঠকখানা। চণ্ডীমণ্ডপে লোক এসে জমায়েত হয় বিভিন্ন কারণে। খাজনা যারা নিজে থেকে এসে দেয়, যারা খাজনা দিতে না পেরে এসে খাজনা কমানোর জন্যে কাকুতিমিনতি করে — এসব দেখাশোনা করেন সেরেস্তাদার অধিরাজ বাড়ুজ্জে। আর এই বারান্দার বৈঠকখানায় সন্ধ্যার পর গ্রামীণ লোকজন আসে, সেখানে উপস্থিত থাকেন জমিদার সূর্যনারায়ণ। একপাশে সারি সারি হুঁকো। কুলীন, আধা-কুলীন, অকুলীন ব্রাহ্মণ; উচ্চ, মধ্য, নিম্নবর্গের কায়স্থ — সবার জন্যে আলাদা আলাদা হুঁকো। ঐ পর্যন্তই ছিল। এখন অন্ত্যজ শ্রেণির বৈঠকখানায় বসে তামাক টানার ব্যবস্থা সূর্যনারায়ণ চালু করেছেন। এদের হাতজোড়, ঘাড়-মাথা নীচু চিরকাল; আজকাল জমিদারমশাই-এর কল্যাণে এদের জন্যে হুঁকো বসানোর ব্যবস্থায় উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য — এরা খুশি নয়। আড়ালে আড়ালে নানা কথা বলে।

সূর্যপ্রতিমের তামাকের নেশা। তাঁর হুঁকো রাখার খোপের নীচে লেখা রয়েছে — "মাস্টারমশাই"। সূর্যপ্রতিম কাছাকাছি এলেই কোনও না কোনও কর্মচারি এসে বলবেই — "মাস্টারমশাই, হুঁকো সাজিয়ে দেবো?" এটা সূর্যপ্রতিমের খুব ভালো লাগে। এখানের মুখের ভাষা ভারি মিষ্টি, কানে সুধা ঢালে। সেই যে চণ্ডীদাসের পদ — "কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো / আকুল করিল মোর প্রাণ।"


সুলোচনার দিনকাল আজকাল ভালো যায় না। দুটি সন্তান নিয়ে একেবারে জেরবার। এদিকে যুদ্ধের পর থেকে জিনিসপত্রের দাম আগুনছোঁয়া। খুড়শ্বশুর সারাদিন এসব নিয়ে আলোচনা করেন। রাতের আকাশে একচিলতে চাঁদ। শৈশবের কথা মনে পড়ে। মা তাকে কী যে ভালোবাসতেন, একেবারে আঁচলের তলায় আগলে রাখতেন তাঁকে। এখানে একগলা ঘোমটা দিয়ে বেরোতে হয়। ছেলেমেয়েদুটিকে সামলে ঘরের কাজে হাত লাগাতে হয়। এতগুলো মানুষ — সারাদিন দক্ষযজ্ঞ লেগেই আছে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে একা একা কাঁদেন সুলোচনা। মা মারা গেছেন দু'বছর হল। বাবাকে হারিয়েছেন ছোট্ট শৈশবে। বাবার কথা সুলোচনার মনেই পড়ে না। নদে জেলা এখান থেকে কত দূর? অনেকটাই? ওখানে একটা ভালো ব্যবস্থা করতে পারলে সবাইকে নিয়ে যাবেন সূর্যপ্রতিম। সেই আশাতেই দিন গুনছেন সুলোচনা। তবে সূর্যপ্রতিম চিঠি পাঠান। সপ্তাহে একটি খাম আসে, অত বিস্তারিত কিছু নয়। চিঠি পেলে আশ্বস্ত হন সুলোচনা। চিঠি খুলে পড়তে পড়তে সুলোচনার চোখে জল আসে —

"নিজের ও বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রেখো। আমি ঠিক আছি। জমিদার মশাই লোক ভালো। বললে হয়তো থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু আমি এখানে সপরিবারে থাকতে চাইছি না। আত্মসম্মানে বাধবে — আমি জানি, তুমিও ওভাবে থাকতে চাইবে না। আমি তো আর জমিদারের কর্মচারি নই, একজন শিক্ষক। আমি জানি, এভাবে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে — একা হয়ে গেছো ভেতর থেকে। সেই যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা — 'সবার মাঝে আমি ফিরি একেলা, কেমন করে কাটে সারাটা বেলা...'। আমি জানি, তুমি পথের দিকে তাকিয়ে থাকো, অপেক্ষায় থাকো। এখানে বাংলার অবস্থা একদম ভালো নয়। এখনও অলিখিত দুর্ভিক্ষ চলছে। তোমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে মাস দুয়েকের ভেতর আমি আসছি।"

