দ্বিতীয় অধ্যায়
➖ এই যে ভূত গবেষক, এটা জানিস কি, সব ভূতই আসলে 'অ্যাপারিশন', কিন্তু সব 'অ্যাপারিশন' ভূত নয়? উত্তরটা দেওয়ার আগে বল, 'অ্যাপারিশন' শব্দটার মানে জানিস তো?
➖ জানব না কেন? জেমস পটার সিরিজের প্রথম বই অনুবাদ করার সময় এটা অনেকবার পড়েছি। অবশ্য ওটা ছিল জাদুর বই। আর এখানে আলোচনা হচ্ছে ভূতের। অবশ্য ভূত আর জাদুতে খুব একটা সীমা রেখা নেই। সে কথা পড়ে হবে। 'অ্যাপারিশন' যার অর্থ আবির্ভাব। বা বলা যেতে পারে ভোজবাজির মত হঠাৎ রূপ পরিগ্রহ করা। ভূত কি এরকম কিছু ব্যাপার? তোমার কী মনে হয়?
➖ দ্যাখ, বেশিরভাগ মানুষই ভূত শব্দটা ব্যবহার করে সেই বস্তুর ক্ষেত্রে যা কোন মৃতদেহ থেকে বের হয়ে আসে। সোজা কথায় তারা আসলে যা বোঝাতে চান তা হলো মৃত ব্যক্তির বা প্রাণীর আত্মা। এই আত্মা ব্যাপারটাও খুব ধোঁয়াটে একটা বিষয়। এখন প্রশ্ন হলো কিসের ভূত দেখা যায় তাহলে?
➖ প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন। বেশ, তাহলে এটা বলতে পারি, বিগত কয়েকশো বছর ধরে যে সমস্ত ঘটনার কথা আমরা শুনেছি বা পড়েছি, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন বস্তুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা কখনোই কোনও মানুষ নয় বা কোনও প্রাণীও নয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রচুর মানুষ ভুতুড়ে ট্রেন বা অন্যান্য যানবাহন বা বাড়ি বা পোশাক বা আসবাবপত্র দেখার কথা বলেছে। এসব কিন্তু মানুষ নয় বা কোনও প্রাণী নয়। ওই সব বস্তুর নিশ্চিত ভাবেই কোনও আত্মা বলতে আমরা যা বুঝি তা নেই। কারণ ওগুলো জীবিত কিছু নয়। আর ভূত বিশ্বাসীদের মতে আত্মা বা ওই জাতীয় কিছু একটাই হলো ভূত।
➖ একদম ঠিক জায়গাটা ধরেছিস। সম্ভবত এরকম যাবতীয় বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্যই, 'প্যারানরমাল' তদন্তকারীরা দেহ বিচ্ছিন্ন আত্মার চাক্ষুষ চেহারা দর্শনকে 'অ্যাপারিশন' শব্দ দ্বারা অভিহিত করতে পছন্দ করেন। যার ভেতর সমস্ত ধরণের অশরীরীদের আবির্ভাবকেই এক্তিয়ার ভুক্ত করা যায়। তা সে মানুষ হোক বা না হোক। কারণ সবই তো আবির্ভাব। দেবদূত শরীর ধারণ করলে সেটাও আবির্ভাব। কিন্তু তাকে ভূত বলা যাবে না । আবার ব্যাখা করা যায় না এমন বিষয়ের তালিকাভুক্ত করতে কোন অসুবিধাও হবে না।
➖ অর্থাৎ এটা বলতেই পারি: সব ভূতই আসলে 'অ্যাপারিশন' বা আবির্ভাব, কিন্তু সব 'অ্যাপারিশন' ভূত নয়। যারা এ লেখা পড়ছেন তাদের বিভ্রান্তি বাড়ানোর জন্য 'অ্যাপারিশন' এর কিছু প্রতিশব্দ জানিয়ে রাখি এই ফাঁকে। যাদের সবগুলোকেই নানান ক্ষেত্রে 'ভূত' বোঝানোর জন্যই ইংরেজিতে ব্যবহার করা হয়। 'নাইটশেড', 'ফ্যান্টাজম', 'ফ্যান্টম', 'শেড', 'শ্যাডো', 'স্পেকটার', 'স্পুক', 'ভিশন', 'রেইথ' ইত্যাদি।
➖ এইসূত্রে একটা কথা বলি। ওই যে শব্দগুলো বললি, সেরকম এরকম নানান ধরণের ভূতের দেখা মেলে আছে সারা পৃথিবী জুড়ে। মজার ব্যাপার তারা নানান ধরণের সময়সূচী ব্যবহার করে থাকে নিজেদের আবির্ভূত করার জন্য।
➖ ভূতের আবির্ভাবের সময় সূচী?
