আমরা যারা ইটালির প্রখ্যাত শহর রোমে বসবাস করি, অথচ ছোটবেলা থেকে স্কুল-কলেজের দিনগুলি কেটেছে কলকাতায়, তাদের কাছে দুর্গাপুজো এক অন্যরকম আনন্দের অনুভূতি নিয়ে আসে। শরতে বাংলার আকাশ যেমন নীল রঙে সেজে ওঠে, সাদা মেঘের ভেলায় দুর্যোগের কালিমা উধাও হয়ে যায় — রোমের আকাশও যেন তেমনই সেজে থাকে। গ্রামবাংলার কাশফুলের সমারোহ যেমন শারদোৎসবের আগমনকে সূচিত করে, রোমের হাইওয়ের দু-পাশেও নজরে পড়ে কাশফুলের দঙ্গল! যেন বাঙালির প্রাণের উৎসবকে সাদরে আহ্বান করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছে।
রোমের মাটিতে শরতের এই দুর্গাপুজো যেন একটুকরো কলকাতা। শুধু একটি উৎসব নয়, প্রবাসী বাঙালিদের ভালোবাসা, ঐতিহ্য ও সৌহার্দ্যের এক সুন্দর উদ্যাপন।
রোমের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গাপুজো-সহ বাঙালিদের নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অধিকাংশই বাংলাদেশি সংগঠনের উদ্যোগে। তবে একটি জায়গার দুর্গাপুজো আয়োজন করে Indian Cultural Organisation (ICO)। জায়গাটি হল Villa Gardiani, Via Prenestina, 325, 00171, Roma (RM)। এখানে টানা পাঁচ দিন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পুজোর অনুষ্ঠান চলে। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি নবরাত্রিও মহাসমারোহে পালিত হয়। প্রবাসী ভারতীয়েরা, যাঁদের অধিকাংশই বাঙালি, ভারতীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় মিলিতভাবে এই আয়োজন করেন।
এখানে যে প্রতিমা স্থাপন করে পুজোর আয়োজন করা হয়, তার বিশেষত্ব হল, সেটি বিশেষ ধরনের ফাইবার দিয়ে তৈরি। ভারত থেকে এই প্রতিমা রোমে নিয়ে আসা হয়। রোমের নদী বা হ্রদগুলিতে প্রতিমা বিসর্জনের অনুমতি পাওয়া যায় না। তাই প্রচলিত জলবিসর্জনের পরিবর্তে প্রতিমাটিকে বিশেষভাবে তৈরি কাঠের বাক্সে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে পরের বছর আবার সেই প্রতিমায় পুজো করা যায়।
রোমে বাঙালির সংখ্যা নেহাত কম নয়। অন্ততপক্ষে কুড়ি হাজার কলকাতার বাঙালি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশী বাঙালির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন। শহরের এখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে বাঙালিটোলা। সেখানকার রেস্টুরেন্টে যে কতরকমের ভর্তা পাওয়া যায় তার ইয়ত্তা নেই!
পুজোর কটা দিন বাঙালিদের সঙ্গে প্রবাসী পাঞ্জাবি কিংবা হিন্দিভাষী মানুষেরা যেমন যোগ দেন, তেমনই ইটালিয়ানরাও সমান আগ্রহে অংশ নেন। পুজোমণ্ডপের আশপাশে কলকাতার মতোই খাবার, খেলনা, হস্তশিল্প আর পোশাক-আশাকের স্টল বসে। এমনকি ফুচকা ও মাটির ভাঁড়ে চা-ও পাওয়া যায়। ইটালিয়ানরা কিন্তু চা খেয়ে ওই ভাঁড় ফেলে দেন না। অমন সুদৃশ্য হাতে তৈরি সামগ্রী তাঁরা সযত্নে রেখে দেন।
কেনাকাটা, হইচই আর মানুষের আনাগোনায় সরগরম হয়ে ওঠে পুরো চত্বর। পাশাপাশি পুজোর আচার-অনুষ্ঠানও চলতে থাকে। সঙ্গে ঢাকের সেই মন ভালো করা ঢ্যাম কুড়া কুড় বাদ্যি — যা না হলে পুজোর আয়োজনই যেন অসম্পূর্ণ!