এরই মধ্যে বাড়িতে এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। খুড়তুতো দেওরের মেয়ে, ছোট্ট একরত্তি মেয়ে — ছোটু — পাকা কাঁঠালের রস খেয়ে ফেলেছিল একটু বেশি। গভীর রাতে শুরু হলো পাতলা পায়খানা। গাঁয়ে এক কবিরাজ আছেন। রাতের বেলা একটি ঝাঁকড়ামাথা তেঁতুলগাছের নীচে দিয়ে যেতে হয়। গাঁয়ের সবার বিশ্বাস — ওই গাছের মাথায় ভূত আছে। রাতের বেলায় ঐ পথে কেউ যায় না। এখন কবিরাজের বাড়ি যেতে হলে ঐ পথে যেতে হয়। জ্যাঠশ্বশুর মানা করলেন — "ঐ পথে এই রাতে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। এরকম বাচ্চাদের হয়েই থাকে। একটু একটু করে চিনি-নুন মেশানো জল দাও।"

ছোটুর বাবা অমিয় বারবার করে বলছিল — "জ্যাঠামশাই, আমি যাই একবার। কিছু হবে না।"

সুলোচনার ভয় হলো। মায়ের মৃত্যুও অমনি পাতলা পায়খানায় হয়েছিল। এমনি রাতের বেলা, কেউ যায়নি ডাক্তার ডাকতে — এমনি ভূতের ভয়। সকালের দিকে মা মারা যান। সুলোচনা তখন এখানে। শেষ দেখেছিলেন মাকে দ্বিরাগমনে যখন গিয়েছিলেন। বুকটা কেঁপে উঠল সুলোচনার।

খুড়শ্বশুর (মানে অমিয়র বাবা) ধমকে উঠলেন — "দাদার ওপরে কথা বলছিস? ভারি লায়েক হয়েছিস, তাই না?"

মাঝরাতে সুলোচনার ঘুম ভাঙল। ছোটু বমি করছে। ছোটুর মা মীরা কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে অমিয়কে বলছে — "ভূত মানুষের মতো হয় না। ওদের একটু বুঝিয়ে বললেই হতো — ছেড়ে দিত তোমাকে। তোমার একটুও মায়াদয়া নেই? পালিয়ে গেলেই তো হতো খিড়কি দুয়ার দিয়ে।"
অমিয় গলা নামিয়ে বলে — "চুপ করো। বাবা-জ্যাঠা শুনলে রক্ষে থাকবে না।"
— "তোমার মেয়ের চাইতে তোমার বাবা-জ্যাঠা বড়ো হলো?"

— "কি হয়েছে? ঘুমোতে দিবি না তোরা?" — জ্যাঠশ্বশুরের গলা। "বউমা, শেষ কথাটি যা বললে, তা আমার কানে এলো। মেয়েমানুষের এতো বাড়বাড়ন্ত ভালো নয়।"

সুলোচনা জানালা খুলতেও ভয় পান। তাকে বাইরে দেখলে জ্যাঠশ্বশুর কী বলে উঠবেন কে জানে! এদিকে ছোটুর দেহ ধীরে ধীরে নেতিয়ে এলো। ওকে চিনি-নুন জলও খাওয়ানো যাচ্ছে না। খেলেই বমি করে ফেলছে।

কবিরাজ ডাকার আর সময় পাওয়া গেল না। ভোরের দিকে সবাইকে ছেড়ে ছোটু চলে গেল।

মীরা ছোট্ট শিশুটির মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদছে। সুলোচনার দু'চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। সামনেই পুজো। ছোটু এসে বলতো — "বাবা বলেছে, এবার মৌলভীবাজার থেকে আমার জন্যে লাল টুকটুকে ফ্রক কিনে আনবে। জে জে কবে আসবে? জি জি — জে জে কতদূর গেছে? সে কি অনেক দূর?" ছোটু কি সুলোচনার মা ছিল? দ্বিতীয় জন্ম? একইভাবে দুজনের মৃত্যু — একইভাবে!