➖ হ্যাঁ রে, কারও কারও দেখা মিলেছে মাত্র একবারই। যেমন, ১৮২৪ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর রাতে ইংল্যান্ডের কাম্বারল্যান্ডে কর্বি ক্যাসলে একটা ছেলের উজ্জ্বল আলোক বিচ্ছুরণকারী শরীর সহযোগে আবির্ভাব হয়েছিল। কেউ কেউ আবার একটা নির্দিষ্ট তারিখ বা রাতে উপস্থিত হয়। ইন্ডিয়ানোলা আইওয়ার সিম্পসন কলেজে ১৩ তারিখ এবং শুক্রবার এক সঙ্গে মিলে গেলেই এক মহিলা ভূতের আগমন হয়। এরকম অনেক ঘটনার কথা তোর পাথক-পাঠিকারা যে রাখেন তা বলাই বাহুল্য। কিছু কিছু আবির্ভাব আবার ঘটে প্রতি বছরে নির্দিষ্ট দিনে। আবির্ভাব বার্ষিকী বলতেই পারিস। আবার অনেক ভূত একটা নির্দিষ্ট স্থানে বারংবার দেখা দিয়েই চলে।
➖ দাদা তোমার কথায় মনে পড়ল। 'প্যারানরমাল' পরিভাষায়, যে 'সৌভাগ্যবান' ব্যক্তি এরকম আবির্ভাব দেখেন বা দেখতে পান তাকে বলা হয় 'পার্সিপিয়েন্ট'। যে চেহারাটাকে দেখা যায় তার পরিভাষা হল 'এজেন্ট'। এই 'এজেন্ট' শব্দটা সাধারণত সেইসব ক্ষেত্রেই বেশি ব্যবহার হয় যখন সেই অজ্ঞাত সত্ত্বা নিজের ইচ্ছায় নিজেকে প্রকাশ করে এবং কোনও একটা বার্তা প্রদান করতে চায়।
➖ এই বার্তা প্রদান করতে চাওয়া ব্যাপারটাই কিন্তু ভূত সৃষ্টির অন্যতম ভিত্তি। এ নিয়ে তোর পাঠকদের জানাতে ভুলিস না যেন।
➖ মোটেই ভুলব না। তাহলে তো ভূতের ইতিহাসের সূত্রপাতের কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তার আগে আরেকটা কথা বলি দাদা। যে বা যারা ভূতে বিশ্বাস করেন তারা ভূতের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য কোনও শক্তপোক্ত ভিত্তির প্রমাণ দাবি করেন না। সেসব তাদের প্রয়োজন হয় না। টাদের কাছে 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু' ধরনের ব্যাপার ওটা। বিপরীতে, ঠিক কি ধরণের প্রমাণ বা কোন মাত্রার প্রমাণ তুমি দাখিল করবে একজন ভূতে অবিশ্বাসীকে বিশ্বাসী বানানোর জন্য?
➖ কাজটা খুব মুস্কিল রে। কেন মুস্কিল জানিস, আসলে বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীদের আলাদা করাটাই কঠিন। মৃত্যুর পরে জীবন আছে কি নেই ? এটা যদি প্রথম প্রশ্ন হয় সেক্ষেত্রেই তো সমস্যা জন্ম নেয়।
➖ কী সমস্যা?
➖ ভূতে বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিত্তিতে মূলত তিন ধরণের মানুষদের দেখা মেলে। এক, সেইসব মানুষ যারা মৃত্যুর পরেও জীবন থাকে এটা বিশ্বাস করেন না, ফলে ভূত হয়ে ফিরে আসারও সম্ভবনাতেও তাদের বিশ্বাস নেই। দুই, সেই মানুষেরা যারা মৃত্যুর পর একটা জীবন আছে এটা বিশ্বাস করেন, কিন্তু তারা আবার এটা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, মৃত ব্যক্তি ভূত রূপে জীবিত জগতে ফিরে আসতে পারে। আর তিন, সেই মানুষেরা, যারা মৃত্যুর পরে জীবন আছে এটা বিশ্বাস করেন এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, মৃত ব্যক্তি ভূত হয়ে ফিরে আসতে পারে।
এই তিন ধরণের বাইরেও এক ধরণের মানুষ আছে। যারা মৃত্যুর পরে জীবন আছে এটা বিশ্বাস করে বা করে না, কিন্তু এটা বিশ্বাস করে যে, অন্যান্য ধরণের অশরীরী আছে। তারা হলো দেবদূত বা ‘ডেমন’ বা দানবিক জাতীয় কিছু। যারা নিজেদেরকে মানুষের রূপে বদলে ফেলতে পারে। যদিও তারা সঠিক অর্থে ভূত নয়।
➖ ঠিক। আবার আর এক ধরণের বিশ্বাসীও আছে দাদা, যারা মনে করেন জীবিত মানুষ একস্থানে অবস্থান করেও অন্য স্থানে নিজের রূপের আবির্ভাব ঘটাতে পারেন । এটা কে কি বলব, ভূত? আবার আক্ষরিক অর্থেই সেই সমস্ত লোকেরাও আছেন যারা কোনও কিছুতেই বিশ্বাস করেন না: মৃত্যুর পরে জীবন, ভূত, স্বর্গীয় আত্মা, অথবা ‘ডেমন’ বা ‘ডেভিল’। অস্বাভাবিক কিছু যে এরকম মানুষদের চোখে পড়ে না বা তারা অনুভব করেন না তা হয়তো নয়। কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলেন যে, এসবের পেছনে নিশ্চিত কোনও যৌক্তিক, প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা আছে।
➖ তাহলে আশা করি বুঝতে পারছিস, এত রকমের বিশ্বাসী অবিশ্বাসী মানুষের সামনে ভূতের অস্তিত্ব প্রমান করা না করার দায়িত্ব নেওয়া আর সামনে খাদ আছে জেনেও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া একই ব্যাপার। তার চেয়ে কাউকে কিছু বিশ্বাস করানোর চেষ্টা না করে, নিজের মতো করে একটা ভাবনা পেশ করার চেষ্টা করাটাই ভালো। তুই সে চেষ্টা করবই সবসময়। যেখানে অনেক অনেক অদ্ভুত তথ্য জানা যাবে, জানানো যাবে।
➖ ঠিক বলেছ। তাহলে আমাকে বলো দেখি জীবনের সমাপ্তি ঘটলে, বা তার পরে তাহলে কী আছে?
➖ এটাই তো আসল প্রশ্ন। এর ভিত্তিতেই সব গবেষণা, সব দর্শন জন্ম নিয়েছে। বুঝতে অসুবিধা নেই ভূতে বিশ্বাসটা আসলে পরকালে বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যদি কোনও কিছুর অস্তিত্বই আর মৃত্যুর পর অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে এমন কিছু হতে পারে না যাকে আমরা ভূত বলে জানি। ফিরে আসার মতো কিছুই সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে থাকবে না।
➖ কিন্তু দাদা এত সহজে তো বিশ্বাস জাগানো যায় না। সময়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হওয়ার সূচনা কাল এবং তারও যুগ যুগান্তর আগে থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, আমরা মারা যাওয়ার পর আসলে কী হয়? আজও একবার না একবার সারা জীবনে মানুষ এ চিন্তা করতে বাধ্য। যতই কোনও বিশেষ দর্শন বা ধর্মের যুক্তি মেনে জীবন যাপন করুন না কেন এভাবনা থেকে তার রেহাই নেই। আর এই চিরন্তন প্রশ্নের সর্বোত্তম তাত্ত্বিক কোনও উত্তর আজও কেউ দিতে পারেনি।
➖ কী করে পারবে। আজ অবধি আমরা এমন কোনও মানুষের দেখা পাইনি যিনি মরে যাওয়ার পর এ জগতে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বলেছেন।
➖ তাহলে এটা মানতেই হবে, জীবন পরবর্তী সময়ে ঠিক কী হয় এটা নিশ্চিতভাবে এ জগতের কেউই জানে না। সবটাই কল্প জগতে বিচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন জাগে, এই জগতের মতো সব কিছুই কি সেখানে আছে?
➖ সম্ভবত এজগতের মতোই কিছু পাওয়া যাবে এই ভাবনা থেকেই কিছু মানুষ বিশ্বাস করতে চায় এই জীবন যা যা কিছু আমাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে তার সব কিছুই পরের জীবনেও পাওয়া যেতে পারে। সেই অনুসারে জীবনযাপন করে। আসলে আমার মনে হয় এর পিছনে ছিল গভীর সমাজ দর্শন। সমাজের পরিবেশ ভালো রাখার ভাবনা। বা তার চেয়ে কিছু বেশি।
➖ ভূতের জন্ম হয়েছিল সমাজকে ভাল রাখতে?
➖ ভেবে দেখিস। আগামী দিনে এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
দ্বিতীয় অধ্যায় উপভোগ করেছেন? তৃতীয় অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।