তৃতীয় অধ্যায়
➖ ইতিহাসে যে সমস্ত সভ্যতা সংস্কৃতির তথ্য পাওয়া যায় তাদের প্রায় সবগুলোই, মৃত্যুর পরে কোনও না কোনোরকম জীবনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাস অনুসারেই মৃত্যুর পরে আত্মা তার কাজের ভিত্তিতে প্রাপ্য জীবন লাভ করে এটাও মানেন অনেকেই। এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে এসব ভাবনা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
এইটুকু শুনেই সবজান্তা দাদা বললেন,
➖ এটাই তো আসল কথা। ভেবে দ্যাখ সমাজতত্ত্ব, আধ্যাত্মিক দর্শন কীভাবে মিশে গিয়েছে ভূতের জগতে। একদা মানুষের বিশ্বাস জন্মেছিল, আজও সে বিশ্বাস বর্তমান, আত্মা বর্তমান জীবনের মতই অনুরূপ অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে, শুধু জগতটা বদলে যায়। জীবিত থাকার সময় করা কাজের ভিত্তিতে আত্মার বিচার করা হয় এবং তার উপর নির্ভর করে 'স্বর্গ' না 'নরক' কোথায় তার স্থান হবে। আত্মাকে ধারাবাহিক পুনর্জন্ম পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। এর সূত্রে উচ্চতর আধ্যাত্মিক জগতের পথে সে এগিয়ে যায়। নিজ উন্নতির চেষ্টা করে আত্মা বিশেষ পুনর্জন্ম বা পুনরুত্থানের জন্য অপেক্ষা করে।
➖ আর এই কাজকে সহজসাধ্য করার জন্য প্রায় প্রতি সমাজে এক শ্রেণীর মানুষের জন্ম হয়েছিল, যারা মৃতদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তাই না দাদা?
➖ একদম। বিদেশী উপজাতীয় আদিবাসী সমাজে এদের পরিচিতি 'শ্যমান' নামে। যাদের আমরা 'ওঝা' বলতেই পারি। আবার এক অর্থে 'পুরোহিত' বললেও ভুল বলা হয় না। কোথাও কোথাও এদেরকে 'অর্যাকল' নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই মানুষগুলো জীবিত এবং মৃত জগতের মধ্যে তথাকথিত মধ্যস্থতাকারী বার্তাবাহক হিসাবে কাজ করেন। জীবিত মানুষদের জন্য এরা মৃতদের তরফ সতর্কবার্তাও বহন করে এনে দেন। 'নেক্রোম্যান্সার' নামেও এক ধরণের মানুষের অস্তিত্ব বিভিন্ন সমাজে আছে। যারা মৃতদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে ভবিষ্যত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। কিছু কিছু সমাজ ব্যবস্থায় এই জাতীয় মানুষেরা মৃত মানুষের আত্মীয়ের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, পরবর্তী জগতে মৃতের শাস্তি কম করে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য। 'মিডিয়াম' নামে পরিচিত কিছু মানুষ জীবিত এবং মৃতদের জগতের মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করেন। বিশেষ করে প্রিয়জনদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করার জন্য।
➖ তারমানে, ভূতের সূত্রে বা মৃত্যু পরবর্তী কাল্পনিক জগতের সূত্রে একটা জীবিকার জন্ম হয়েছিল।
➖ একদম। মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুক্তি দিয়ে ভেবে দেখলে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
➖ আত্মা যদি মৃত্যু্র হাত থেকে বেঁচেই যায়, তাহলে সে কোথায় যায় দাদা?