মীরার কোল থেকে ছোটুর অসাড় দেহকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেওয়া হলো। আর সেটা করতে হলো অমিয়কেই। তার দু'চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। শুধু জ্যাঠশ্বশুর গুম হয়ে বসে আছেন।


"জমিদারমশাই, কিছু চাল পাবো গো? বড্ড পেটের জ্বালা।"

সূর্যপ্রতিমের জানালার পাশেই পড়ার টেবিল। এখান থেকে বাইরের উঠোন, চণ্ডীমণ্ডপে লোকজনের আসা-যাওয়া সব দেখা যায়। বারান্দার বৈঠকখানায় টানা পাখা চালাচ্ছে এক কর্মচারি। সূর্যনারায়ণ বসে আছেন। তিনি মহিলাটিকে দেখলেন।

"এই দেখো, একেবারে ভেতরবাড়িতে চলে এসেছে।" — প্রায় তেড়ে যাচ্ছিল এক কর্মচারি।

সূর্যনারায়ণ বাধা দিলেন। ওকে অন্তঃপুরে পাঠালেন। সামান্য কিছু খাবার অন্তঃপুর থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সূর্যপ্রতিম দেখলেন — পান্তাভাত, সাথে কিছু পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা। মহিলাটি হাতে নিয়ে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, ওখানেই গোগ্রাসে গিলতে শুরু করেছে। সূর্যপ্রতিম দেখছেন।

কর্মচারিটি তেড়ে গেল — "এই তোরা কি মানুষ? যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস, সেখানে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিস? যা এখান থেকে!"

সূর্যপ্রতিম দেখলেন, মহিলাটি খাবার হাতে প্রায় ছুটছে; পেছনে তাড়া করছে সেই কর্মচারি।

"মাস্টারমশাই!" — চমকে সূর্যপ্রতিম পেছনে দরজায় তাকিয়ে দেখেন, জমিদার মশাই দাঁড়িয়ে।
সূর্যনারায়ণ বললেন, "আরে দাঁড়িয়ে পড়লেন কেন? আপনি আমার নমস্য। শিক্ষক মানুষ। আসুন, একটু কথা বলি।"

সামনের বারান্দায় বসলেন মুখোমুখি।

সূর্যনারায়ণ বললেন, "বড্ড মুশকিলে পড়েছি, মাস্টারমশাই। গিন্নী তো দিনরাত বলেই চলেছে — আমি নাকি জমিদারি লাটে তুলব। দুর্ভিক্ষের প্রকোপটা এখনও রয়ে গেছে। আমার ভান্ডারটাও খালি হতে কতক্ষণ! যদি দানসত্র খুলে বসি, তাহলে মানুষ সকাল থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আচ্ছা, মাস্টারমশাই, দেশ কি স্বাধীন হতে চলেছে? কী মনে হয় আপনার? আপনি তো খবরের কাগজ খুঁটিনাটি পড়েন, দেখেছি।"
সূর্যপ্রতিম বললেন, "হয়তো হবে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের এই বিভাজন ঠিক ভালো ঠেকছে না।"
"হুম। বৃটিশরা শেষ পর্যন্ত কি চলে যাবে সত্যিই?"
"হয়তো যাবে। কিন্তু মানুষের মাঝে যে বিভাজন দেখতে পাচ্ছি, তাতে কেমন যেন লাগছে। কেমন স্বাধীনতা আমরা পাবো, কে জানে! আর এই যুদ্ধে, দুর্ভিক্ষে মানুষের অবস্থা চোখে দেখার মতো নয়।"
"হুম। আপনি হয়তো ভাবছেন — এতো বড়ো ধানের গোলা থাকা সত্ত্বেও আমি কেন সবাইকে সাহায্য করছি না?"
"না না। ওভাবে বলবেন না! আমি স্বাধীন ভারত কেমন হবে, তাই বলছি।"
"বৃটিশরা তেমন খারাপ নয়, বুঝেছেন। ওরা আমাদের থেকে অনেক উন্নত। কী না করল বলুন তো! এই রেলগাড়ি চালু করল, কলকারখানা বসাল, ইশকুল-কলেজ করল। ঐ যে রামমোহন, বিদ্যাসাগর — এঁদেরকে সাহায্য করেছে, নাহলে কি মেয়েদের জন্যে এতসব ভালো কাজ হতো? এই যে প্রেসিডেন্সি কলেজে আমি পড়তাম — সেই কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেছিল জানেন তো?"
সূর্যপ্রতিম বললেন, "হ্যাঁ। রাজা রামমোহন রায়।"
"শুধু রাজা রামমোহন রায়? ডেভিড হেয়ার, আলেকজান্ডার ডাফ, রাজা রাধাকান্ত দেব — এঁরা সাহায্য করেছেন। প্রথমে হিন্দু ইশকুল, তারপর হিন্দু কলেজ, তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজ। ওরা এদেশে শিক্ষাবিস্তারে আমাদের অনেক এগিয়ে দিয়েছে। ইংরাজদের চলে যাওয়া আমার তেমন ভালো লাগছে না।"
"আপনি স্বাধীনতা চান না?"
"আপনার কাছে বলতে আমার বাধা নেই, মাস্টারমশাই — সত্যিই আমি চাই না। চলুন, আপনাকে একটা ঘরে নিয়ে যাই।"

