বিরহী রাধার অভিমান ভরা আকুল আর্তি। প্রেমিক কৃষ্ণ তার মতো ভালবাসতে পারেনি কোনদিন। স্বামী সংসার, গঞ্জনা লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন সে বংশীধারীর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর ছেড়ে পথে নেমেছে । রাধাকে পথে বসিয়ে মথুরায় গিয়ে রাজ্যপাটে মন দিয়েছে প্রেমিক প্রবর শ্রীকৃষ্ণ — ঈশ্বরের প্রতীক বনমালী! অভিমান, বিরহ, প্রিয়-সঙ্গহীনতার যন্ত্রণায় কাতর আমাদের রাধিকার কণ্ঠে যেন অভিশাপ ঝরে পড়ে — "তুমি আমারি মতন জ্বলিও জ্বলিও বিরহ কুসুম হার গলেতে পরিও...” এতো কল্পনাবিলাস মাত্র!
ভালবাসা-অভিমানহীন এক যাপনের অমানবিক নারকীয় যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত ছিন্নভিন্ন হয়ে রক্তমাংসের সত্যিকার এক নারী সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলে তোমারই সৃষ্ট নারী পুরুষে এমন ভেদ করার জন্য, নারীকে এমন যন্ত্রণাদগ্ধ করার জন্য — হে ঈশ্বর তোমাকে একবার নারী হতেই হবে — BE A WOMAN ONCE, OH LORD...
শেষ করলাম বুকার জয়ী বানো মুস্তাকের এক অসামান্য গল্প BE A WOMAN ONCE, OH LORD! অসামান্য গল্পের বুনোট, বিষয় নির্বাচন এবং অসামান্য গল্পের নরম, কোমল ভঙ্গীতে সমাজ সংসার ঈশ্বরের সৃষ্টির বিরুদ্ধে সরোষ ধিক্কার, প্রতিবাদ!
উত্তমপুরুষে কথা বলা এই গল্পের মেয়েটি স্বভাবগত ভাবেই প্রথম থেকে নম্র, অনুগত। মাটির দিকে তার দৃষ্টি। আকাশ, বাতাস, সমুদ্র, অরণ্য, মেঘ, বৃষ্টি, সবুজ শ্যামলিমায় মুগ্ধ হওয়ায় তার কোন অধিকার নেই — এ সত্য সে জানে। সে মেনে নিয়েছে — "these are not things I can touch or immerse myself in... You have given all these for him, for your Supreme creation..."
চার দেওয়ালের কারাগারে বন্দী মেয়েটি কখনো কখনো মুক্তির স্বাদ পায় "...in the form of a breeze... jasmine plant that infused the air with heady fragrance... সামনের দরজার দিকে তার যাওয়া বারণ। সে তাদের মাঝের ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে "The white cottony clouds... The roaring black black clouds that looked like elephants... হৃদয়ে অনুভব করে দুর্দান্ত বৃষ্টির ধারা।
তবু মায়ের উপদেশ — সব সময় তার কথা শুনে চলবে... সে তোমার ঈশ্বর — সারা জীবন তার খিদমৎ খাটবে। চলে যাবার সময়া মা তার হৃদয়ের টুকরোটিকে শেষবারের জন্য আঁকড়ে ধরলে তাকে চিলের মতো ছিনিয়ে নেয় মায়ের নির্দেশিত সেই ঈশ্বর — "I was a precious jewel wrapped in gold and silver-embroidered cloth."