➖ সাধারণ বিশ্বাস অনুসারে এক নতুন জগতে। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, সে জগত এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে অসাধারণ রকমভাবে বৈচিত্র্যময়ভাবে নব নব রূপে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।
➖ কেমন, একটু যদি বলো মনে হয় পাঠকদের খারাপ লাগবে না।
➖ বেশ শোন তাহলে। প্রাচীন গ্রীসের মানুষেরা এক 'আন্ডারওয়ার্ল্ড' বা ভূগর্ভস্থ জগতের কথা লিখেছিল যা আক্ষরিকভাবেই পৃথিবীর নীচে পাওয়া যায়। তাদের বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীর বুকে অবস্থিত নানান পাহাড়ি গুহা, ফাটল ইত্যাদির সাহায্যে সেই সাম্রাজ্যের অধিপতি হেডিসের জগতে প্রবেশ করা যায়। 'অ্যানিমিস্টিক' সমাজ বিশ্বাস করে যে, তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মা সবসময় অদৃশ্য রুপে তাদের আশেপাশেই থাকে। 'অকাল্টিস্ট' এবং 'ক্যাবালিস্ট'রা পৃথিবীর চারপাশে এক অদ্ভুত স্তর বা মালভূমি জাতীয় স্থানের বর্ণনা দিয়েছেন, যা আত্মাদের বাসভুমি। সেখানেও স্তর ভেদ আছে আত্মার গুণ মান অনুসারে।
অধিকাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আকাশে অবস্থিত স্বর্গের ধারণায় বিশ্বাসী। তারা মনে করেন যারা এ জগতে ভালো কাজ করেন তাদের জন্য ওখানে পরকালে বাসস্থান সংরক্ষিত থাকে। আকাশের অবস্থান যেহেতু ওপরে তাই জাহান্নাম বা নরকের অবস্থান নিচে। উল্লেখ্য নিচে মানে এখানে আক্ষরিক অর্থে কিন্তু মাটির নিচে নয়।
কিছু সংস্কৃতিতে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে অদৃশ্য 'নিদার-ওয়ার্ল্ড' বা অজ্ঞাত জগতে আটকা পরে থাকতে হয় বিচারের বা পুনর্জন্মের জন্য।
অন্য সেই জগতে আত্মা কীভাবে পৌঁছবে সেটা নিয়েও নানা সমাজে নানা মতের প্রকাশ দেখা যায়।
ফারাওদের সময় মিশরে, সমাধি কক্ষর দেওয়াল এবং 'সারকোফাগি' বা শবাধারের গায়ে হিয়ারোগ্লিফ অক্ষর মালা দিয়ে সজ্জিত করা হত। সম্মিলিতভাবে আজ সেই সব লেখা 'বুক অফ দ্য ডেড' হিসাবে পরিচিত। সেখানে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে পরবর্তী জগতে যাওয়ার পথ। আগে তার বিচার হবে এবং সেই আত্মা অন্য জগতে পুনর্জন্ম লাভ করবে। সেই সময়ের জাদুকর-পুরোহিতরা মৃতের যাত্রাপথ সুগম করার জন্য নানান আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা সহ শবদেহকে মমিতে পরিণত করত।
প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, আত্মার দুটো অংশ — 'বা' এবং 'কা'। 'বা' মানুষের বৈশিষ্ট্য, এবং ব্যক্তিত্বকে ধারণকারী শক্তি এবং 'কা' জীবনস্রোত। এই দুই অংশরই ক্ষমতা ছিল রাতের বেলায় সমাধি ত্যাগ করে জীবিতদের জগতে বিচরণ করার।
প্রাচীন বিশ্বাস অনুসারে আত্মাকে একটা নদী পার হয়ে যেতে হয় শেষ বিচার লাভের জন্য। এর সুত্রপাতও হয়েছিল মিশরে ফারাওদের সময়কালেই। ধ্রুপদী গ্রীস সংস্কৃতিতে এই ভাবনার প্রসারণ ঘটে। তারা বলে, আত্মাকে একটা ছোট নৌকায় করে স্ট্রিক্স নদী পার হয়ে হেডিসে যেতে হবে। এই নৌকার চালক চ্যারন/ক্যারণ। এই কিংবদন্তি রোমান সমাজেও অনুমোদিত হয় এবং পুরাণে রূপান্তরিত হয়ে যায়। খ্রিস্টধর্মের সূচনাকালে যে বিষয়টা এই ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহর একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটা হলো, সেন্ট অগাস্টিনের এক বিশেষ ঘোষণা। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বিচারের জন্য কোনও নদী পার হওয়ার দরকার নেই বা কোনও নৌকাচালকের মুখোমুখি হতে হবে না। কারণ স্টিক্স বলে কোনও নদী নেই।
➖ চমকপ্রদ তথ্য নিঃসন্দেহে।
➖ মৃতদের অস্তিত্বকে সম্মান জানানো এবং তাকে রক্ষা করার উৎসব হাজার হাজার বছর আগের সংস্কৃতি। প্রাচীন গ্রিসের মানুষেরা ফেব্রুয়ারির শুরুতে বা মার্চের প্রথম দিকে অ্যান্থেসটেরিয়া পালন করত। যেখানে তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মাকে নিজ নিজ বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করার আমন্ত্রণ জানাত। উৎসব শেষে ভদ্র নম্রভাবে তাদের পুরো এক বছরের জন্য বিদায় নেওয়ার কথা জানাত। কেন অনুমান করতে পারছিস কি?