সূর্যপ্রতিমের ভেতর থেকে একটা বিরূপ মনোভাব এলো। এই জমিদারদের তোষামোদের জন্যেই ইংরাজদের এতো বাড় বেড়েছে। এত যুবক প্রাণ দিল স্বাধীনতার জন্যে, আর এই লোকটা বলে কি! দেশের মানুষের ওপর এতো অত্যাচারের পরও এভাবে বলতে পারলো লোকটা?

সূর্যনারায়ণ বললেন, "আসুন, মাস্টারমশাই।" আগে আগে চলেছেন সূর্যনারায়ণ।

বিশাল বৈঠকখানা। বড় বড় কৌচ। সম্ভবত এখানে ইংরাজ আমলারা বসে। দেয়ালে বিশাল সব তৈলচিত্র।

"ইনি আমার বাবা সৌরনারায়ণ। ইনি আমার পিতামহ শৌর্যনারায়ণ। প্রতিটি ছবির নীচে শিল্পীর নাম দেখুন, আর পাশে সম্মাননাপত্র দেখুন।"

সূর্যপ্রতিম দেখলেন, সব শিল্পীই ইংরাজ, আর সম্মাননাপত্রও বৃটিশরাজের দেওয়া। জিজ্ঞেস করলেন — "আপনার ছবি?"

"হতো। কিন্তু এখন বড় অস্থির পরিস্থিতি। এই যুদ্ধের পর ওরা বেসামাল। নিজেরাই ক্ষমতা এদেশীয়দের কাছে হস্তান্তর করে চলে যেতে চাইছে। আমার কপালটাই খারাপ, বুঝলেন? কলকাতায় প্রেসিডেন্সিতে পড়ছিলাম — কত কী শিখছিলাম — কিন্তু হঠাৎ করে বাবা চলে গেলেন, আমাকে চলে আসতে হলো পড়াশোনা ছেড়ে। আমি চাই, এদেশের সবাই লেখাপড়া শিখুক। তাই দরিদ্র গ্রামবাসীর ছেলেমেয়েদের ইশকুলে আসার অধিকার দিয়েছি। তবে বেশিরভাগই আসে না। একটা ফী তো দিতেই হবে, নাহলে ইশকুল চালাবো কী করে। এই যেমন শিক্ষকদের মাইনে, যেমন দপ্তরির মাইনে।"

সূর্যপ্রতিম বললেন, "ওরা তো আসেই না, জমিদারমশাই। আসে উচ্চ বর্ণের সন্তানরা।"
"সেটাই তো বলছি, মশাই। এই অস্থির পরিস্থিতিতে কী আর করা যায়, বলুন তো? তবে আমি যা করার করেছি সাধ্যমতো। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই।"

সূর্যপ্রতিমের ভেতরটা খচখচ করছে। লোকটি ইশকুল খুলেছে, অন্ত্যজদের কিছুটা অধিকার দিয়েছে — অথচ স্বাধীনতা চায় না। আশ্চর্য স্ববিরোধ! সূর্যনারায়ণের মতো মানুষরাই কি ইংরাজদের সাথে গোপন সম্পর্কে জড়িত? এরাই হয়তো স্বদেশিদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে গোপন দূত পাঠায় ইংরেজ আমলাদের কাছে? নাহলে এতো সম্মানপত্র কেন? শ্রী শ্রী বাবু শৌর্যনারায়ণ, তারপর ইংরাজের স্তবগাথা — এমনি এমনি কি দেয়?

