অষ্টম অধ্যায়
➖ তৃতীয় শতাব্দীতে, প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে খ্রিস্টধর্ম তাদের ভিত্তি অনেকটাই শক্ত করে ফেলেছিল। এর সাথেই পৌত্তলিকদের কাছে নিজেদের ধর্মকে আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্দেশ্যে সেই সময়ের খ্রিস্টান চার্চ প্রচলিত জনপ্রিয় ধর্মীয় অনেক বিষয়কেই তাদের আচারের ভেতর সংযুক্ত করে নিয়েছিল। বিশেষ করে ভূত এবং পরকালের অনেক আচার সেখানে ঢুকে যায়। সেই সময়ের খ্রিস্টান লেখকদের ভেতর একজন জাস্টিন মার্টিয়ার জানিয়েছেন, নতুন এই ধর্ম ব্যবস্থায় বিশ্বাস করা হতে থাকে মৃত্যুর পরেও একটা জীবন আছে। উনি ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ এর সাউলের কাহিনীর, যার কথা আমি আগেই বলেছি, দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যেখানে পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে খ্রিস্টানরা মৃত্যুর পর আত্মা বা ভূতে বিশ্বাস করে।
প্রথমদিকের খ্রিস্টান চিন্তাবিদরা বলতেন, ভূত আছে এবং তারা শুধুমাত্র অশরীরী অবয়ব ছাড়া আর কিছু নয়। আর এর জন্যই, মৃত্যুর পরে, সমস্ত মানুষ সামাজিক স্তরে একই ধরণের সত্তায় পরিণত হয়। এই বিশেষ ধারণাটা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের সেই সমস্ত জনসাধারণের কাছে প্রবল আকর্ষণীয় হয়েছিল যারা তুলনামূলকভাবে সমাজের নিচের দিকে অবস্থান করত। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে উচ্চস্তরের সমকক্ষ হওয়ার ভাবনা তাদের প্ররোচিত করেছিল নতুন ধর্ম পালনে। আর এই সূত্রেই একাধিক ভূতের গল্প তথা কিংবদন্তী জন্ম নিতে থাকে।
কথাগুলো শুনে সবজান্তা দাদা বললেন, "এরকম একটা সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকাটা খ্রিস্টান চার্চের পক্ষে যে একটা বড় ব্যাপার ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ এর সূত্রেই এসেছিল সেই অমোঘ প্রশ্ন — একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার আত্মা কোথায় যায়? এবার তোর লেখার পাঠক পাঠিকারা এতদূর পড়ার পর বলতেই পারে, যেখানেই যাক না কেন এ নিয়ে এত ভাবার কী আছে? এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কিসের কারণে? তুই কি বলতে পারবি এর উত্তর?"
➖ অবশ্যই পারব। কারণ এর সাথেই তো আরও একটা প্রশ্ন জুড়ে যাচ্ছে। যে আত্মা অন্য জগতে গেল, সে কী তাহলে ইচ্ছেমত এই জগতে ফিরে আসতেও পারে?
➖ ভেরি গুড। ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় সূচনা লগ্নের খ্রিস্টান তাত্ত্বিক এবং লেখকরা একমত ছিলেন যে, আত্মা কোনও একটা জায়গায় অবশ্যই যায় এবং অপেক্ষা করে শেষ বিচারের। এই বিষয়ে তারা তিনটে সম্ভাব্য স্থানের কথাও বলেছিলেন — এক, কোনও এক অদৃশ্য অঞ্চল যা ঈশ্বরের দ্বারা সংরক্ষিত বা নিয়ন্ত্রিত। দুই, তথাকথিত 'আব্রাহামের বক্ষদেশ'। যদিও কেউ ঠিকঠাক জানত না যে এটা কী বা কোথায় এর অবস্থান। তিন, 'আন্ডারওয়ার্ল্ড' বা ভূগর্ভস্থ এক জগত যেখানে শাস্তি পেতে হয় নাকি সে স্থান আরামদায়ক সেটা নিশ্চিত হতে পারেননি তারা। মধ্যবর্তী একটা অঞ্চল বলেই মানা হতো।
মহান খ্রিস্টান তাত্ত্বিক সেন্ট অগাস্টিনও বলেননি, তার আত্মা ঠিক কোথায় গিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর। মানুষ শুধু জেনেছিল, স্বর্গ এবং নরকের মধ্যে সেটা এমন এক 'ইথার জগত' যেখানে আত্মাদের থাকতে হয়। পাপের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয়বার পার্থিব জীবন ধারণের।
➖ দাদা, সম্ভবত এই সূত্রেই 'পারগেটরি' বা প্রায়শ্চিত্ত পরিশোধক ব্যবস্থা বা পরিশুদ্ধিকরণ ভাবনাটাও জন্ম নেয়, তাই না?
