বামপন্থী: আপনি ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতির পদ ছেড়ে দিলেন। ১৯৪১ সালে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে পালালেন। এরপর বার্লিন, রোম গেলেন ফ্যাসিবাদীদের সাথে হাত মেলাতে — এই পথটা কি খুব স্বাভাবিক ছিল?
নেতাজি: স্বাভাবিক নয়। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোন পথটা স্বাভাবিক ছিল? ১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল, আপনাদের পার্টি তখন কী বলেছিল?
বামপন্থী: আমরা বলেছিলাম এটা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। হিটলার, মুসোলিনি — ওরা মানবতার শত্রু।
নেতাজি: আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কী ছিল? জালিয়ানওয়ালাবাগ, বেঙ্গল ফ্যামিন, সেলুলার জেল — এগুলো কি মানবিক ছিল? আমি দেখেছিলাম — দূরের শত্রুকে নিন্দা করতে গিয়ে কাছের শত্রুকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
বামপন্থী: কিন্তু ১৯৪১-এর পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে ঢুকল। হিটলার তখন সরাসরি সোভিয়েত আক্রমণ করেছে। ফ্যাসিবাদ তখন আমাদের প্রধান শত্রু হয়ে উঠল।
নেতাজি: ঠিক। আর ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের লাইন বদলাল। আগে যেটা ছিল Imperialist War, সেটা হয়ে গেল People’s War... আপনার কাছে এই বদলটার মানে কী ছিল?
বামপন্থী: এর মানে ছিল — ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য তখন সময়টা সঠিক নয়।
নেতাজি: আর আমার কাছে এর মানে ছিল — ভারতের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক কৌশলের পাদটীকা হয়ে গেল।
বামপন্থী: আপনি তখন বার্লিনে গিয়ে ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার খুললেন। আজাদ হিন্দ রেডিও চালালেন। কিন্তু জার্মানি আপনাকে কী দিল?
নেতাজি: প্রায় কিছুই না। আর সেটা আমার হতাশাই ছিল। হিটলার ভারতকে গুরুত্ব দেয়নি। আমি সেটা বুঝেছিলাম।
বামপন্থী: তাহলে আপনি কেন ওই পথে গেলেন?
নেতাজি: কারণ লন্ডনে কোনো দরজা খোলা রাখে নি। মস্কো-ও না। আপনাদের পার্টি তখন বলছিল — ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে দুর্বল করা যাবে না।
বামপন্থী: কারণ সোভিয়েতের অস্তিত্ব তখন বিপন্ন।
নেতাজি: আমি সেটা বুঝি। কিন্তু আপনি কি বুঝেছেন — ভারতীয়দের অস্তিত্ব সেই সময় কতদিন ধরে বিপন্ন ছিল?
বামপন্থী: আপনি পরে জাপানে গেলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়লেন। INA ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরল। আপনি কি জানতেন, এতে বিভাজন তৈরি হবে?
নেতাজি: আমি জানতাম। কিন্তু আমি এটাও জানতাম — কোনো সেনা বিদ্রোহ ছাড়া ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভেতর ফাটল পড়বে না। আর সেই ফাটলই পরে ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহে দেখা গেল।
বামপন্থী: আপনি বলুন — আপনি কি জানতেন না, যাঁদের সঙ্গে আপনি কথা বলছেন, তাঁরা ফ্যাসিবাদী শক্তি? গণহত্যা, দমন, আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্ত?
নেতাজি: নিশ্চই জানতাম। কিন্তু একটা জিনিস আরও বেশি করে জানতাম — আমার দেশ তখন পরাধীন। ওরা কারা ভাবার চেয়েও বেশি আমি ভাবছিলাম আমার দেশের শত্রু কারা।
বামপন্থী: INA-কে তখন একটা ফ্যাসিস্ট সহযোগীর মতোই দেখাচ্ছিল।
নেতাজি: আর আমি দেখছিলাম — লাল কেল্লার ট্রায়ালে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। হিন্দু, মুসলমান, শিখ — একসঙ্গে। এই জনসমর্থন কি আদর্শগত ভুল ছিল? আপনি কি বলেন?
বামপন্থী: কিন্তু সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেনের মিত্র ছিল। ফ্যাসিবাদ ছিল প্রধান শত্রু।
নেতাজি: ঠিক। কিন্তু তখনই তো প্রশ্নটা ওঠে — আমার শত্রু কে ঠিক করবে? স্বদেশের বাস্তবতা, না কোনো আন্তর্জাতিক লাইন?
বামপন্থী: কিন্তু আদর্শ? আপনি কি মনে করেন আদর্শের কোনো মূল্য নেই?
