প্রথম ছয়টি অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
সপ্তম অধ্যায়
➖ ভুতেরা ফিরে আসে — কিসের জন্য? এইভাবে যদি আমাদের আলোচনার পর্বটা এগিয়ে নিয়ে যাই তাহলে মনে হয় সুবিধা হবে কী বলিস?
➖ হ্যাঁ দাদা। ওরা কিসের জন্য ফিরে আসে এর উত্তরে ক্ল্যাসিক গ্রীক এবং রোমান সাহিত্যের এক অতি পরিচিত বিষয় হলো যথাযথ শেষকৃত্য করার দাবি নিয়ে ভূতের আবির্ভাব।
➖ উদাহরণ?
➖ তিনটে বলি, যা আপাতত মনে পড়ছে —
এক, ট্রয়ের যুদ্ধের সময়, প্যাট্রোক্লাসের অশরীরী তার সহযোদ্ধা অ্যাকিলিসের কাছে উপস্থিত হয়েছিল। সে চেয়েছিল সঠিকভাবে তাকে দাহ করা হোক। ভূতটা অবশ্য এর সাথে একটা দুঃসংবাদও দিয়েছিল — অ্যাকিলিস নিজেও এই ট্রয়ের যুদ্ধেই মারা যাবে।
দুই, ইউলিসিসের সমুদ্রযাত্রার এক সাথী এলপেনর। যার মৃত্যু হয়েছিল সির্সের দ্বীপে। তার আত্মাও ফিরে আসে, ইউলিসিসকে ওই দ্বীপে ফিরে গিয়ে যথাযথভাবে তাকে সমাধিস্থ করার আবেদন জানায়।
তিন, রোমান সম্রাট ক্যালিগুলার ভূত ল্যামিয়ানের উদ্যানে ঘুরে বেড়াত। হত্যা করার পর তার দেহ দ্রুত পুড়িয়ে দিয়ে ওখানেই পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। একজন সম্রাটের যেরকম শেষকৃত্য করা উচিত সেরকম অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত তার ভূতকে অনেকেই ওই স্থানে দেখতে পেয়েছিলেন। যেস্থানে ক্যালিগুলাকে খুন করা হয়েছিল সেই স্থানে তাকে ছাড়াও অন্যান্য অনেক ভূতের দেখা পাওয়া যেত বলে জানা যায়।
➖ বেশ বেশ। অনেক সময় আবার এটাও দেখা গিয়েছে, নিজের চেনা মানুষদের কাছে বা কোনও কোনও সময় অপরিচিত মানুষের কাছেও ভূতের আগমন হচ্ছে, জীবিত জীবনের বা পরবর্তী সময়ে তার জন্য করা নানান কাজের ধার শোধ করার জন্য।
➖ একদম দাদা। এর একটা উদাহরণ হলো রোমান রাজনীতিক এবং লেখক সিসেরোর (খ্রিস্টপূর্ব ১০৬-৪৩) একটা লেখা। যেখানে উনি সিমোনাইডস নামক এক মানুষের কথা লিখেছেন। যে এক অজানা আগুন্তুকের মৃতদেহ কবরস্থ করেছিল। সেই আগন্তুকের ভূত সিমোনাইডসের কাছে উপস্থিত হয়েছিল। তাকে পরামর্শ দিয়েছিল জাহাজে সফর না করার। সিমোনাইডস অশরীরীর কথা মেনে নিয়েছিলেন । পরে জানতে পারে যে, জাহাজটা সমুদ্রের বুকে হারিয়ে গিয়েছে।
➖ অর্থাৎ প্রাণরক্ষাকারী ভূতের গল্প।
➖ এমন অনেক নমুনাও পাওয়া যাচ্ছে যেখানে ভুত বা আত্মারা বর্তমান সময়ের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই বলতে পারে না কিন্তু অতীত সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ সচেতন । খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস লিখে গেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীর মানুষ পেরিয়ান্ডারের স্ত্রীর কথা। গ্রীস করিন্থের শাসকের স্ত্রীর আত্মা মৃতদের জগত থেকে ফিরে এসেছিলেন স্বামীর হারিয়ে যাওয়া এক মূল্যবান বস্তু খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য।
➖ সাহায্যকারী ভূত। থুড়ি ভূতনীও বলা যায়।
