Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
আমার জীবনের এক বিশেষ শিক্ষক
আমার জীবনের এক বিশেষ শিক্ষক

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা আমাদের মনে দাগ কেটে যায়। কেউ বিদ্যালয়ে পাঠ্যজ্ঞান দেন, আবার কেউ জীবনের বাস্তব শিক্ষার পথ দেখান। আসলে মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিনিয়ত নানা মানুষের কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে চলে—যিনি আমাদের জীবনের চলার পথে আলো দেখান, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। আজ আমি সেইসব শিক্ষকদের মধ্য থেকে আমার জীবনের এক বিশেষ শিক্ষক — আমার মাতামহ বা দাদুর কথা বলব, যাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার জীবন গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়েছে।

বয়স তখন আট-নয় বছর। সালটা ১৯৯১। এলাহাবাদ থেকে এসে ভর্তি হলাম আমাদের গ্রামের কোড়াবাড়ি কালিদাস ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে। স্কুলে তখন ছিলেন দু’জন শিক্ষক — প্রধান শিক্ষক ভবানীপ্রসাদ বসু, যাঁকে গ্রামের সবাই স্নেহ করে ফেলু মাস্টার বলত, আর ছিলেন উমা পাল দিদিমণি। তাঁরা দু’জনেই একসঙ্গে চারটি শ্রেণির পাঠদানের ভার সামলাতেন। সেই ছোট্ট স্কুলঘর, টিনের ছাদ আর সামনের খোলা মাঠ — সবকিছু আজও চোখে ভাসে।

রোজ সকালে স্নান করে ইউনিফর্ম পরার পর মা তার হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে মাথায় চিরুনি করে দিতেন। টিনের বাক্সে বইপত্র ভরে দৌড়ে যেতাম স্কুলে। তখন স্কুল মানে ছিল শুধু বই নয় — ছিল বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, আনন্দ, ছিল কৌতূহল, ছিল শেখার আগ্রহ। কিন্তু সেই বিদ্যালয়ের বাইরেও আরেকটি বড় বিদ্যালয় ছিল আমার — তা আমাদের বাড়ি, আর তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমার দাদু।

বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আমাদের পুঁথিগত শিক্ষা দিতেন, কিন্তু জীবনের প্রকৃত শিক্ষা — মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার শিক্ষা — আমি পেয়েছিলাম দাদুর কাছ থেকেই। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এক মানুষ।

প্রথম যে শিক্ষাটা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলাম, সেটি হলো সময়জ্ঞান। সেই সময় বাড়ির দেওয়ালে বড় ঘড়ি ঝুলত, তিনটি কাঁটায় চলত সময়ের হিসাব। আমি তখন দেওয়াল ঘড়ি দেখে সময় বুঝতে পারতাম না। কাঁটার ঘূর্ণন আমার মনটাকে চরকির পাকের মতো নাচিয়ে তুলত। কিন্তু দাদু ধৈর্য ধরে আমাকে শেখাতেন — ঘণ্টার কাঁটা কোথায়, মিনিটের কাঁটা কোথায়, কীভাবে সময় ঘড়িতে দেখতে হয়। আমার সেই ঘূর্ণায়মান ঘড়ির কাঁটার মতো চঞ্চল মনকে দাদুর শেখানো পথে স্থির করে আজও তাঁর শেখানো নিয়ম মেনে আমি ঘড়িতে সময় দেখি। আমার ছেলেকেও সেইভাবেই শিখিয়েছি। প্রকৃত শিক্ষা এই তো — যা নিজে শিখে অন্যকে দিতে পারি।

গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িত আরও অনেক বাস্তব শিক্ষা দাদুর কাছেই পেয়েছি। যেমন — গাছে চড়া, ছিপ ফেলে মাছ ধরা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো — সবই তাঁর তত্ত্বাবধানে। আমাদের বাড়ির বাগানে ছিল আম, লিচু, ফলসা, জামরুল, সবেদা, কাঁঠাল, বাতাবি লেবুর বড় বড় গাছ। সেই গাছগুলোই ছিল আমার গাছে চড়ার শিক্ষা লাভের পাঠশালা। প্রথম প্রথম গাছে ওঠার সময় হাত-পা ছড়ে যেত, চামড়া উঠে যেত, কিন্তু দাদু শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভারসাম্য রাখতে হয়, কোথায় হাত রাখতে হয়, কীভাবে নামতে হয়। ডালপালাযুক্ত গাছে ওঠা সহজ হলেও, ডালবিহীন নারকেল বা তালগাছে ওঠার সাহস বার কয়েক চেষ্টা করার পর আর হয়নি।

গাছে বসে সুমিষ্ট আম, লিচু, জামরুল, ফলসা, বাতাবি লেবু খাওয়া যেমন মজার ছিল, তেমনি তার সঙ্গে উপরি পাওনা হতো পিঁপড়ের কামড়ের জ্বালা। পিঁপড়ের কামড় খেয়ে যে ফরমিক অ্যাসিড শরীরে ঢুকত, তার জ্বালা অবশ্য ফলে থাকা প্রাকৃতিক শর্করার নেশার কাছে তুচ্ছ প্রতিপন্ন হতো।

