“আবে জমজম” — এই নাম শুনলেই মনে ভাসে পবিত্রতা, অলৌকিকতা এবং ঈমানের অগ্নিপরীক্ষার এক অবিস্মরণীয় গল্প। বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা শহরে, মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে, কাবা শরিফের প্রায় ২০ মিটার দূরে অবস্থিত এই পবিত্র কূপ। আরবি শব্দ “জমজম” উদ্ভূত হয়েছে “জাম্মা” ধাতু থেকে, যার অর্থ “বারবার প্রবাহিত হওয়া” বা “ধ্বনি তুলতে তুলতে প্রবাহিত হওয়া”। আরেক ব্যাখ্যায় বলা হয়, জল উপচে উঠলে “জম জম” বা “থাম থাম” বলে চিৎকার করা হয়েছিল, সেই থেকেই এর নাম হয়েছে “জমজম”। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব এই কূপের সৃষ্টি, ইতিহাস ও অলৌকিকতা।
প্রাচীনকালে, যেখানে আজ মক্কা শহর, সেখানে ছিল এক জনমানবহীন শুষ্ক মরুভূমি। তিন প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মের (ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম) পিতৃপুরুষ ছিলেন ইব্রাহিম বা আব্রাহাম। তিনি কেনান দেশে বাস করতেন। কেনান দেশটি ছিল বর্তমান ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, লেবানন, পশ্চিম সিরিয়া ও জর্ডানের পশ্চিমাংশ নিয়ে গঠিত। দীর্ঘদিন ইব্রাহিম নবী সন্তানহীন ছিলেন। অতঃপর বৃদ্ধ বয়সে দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে তাঁর প্রথম সন্তান ইসমাইল জন্মগ্রহণ করেন। ইসমাইলও পরবর্তীকালে একেশ্বরবাদের নবী হন।
বৃদ্ধ বয়সে লাভ করা এই ছোট্ট সন্তানকে ইবরাহিম অতিশয় ভালোবাসতেন। তিনি তাঁকে চোখের আড়াল হতে দিতেন না। একপলক না দেখলেই তাঁর হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠত। এমনই প্রাণপ্রিয় পুত্রের প্রতি যখন তাঁর ভালোবাসা দিনদিন ক্রমবর্ধমান, ঠিক তেমনি সময়ে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য ওহির (ঐশী নির্দেশ) মাধ্যমে জানালেন — দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে এক নির্জন মরুপ্রান্তরে রেখে আসতে হবে এবং যতক্ষণ না আল্লাহর নির্দেশ হয়, ততক্ষণ তাঁদের ফিরিয়ে আনা যাবে না।
নবী ইবরাহিমের হৃদয়ে যেন তীর এসে লাগল। তিনি ভাবলেন — কীভাবে তা সম্ভব? কিন্তু তিনি মনের দাঁড়িপাল্লায় একদিকে পুত্রস্নেহ, অন্যদিকে মহান আল্লাহর নির্দেশ চাপিয়ে ওজন করলেন। ঈশ্বরপ্রেমী ইবরাহিম ঈশ্বরের নির্দেশকেই প্রাধান্য দিলেন। নিজের অন্তরে পাথর চাপা দিয়ে হাজেরাকে শিশুপুত্রসহ তাঁর সঙ্গে দূরে যাত্রার জন্য তৈরি হতে বললেন। সঙ্গে কিছু জল ও খেজুর নিলেন। তারপর বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা শহরে, কাবা শরিফের নিকটে মরুভূমির জনমানবহীন শুষ্ক প্রান্তরে এসে থামলেন। অতঃপর স্ত্রীকে ঈশ্বরের নির্দেশের কথা সব খুলে বললেন।
তখন আল্লাহর বান্দা ইবরাহিম শোনালেন বিশ্বাসের এক অমোঘ বাণী — “যিনি এই শিশু ও আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা, তিনি যদি চান তাহলে তোমার শিশুকে রাজপ্রাসাদের মখমলের পালঙ্কে রাখলেও তুমি তাকে ধরে রাখতে পারবে না। সুতরাং চিন্তা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের দেখছেন এবং সবকিছু তাঁর নির্দেশেই হচ্ছে।”
নিঃশব্দে বিদায় নিলেন তিনি। শুধু একটি গভীর চুম্বন এঁকে দিলেন নিষ্পাপ কপালে — যে চুম্বনে মিশে ছিল সকল নির্ভরতা ও বিদায়ের নীরব ভাষা। তারপর আর পিছনে না তাকিয়ে — পাছে মায়ার বাঁধন টলে যায় — দৃঢ় পদে তিনি পা বাড়ালেন তাঁর গন্তব্যের দিকে, সোজা কেনানের পথে।
আর এদিকে পড়ে রইলেন জননী হাজেরা ও তাঁর শিশুপুত্র। এক, দুই, তিন দিন যায় — ক্রমে জীবনের শেষ সম্বলটুকুও ফুরিয়ে আসে। খেজুর ও জল নিঃশেষ হয়ে গেল। এই চরম উষ্ণ মরুপ্রান্তরে, যেখানে বাতাসও যেন অঙ্গার, সেখানে তীব্র জলকষ্টে জননীর স্তনে দুধও শুকিয়ে যায়।
মাতার বক্ষ যখন শূন্য, তখন শিশুটিকে গ্রাস করে প্রখর মরুতাপ। সে প্রবল তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। সেই অসহ্য পিপাসার যন্ত্রণা তার কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে। সে শিশুর কান্নায় মরুপ্রান্তর বিদীর্ণ হয়ে ওঠে, যেন পৃথিবীর সকল করুণা একযোগে সেই বালির বুক থেকে সাড়া চাইছে।