নেতাজি: আমি যদি আদর্শে বিশ্বাস না করতাম, তাহলে ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদে বসেই জীবনটা কাটিয়ে দিতাম। আমি আদর্শ ত্যাগ করিনি। আমি শুধু আদর্শকে বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়েছিলাম।
বামপন্থী: কিন্তু আমরা স্পষ্ট দেখছিলাম, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দুর্বল হচ্ছে। গণআন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন — এই পথেই স্বাধীনতা আসতো।
নেতাজি: আর আমি দেখছিলাম — গণআন্দোলন দমন করা হচ্ছে, পাশাপাশি যুদ্ধ চলছে, আর ভারতকে জিজ্ঞেস না করেই ভারতকে সেই যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম — এই যুদ্ধ কি আমাদের?
বামপন্থী: আমরা তখনও বিশ্বাস করতাম — স্বাধীনতা আসবে গণআন্দোলন আর সাংবিধানিক পথে।
নেতাজি: আর আমি বিশ্বাস করতাম — গণআন্দোলনের সঙ্গে শক্তির প্রদর্শন না থাকলে কোনো সাম্রাজ্যবাদ দরজা খুলে দেয় না।
বামপন্থী: আপনি জার্মানিতে গেলেন। ইতালিতে গেলেন। হিটলারের সাথে আপনার হাত মেলানোর ছবিগুলো আজও বাঙালিকে অস্বস্তিতে ফেলে।
নেতাজি: ছবিতে ব্যর্থতা, হতাশা, দরকষাকষি — কিছুই ধরা পড়ে না। ছবিতে শুধু হাত মেলানো দেখা যায়, উদ্দেশ্য না।
বামপন্থী: আপনি কি স্বীকার করেন না — এই কৌশল নৈতিকভাবে সঠিক ছিল না?
নেতাজি: উপনিবেশিকতা তো নিজেই নৈতিক অপরাধ। যখন নৈতিকতার মাটি আগেই কেউ বিষাক্ত করে দিয়েছে, তখন নিখুঁত পথ বলে কিছু থাকে না। আমি শুধু আমার দেশের কথা ভেবেছিলাম।
বামপন্থী: আপনি মনে করেন আমরা দেশের কথা ভাবিনি?
নেতাজি: না। আমি মনে করি, আপনারা দেশের কথা ভাবতেন — কিন্তু দেশকে ভাবতেন ভবিষ্যতের কোনো নিখুঁত আদর্শের মধ্যে রেখে। আর আমি ভাবতাম — সেই মুহূর্তের রক্তমাখা বাস্তবতায়।
বামপন্থী: আপনি কি মনে করেন, আমরা দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম?
নেতাজি: না। আমি মনে করি, আপনারা এমন এক আদর্শের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যেটা ভারতের প্রয়োজনকে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের নিচে রেখেছিল।
বামপন্থী: তাহলে আপনি বলছেন — আমাদের আনুগত্য আদর্শের প্রতি বেশি ছিল?
নেতাজি: আমি বলছি — যখন আদর্শ বলছে "এখন নয়, অপেক্ষা করো", আর দেশ বলছে "এখনই", তখন মানুষকে বেছে নিতে হয় অগ্রাধিকার কার।
বামপন্থী: আপনি কি মনে করেন, আদর্শ বদলানো উচিত ছিল?
নেতাজি: আমি মনে করি, আদর্শ যদি বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে কথা না বলে, তাহলে সেটা তত্ত্ব থাকে — রাজনীতি নয়।
বামপন্থী: আপনি কি ভাবছেন ইতিহাস আপনাকেই সম্পূর্ণ সঠিক বিচার করেছে?
নেতাজি: ইতিহাসের দায়িত্ব কাউকে সঠিক-বেঠিক বিচার করা নয়। ইতিহাসের কাজ সত্য নথিভুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যতের মানুষ ফিরে তাকিয়ে বিচার করতে পারে।
বামপন্থী: আজ যদি আপনি ফিরে তাকান?
নেতাজি: আজও আমি একই প্রশ্ন করতাম — যখন দেশ ডাকছে, তখন আদর্শ কি দেশের পাশে দাঁড়াবে, না দেশকে বলবে — আরও একটু অপেক্ষা করো?
( নীরবতা )
বামপন্থী: তাহলে আপনিই বলুন — দেশ বড়, না আদর্শ?
লেখিকার নোট : এই লেখাটি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বামপন্থী চিন্তাধারা ও তার বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে সম্মান করি — সমাজ, শোষণ ও ক্ষমতার প্রশ্নে সেই দর্শনের অবদান অস্বীকার্য। এই সংলাপটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা প্রশ্ন নিয়ে, যেখানে আদর্শ ও দেশের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়, বরং পাঠকের সামনে একটি চিন্তামূলক প্রশ্ন রেখে যায়। ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক — এবং স্বাগত।
লেখিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে এমবিএ। স্কুলজীবন থেকেই পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত; বর্তমানে একটি এডুকেশন কনসালটেন্সির ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। সুইজারল্যান্ড থেকে কাশ্মীর — দীর্ঘদিনের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতায় বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল তাঁর দেখা। 'উদ্যোগ' ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন।