মহর্ষি বেদব্যাসের লেখা ‘মহাভারত’ পড়তে বসলে পাঠকের মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কুরুক্ষেত্রের ১৮ দিনব্যাপী এই ধ্বংসলীলার জন্য দায়ী কে? কোন মূর্তিমান বিধ্বংসীর অভিশাপে তথা হস্তক্ষেপে এই ১৮ দিনব্যাপী যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল? প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ — গান্ধাররাজ সৌবল শকুনি, আর কে? তিনিই তো মূর্তিমান শয়তানের মতো প্রাণপ্রিয় বোন গান্ধারীর রাজসংসারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন, তিনিই তো একের পর এক কুমন্ত্রণা দিয়েছেন প্রিয় ভাগ্নে দুর্যোধনকে! এই বিধ্বংসী যুদ্ধে ভাগ্নেকে প্ররোচিত করেছেন তো তিনিই! জ্ঞাতিবিরোধের সূচনা তো করিয়েছিলেন তিনিই!
না, এই নিয়ে সন্দেহের সত্যিই কোনো অবকাশ নেই। গান্ধাররাজ শকুনি ছোটো থেকে নিজের ভাগ্নের মন বিষাক্ত না করে তুললে হয়তো মহাভারতের যুদ্ধটাই হতো না, হয়তো এই মহাকাব্যের শেষাংশ হতো অন্যরকম! কিন্তু শকুনির একার ঘাড়ে পুরো দোষটা চাপানো অন্যায় হবে। শকুনি নিজের একমাত্র বোনের রাজসংসার নষ্ট করেছিলেন ঠিকই! কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় কি তাঁর হাতে রেখেছিল কুরুবংশ? এই মূর্তিমান ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম তো কুরুবংশই দিয়েছিল, তাই তাঁর প্রতিশোধের বিষাক্ত ফল ভুগতে হয়েছে তাদেরই!
শকুনি ছিলেন সুদূর গান্ধার অর্থাৎ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কাবুল ও সোয়াত নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন ইন্দো-আর্য রাজ্যের রাজা সুবল এবং রানি সুধর্মার ৯৯ জন পুত্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং রাজদম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান গান্ধারীর সব থেকে বড় ভরসার স্থল — বড় দাদা। সুখে-শান্তিতে জীবন কাটছিল এই ছোট্ট সমৃদ্ধ রাজ্যের রাজপরিবারের এবং রাজ্যবাসীদের! কিন্তু সুখ কি আর কারও জীবনে চিরস্থায়ী?
বংশের একমাত্র কন্যাসন্তান, আর তার জন্য কিনা সম্বন্ধ আসছে জন্মান্ধ বরের! যিনি আবার এই অন্ধত্বের জন্য রাজসিংহাসনের অধিকারীও নন, অবহেলায় একপাশে পড়ে থাকা একজন রাজপুত্র মাত্র! রাজা-রানির থেকেও তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শকুনি এই বিয়েতে আপত্তি করেছিলেন সব থেকে বেশি, কিছুতেই নিজের আদরের বোনকে কুরুবংশের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ হতে দিতে চাননি তিনি! কিন্তু মহাবীর ভীষ্মের সামনে সেই জেদ টিকলে তো!
রাজকুমারী গান্ধারী একজন অতি সুন্দরী সুলক্ষণা নারী, তার ওপর তিনি মহাদেবের কাছে আশীর্বাদ পেয়েছিলেন শতপুত্রের জননী হওয়ার। গান্ধারীর এই তিনটি গুণই তাঁকে কুরুপরিবারের কাছে অপরিহার্য করে তুলেছিল, তাঁকে হস্তিনাপুরের রাজবধূ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন পিতামহ ভীষ্ম। তাই গান্ধাররাজ্যে প্রবেশ করেই রীতিমতো দূতের মাধ্যমে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি — গান্ধারীর বিবাহ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে করাতে হবে, নয়তো তাঁর সঙ্গে আসা সুবিশাল সৈন্যবাহিনী এক মুহূর্তেই তছনছ করে দেবে এই সুন্দর জনপদ, বয়ে যাবে রক্তগঙ্গা, রাজ্য হয়ে যাবে শ্মশান!
এই হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিই সেদিন জন্মান্ধ স্বামীকে বরণ করে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না রাজকুমারীর কাছে! নিজের রাজ্য এবং রাজ্যবাসীর স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে রাজি হয়েছিলেন গান্ধারী সহজেই। শুধু একটা ছোট্ট প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি! ছোট্ট!?
বিবাহ করার উদ্দেশ্যে সুদূর গান্ধার থেকে হস্তিনাপুরের রাজসভায় যখন উপস্থিত হলেন রাজকুমারী, তখন দেখা গেল রেশমের কাপড়ের আবরণে নিজের দুই চোখ সযত্নে ঢেকে ফেলেছেন রাজকুমারী, জন্মান্ধ স্বামীর পাশাপাশি স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছেন আপাত-আরোপিত অন্ধত্ব! নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই বিয়েতে রাজি হলেও শ্বশুরগৃহের কোনো মানুষের মুখ দর্শন করলেন না রাজকুমারী, অব্যক্ত প্রতিবাদ আর ঘৃণায় স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন এক চির-অন্ধকারময় জীবন!