➖ একইসঙ্গে এটাও দেখা যাচ্ছে যে, সব ভূতই ভবিষ্যৎ বলতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, এটাকে একটা ক্ল্যাসিক্যাল যুগের সমাপ্তি রূপে আমরা ধরে নিতে পারি। আগে ভবিষ্যতের কথা জানাত 'অর্যাকল'রা। একের পর এক 'অর্যাকল'দের অবলুপ্তি ঘটার পর দেখা যাচ্ছে ভূতেরা ভবিষ্যতের ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতা নিজেদের ভেতর বিকশিত করেছে।
➖ অর্থাৎ নিজেদের বা ভুতেদের সময়ের উপযোগী করে নিচ্ছেন কাহিনিকাররা।
➖ হ্যাঁ সেটাই মনে হয়। শোকাহতদের সান্ত্বনা দিতেও ভূতেরা ফিরে এসেছে। এনিয়াসের স্ত্রীর ভূত [নাকি পেত্নী বলব?], যিনি ট্রয়ের যুদ্ধর সময় আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন, ফিরে এসেছিলেন স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে। এছাড়াও সেই সমস্ত মানুষদের ভূতেরাও ফিরে ফিরে এসেছে, আজও আসে অনেক জায়গায়, যাদের মৃত্যু হয়েছে কোনও হিংসাত্মক পরিণতিতে। তাদের আত্মারা 'ভূত' এর রূপে নিয়ে ফিরে আসে জীবিত মানুষদের কাছে তাদের হত্যাকারীকে খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য।
রোমান কবি ওভিড (৪৩ খ্রিষ্টপূর্ব – ১৮ খ্রীষ্টাব্দ) রেমাসের অশরীরীর সম্পর্কে এরকম এক কাহিনী লিখে রেখে গেছেন। যে ফিরে এসেছিল তার আততায়ীর নাম জানানোর জন্য।
'ডি ডিভিনেশনে', সিসেরোর এই লেখায় পাওয়া যায় এক সরাইখানায় দুজন বন্ধু আশ্রয় নিয়েছিল। এদের ভেতর একজনকে সরাইখানার মালিক হত্যা করে। তার ভূত ফিরে আসে এবং নিজের মৃতদেহ খুঁজে পেতে সাহায্য করে বন্ধুকে। তারসঙ্গেই যথাযথ শেষকৃত্য করার অনুরোধও জানায়।"
তবে যত যাই হোক ভূতকে কিন্তু বিঘ্নকারী বিরক্তি উদ্রেককারী সত্ত্বা রূপেই বেশিরভাগ মানুষ মনে করে থাকেন।
➖ এর সূচনাও তো দাদা সেই প্রাচীন সময়কাল থেকেই। দ্বিতীয় শতাব্দীতে, গ্রিক লেখক পৌসানিয়াসের লেখায় এরকম এক ভুতুড়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। উনি লিখেছেন, ৬০০ বছর আগে ম্যারাথনের যুদ্ধ যেখানে হয়েছিল, সেই স্থানেই মৃত যোদ্ধাদের কবর দেওয়া হয়েছিল। সেখানে রাতের বেলায় [কেন? যুদ্ধ তো দিনের বেলা হয়েছিল?] যুদ্ধের সময় সৈন্যদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শোনা যায়।
'লাইফ অফ সিমন'-এ, গ্রীক জীবনীকার প্লুটার্ক (৪৬?-১২০? খ্রিস্টাব্দ) লিখেছেন, চ্যারোনিয়ায় স্নানাগারগুলো ভুতুড়ে। ওখানে একজন খুন হওয়া মানুষের 'ডেমন' [এরা ঠিক কী ধরণের সত্ত্বা সেটা এই লেখার শেষে জানালাম।] ঘুরে বেড়ায়। যে জীবিতকালে গুন্ডা ছিল। মাঝে মাঝে অশরীরী অবয়বের আবির্ভাব, গোঙানি এবং আরও সব ভয় ধরানো শব্দ শোনা যেত ওই সব স্নানাগারের ভেতর। যার সহ্য করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ওখানকার বাসিন্দারা স্নানাগারগুলো বন্ধ করে দেয়।