মেয়েটির তখন নিজের ব'লে আর কিচ্ছু নেই — "Even my name got lost. (my new name was) His wife. My body, my mind were not my own... He devoured me... My body was his playground; my heart, a toy in his hand." তবু সেই Supreme creation এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করে না। স্বামী তাকে বারবার অপদার্থ, ভিখারি বলে গাল দেয়, তাকে বাপের বাড়ি পাঠায় পঞ্চাশ হাজার টাকা আনার জন্য। দরিদ্র বাপ-মার পক্ষে সে দাবি মেটানো সম্ভব হয় না। চিরকালের জন্য মেয়েটির সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তার বাবা মারও মেয়েকে দেখতে আসা নিষিদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথের 'দেনাপাওনা' মনে পড়ছে কি? দেশ, কাল, ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে গল্পটি আদ্যান্ত এইভাবে সর্বজনীন হয়ে গেছে। ফিরে আসার সময় মেয়েকে তৃপ্তি করে খাওয়ায় মা, বেণী বেঁধে চুলে ঝুলিয়ে দেয় জুঁইয়ের মালা। পতিগৃহে ফিরেও মেয়েটি জুঁই জড়ানো সেই বেণী খুলতে পারে না — "I was scared of Amma's loving kisses slipping away..."
মেয়েটির খেয়েছে কিনা, সুস্থ কিনা জানতে চায়না সেই Supremo। কিন্তু সে লাঙল চষে, বীজ ফেলে প্রতিদিন। "...the body was ripe, the womb ready, and his hunger was great too." স্বাভাবিক নিয়মে মেয়েটির সন্তান হয় — প্রথমে কন্যা, পরে পুত্র। কন্যাটি তখনও মায়ের কোলের উষ্ণতায় মাতৃদুগ্ধ পানরত, আবার একটি প্রাণের স্পন্দন অনুভব করে মেয়েটি। ভীষণ ভাবে বিচলিত, আশঙ্কিত হয়ে পড়ে সে, অন্য পক্ষের নিরুদ্বিগ্ন উত্তর "I am the one raising them, what is your problem in bearing them?" মেয়েটি ঈশ্বরের সামনে ভেঙে পড়ে "If only you had told him, just once, about the difficulties of giving birth... a pain so intense it breaks the ribs... মেনে নেওয়া — সব কিছু মেনে নেওয়া "I had morphed into the most dutiful servant; ...with no awareness of social relationships, nameless, less than a person, I was only his wife, that is, free labour."
মার মন পোড়ে মেয়ের জন্য। বাড়ির সব কিছু বিক্রিবাট্টা করে কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে জামাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ যাওয়ার পথে পথ দুর্ঘটনায় মা মারা যায়। মাকে শেষ বারটি দেখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় না, তাকে ঐ দুর্ঘটনা সম্বন্ধে জানানোও হয় না। কিন্তু মেয়েটি বেশ বুঝতে পারে মৃত স্ত্রীর ছিন্নভিন্ন দেহের পাশে বসা তার শোকস্তব্ধ বাবার কাছ থেকে ঐ কুড়ি হাজার টাকা এবং মায়ের সামান্য গহনাটুকু নিয়ে আসতে ভোলেনি স্বামী।
মেয়েটি আবার অসুস্থ হয়, পেটে সিস্ট। অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছেলেমেয়ে দুটিকে হাসপাতালেই তাদের মায়ের কাছে রেখে লোকটি আবার বিয়ে করতে ছোটে, নতুন স্ত্রীকে দেওয়ার জন্য মেয়েটির কাছ থেকে তার হার প্রায় ছিনিয়ে নেয় — সদম্ভে জানায় মেয়েটি বিছানায় একেবারে শীতল মৃতদেহের মতো পড়ে থাকে, তাই তার কামবাসনার পূর্তির জন্য নতুন নারী প্রয়োজন। লোকটি আর ফিরে আসে না। কয়েকদিন হাসপাতালের বদান্যতায় সন্তান নিয়ে সেখানেই কাটায় মেয়েটি। একদিন চলে আসতে হয়। বাড়ির দরজা বন্ধ। সকাল থেকে সন্ধ্যা বাড়ির পিছনে সন্তান নিয়ে অপেক্ষা করে। প্রতিবেশীরাও আসে না। সন্ধ্যাবেলায় লাল রংয়ের সোনারূপা জড়ানো শাড়ি পরা নতুন বউ নিয়ে Supremo সামনের দরজা খুলে বাড়ি ঢোকে, পিছনে তখন ক্ষুধার্ত, অবসন্ন হতভাগ্য মেয়েটি, ঘুমের ঝুলে পাশের নর্দমার পড়ে যাওয়া নোংরা কাদা মাখা সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। গলা ফাটিয়ে ঈশ্বরের কাছে সে তার আর্তি জানাতে চায়।
বানো মুস্তাক মেয়েটির জিহ্বা শানিত করেন — "If you were to build the world again, to create males and females again, do not be like an inexperienced potter. Come to earth as a woman, Prabhu! Be a woman once, oh Lord!"
