সময়টা তখন ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে। ভারতবর্ষ তখন মুঘলদের শাসনাধীন, আর সাধারণ মানুষের ভাগ্যের বিধাতা ছিলেন আজিম-ও-শান শাহেনশাহ, মানে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। ইতিহাসের পাতা উল্টে যতটা বোঝা যায়, তিনি ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী শাসক। মনিব-ভিত্তিক দক্ষতার থেকে জনগণ-ভিত্তিক দক্ষতার পরিমাপ তাঁর মধ্যে হয়তো কিছুটা বেশি ছিল। সেই কারণেই তিনি মানবদরদী ও প্রজাহিতৈষী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সমগ্র মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার স্বার্থে।
কথাতেই আছে — “প্রথম ছাপই স্থায়ী ছাপ”। তাই হয়তো কৃষকদের খাজনা আদায় সহজ করার জন্য তিনি হিজরি ও সৌর বছরের সমন্বয়ে এক নতুন সন চালু করেন। সে যুগে এই দিনপঞ্জিকার নাম ছিল “ফসলি সন”, যা পরে বাংলা সনে রূপান্তরিত হয়। সময়ের হাত ধরে ও আমাদের সকলের অতিপরিচিত শব্দ “পরিবর্তন”-এর মাধ্যমে আজ এই দিনটি পয়লা বৈশাখ ওরফে বাংলা নববর্ষ নামে বহুল প্রচলিত। এটি প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ এপ্রিল নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়।
এই দিন পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসেবের খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন। আগে থেকেই আমন্ত্রণপত্র দ্বারা নিমন্ত্রিত গ্রাহকদের মিষ্টি ও শরবত খাওয়ানো হয়। তারই সঙ্গে বিক্রেতা বন্ধুরা ক্রেতা ভাইদের হাতে উপহারস্বরূপ তুলে দেন একটি বাংলা ক্যালেন্ডার। একেই গোদা বাংলায় বলে হালখাতা। বাণিজ্যিক দিক থেকে এই দিনের গুরুত্বও অপরিসীম, কারণ সারা বছরের ক্রেতা বন্ধুদের ঝোলা ভর্তি ঋণের বোঝার অন্ততপক্ষে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পরিশোধিত হয়।
এই দিন বিভিন্ন সংস্থায় আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় রবিদাদুর “এসো হে বৈশাখ” গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। তিনি শুধু বাংলার একজন মনীষী নন, বরং তিনি হলেন আমাদের জাতির গর্ব তথা আমাদের আবেগ। আর সেদিন মহিলারা সাধারণত “লালপাড়-সাদা শাড়ি” এবং পুরুষরা “পাঞ্জাবি-পায়জামা” তাঁরই সম্মানার্থে পরিধান করেন। আলপনা, ফুল ও লোকজ সাজে ঘর সাজানো আর পান্তা-ইলিশের প্রাচুর্য পরিলক্ষিত করা যায়।
এই দিনটিতে পাঞ্জাবে বৈশাখী পালিত হয়, ভাংড়া ও গিদ্ধা নাচের মধ্য দিয়ে নতুন ফসল কাটার উৎসব হিসেবে। এছাড়াও এই দিনটি শিখ ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে খালসা প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে। এতো গেল মানচিত্রের উত্তর দিকের কথা, এবার নিচে অর্থাৎ দক্ষিণে আসা যাক।
কেরালায় এই দিনটি বিষু বা ভিশু নামে পরিচিত। “ভিশু কানি”-র অর্থ হল শুভ দর্শন। ওই দিন দেবতার সামনে ফল, ফুল, সোনা দিয়ে সাজানো হয়। আতশবাজি ও ভোজের বিশেষ আয়োজন সম্পন্ন হয়।
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র তামিলনাড়ুতে এই দিনটি পুথান্ডু নামে পরিচিত। ঘরের সামনে সুন্দর রাঙোলি এবং পারিবারিক পুজো, আর তার সঙ্গে এখানকার আঞ্চলিক খাবার “মাঙ্গাই পচড়ি” — হল এই দিনের বিশেষ দ্রষ্টব্য।
এবার মানচিত্রের মাঝামাঝি অবস্থিত মহারাষ্ট্রের গুড়ি পাড়োয়া হলো মারাঠি ও কোঙ্কনি হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ। এটি মহারাষ্ট্র, গোয়া এবং মধ্যপ্রদেশে মহাসমারোহে উদযাপিত হয়। মারাঠা শাসক ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ এই উৎসবের প্রচলন করেছিলেন, যা বর্তমানে মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“গুড়ি” হলো একটি বিশেষ পতাকা, যা লাঠির মাথায় উল্টানো রূপা, তামা বা পিতলের পাত্র, নিমপাতা এবং ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে জানালা বা বাড়ির বাইরে তোলা হয়। এই দিনে নতুন ফসলের উৎসব হিসেবে নিমপাতা, গুড়, ধনে এবং অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণ খাওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং এটি জীবনের সুখ-দুঃখের মিশ্রণের প্রতীক।
ভৌগোলিক মান্যতা অনুসারে এই দিনটিতে সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, তখন দিন ও রাত্রি সমান হয়, যা বসন্তের শেষ ও গ্রীষ্মের শুরুর প্রতীক। আমাদের পড়শি রাজ্য ওড়িশায় এই দিনে দই, নারকেল, গুড় ও মশলা মেশানো এক বিশেষ পানীয় — যার নাম “পানা” — তৈরি করা হয় এবং সূর্যদেবের বিশেষ পুজো-অর্চনা করা হয়। তাই ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব মহাবিষুব সংক্রান্তি বা পানা সংক্রান্তি নামেও পরিচিত।
পশ্চিমবঙ্গের অন্য এক প্রতিবেশী আসামের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও কৃষিভিত্তিক উৎসব হলো রঙালি বিহু বা বোহাগ বিহু, যা অসমীয়া নববর্ষ এবং বসন্তের আগমন উপলক্ষে সাত দিন ধরে পালিত হয়।
এই উৎসবটি সাতটি পর্যায় নিয়ে গঠিত — চত, রাতি, গোরু, মানুষ, কুটুম, মেলা এবং চেরা। নতুন বস্ত্র পরিধান, পিঠা তৈরি, হুঁচরি (বিহু দল গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে) এবং বিহু নৃত্য ইত্যাদির মাধ্যমে এখানকার অধিবাসীবৃন্দ এই উৎসবকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলেন।
তাই বৈশাখ আমাদের মনে চিরকাল নবজাগরণের বার্তা বয়ে আনে। পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমরা এই দিনে নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করি। উৎসবের আনন্দ, ঐতিহ্যের ছোঁয়া আর ভালোবাসার বন্ধনে এই দিনটি আমাদের জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠে।
তাই পয়লা বৈশাখ আমাদের মনে চিরকাল নতুনের আহ্বান জাগিয়ে তোলে — নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন করে বাঁচার, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।