বিকেলে সূর্যপ্রতিম গ্রামের পথে বেরোলেন। সূর্য অস্তে যাচ্ছে, তার অপূর্ব লালিমা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।

"মাস্টারমশাই, ও মাস্টারমশাই — দাঁড়ান। আপনার চিঠি আছে।"

কাঁধে চিঠির ভারি ব্যাগ। দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে ডাকপিয়ন। সূর্যপ্রতিম দাঁড়িয়ে পড়লেন। শেষ বিকেলের রাঙা আলোয় পথঘাট রাঙা।

পিওন ব্যাগ হাতড়ে একটা খাম তুলে দিল তাঁর হাতে। একমুখ হেসে বলল — "খুব ভালো হলো, মাস্টারমশাই, আপনাকে পেয়ে গেলাম। আমি দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি — মনে হলো মাস্টারমশাই না? আসি, মাস্টারমশাই।"

এখান থেকে ডাকঘর অনেকটা দূর। লোকটা সেইরকমই দ্রুত গতিতে যাচ্ছে। একদিকের কাঁধ গেছে বেঁকে। সামনেই শাখাপত্র ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বটগাছ। অদূরে জমিদারেরই খনন করা পুকুর। পাড়টা বাঁধানো। সূর্যপ্রতিম বাঁধানো ঘাটের একপাশে বসে চিঠি খুললেন। সুলোচনার চিঠি।

শ্রীচরণেষু

আমার প্রণাম নিবেন। কেমন আছেন? লিখিয়াছিলেন খাওয়াদাওয়া জমিদার বাড়িতে ভালো। শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো? আপনার জন্যে ভারি চিন্তা হয়। দুটি ছোট শিশু লইয়া আমি যারপরনাই কষ্ট করিতেছি। ইহার মধ্যে এক মারাত্মক ঘটনা ঘটিয়াছে। অমিয়র কন্যা ছোটু আর ইহজগতে নাই। সময়মতো চিকিৎসা না পাইয়া সে মারা গিয়াছে। আমার মনে হয় — আপনি থাকিলে নিশ্চয়ই ওর সুচিকিৎসা হইত, কারণ আপনি সাহসী। এখন সারাক্ষণ ভয় হয় — কিজানি ঝুনু-রুনু না অসুস্থ হইয়া পড়ে! এই এতবড় সংসারের কাজ করিতে করিতে আমি ক্লান্ত হইয়া পড়ি। ইহাদের দিকে সেইভাবে নজর রাখিতে পারি না। আচ্ছা, এইখানে কি চাকুরি পাওয়া যাইবে না? অতদূরে বাহিরে থাকিয়া আপনিও তো অসুস্থ হইয়া পড়িতে পারেন। তখন কে দেখিবে? একটা চিঠি পাঠাইলে সেটা পৌঁছাইতে পৌঁছাইতেই তো সময় চলিয়া যায়। ত্রিপুরার রাজপরিবারের ছেলেকে পড়াইবার জন্য বলিয়াছিল — সেটা কি মনে পড়ে? মৌলভীবাজার শহরে ওরা আছে। খুড়শ্বশুর বলিয়াছেন, একদিন মৌলভীবাজার শহরে উনার কাছে একটি লোক নাকি আবার আপনার খোঁজ করিয়াছে।

সব বলিলাম। এখন যাহা ভালো মনে করিবেন, তাহাই করিবেন। তবে আমি বলিতেছি — চলিয়া আসুন। ইহাতেই সবার মঙ্গল। প্রণাম জানিবেন।

