রাজ্য সরকারের অধীনে চাকুরীরত কর্মচারীদের সম্পর্কে সাধারণত মানুষের কমন ধারণা, এরা তো আসে যায়, মাইনা পায়! নয়তো একদলের মতে এদের তো দশটা-পাঁচটার চাকরি, কাজের চাপ,ডেডলাইন কিছুই নেই, বাড়ি ফিরে আরামই আরাম! তারপর আছে সারাবছর ধরে অজস্র ছুটি!
কথাগুলো সত্যি না মিথ্যে এই তর্কে না গিয়ে প্রথমে রাজ্য সরকারী অফিসগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরবো।
সরকারী চাকরীর মাইনা কম বেশি যাই হোকনা কেন, বরাবরের প্রচলিত ধারণা ছিল এটা পার্মানেন্ট জব, একবার পেয়ে গেলে আর কোন চিন্তা নেই, ৬০ বছর বয়স অবধি একেবারে নিশ্চিন্ত! আর অবসর গ্রহণের পর পেনশন, গ্রাচুইটি জাতীয় বহুবিধ সুযোগ সুবিধা। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ের সরকারী চাকরি পাওয়া আর লটারী লেগে যাওয়া মোটামুটি একই রকম!
বর্তমানে কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টেছে। জেনারেল লাইন নিয়ে পড়াশোনা করা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে সরকারী স্কুলের শিক্ষক/শিক্ষিকার চাকরি কিছু বছর আগেও ছিল রীতিমতো লোভনীয় চাকরি, নিজের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়ার সুবর্ন সুযোগ। ২০১২–১৩ সাল অবধি স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাগুলো নিয়মিত হয়েছে এবং তার মাধ্যমে বহুসংখ্যক শিক্ষক শিক্ষিকা নিযুক্ত ও হয়েছেন সরকারী স্কুলগুলিতে।কিন্তু বর্তমান সরকারের হাতে পরীক্ষার দায়িত্ব যাওয়ার পর থেকেই পরীক্ষা গুলো মোটামুটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি, টাকা তছরুপ এবং জালিয়াতির ফলস্বরূপ হাইস্কুল এবং প্রাথমিক দুই ধরনের শিক্ষা ক্ষেত্রের নবনিযুক্ত শিক্ষকেরা এবং শিক্ষাকর্মীরা চাকরি পাওয়ার পাঁচ বা ছয় বছরের মাথায় হঠাৎ নোটিস পাচ্ছেন, তাঁদের চাকরিটি বাতিল। তাঁদের সংসার, পরিবার পরিজনের কী হবে, তা নিয়ে কোর্ট বা সরকার কারুর কোনো মাথা ব্যথা নেই। চাকরিতে পুনর্বহাল হতে গেলে নতুন করে পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে! নতুন করে নোটিফিকেশন বের হতে হতে অজস্র বার কোর্ট কেসের চক্কর,পরীক্ষা হওয়ার পর জয়েনিং পেতে পেতে মাথার চুল সাদা হওয়ার জোগাড়, আবার সৌভাগ্য ক্রমে চাকরি পেয়ে গেলে সঙ্গে সর্বক্ষণের সঙ্গী টেনশন; চাকরিটা থাকবে তো! হঠাৎ করে চলে যাবে নাতো!
শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের চাকরির সমস্যা এবং প্রয়োজনের তুলনায় উপস্থিত কর্মীর সংখ্যায় ঘাটতির ফল স্বরূপ সরকারী স্কুলগুলোতে কার্যত তালা ঝোলার উপক্রম! যেকজন শিক্ষক শিক্ষিকা আছেন,তাঁদের ওপর প্রচণ্ড চাপ যার ফলে স্কুলগুলোতে ঠিকমতো পঠন পাঠন হচ্ছেনা। যার ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠছে রীতিমতো এক্সপেন্সিভ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। সরকারী স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে পড়ার মুখে যোগ্য শিক্ষক এবং শিক্ষা কর্মীদের অভাবে! আর মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ ক্ষমতার শেষ সীমায় গিয়ে ছেলে মেয়েদের নিয়ে ছুটছেন দামী দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। তাতে আদৌ কতোটা প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে তার উত্তর তো সময়ই দেবে কিন্তু আনুষঙ্গিক উপকরণের খরচ যোগাতে যোগাতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে!
