ডিসেম্বর মাসের আজ প্রথম দিন। রাত শেষে ভোরের নরম আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র, কিন্তু সূর্যটা এখনও কুয়াশার ঘন চাদরের আড়ালে লুকোনো। বাইরে কান পাতলে শব্দ নেই বললেই চলে; যেন প্রকৃতি নিজেও তার শীতের ঘুম ভাঙতে চাইছে না।
এই নীরবতা ভেঙে উঠল বৃদ্ধ হরিপদর কাশির শব্দ। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই। এই ডিসেম্বরের শুরুতেই তাঁর কাঁথা-মুড়ি দেওয়া অভ্যেস। কিন্তু আজ অন্য এক টানে তিনি বিছানা ছেড়েছেন। তাঁর ছোট্ট, কাঁচাপাকা চুলগুলো কুয়াশার আর্দ্রতায় আরও ভিজে উঠেছে।
হরিপদ ধীরে ধীরে দরজায় ছিটকিনি খুলে বারান্দায় এলেন। সামনের উঠোনটা এখন সাদা মেঘের সাগরে ঢাকা। কুয়াশার এমন ঘনত্ব যে উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছটার উপরের অংশও আবছা। দূরের ধান ক্ষেতগুলো থেকে ভেসে আসা মৃদু ভেজা মাটির গন্ধ মনকে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়।
"নাহ্, আজ অনেক কুয়াশা," বিড়বিড় করে বললেন হরিপদ।
পাশের বাড়ি থেকে তখনও কেউ ওঠেনি। শুধু গোয়ালঘর থেকে দুটো গরুর হাম্বা ডাক শোনা গেল, যা কুয়াশার পুরু দেওয়াল ভেদ করে যেন কানে এল না ঠিকঠাক। গ্রামের মেঠো পথটা এখন নিশ্চুপ, যেন কোনো সাদা জাদুকরী মন্ত্রে সব কিছু স্থির হয়ে আছে।
আসলে, হরিপদর আজ একটু বেশিই তাড়া ছিল। তাঁর ছেলে অশোকের আজ সকালে শহরে থেকে বাড়ি আসার কথা ছিল। সেই কারণেই গত পরশু তিনি সাইকেলে করে পাশের গ্রাম থেকে এক ভাঁড় খাঁটি খেজুর গুড় আর কিছু নতুন চাল কিনে এনেছেন। অশোকের পায়েসের জন্য রাখা সেই গুড়ের ভাঁড়টা বারান্দার তাকে সযত্নে রাখা আছে। এই ভোরে সেই মিষ্টি গন্ধটাই যেন হরিপদকে উষ্ণতা দিচ্ছিল।
হরিপদর মনে পড়ল তাঁর ছেলেবেলার কথা। ডিসেম্বর এলেই খেজুর গাছ থেকে টাটকা রস নামানোর উৎসব শুরু হতো। তখন কনকনে ঠাণ্ডা হলেও সেই রসের হাঁড়িতে মুখ লাগানোর লোভ সামলানো যেত না। এখন সময় বদলেছে।
হরিপদ এই সময়টুকু কেবল তাঁর, যেখানে তিনি অতীতকে অনুভব করেন এবং প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ নিজের করে পান। কিছুক্ষণ পর, দূরের রাস্তা থেকে সাইকেলের ঘণ্টি আর খবরের কাগজের হকারের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
হঠাৎই তাঁর পকেট ফোনটা কেঁপে উঠল। অশোকের ফোন।
হরিপদর মুখের হাসিটা নিমেষে ম্লান হয়ে গেল। "ঠিক আছে, বাবা," একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে তিনি বললেন, "সাবধানে কাজ করিস। গুড় আর চাল তোর জন্য তোলা থাকল।"
ফোন রেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। অপেক্ষার আনন্দটা হঠাৎই যেন কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, দিনের শুরু হয়ে গেছে। তিনি এক ঝলক হাসি হেসে বারান্দার কোনায় রাখা তুলসি গাছটার দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই, মেঠো পথের দিক থেকে এক ভবঘুরে ব্যক্তির অস্পষ্ট ছায়া বারান্দার দিকে এগিয়ে এলো। লোকটির পরনে ছেঁড়া কাঁথা, মুখটা শীতে ফ্যাকাশে।
"একটু জল হবে, বাবা?" লোকটি ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞাসা করল।
হরিপদ লোকটিকে ভালো করে দেখলেন। ঠাণ্ডায় লোকটি কাঁপছে। "জল দিচ্ছি। তার চেয়ে বরং ভেতরে এসে বসো। একটু গরম কিছু খাও।"
জল, লাল চা ও একটু মুড়ি দেওয়ার পর, হরিপদ ইতস্তত না করে বারান্দার তাক থেকে খেজুর গুড়ের ভাঁড়টি নামিয়ে লোকটির হাতে তুলে দিলেন।
"এটা রাখো। ছেলেটা আসতে পারল না। তার জন্য আনা ছিল। এই শীতে এটা তোমার কাজে লাগবে।"
ভবঘুরে ব্যক্তিটি অবাক হয়ে ভাঁড়ের দিকে তাকালো, তারপর কৃতজ্ঞতায় চোখ ছলছল করে উঠলো। "ঈশ্বর আপনার ভালো করবেন, বাবা," সে বলল।
কুয়াশার চাদরটা ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করেছে। পূর্ব দিগন্তে একটা হলদে আভা দেখা যাচ্ছে। হরিপদর মনে হলো, তাঁর ছেলের জন্য রাখা অপেক্ষার গুড় আজ ঠিক অন্য এক মানুষের মুখে গিয়ে শান্তি এনে দিলো। শীতের প্রথম দিনের এই কুয়াশা ঢাকা ভোর তাঁর মনে নতুন করে এক শান্তির বীজ বুনে দিয়ে গেল।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।