➖ অবশ্যই পারছি। বোঝাই যাচ্ছে এর পিছনে থাকত একটাই আশা, খাওয়া দাওয়া করে সন্তুষ্ট ভূতেরা যেন কোনওরকম শয়তানি আচরণ না করে।
➖ অর্থাৎ এটাই বিশ্বাস করা হত যে, শান্তিতে থাকতে হলে ভূতেদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে।
➖ দাদা আমি পড়েছি প্রাচীন রোমানরা 'লারেস' নামের এক ধরনের আত্মায় বিশ্বাস করত। যাদের ভালো প্রকৃতির বলেই মনে করা হত। ওই আত্মাদের নিজেদের বাড়ি এবং এলাকায় আসার জন্য আবাহন করা হতো। যেখানে তারা মানুষের অভিভাবক দেবদূতের মতো বলে বিবেচিত হতো।
➖ একদম। শুধু তাই নয় বেশির ভাগ পরিবারের নিজস্ব 'লারেস' থাকত। যা আসলে কোন এক মৃত আত্মীয়র আত্মা। আবার পুর জনগোষ্ঠীকে সাহায্যকারী এই ধরণের আত্মাও যে ছিল তার উল্লেখ মেলে। আর এর উল্টো দিকে ছিল 'লার্ভা' বা মন্দ আত্মা। যারা অন্যদের ভয় দেখানোর সাথে সাথে ক্ষতি করারও চেষ্টা করত। যেসব মানুষ কোন জীবিত পারিবারিক সদস্য না থাকা অবস্থায় মারা যেত, তাদের আত্মারাই এই ধরণের ভূতে পরিণত হতো বলে বিশ্বাস করত তারা। আবার যারা অকালে, হিংস্রতার কারণে খুন হয়ে বা জলে ডুবে মারা যেত তারাও 'লার্ভা' ভূতে পরিণত হত বলে মনে করা হত। মে মাসের শুরুতে এই অশুভ আত্মাদের জন্য প্রতি বছর তিন দিনের 'পার্টি' দেওয়া হত। এই আশায় যে তারা খুশি হয়ে চলে যাবে এবং কোন রকম অত্যাচার করবে না।
➖ দাদা, আজও তো অনেক সংস্কৃতিতেই মৃতকে সম্মান জানাতে বার্ষিক মৃত্যু দিবস পালন করা হয়ে থাকে। যদিও আমার মনে হয়, এই সব উৎসবের মূল উদ্দেশ্য, আত্মাদের খেতে দেওয়ার অছিলায় আত্মীয় বন্ধু সহযোগে একটা দারুন ভোজের আয়োজন করা।
➖ কথাটা খারাপ বলিসনি। আমাদের প্রায় সব উৎসবই তো তাই। চীনের মানুষেরাও পূর্বপুরুষদের সম্মান করার জন্য, আত্মাদের সম্মান করার জন্য তিনটে বিশেষ আচার অনুষ্ঠান পালন করে। আমাদের দেশেও মৃত্যুর পর একাধিক আচার অনুষ্ঠান পালন করে সম্মান জানানোর প্রচলন আছে। হাঙ্গেরিতে দু সপ্তাহ ধরে দারুণ রকম খানাপিনা সহযোগে ভূত উৎসব বা 'গোস্ট ফেস্টিভ্যাল' পালন করা হয়। বংশধরবিহীন রূপে মারা যাওয়া মানুষদের আত্মাদের এই অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
মৃতদের জন্য উৎসবের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিন সম্ভবত মেক্সিকোতে পালিত হয়। যেখানে ২রা নভেম্বর 'এল দিয়া দে লস মুর্তেস' উদযাপন করা হয়। যার সূচনা হ্যালোইনের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। মেক্সিকান 'ডে অফ ডেড' সমগ্র পরিবারের জন্য পুনর্মিলন এবং ভোজসভার বিশেষ দিন। ওইদিনের সাজসজ্জায় কঙ্কালের ভয়ঙ্কর সব ছবি ব্যবহার করা হয়। এমনকি আসল মাথার খুলিও থাকে সেখানে। যা কবর থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়। আত্মীয়দের কবরখানার কাছে আয়োজন করা হয় পিকনিক। আর এসবের সেই একটাই উদ্দেশ্য, আগামী এক বছর তারা যেন আরাম করে শুয়ে থাকেন। মানুষের জীবন যাত্রায় ব্যাঘাত না ঘটান।
➖ 'হ্যালোইন' উৎসবটাও সম্ভবত তাই, না দাদা?
➖ হ্যাঁ। মূল কথাটা হলো 'অল হ্যালোস ইভ'। সম্ভবত মৃতদের জন্য সবচেয়ে পরিচিত উৎসব। এই পৌত্তলিক অনুষ্ঠানটার সূত্রপাত হয়েছিল কেল্টিকদের আবাসস্থলে। যা পালিত হত ৩১শে অক্টোবর শরৎকালের ফসল ঘরে তোলা এবং শীতের সূচনা উপলক্ষে। ওদিকে, ভ্যাটিকানে, পোপ চতুর্থ বনিফেস সপ্তম শতাব্দীতে রোমান 'ফেরালিয়া'কে (যা ছিল মৃতদের শান্তি প্রদান করার জন্য আয়োজিত আরেকটা পৌত্তলিক উৎসব) প্রতিস্থাপন করার জন্য 'অল সেন্ট ডে' চালু করেছিলেন। যা পালিত হত ২১শে ফেব্রুয়ারি। পোপ চতুর্থ বনিফেস পরে এই উৎসবের তারিখ পরিবর্তন করে ১লা নভেম্বর করেন। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের ধারায় কেল্টিক, পৌত্তলিক এবং খ্রিস্টান উৎসব সব মিলেমিশে একটা বড় উৎসবে পরিণত হয়। যার নাম 'হ্যালোইন'।
তৃতীয় অধ্যায় উপভোগ করেছেন? চতুর্থ অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।