এতো ছিল সরকারী স্কুলের করুণ চিত্র। এবার আসি অফিসগুলোর অবস্থায়। রাজ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, অথচ চাকরির সুযোগ খুবই কম! পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি থাকলেই শিক্ষিত নব প্রজন্ম ছুটছে ভিনরাজ্যে নয়তো ভিনদেশে চাকরি এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায়। সেখানে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরা নিরুপায় হয়ে তাকিয়ে আছে সরকারী চাকরীর দিকে। দীর্ঘদিন পর আসে একেকটা পরীক্ষার নোটিফিকেশন, দুতিনটি ধাপ পেরিয়ে বাছাই হয়ে চাকরি পেতে পেতে লেগে যায় ৩–৪ বছর।
শুধু কাজের চাপ থাকলেও একরকম! অফিসগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত টক্সিক। বর্তমান সরকারের অনুগামী কর্মচারী সংগঠন — ফেডারেশন গোষ্ঠী; জয়েনিং এর প্রথম দিন থেকে সদ্য আগত এমপ্লয়ীদের চাপ দিতে থাকে তাদের সংগঠনে নাম লেখানোর জন্য। তাদের দলে না ঢুকলে আসতে থাকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ চাপ, উল্টোপাল্টা জায়গায় পোস্টিং, প্রতিহিংসা মূলক বদলি অথবা অন্যান্য ভাবে হ্যারাসমেন্ট! প্রতিটি কর্মচারীর স্বামী/স্ত্রী, বাবা–মা — প্রত্যেকের ডিটেইলস, তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যাবতীয় খুঁটিনাটিতে নজর রাখে এই সংগঠন। নামে কর্মচারীদের সাহায্যার্থে থাকলেও আদতে তারা ক্ষতিই করে! তাদের দলে থাকলে সুযোগ আছে পছন্দ মতো পোস্টিং পাওয়ার, বাড়ির কাছাকাছি অফিসে যাওয়ার, সারাদিন এতটুকু কাজ না করেও দলের ঝান্ডা ঘাড়ে তুলে বেড়োলেই তারা 'সুযোগ্য' কর্মচারী! আর ভিন্ন মতাদর্শের লোক হলেই সে যতই কাজের লোক হোক, যতোই নিয়মনিষ্ঠ কর্মনিষ্ঠ হোক তার উল্টোপাল্টা জায়গায় ট্রান্সফার অবধারিত।
বাম আমলেও দলে নাম লেখানো থাকলেই 'চিরকুটে চাকরি' মিলতো, সে উপযুক্ত চাকরি প্রার্থী হোক আর না হোক! আর এই আমলেও একই ভাবে, মন্ত্রীর যোগাযোগে সরকারী চাকরী প্রাপ্তির সংখ্যা নেহাত কম নয়! প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট কার্যত এই ধরণের ধামাধারি কর্মচারীর ভিড়ে ঢাকা পড়ে গেছে। জীবনে এদের কোনো অফিসিয়াল কাজ করতে দেখা যায়না, অথচ ডিপার্টমেন্টে এদের ক্ষমতাই সব থেকে বেশী। নিজের ভাগের এবং অন্যদের ভাগের কাজ সামলাচ্ছেন হয় গুটিকতক পিএসসি থেকে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে আসা কর্মচারীরা নয়তো কিছু সংখ্যক কন্ট্রাকচুয়াল স্টাফরা!
সকাল দশটার মধ্যে অফিসে ঢুকে সন্ধ্যা ৬টা সাতটা অবধি থেকে জরুরী কাজ করে দিয়ে আসতে হয় কর্মচারীদের। সারাদিনে বেশিরভাগ কর্মচারীদের কম করেও তিন তিন ছয় ঘণ্টার জার্নি করতে হয় কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য! তার ওপর কাজের চাপ, প্রশাসনিক সমস্যা!ডেডলাইন টার্গেট — সবই আছে এখানে, একটু অন্যরকম চেহারায়। তার সাথে বায়োমেট্রিক এটেনডেন্স এর সৌজন্যে অফিসে ঢুকতে একটু দেরী হলেও জোটে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার থেকে ধমক, ছুটি কেটে নেওয়া! অথবা নিজের দরকারের সময় অফিস থেকে ছুটির আবেদন নামঞ্জুর হওয়া! সাধারণ কর্মচারীরা সবসময়ই হন সমস্যার ভুক্তভোগী! সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে অফিসগুলোর পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। কাজ করেও শান্তি নেই, স্বাধীন চিন্তাধারার সুযোগ নেই, স্বাধীন রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে চলাও যে কী কঠিন!
উপরন্তু আছে মহার্ঘ ভাতার কণ্টক যন্ত্রণা। সমস্ত দেশের মধ্যে সব থেকে কম পরিমাণ মহার্ঘ ভাতা জোটে এই দুর্ভাগা রাজ্যের কর্মচারীদের। বছরের পর বছর কোর্টে মামলা চলে কিন্তু কর্মচারীরা থেকে যান সেই 'বঞ্চিত'দের দলে! সংসারের খরচ বেড়ে চলে দিনের পর দিন কিন্তু কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতার পরিমাণ বাড়ে না! যৎসামান্য মাইনার টাকা সম্বল করে, ফেডারেশন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চোখ রাঙানির মধ্যে ক্রমাগত কাজ করে চলেন রাজ্য সরকারের কর্মচারীরা!
তাই পরিশেষে বলতে চাই, রাজ্য সরকারী চাকরী মানেই শুধু অফুরন্ত সুখ,সুবিধা আর ছুটি যারা ভাবেন, তারা আরো ভাবুন, গভীরে গিয়ে ভাবা প্র্যাকটিস করুন! দূর থেকে সব সোনালী রঙের জিনিসকেই 'সোনা' মনে হতে পারে কিন্তু চকচক করলেই তা 'সোনা' হয়ে যায়না!
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।