➖ এই প্রসঙ্গে জানিয়ে দিই, কিছু কাহিনী অনুসারে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভূত কোনও মধ্যস্থতাকারীর জন্য অপেক্ষা করে না। এরকম অনেক কিংবদন্তী আছে যেখানে স্বয়ং ভুত নিজেই তার খুনি বা হামলাকারীদের শাস্তি দিয়েছে। মনে রাখিস সবটাই 'কিংবদন্তী'। যা আজকের দিনে আর ঘটে না। যদিও ভূতেদের পক্ষে কোনও জীবিত মানুষকে ছোঁয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করা হয়, তবুও কিছু ক্ষেত্রে তেনারা নিজেরাই তাদের অপরাধীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে সক্ষম বলেও বিবৃত হয়েছে। বাসস্থানে ভূতুড়ে নানান কাণ্ড কারখানা ঘটার কাহিনীর সূত্রপাত সম্ভবত এসব থেকেই হয়েছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এই সব ভূতেদের ঠিকঠাকভাবে শেষকৃত্য সম্পাদন করা হয়নি।
➖ আচ্ছা দাদা, এইসব থেকে কী এটাই মনে হয় না-আসলে এই সব গল্পকথা সৃষ্টি করার আসল উদ্দেশ্য ছিল, একজন মানুষের মৃতদেহটাকে সঠিক পদ্ধতিতে পঞ্চভূতে বিলীন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা বা রোগ জীবাণু ছড়ানো থেকে আটকানোর ব্যবস্থা করা বা পরিবেশ দূষণ রোধ করা?
ডেমন
গ্রীক 'ডেইমন' থেকে 'ডামন' তার থেকে ইংরেজি 'ডেমন', বাংলায় দানব বা রাক্ষস বলা যেতে পারে। তবে আমরা সাধারণত দানব বা রাক্ষস বলতে যা বুঝি সম্ভবত তার চেয়ে খারাপ এক শয়তানি আত্মা। ডেমনরা প্রায়শই অদৃশ্য থাকে। তবে যখন দেখতে পাওয়া যায় তখন এদের ডানা আছে বোঝা যায় এবং অবশ্যই উড়তে পারে। এদের ক্ষমতা আছে ভবিষ্যত দেখতে পাওয়ার। এরা অন্য ডেমন এবং মানুষের সাথে শারিরীকভাবে মিলিত পারে। এদের 'মৃত্যু'ও হয়। যেকোনোরকমের আকারে এদের আবির্ভাব হতে পারে। যেকোনো মানুষ এবং প্রাণীর দেহে এরা প্রবেশ করতে পারে এবং সেই দেহে বসবাস করতে পারে। সঠিক মন্ত্র ব্যবহার করতে পারলে এদের শরীর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়। আর একটা ব্যাপার এরা জল, নুন, আগুন এবং বিশেষ কিছু গুল্মলতাকে খুব ভয় পায়।
অন্য কোনও ভৌগলিক অঞ্চলের তুলনায় ডেমনেরা মরুভূমিতে বাস করতে বেশি পছন্দ করে বলেই মনে করা হয়। বিদেশী বিশ্বাস অনুসারে, বলা হয়ে যে হাঁচির সময় শরীরে অবস্থানকারী ডেমন বের হয়ে যায়। তার জন্যই 'ব্লেস ইউ' বা 'গেসুন্ডহেইট!' বা 'বঁ সাঁত!' জাতীয় ইতিবাচক শব্দের ব্যবহার হয় কেউ হাঁচি দেওয়ার পর।
এরা কাউকে কোনও দিন সাহায্য করেছে বলে জানা যায় না। কিন্তু ক্ষতি করতে ওস্তাদ। ব্রিটিশ জাদুঘরে আছে 'দ্যা লেসার কী অফ সলোমন' বা 'লেমেগেটন' পুঁথি। যেখানে ৭৩ রকম ডেমন তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। তবে এরকম প্রাচীন তালিকা অনেক পাওয়া যায় তাই আজ অবধি সর্বসম্মত কোনও তালিকা বানাও সম্ভব হয়নি। এই সব ডেমনরা একদা অ্যাঞ্জেল বা স্বর্গদূত ছিল বলে বিশ্বাস। বিদ্রোহী এই অ্যাঞ্জেলরা ঝড়, জাহাজ ধ্বংস, ভূমিকম্প এবং অন্যান্য বিপর্যযয়ের কারণ।
সপ্তম অধ্যায় উপভোগ করেছেন? অষ্টম অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।