পুত্রের কাতরতা আর সহ্য হয় না। মা তাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু করতে বদ্ধপরিকর। একফোঁটা জলের খোঁজে তিনি কোলের মানিককে সাবধানে উত্তপ্ত বালিতে শুইয়ে দিলেন। তারপরই শুরু হলো তাঁর মহাকাব্যিক দৌড়। সামনেই দেখা যায় দুটি রুক্ষ পাহাড় — সাফা ও মারওয়া। মরীচিকার মায়া তাঁকে এক পাহাড় থেকে টেনে নিয়ে যায় অন্য পাহাড়ে, আর সেই অন্য পাহাড় থেকে ফিরে আসে প্রথমটিতে।
তিনি দৌড়াদৌড়ি করেন এক উদভ্রান্তের মতো। তিনি চঞ্চলা মা। তাঁর পদতলে বালি নয়, যেন জ্বলন্ত শিখা। চোখে অশ্রুর ধারা, কণ্ঠে নিরন্তর প্রার্থনা আর মনে সন্তানের জীবনভিক্ষা। একটু জলের আশায়, একটু আশ্বাসের খোঁজে এভাবে কাঁদতে কাঁদতে তিনি এই দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। প্রতি পদক্ষেপে ছিল করুণার আহ্বান।
অবশেষে সপ্তম বারের শেষে চরম ক্লান্তি ও হতাশায় তিনি নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন পুত্রের কাছে। এসে দেখলেন — এ কী অলৌকিক দৃশ্য! তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল যেখানে বালিতে শুয়ে কান্না করছিলেন, যেখানে তার কচি পা দুটি ঘষা খাচ্ছিল, ঠিক সেই স্থানেই — মৃত্যুর প্রান্তরেই — জীবনের উৎস। মাটির নিচ থেকে অলৌকিকভাবে জল উপচে উঠছে! এক স্বচ্ছ, নির্মল, কারুণ্যের ধারা! মরুভূমির কঠিন বুক চিরে বিধাতার অপার আশীর্বাদরূপে জন্ম নিয়েছে সেই পবিত্র ঝর্ণা।
জুরহুম গোত্রের মতো বিভিন্ন যাযাবর দল এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জল দেখে সেখানে বসতি স্থাপনের জন্য হাজেরা (আ.)-এর কাছে অনুমতি চায়। হাজেরা তাঁদের সেখানে থাকতে এবং কূপের জল ব্যবহার করতে অনুমতি দেন। এই উপজাতিদের আগমনের ফলে মক্কা একটি স্থায়ী বসতিতে পরিণত হয়। এই গোত্র ইসমাইলের সংস্পর্শে আসে এবং তাঁর কাছে আরবি ভাষা ও রীতিনীতি শেখে।
আল্লাহর নির্দেশে নবী ইবরাহিম তাঁর পুত্র ইসমাইলের সঙ্গে মিলিত হন এবং দু’জনে মিলে একটি পবিত্র উপাসনাগৃহ নির্মাণ শুরু করেন। এই উপাসনাগৃহটিই হলো আজকের কাবা। ইবরাহিম এবং ইসমাইল এটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং এটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। এই কাবা ছিল আল্লাহর ইবাদতের জন্য পৃথিবীর প্রথম গৃহ।
কাবা নির্মাণের পর ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে এই গৃহে তীর্থযাত্রা (হজ) করার জন্য আহ্বান জানান, যা আজও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম পালন করে থাকেন।
জমজম কূপের জল সরবরাহ একটি বিস্ময়কর ঘটনা। লক্ষ লক্ষ মানুষ বহু শতাব্দী ধরে প্রতিদিন এই জল পান করছেন এবং গ্যালন গ্যালন জল সারা বিশ্বে নিয়ে যাচ্ছেন, তবুও এর জলস্তর বা জলের যোগান সামান্যও কমে না।
ভূতাত্ত্বিক ও গবেষকেরা কূপটি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, জল পুনঃপূরণের হার অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত। এমনকি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প ব্যবহার করে জল বের করে নেওয়ার পরও জলের স্তর দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে। জমজমের জল প্রাকৃতিকভাবেই জীবাণুমুক্ত এবং এতে কোনো ছত্রাক বা শৈবাল জন্মায় না। এটি বহু শতাব্দী ধরে সংরক্ষণ করার পরও এর স্বাদ বা বিশুদ্ধতা হারায় না।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এই জলে ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ অন্যান্য সাধারণ জলের তুলনায় বেশি। এই খনিজগুলো মানবদেহের জন্য উপকারী এবং এই কারণেই অনেকে এটিকে “ক্ষুধা নিবারক” এবং “রোগ নিরাময়কারী” বলে বিশ্বাস করেন।
জমজম কূপ শুধুমাত্র একটি জলের উৎস নয়, এটি ঈমান, ধৈর্য এবং আল্লাহর অসীম রহমতের এক জীবন্ত প্রতীক। মা হাজেরার ত্যাগ এবং আল্লাহর কুদরতের এই নিদর্শন আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস ও ভরসার সঞ্চার করে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।