ইতি
সুলোচনা
২রা আষাঢ় ১৩৫৩ সাল

সূর্যপ্রতিম কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ছোটু নেই? সেই ছটফটে শিশুটা। সুলোচনা লিখেছে — চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে। কী হয়েছিল তার? সব খুলে লেখেনি সুলোচনা। আহা, ছোটুর সেই কোমল শিশু মুখটি মনে পড়ল। খুব ছটফটে। পুতুল খেলত রুনুর সাথে। একটি পুতুলের চোখমুখ এঁকে দিয়েছিল সুলোচনা। ছোটু ছুটে এসেছিল তাঁর কাছে, বলেছিল — "জে জে!" — একটু বড়ো হয়ে গেছে সে, তবু ডাকে জে জে। "জে জে, এই পুতুলটা জি জি (সুলোচনা) করে দিয়েছে। চোখমুখ সব এঁকে দিয়েছে। আর এইটার নাম তুমি দেবে।" তিনি নাম দিয়েছিলেন — 'সুশীলা'। এতে কী খুশি ছোটু! রুনু আর ছোটুর যত্নে সুশীলার বিছানা ঝকঝকে; সুশীলা ভালো ভালো খাবার খায়, আর ঝকঝকে তকতকে বিছানায় ঘুমোয়। চোখে সহজে জল আসে না সূর্যপ্রতিমের — এলে ভালো হতো। শুধু বুকের ভেতরটা হু হু করে জ্বলতেই থাকে। এই জ্বালাটা ভয়ানক। দুঃখে চোখের জল সব ধুয়েমুছে দেয়। কিন্তু এই যে বুকের ভেতর খান্ডবদাহ — তা সহ্য করাটা ভারি কঠিন।

"মাস্টারমশাই গো, মাস্টারমশাই গো — একটা জিনিস। এখানেও এঁনারা আছেন। আজ মাঠ চষতে গিয়ে এটা পেলাম। পিদিম মনে হচ্ছে।" — নিতাই হাঁফাচ্ছে।

"এটা লাঙলে লাগছিল, মশাই গো। সারাদিন জায়গাটা চষার পর মাটির ঢেলার সাথে বেরিয়ে এলো। দেখুন গো, মাস্টারমশাই।"

সূর্যপ্রতিম হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। দেখে মনে হচ্ছে পাথরের তৈরি প্রদীপ। গায়ে কারুকাজ করা।

"এটা হাতে নেওয়ার পর থেকে আমার কেমন যেন গা ছমছম করছে গো, মাস্টারমশাই।"
সূর্যপ্রতিম বললেন, "জলপ্রদীপ। মনে হচ্ছে অনেক পুরনো কালের।"
"পুরনো কাল? মাটির নীচে চলে গেল কী করে গো?"
"কত কিছু হয়। বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস। সভ্যতা চলে যায় মাটির নীচে।"
"তেনারে এখানেও আছেন? তা এটা আপনি রাখুন, মাস্টারমশাই। আপনি যা করার করবেন। সন্ধেবেলা বড্ড গা ছমছম করছে।"

পথে ঘাটে সন্ধে উৎরে রাত নেমেছে।
নিতাই বলল, "সাবধানে যান, মাস্টারমশাই। তেনারা না রাগ করে বসেন। আর জমিদার মশাইকে বলবেন — নিতাই এই প্রদীপখানা মাটির নীচে পেয়েছে। বলবেন, মশাই, আমার কথাখানা।"
সূর্যপ্রতিম বললেন, "হ্যাঁ, নিশ্চিত বলব। তুমি পেয়েছ — তোমার কথা বলব না?"


আনমনা হয়ে হাঁটছেন সূর্যপ্রতিম। "ছোটু, তুই চলে যাবি জানলে কখনও এখানে আসতাম না রে।" আসবার সময় বারবার পাঞ্জাবির কোণ টেনে ধরে বলছিলি — "কোথায় যাচ্ছ, জে জে? তোমার ভয় করছে না? একা একা কতদূর! কবে আসবে?"

চোখে জল আসে না সূর্যপ্রতিমের। এলে ভালো হতো। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন ম্যালেরিয়া মহামারিতে, তার কিছুদিন পর মা। কী করে যেন ভাইবোন তিনজন বেঁচে গেলেন। দুই দিদি তাঁকে মাতৃস্নেহ দিয়ে বড় করেছেন।

সে রাতে তিনি হাতে কী এনেছেন — লক্ষ করার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। প্রদীপটি টেবিলের একপাশে রেখে দিলেন। খুব তামাক টানার ইচ্ছে হলো। তিনি বারান্দার বৈঠকখানায় এলেন। অর্ধমনস্কের মতো একটি সাজানো হুঁকো তুলে নিয়ে লম্বা করে দু'-তিন টান দিতেই হা হা করে ছুটে এলো কানাই — এই কানাই রয়েছে হুঁকো সাজানোর দায়িত্বে।

কানাই বলল, "ও মাস্টারমশাই, ও মাস্টারমশাই — আপনি যে হরে বাগদির হুঁকোয় টান দিয়ে ফেললেন গো! কী হবে গো? এমন কি করতে আছে! এমন তো কখনও করেননি, মাস্টারমশাই!"
সূর্যপ্রতিম বললেন, "কি হয়েছে, কানাই?"

