মণিপুর উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি সুন্দর রাজ্য। রাজ্যটি তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এখানে পালিত হয় নানা উৎসব। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উৎসবগুলির মধ্যে একটি হল “সজিবু নংমাপানবা”, যা “চেইরাওবা” নামেও পরিচিত।
মণিপুরের চেইরাওবা উৎসব ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের সূচনা করে এবং এটি অত্যন্ত উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এই দিনে স্থানীয়রা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়, ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও সাজায়, দেবতাদের উপাসনা করে এবং আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যায়। এছাড়াও, মানব অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে মানুষ একত্রিত হয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে।
চেইরাওবা উৎসব মণিপুরি বা মেইতেই চান্দ্র পঞ্জিকার প্রথম মাস “সজিবু”-র প্রথম দিনে উদযাপিত হয়। পাশ্চাত্য পঞ্জিকা অনুযায়ী, উৎসবটি সাধারণত মার্চের শেষ দিকে বা এপ্রিলের শুরুতে পড়ে। “সজিবু চেইরাওবা” হলো মণিপুরের সানামাহিজম ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ। যদিও একসময় শুধুমাত্র সানামাহিজম ধর্মের অনুসারীরাই এটি উদযাপন করতেন, বর্তমানে সব ধর্মের মানুষই এই উৎসবে অংশ নেন।
“সজিবু নংমাপানবা” নামটি তিনটি মণিপুরি শব্দ থেকে এসেছে — “সজিবু”, যার অর্থ বছরের প্রথম মাস; “নংমা”, যার অর্থ মাসের প্রথম দিন; এবং “পানবা”, যার অর্থ হওয়া। অর্থাৎ, শব্দগুলোর সম্মিলিত অর্থ দাঁড়ায় — মেইতেই চান্দ্রবর্ষের প্রথম দিনের সূচনা।
সানামাহিজম ধর্মের অনুসারীদের মতে, মেইতেই নববর্ষ বা সজিবু নংমাপানবা-র উৎপত্তি ১৩৫৯–১৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা মালিয়া ফাম্বালচা, যিনি “কোই-কোই” নামেও পরিচিত, তাঁর সময় থেকে।
এই কারণে চেইরাওবা উৎসবের দিনে মণিপুরের মানুষ তাঁদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের জন্য ঐতিহ্যবাহী ভোজের আয়োজন করেন। প্রথমে তাঁরা বাড়ির প্রবেশপথে স্থানীয় দেবতাদের উদ্দেশ্যে খাবার নিবেদন করেন, তারপর অতিথিদের পরিবেশন করা হয়।
খাবার উপভোগ করার পর মানুষজন প্রার্থনা করতে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন। তাঁদের বিশ্বাস, পাহাড়ে আরোহণ জীবনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রতীক।
প্রথম নৈবেদ্য নিবেদন অনুষ্ঠান
মেইতেই জনগোষ্ঠী অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে। পরিবারের সকলের মিলন এবং মধ্যাহ্নভোজের জমকালো আয়োজন এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের ভোরবেলা মেইতেই দেবতা “লাইনিংথৌ সানামাহি”-কে ফল, শাকসবজি, চাল এবং অন্যান্য কাঁচা খাদ্যদ্রব্য নিবেদনের মাধ্যমে দিনটি শুরু হয়।
ভোজের প্রস্তুতি
লাইনিংথৌ সানামাহির আশীর্বাদ লাভের পর নৈবেদ্যের উপকরণ ব্যবহার করে বিজোড় সংখ্যক পদ — সাধারণত ৩, ৫, ৭ অথবা ৯টি — প্রস্তুত করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির পুরুষেরা রান্না করেন এবং মহিলারা উপকরণ কাটা ও ধোয়ার কাজে সাহায্য করেন।
দ্বিতীয় নৈবেদ্য নিবেদন অনুষ্ঠান
ভোজের খাবার প্রস্তুত হয়ে গেলে সেগুলি বাড়ির চারপাশে দুটি ভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থানে নিবেদন করা হয় — একটি সামনের দরজায় এবং অন্যটি পিছনের দরজায়। নৈবেদ্যের আগে স্থানগুলো বিশেষভাবে পরিষ্কার ও পবিত্র করা হয়। প্রায় ২×২ ফুট জায়গা পরিষ্কার করে কাদা, ফুল এবং পাতা দিয়ে সাজানো হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্র এই পবিত্র স্থানে তিন দেবতাকে — “কুমসানা কুমলিকলাই”, “লামসেনবা তুসেনবা” এবং “লাম্মাবা তুমাবা”-কে নৈবেদ্য নিবেদন করেন। সাধারণত নৈবেদ্যের মধ্যে থাকে ভাপানো ভাতের একটি ছোট স্তূপকে ঘিরে বিজোড় সংখ্যক খাবার, একটি প্রতীকী মুদ্রা, ফল, ফুল, একটি মোমবাতি এবং ধূপকাঠি — যা কলাপাতার উপর সাজিয়ে রাখা হয়।
ভোজ
এই অনুষ্ঠানের পর ভোজের জন্য প্রস্তুত করা খাবার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিনিময় করা হয়। এই প্রথাটিকে বলা হয় “মাথেল লানবা”। এরপর শুরু হয় ভোজ।
বিশ্বাস করা হয়, নববর্ষের দিনে যা কিছু ঘটে, তা বছরের বাকি সময়েও ঘটতে থাকে। অর্থাৎ, কেউ যদি সেই দিনে সুখী ও সুস্থ থাকে, তবে সারা বছরও সে সুখী ও সুস্থ থাকবে।
চিং কাবা — টিলা আরোহণ
উৎসবের পর ঐতিহ্য অনুসারে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় সম্প্রদায়ের তৈরি একটি ছোট টিলায় আরোহণ করে পাহাড়ের দেবতাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এটি আত্মার ঐশ্বরিক স্তরে উন্নীত হওয়ার প্রতীক।
সিংজামেই-এর “চিন-ঙ্গা” এবং চিংমেইরং-এর “চেইরাও চিং” এই টিলা আরোহণ অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সেদিন টিলার রাস্তার দুপাশে খেলনার দোকান, খাবারের দোকান এবং অন্যান্য ছোট দোকান বসে। অংশগ্রহণকারীরা সেখানে নানা জিনিস কেনাকাটা করেন। চিং কাবা সাধারণত সূর্যাস্তের আগে, বিকেল থেকে সন্ধ্যার প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত হয়।
বিশেষ খাবার
“ইরোম্বা” (Eromba), “ওতি” (Ooti) সহ বিভিন্ন প্রথাগত খাবার তৈরি করে দেবতাদের নিবেদন করা হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
রাতে অনুষ্ঠিত হয় “থাবল চংবা” (Thabal Chongba) — মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য।
লেখিকা পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কর্মসূত্রে বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া ও বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ে ওঠায় লালমাটি, শাল, পলাশ, শিমূল ও মহুয়ার প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়, যার প্রতিফলন তাঁর লেখায়ও দেখা যায়। আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতি নিয়েও তিনি লিখে থাকেন। বিবাহের পর ভারতীয় বায়ুসেনার কর্মসূত্রে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলা ও হিন্দি — দুই ভাষাতেই কবিতা লেখেন। পাশাপাশি তিনি গায়িকা, বাচিকশিল্পী ও নৃত্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “প্রচেষ্টা”।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।