➖ দ্বাদশ শতাব্দীর সময় যখন মধ্যযুগ ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে এ জগত থেকে, তখন এই পরিশুদ্ধিকরণের ধারণা ক্যাথলিক চার্চ দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১২৫৪ সালে সম্ভবত পোপ চতুর্থ ইনোসেন্টকে লেখা এক ধর্মীয় চিঠিতে 'পারগেটরি' শব্দটার প্রথম 'অফিসিয়াল' ব্যবহার হয়েছিল । ১২৭৪ সালে 'কাউন্সিল অফ লিওন্স' এ নিয়ে আলোচনা করা হয়। 'কাউন্সিল অফ ফ্লোরেন্স' (১৪৩৮-১৪৪৩)-এও এ নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়েছিল। কাউন্সিলের পক্ষে থেকে ঘোষণা করা হয়, মূল্যের বিনিময়ে মৃতদের সাথে যোগাযোগ, অলৌকিক পদ্ধতিতে বার্তা প্রেরণ করা এবং তাদের কাছ থেকে কোনও বিষয়ে সংবাদ প্রাপ্তি বাস্তবে সম্ভব। শুধু তাই নয় চার্চের নিয়ামকেরা মৃত মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধিকরণ কষ্টের পরিমাণ কমানোর জন্য বিশেষ আচার প্রথাও চালু করে।
➖ দাদা এর পিছনে মূল উদ্দেশ্য কী ছিল তা আশা করি তোমাকে বলে দেওয়ার দরকার নেই। সমঝদারোকে ইশারাই কাফি! [অনুগ্রহ করে কেউ রাগ করবেন না, খাপ বসাবেন না] আসলে সারা বিশ্বের সমস্ত ধর্মের পীঠস্থানের সঙ্গে যুক্ত কিছু সুবিধাবাদী মানুষ বা সংস্থা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, এরকম সব কিংবদন্তী ও আচার প্রথার জন্ম দিয়েছেন এবং বাধ্য করেছেন সবাইকে মেনে নিতে। যারা এ লেখা পড়ছেন তাদের বলব, শান্ত মনে সামাজিক অবস্থান বুঝে ভেবে দেখুন, আমার কথাটা ভুল নয় বলেই মনে হবে।
➖ দাদা, অতিকায় পর্বতের মতো মনের ভিতর গেঁথে বসা বিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে একটু ঝাঁকুনিও তো দরকার।
➖ ঠিক আছে। আপাতত জেনে রাখ, আত্মার আবির্ভাব বাঅ্যাপারিশন'এর একাধিক ঘটনা অন্ধকার এবং মধ্যযুগ জুড়ে অব্যাহত ছিল। ভূতের নানাবিধ রূপ এবার হাজির হতে শুরু করে মানুষের স্বপ্নের জগতেও। সেই সময়ের বেশিরভাগ বর্ণনা অনুসারে, মানুষের আকারে যে ভূতের দেখা যেত তাদের অবয়ব হতো ফ্যাকাশে এবং মুখেচোখে থাকত বিমর্ষ দুঃখের ছাপ। ৯০ শতাংশ অশরীরীর গায়ে হাত পায়ে এবং মুখে দেখা যেত পোড়া দাগ ও ক্ষত চিহ্ন। যা আসলে ছিল পরিশুদ্ধিকরণের চিহ্ন। কখনও কখনও, এই সব ভূতেরা মানবেতর রূপেও উপস্থিত হত। অনেকেই আলোর বল বা ঘুঘুপাখি রূপে এদের দেখা পেতেন।
➖ ঠিক, গল্প অনুসারে খ্রিস্টান অশরীরীর দল ফিরে আসত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বীকারোক্তি দিতে এবং ক্ষমা চাইতে। জীবিত থাকার সময় যে পাপ তারা করেছে তার কথা বলত। তার জন্য কী প্রায়শ্চিত্ত তাদের করতে হচ্ছে সেটাও জানাত। একটা বিষয়ে ওই যুগের প্রায় সব ভূতের গল্পেই মিল পাওয়া যায়। জীবনযাপনের সময় সমস্ত ধরণের ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং নিয়ম কানুন মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা সতর্ক করে দিত।
কিছু কী বুঝতে পারছেন পাঠক পাঠিকাবৃন্দ বিদেশী ভুতের গল্পের [বিদেশি কেন দেশীয় ভুতেদের শিকড় খুঁজতে গেলেও এরকম কিছুই পাওয়া যাবে] আসল উৎস কোথায়?
কিন্তু যুগের বদল মানেই পরিবর্তনের হাওয়া। এ সিরিজে আগামী কোনও এক সময়ে আমরা দেখব ১৬ শতাব্দীতে, সংস্কারবাদী প্রোটেস্ট্যান্ট লেখক এবং চিন্তাবিদরা ভূতের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। অদ্ভুত তাই না?
যাইহোক তাত্ত্বিক এবং চিন্তাবিদদের ভাবনা চিন্তা থেকে একটু সরে যাব এবার। কারণ কিছু প্রশ্ন ফেলে দেওয়ার মতো নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ ঠিক কী ধরণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, যাতে তাদের বেশিরভাগের মনেই এ ধারণা নিশ্চিত হয় যে, মৃত্যুর পরেও জীবন আছে? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে তাহলে তাদের নির্মাণ কী দিয়ে হতে পারে?
অষ্টম অধ্যায় উপভোগ করেছেন? নবম অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।