সূর্যনারায়ণ একপাশে বসে আছেন এক বড় কেদারায় — লক্ষ করেননি সূর্যপ্রতিম।

কানাই বলল — "জমিদারমশাই, মাস্টারমশাই হরে বাগদির হুঁকো মেরে দিয়েছে। কী হবে গো?"

সূর্যনারায়ণ প্রথমে একটু গম্ভীর, পরে হাল্কা হেসে বললেন — "মাস্টারমশাইকে যেন খানিক আনমনা লাগছে। কিছু কি হয়েছে?"
আবার কানাই হাতজোড় করে বলে, "কি হবে গো, জমিদারমশাই?"
সূর্যনারায়ণ ভেংচি কেটে বলেন, "কি হবে গো, জমিদারমশাই? তুমি ছিলে কোথায়? কী হবে তা মাস্টারমশাই বুঝবেন!"
কানাই বলল, "আর যদি কিছু না বোঝেন?"
সূর্যনারায়ণ বললেন, "তাতে তুমি প্রায়শ্চিত্ত করবে।"

বসে আছে অনেক লোক। তার মধ্যে কি হরে বাগদি আছে? লজ্জায় তিনি কারো দিকে তাকাতে পারছেন না। বাগদিদের বৃত্তি হচ্ছে চাষাবাদ করা, মাছ ধরা। এই বৃত্তি বা পেশা দেখেই মানুষ মানুষকে কতো অপমান করে। তবে সবটাই গা সওয়া। অভ্যেস। অপমান যখন রক্তে মিশে যায়, তখন অপমানকে মনে হয় সহজ এবং প্রাপ্য।

সূর্যপ্রতিম জমিদারমশাইকে একটি নমস্কার দিয়ে বললেন, "আজ আমার মনটা ভালো নেই, জমিদারমশাই। আগামীকাল আপনার সাথে দেখা করব একবার। আজ আসি।"
সূর্যনারায়ণ বললেন, "কেন? বাড়ির সবাই ভালো তো?"
"আগামীকাল বলব, জমিদারমশাই। আজ আমি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।"

তারপর সবার দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বললেন, "ভুল হয়ে গেছে। সবাই আমায় মাফ করে দেবেন। আর কখনও এরকম হবে না। আসি, জমিদারমশাই?"
"আসুন।"


রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলেন সূর্যপ্রতিম। দেখলেন এক প্রাচীন প্রাসাদ, চমৎকার রাস্তাঘাট, গাছপালা, ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। চমৎকার বাঁধানো দীঘি। এক নারী হাতে এক কারুকাজ করা পাথরের প্রদীপ জ্বালিয়ে বাঁধানো দীঘির সিঁড়ি দিয়ে নামলো, তারপর অন্ধকার দিগন্তের দিকে প্রদীপ তুলে ধরল। এই প্রদীপটি কোথায় দেখেছেন তিনি? কোথায়?

খুব স্পষ্ট ভোরের স্বপ্ন। এমন স্বপ্ন দেখার কথা তো নয়। কারণ তিনি গতকাল ছোটু ছাড়া কারো কথা ভাবেননি। ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে দেখলেন — ভোর পাঁচটা বাজতে চলেছে। এখনও অন্ধকার। উঠে আলো জ্বালালেন। তারপর আলোর কাছে নিয়ে এলেন নিতাই বাগদির দেওয়া প্রদীপটি। কাল রাতে অত লক্ষ করেননি; আজ দেখলেন সত্যিই এটা প্রদীপ। পাথরের তৈরি কি? সারা গায়ে অপূর্ব কারুকৃতি। প্রদীপের কানার ধারটা অল্প ভেঙে গেছে। একটা শিহরণ এলো। গতকাল রাতের স্বপ্নটা যেন জীবন্ত। স্তব্ধ অতীত — সেই বধূ যে দিগন্তে প্রদীপ দেখাচ্ছিল, সে আছে স্বপ্নে। সময়ের স্রোতে সে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু সে আছে। তার হাতের স্পর্শ কি আজও এই প্রদীপের গায়ে লেগে নেই?