নিজ ধর্ম, সমাজ, রীতি রিওয়াজের উপরে উঠে বানু বা তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন। ঈশ্বরকে "inexperienced potter" — "অনভিজ্ঞ কুমোর" বলে ঘোষণা করলেন! এ এক সাঙ্ঘাতিক প্রতিস্পর্ধা।
আজকের দিনে সারা বিশ্বজুড়ে চলেছে কণ্ঠস্বর রোধকারী এক ভয়ংকর রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। আধিপত্যবাদী, মৌলবাদী শক্তির এই আস্ফালন বহুদিন ধরেই কবি, সাহিত্যিক, মানবতাবাদী, বামপন্থী মতবাদের গলা টিপে হত্যা করার জন্য সক্রিয় ছিল এবং এখন তা আরও বেড়েছে। নৈরাজ্য দমনের মিথ্যা অজুহাতে দেশে দেশে বিভিন্ন দমনমূলক আইন প্রণয়ন হচ্ছে, প্রতিবাদী শক্তিকে পিষে দেওয়ার জন্য ভয় দেখানো হচ্ছে, সন্ত্রাস ছড়ানো হচ্ছে । সেখানে বানু মুস্তাকের কলম অত্যন্ত সহজ, সরল ভাবে, পারিবারিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে "জিহাদ" ঘোষণা না করেও অনেক কথা বলে দিল।
বানু মুস্তাক শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি আইনজীবী, বিভিন্ন অসমতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন এক্টিভিস্টও। কর্নাটকের সুপরিচিত বান্দায়া সাহিত্য আন্দোলনের সাথেও যুক্ত। এই আন্দোলনে যুক্তরা মানুষের জীবনে, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জীবনে চেপে বসা সমাজের আধিপত্যবাদ দূর করতে চান। গৌরী লঙ্কেশ খুনও হন এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মুখ হওয়ার জন্য। বানো নিজে, জন্মসূত্রে যে ধর্মের মানুষ, সেই ধর্ম রক্ষার নামে মৌলবাদীদের অন্যায়, বঞ্চনা, অমানবিকতার বিরুদ্ধে ঋজু শিড়দাঁড়ায় দাঁড়ানো নারীরা ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে যেখানে প্রাণ দিয়ে, কারারুদ্ধ, চাবুকের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত, সামাজ বিচ্ছিন্ন 'একঘরে' হয়ে থাকছেন সেখানে বানো মুস্তাকের এই গল্প যথেষ্ট সাহসীয়ানা ও বলিষ্ঠতার পরিচায়ক। তাঁর কথায় — "আমার চারপাশে অসংখ্য মানুষ, বিশেষত নারীরা প্রতিদিন অত্যাচারিত হচ্ছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, যন্ত্রণা সহ্য করছেন। ধর্ম, সমাজ, রাজনীতির চাপিয়ে দেওয়া অন্ধ আনুগত্যও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উপর প্রতিনিয়ত এমন আঘাত হানছে যে, আমাদের স্বাভাবিক বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো আমায় গভীরভাবে আঘাত করে। মনে হয় আমি কিছুই করতে পারলাম না এসবের প্রতিকারে। এই অসহায় বোধ আমাকে লিখতে বাধ্য করে।"