খুব সহজেই অবশ্য সেই পিঁপড়েদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ ঘটে যেত। গাছে থাকা পিঁপড়েদের বাসা থেকে তাদের পাড়া ডিম চুরি করে সেই ডিম দিয়ে বানানো হতো চার। সেই চার ফেলে যখন পুকুরে মাছ ধরতে বসতাম, তখন তার অমোঘ টান মাছেদের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হতো না কোনোমতেই। লোভে পড়ে যে ভুল তারা করত, তার প্রায়শ্চিত্ত করত বড়শিতে গেঁথে। চার তৈরি করা, ছিপ তৈরি করা, ছিপ ফেলে মাছ ধরার কৌশল — সমস্ত কিছুর শিক্ষাকর্তা সেই দাদু।

চতুর্থ শ্রেণি শেষ করে যখন পঞ্চম শ্রেণিতে উঠলাম, ভর্তি হলাম গাংনাপুর হাই স্কুলে। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে স্কুল, আর যেতে হবে সাইকেলে। কিন্তু আমি তো তখনও সাইকেল চালাতে জানি না! তখন আবার দাদুই উদ্ধারকর্তা। নিজের পুরোনো হারকিউলিস সাইকেল নিয়ে মাঠে নিয়ে গিয়ে আমাকে শেখাতে শুরু করলেন। নিজের থেকেও উঁচু সাইকেলে প্রথমে 'হাফ প্যাডেল' দিয়ে চালানো শুরু — বারবার পড়ে যাওয়া, শরীরে কালশিটে পড়া, হাঁটু ছড়ে যাওয়া — সব কিছুর পর একদিন দাদুর হাত ধরেই সেই প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়। পরে নিজের নতুন হিরো সাইকেলে চেপে স্কুলে যাওয়ার যে আনন্দ — তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সেই আনন্দের অংশীদার হিসেবে দাদুকেই স্মরণ করি তাই।

এরপর দাদুর কাছেই সাঁতার শেখা। প্রথম প্রথম নন্দীদের পুকুরে নেমে তার বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে ভাবনার জগৎ পুকুরকে নদীতে রূপান্তরিত করে দিত। খালি মনে হতো — জলে ডুবে যাব না তো? জলে যে ভাসা যেতে পারে, সেই শিক্ষা এবং সাহস দাদুই জুগিয়েছিলেন। তাঁর সাহচর্যেই একদিন সাঁতার কাটতে শিখে উঠি।

আরও এক অমূল্য শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন — শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা পড়া ও বলা। প্রতিদিন সকালবেলায় আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে বসতে হতো। দাদুকে জোরে জোরে খবর পড়ে শোনাতে হতো, ভুল উচ্চারণ হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিতেন। এই অভ্যাস আমার মধ্যে শুধু ভাষার সৌন্দর্যই আনেনি, আত্মবিশ্বাসও জাগিয়েছিল। আজ লেখালেখি বা বক্তব্য দেওয়ার সময় সেই শিক্ষা অমূল্য সম্পদ হিসেবে পাশে থাকে।

দাদুর শিক্ষা শুধু ব্যবহারিক ছিল না, ছিল নৈতিকও। তিনি বলতেন — "অহংকার নয়, পরিশ্রমই মানুষকে বড় করে।" এই কথাগুলো জীবনের প্রতিটি মোড়ে পথপ্রদর্শক হয়ে থেকেছে।

আজ দাদু আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর দেওয়া শিক্ষা, তাঁর মূল্যবোধ, তাঁর হাসিমাখা মুখ আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে। যখনই জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, মনে হয় দাদুর কণ্ঠস্বর কানে বাজছে — "ঠান্ডা মাথায় ভাবো, মন দিয়ে কাজ করো, সময়কে মূল্য দাও।"

আমার জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক নিঃসন্দেহে আমার দাদু। বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাইরা যেমন অক্ষরের পাঠ শেখান, দাদু তেমনই শিখিয়েছিলেন জীবনের পাঠ।

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন কিছু শিক্ষক থাকেন — যাঁরা বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনে আমাদের শিক্ষা দেন। সেই শিক্ষা কখনও সময় দেখা শেখায়, কখনও ধৈর্য ধরতে শেখায়, কখনও ভালোবাসতে শেখায়, কখনও দেয় মানুষ হওয়ার পাঠ। তাই আমি মনে করি, শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি সম্পর্কে লুকিয়ে থাকে। প্রত্যেকেই আমরা আমাদের জীবনে এরকম কারোর কাছ থেকে বিশেষ শিক্ষা লাভ করি, এবং সেই শিক্ষাই হলো আসল জীবন গঠনের শিক্ষা।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 2 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top