"তব সঞ্চার শুনেছি আমার / মর্মের মাঝখানে, কত দিবসের কত সঞ্চয় / রেখে যাও মোর প্রাণে।"

ইস্কুলে যাওয়ার সময় প্রদীপটাকে একটা খবরের কাগজে মুড়ে তিনি কাঁধব্যাগে ঢোকালেন। ইস্কুলের ইতিহাস শিক্ষক অরুণোদয়কে দেখাতে হবে।

অরুণোদয় দেখছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। বলল — "এটি জলপ্রদীপ। সম্ভবত এই জায়গা পর্যন্ত রাজন্যবর্গের সভ্যতা বিস্তারিত ছিল। এইটা তুমি জমিদার মশাইকে দেখিও। সেনবংশ, পালবংশ, আর মোগল আমলের কিছু নিদর্শন রয়েছে এসব এলাকায় — বলে মনে করা হয়। এ নিয়ে নাকি বইও আছে। কিন্তু এই প্রত্যন্ত গ্রামে কোথায় পাবো বলো ঐসব বই — গত শতাব্দীতে লেখা। আমি বুঝতেই পারছি না প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন দেবলগড়। তুমি জমিদারমশাইকে বলে দেখো।"

জমিদারমশাইকে প্রদীপটি দেখাতেই মনে হলো, তিনি একটু গম্ভীর। খুব মনোযোগ দিয়ে প্রদীপটি দেখছেন খুঁটিয়ে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দীর্ঘশ্বাসের কারণ বুঝতে না পেরে সূর্যপ্রতিম চুপ করে রইলেন।

সূর্যনারায়ণ বললেন, "এটা আমার কাছেই থাক, মাস্টারমশাই। দেখি, কী করতে পারি। মাস্টারমশাই, বৃটিশরা যদি স্থিরভাবে রাজত্ব চালাতে পারতো, তাহলে এসবের কদর হতো। প্রত্নতত্ত্বে, পুরাতত্ত্বে এদের কতো আগ্রহ, কে না জানে! এখন তো ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়। তবু আমি চেষ্টা করব।"


সূর্যপ্রতিম ফিরে এসেছেন শ্রীহট্টের গ্রামে। প্রায় পালিয়েই এসেছেন বলা চলে। ১৬ আগস্ট "ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে"-র ডাক দেওয়া হয়েছে — ধর্মের নিরিখে দেশভাগের জন্যে। সেদিন ১১ই আগস্ট, সূর্যপ্রতিম বহুকষ্টে রেলের টিকিট জোগাড় করলেন। সূর্যনারায়ণ তাঁকে বলেছিলেন — "মাস্টারমশাই, আপনি বাড়ি চলে যান। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে চলেছে। আপনার বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান ফেলে এসেছেন। এতটা দূরের পথ। আপনাকে নিয়ে বড় চিন্তা হয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরে আসবেন অবশ্যই।"

"ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে"। কলকাতা, পাঞ্জাব, নোয়াখালিতে আগুন জ্বলছে। মৃত্যু আর মৃত্যু।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের সেই ছেলেটিকে পড়াচ্ছেন সূর্যপ্রতিম। সুনয়ন রায়বর্মণ — তাঁর ছাত্রটির নাম। বেশ বুদ্ধিমান। জিজ্ঞেস করে — "মাস্টারমশাই! শুনছি দেশ নাকি স্বাধীন হবে। কিন্তু কলকাতায় নাকি খুব গন্ডগোল। এতো রক্ত ঝরছে কেন?"

সুলোচনা ঈশ্বরের কাছে বসে কাঁদেন আর বলেন — "মাগো, তোমার অশেষ করুণা মা — আমার স্বামীকে সুস্থদেহে ফিরিয়ে এনেছ।"

শুধু সূর্যপ্রতিম ভেতর থেকে আফসোস করেন — যাওয়া হলো না সেই দেবলগড়ে। জলপ্রদীপ হাতে সেই রমণীর স্বচ্ছতোয়া দীঘির ধাপ ভেঙে ভেঙে নেমে যাচ্ছে। সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। সেই সুমধুর ভাষায় আর বলতে শুনবেন না — "জমিদারমশাই গো, মাস্টারমশাই হরে বাগদির হুঁকো মেরে দিয়েছে।"




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top