নবম অধ্যায়
➖ তোর আগের দিনের শেষ কথা অনুসারে তাহলে আমাদের সামনে মূল প্রশ্ন মৃতরা কি সত্যিই ফিরে আসে? যদিও তুইও চরম অবিশ্বাসী তবুও তোর কাছেই উত্তর জানতে চাইছি।
➖ শুধুমাত্র তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিচ্ছি, ভূত ব্যাপারটা বাস্তব, মানে আমাদের জীবিত শরীরে থাকা কিছু একটা অংশ আমরা মরার পরেও ‘বেঁচে’ থাকে এবং পৃথিবীতে ফিরে আসতে সক্ষম। কিন্তু দাদা, এমন কোনও প্রমাণ আছে কি, যে আমাদের কিছু অংশ মৃত্যুর পরেও টিকে থাকে?
যারা মৃত ব্যক্তির ভূত দেখেছেন এবং তাকে ভূত হিসাবে চিনতে পেরেছেন তাদের জন্য, সম্ভবত অন্য কোনও প্রমাণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ‘বিজ্ঞান’ বিশ্বাসীরা তখনই আত্মাকে মেনে নেবেন, যদি তাকে কোনও না কোনওভাবে পরিমাণগত পরিমাপের গণ্ডিতে আনা যাবে নিতে পারে। কিছু গবেষক, ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে আত্মাকে সংজ্ঞায়িত করতে চান না। তারা বলেন এটা এক ধরণের মৌলিক শক্তি। নানান শক্তি স্রোতের মতই।
➖ এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আত্মায় বিশ্বাস করে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধি বা মানসিক ভাবে কিছুটা শান্তি লাভের আশায়। কারণ তাতে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে হয়ে যায়। বেশি চিন্তা ভাবনা করতে হয় না। আর কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যুক্তি দ্বারা ব্যাখা করা সম্ভব নয় এমন সব ‘অসাধারণ’ অভিজ্ঞতার কারণে। যার ভিতর আছে সরাসরি আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপন, মিডিয়ামের দ্বারা আত্মার লেখা, শরীরের বাইরে বের হয়ে আসার অভিজ্ঞতা লাভ, চোখের সামনে আত্মার আবির্ভাব দেখা এবং মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ।
➖ কিন্তু এসবই যে কেবলমাত্র ‘ভাঁওতাবাজি’ তার কোন প্রমাণ কি তুই দিতে পারবি?
➖ প্রমাণ দরকার? বেশ তাহলে এবার যা বলব তা তোমাকে হয়তো বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে।
(সবার জন্য একটাই বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ এক্ষেত্রে — যেটা জানবেন বা দেখবেন সেটাকে চোখ-কান বন্ধ করে বিশ্বাস করে নেবেন না।)
➖ খালি মুখে এরকম আলোচনা ঠিক ভাল লাগে না। গিয়ে দ্যাখ না কাকিমার ভাঁড়ারে বিজয়ার নিমকি আর আছে কিনা।
নিমকি ছিল না। তবে মা গরম গরম কচুরি আর গরম চা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সে সব সাঙ্গ করে দাদা বললেন,
➖ এবার বল কি বলবি?
➖ সবার আগে ঠিক করতে হবে। মরার পরেও যা বেঁচে থাকে সেই ‘জীবিত বস্তুটা’কে কী নাম দেব? ‘সোল’ বা আত্মা? নাকি ‘গোস্ট’ বা ভুত?
➖ যদিও ভূতের আলোচনা। তবু আত্মা শব্দটাই ব্যবহার করলে ভালো হয় মনে হয়।
➖ ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাপার এটাই যে, আত্মার ধারণাটাকে সংজ্ঞায়িত করা বড় কঠিন। কারণ এর অর্থ বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং সভ্যতাতে নানান ধরণের মাত্রায় ব্যবহার হয়। আত্মার অস্তিত্ব আছে কিনা এবং এর প্রকৃতি ঠিক কী, এই দুটো মৌলিক প্রশ্ন মানব সভ্যতার সম্ভবত সবচেয়ে বেশি চর্চিত ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক প্রশ্ন, যা নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে চিন্তা ভাবনা হয়ে চলেছে। আমি সামান্য মানুষ। এর কোন নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারব তার কোনও জোরালো দাবি করছি না। কিন্তু যেটা করব সেটা হলো তোমার, থুড়ি এ লেখার পাঠক পাঠিকাদের ভাবনার জগতকে একটু বিস্তার করে দেব।
মুচকি হেসে সবজান্তা দাদা বললেন,
➖ আমার তো মনে হচ্ছে কিছু পরিমাণ ঘেঁটেও দিবি!
➖ দ্যাখো তুমি ভাল করেই জান যে, পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই বিশ্বাস করা হয়, আত্মা চিরন্তন এবং দেহের বিনাশের পরেও তার অস্তিত্ব থেকে যায়। জুডিও-খ্রিস্টান চিন্তাধারা অনুসারে, আত্মা ঈশ্বর প্রদত্ত এক বস্তু বা শক্তি । এখানেও একটা সমস্যা আছে।
➖ আবার কিসের সমস্যা? ও বুঝতে পেরেছিল ‘সোল’ এবং ‘স্পিরিট’ দুটো শব্দের অর্থ নিয়ে সমস্যা?
➖ হ্যাঁ, দুটোর মানেই তো আত্মা। তাই ‘সোল ইজ আ গড গিভেন স্পিরিট’ এই কথাটাকে আমার মত করে বললাম। আশা করি বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এই শক্তি জীবনের শুরুতে দেওয়া হয়ে থাকে। এ এমন এক শক্তি যা একজন মানুষকে অন্যের থেকে স্বতন্ত্র করে। যখন দেহ বিনষ্ট হয়, আত্মা নামক সেই শক্তি থেকেই যায়। শরীর ত্যাগ করে সে চলে যায় পরলোকে। শেষ বিচার এবং পুনরুত্থানের অপেক্ষা করতে থাকে।
➖ আত্মার একেবারে সহজ সরল ব্যাখ্যা। ভালো।
➖ কিন্তু দাদা, অনেক ‘প্যারানরম্যাল’ ভাবনায় বিশ্বাসী এক পা এগিয়ে মনে করেন, একজন ব্যক্তি জীবিত থাকার সময়েই তার আত্মা শরীর থেকে আলাদা হতে পারে এবং শরীরে ফিরে আসতে পারে। আর এভাবেই সে শরীরের বাইরে বের হয়ে আসার অভিজ্ঞতা (‘আউট অফ বডি এক্সপেরিয়েন্স’) এবং মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা (‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’) লাভ করা যায়। ‘প্যারানরমাল’ তত্ত্ববাদীদের কথানুসারে, এই দুই ধরণের অভিজ্ঞতা কালে প্রকৃতপক্ষে শরীর থেকে যা বের হয় তাকেই বলা হয় ‘অ্যাস্ট্রাল বডি’ বা সূক্ষ্ম শরীর। যা অনেকটা যানবাহনের মত কাজ করে। আর এই বস্তুটা আত্মা নামক শক্তিকে বহন করে।
➖ বাহ্, বেশ ইন্টারেস্টিং?
➖ তুমি এসব জানো না বলতে চাও?
➖ ইয়ে না, মানে জানি। দেখছিলাম তুই ঠিক কতটা পড়াশোনা চালাচ্ছিস।
➖ তাহলে এবার তুমিই বলো।
➖ বেশ। একদল মানুষের কাছে এই ‘অ্যাস্ট্রাল বডি’ ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের দাবি অনুসারে, ‘অ্যাপারিশন’ বা ভূতের আবির্ভাবকালে যা ফিরে আসে সেটা আত্মা নয়। সেটা ওই সুক্ষ্ম শরীর রূপী বাহন।
➖ এটা কিন্তু একটা সাংঘাতিক ‘স্টেটমেন্ট’ দাদা! কারণ এর অর্থ আমরা আসল ভূত বা আত্মাকে কোনোদিনই দেখতে পাই না! প্রকৃত আত্মা হয় জীবিত ব্যক্তির মূল শরীরের ভেতরেই থেকে যায় অথবা পরবর্তী জগতে চলে যায় মৃত্যুর পর। থেকে যায় আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। তাহলে একে ভয় পাওয়ার দরকার কি?
➖ এ নিয়ে দ্বিমত নেই। যাই হোক, বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে চলেছেন আত্মাকে পর্যবেক্ষণ করার বা দেখতে পাওয়ার একটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য, বস্তুনিষ্ঠ উপায় খুঁজে বার করার। কেউ কেউ আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন মৃত্যুর ঠিক আগে ও পরে একজন ব্যক্তির দেহের তুলনা করে। এ বিষয়ে এক বিখ্যাত পরীক্ষার কথা হয়তো তুই জানিস।
➖ আত্মার ওজন নির্ধারণ করা হয়েছিল যে পরীক্ষায়?
➖ হ্যাঁ। বলা হয়েছিল কত পাউন্ড এবং কত আউন্স ওজন একটা আত্মার হতে পারে। ওজনের এই পার্থক্য দ্বারা প্রমান করতে চাওয়া হয়েছিল যে ওই পার্থক্যর কারণ দেহ থেকে আত্মার বিদায়।
➖ আমি পড়েছি, তুমি পাঠক পাঠিকাদের জন্য একটু বলো?
➖ ১৯০৭ সালে এরকম একটা পরীক্ষা করেন গবেষক ডানকান ম্যাকডুগাল। মৃত্যুর একেবারে আগে এবং পরে পাঁচজনের শরীর ওজন করে উনি আত্মার ওজন পরিমাপ করার চেষ্টা করেছিলেন। দুজন রোগীর দেহের ওজন ওই সময় হঠাৎ করেই আধ-আউন্স করে কমে গিয়েছিল।
তিন মিনিটের মধ্যে হঠাৎ করেই এক আউন্স ওজন হ্রাস পায়। তৃতীয় শরীরের ওজন ওঠানামা করতে থাকে। মৃত্যুর ঠিক পরক্ষণেই ওজন একটু কমে যায়। তারপর আবার বাড়ে এবং আবার বেশ খানিকটা কমে যায়। বাকি দুটো শরীরের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। বলাই বাহুল্য, এক ধরনের ফলাফল না পাওয়ার কারণেই এই পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া যায়নি।
➖ তাতে কি লাভ হয়েছে দাদা। শুরুতে বলেছিলাম, যে বিশ্বাসী তার কোনও প্রমানের দরকার পড়ে না। এই ঘটনার ভিত্তিতে আজও অনেকেই শরীরের এই ওজন পরিবর্তনকে ভুতের অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ বলেই মনে করেন।
নবম অধ্যায় উপভোগ করেছেন? দশম অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।