পুজোমণ্ডপের বিপরীত দিকে মঞ্চ। সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতির নানা শাখার অনুষ্ঠান চলে। কর্মসূচি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। সেই অনুযায়ী ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল ডান্সের মধ্যে কত্থক, ভরতনাট্যম ইত্যাদি পরিবেশিত হয়। থাকে ফোক ডান্সও। নৃত্যের পাশাপাশি আহার-বিহার চলতে থাকে পুরোদমে। তবে দেশাচার মেনে চারপাশের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে সকলেই বিশেষ সতর্ক থাকেন।
পুজোর আয়োজন শুরু করার আগে সরকারি অনুমোদনের কাজটি সেরে নিতে হয়। স্থান নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হয় ছিমছাম, অথচ জাঁকজমকপূর্ণ। ষষ্ঠীর দিন ভারতীয় দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারীরা আসেন। রাষ্ট্রদূতের হাত দিয়েই পুজোর সূচনা হয়। তাঁর সম্মানে ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্য পরিবেশিত হয়। এমনই এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমার ভরতনাট্যম পরিবেশন করার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর সামনে আমার সামান্য নাচ উপস্থাপন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল।
সপ্তমীতে রবীন্দ্রগানের সঙ্গে রবীন্দ্রনৃত্যের আয়োজন থাকে। কলকাতা থেকে বিভিন্ন সংগীতশিল্পীকে নিয়ে আসা হয়। তাঁরা রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও অন্যান্য গান পরিবেশন করেন। অষ্টমীর দিন এখানে নবরাত্রি উপলক্ষে নাচের অনুষ্ঠান শুরু হয়। নবরাত্রি সেলিব্রেশনে থাকে ডান্ডিয়া নাচ, যাকে কেউ কেউ স্টিক ডান্সও বলেন। লেহঙ্গা-চোলি কিংবা ঘাঘরা পরে সারা মাঠ জুড়ে মহিলারা একে অপরের কাঠিতে কাঠি ঠুকিয়ে সেই ঐতিহ্যমণ্ডিত নাচে মেতে ওঠেন। এই অপরূপ পরিবেশ ভোলার নয়।
এরই মাঝে সকালে, যখন মঞ্চ প্রায় শূন্য, তখন ইটালিয়ান মহিলারা সেখানে যোগব্যায়াম প্রদর্শন করেন। আবার একদিন ইটালিয়ান ডান্স গ্রুপ বলিউড ডান্স পরিবেশন করে উৎসবের আমেজকে পরিপূর্ণ করে তোলে। ইটালির মানুষের কাছে ভারতের বলিউড ফিল্মের কেমন কদর, তাঁদের এই উৎসাহী অংশগ্রহণেই তা বোঝা যায়।
বাঙালি, পাঞ্জাবি ও ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মানুষের ঝলমলে উপস্থিতি, আর ইটালিয়ান নারী-পুরুষের সহযোগিতায় দুর্গোৎসব সর্বার্থে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। সদ্ভাবনার এ এক অপূর্ব নিদর্শন। রোমের এই দুর্গোৎসব তাঁদের সামনে বাঙালি তথা ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে তুলে ধরে।
আর আমাদের মতো প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে এই কয়েকটি দিন বয়ে আনে নির্মল আনন্দ ও অবকাশ। ঢাকের বাদ্যি, পরিচিত গান আর মানুষের মিলনমেলায় আবার জেগে ওঠে দেশে ছেড়ে আসা আত্মীয়পরিজনের সঙ্গে শারদোৎসব পালনের স্মৃতি।
লেখিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। কলকাতার বাঙালি হলেও গত ১০ বছর ধরে রোমের ভায়া কর্নেলিয়ার বাসিন্দা। কলকাতায় থাকাকালীন পাঁচ বছর টেলিসিরিয়ালে সফলভাবে অভিনয় করেছেন। আকাশ ৮ চ্যানেলে নিয়মিত কাজ করার পাশাপাশি শর্ট ফিল্ম ও থিয়েটারেও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইতালিতে কয়েক বছর চাকরি করার পর বর্তমানে সমাজমাধ্যমে সক্রিয়। নাচের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। ভরতনাট্যমে তাঁর শিক্ষাগুরু শ্রদ্ধেয়া থাঙ্কমণি কুট্টি।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।