বিবাহের পর ভীষ্ম রাজকুমারী গান্ধারীর সমগ্র পরিবারকে ভোজনের জন্য আমন্ত্রণ জানান হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে এবং সেই ভোজসভায় তাঁদের রীতিমতো অপমান করে ন্যূনতম খাবার দিয়ে কারাগারে বন্দি করেন। আকস্মিক এই আক্রমণ প্রতিরোধের উপায় সেদিন ছিল না গান্ধার রাজপরিবারের কাছে। তাই মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিরস্ত্র অবস্থায় এসে হঠাৎই সৈন্যবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে কারাগারের বন্দিত্ব মেনে নিতে বাধ্য হন রাজা সুবল এবং তাঁর শতপুত্র!
অপরাধ কী ছিল তাঁদের? ধৃতরাষ্ট্র এখানে এক অদ্ভুত অভিযোগ আনেন গান্ধার রাজপরিবারের বিরুদ্ধে। তাঁরা নাকি বিশ্বাসঘাতক, ইচ্ছা করে নিজেদের শয়তানি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মেয়ের ইতিহাস লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন হস্তিনাপুরের রাজকুমারের সঙ্গে!
প্রকৃতপক্ষে গান্ধারীর জন্মের পর রাজজ্যোতিষীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে গান্ধারীর প্রথম স্বামী মারা যাবেন, রাজকুমারী হবেন বাল্যবিধবা, আর রাজকুমারী যদি এরপর দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তাহলে তাঁর দ্বিতীয় স্বামীর হবে দীর্ঘ আয়ু! তাই এই বৈধব্যযোগ কাটানোর জন্য ছোটোবেলাতেই একটি ছাগলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজকুমারী গান্ধারীর এবং সেই ছাগলটিকে বলি দেওয়া হয়েছিল বিবাহের পরেই। ফলে রাজকুমারীর বৈধব্যযোগ কাটানো গিয়েছিল সহজেই। তাই ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্বামী!
বিবাহের পূর্বে গান্ধারীর জন্মছকের এই কাহিনি রাজা সুবল হস্তিনাপুরের রাজপরিবারের কাছে গোপন রেখেছিলেন, কিন্তু বিবাহের পরেই গান্ধারীর সঙ্গে আগত দাসীদের মুখ থেকে কোনোভাবে এই কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে এবং গান্ধারীর জন্মান্ধ স্বামীর কানে পৌঁছে যায়! অপমানের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে পিতামহ গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের কাছে ছুটে গিয়ে এই অপমানের প্রতিশোধ প্রার্থনা করেন ধৃতরাষ্ট্র!
কারাগারে বন্দি রাজপরিবারের ১০১ জন সদস্যের জন্য সারাদিনে বরাদ্দ থাকত শুধু একজন মানুষের উপযোগী অন্ন এবং পানীয়! কুরুবংশের এই নিষ্ঠুর আচরণে বিচলিত রাজা সুবল সিদ্ধান্ত নেন যে ভীষ্মের এই আচরণের জন্য ভীষ্ম এবং কুরুপরিবারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে তাঁর পরিবারের একজন সদস্যকে যেকোনো মূল্যে বাঁচতেই হবে। তাই শকুনি, সবচেয়ে ধুরন্ধর এবং চতুর পুত্র, পাশা খেলায় পারঙ্গম — বাঁচতে হবে তাঁকেই! বেঁচে থাকার জন্য অন্য সকলকে খাবার না দিয়ে তাঁকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল ওই সামান্য খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের জন্য।
শকুনির চোখের সামনে দিনের পর দিন একে একে তাঁর সমস্ত ছোটো ভাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অনাহারের জ্বালায়! রাজা সুবল মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে নিজের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে শকুনির পায়ে ছুরিকাঘাত করেন এবং তাঁকে বলে যান, এই পায়ের ব্যথা শকুনিকে সারাজীবন কুরুপরিবারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে! তিনি শকুনিকে তাঁর উরুর হাড় থেকে পাশা বানাতে নির্দেশ দেন, যে পাশার দান ভবিষ্যতে কুরুবংশের ধ্বংস ডেকে আনবে!
গান্ধার রাজপরিবারের ১০০ জন সদস্যের মৃত্যু ঘটে ওই রাজকারাগারের অন্ধকারে! এরপর সম্ভবত ক্ষমাঘেন্না করেই শকুনিকে মুক্তি দেন ভীষ্ম এবং ধৃতরাষ্ট্র! হয়তো তাঁদের মনে হয়েছিল, এই একজন মানুষ আর কী-ই বা করতে পারবে মহান কুরুবংশের বিরুদ্ধে!
কারাগার থেকে মুক্ত হয়েই শকুনি নিজের দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা শুরু করেন, যা অদূর ভবিষ্যতে কুরুবংশকে ধ্বংস করে দেবে!
আশ্চর্যের বিষয়, নিজের জন্মভূমি আর পরিবারের ওপর হওয়া এই অত্যাচারের সময় রাজবধূ গান্ধারীর প্রতিবাদের কাহিনি সেরকমভাবে কোথাও লেখা নেই! তিনি কি হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে নিজের স্বেচ্ছা-আরোপিত অন্ধত্ব নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলেন যে এইসব খবর তাঁর কানে পৌঁছত না!? নাকি নিজের চোখ ঢেকে রেখেই তিনি সমস্ত অপরাধের প্রতিবাদ করা হয়ে গেছে ভেবেছিলেন!? নাকি তখন রাজবধূ ব্যস্ত ছিলেন শতপুত্রের জন্ম দিয়ে রাজসংসারে রাজমাতার স্থান পাকা করার উদ্দেশ্যে?
সে যে কাজেই তিনি ব্যস্ত থাকুন, সমগ্র মহাভারত জুড়ে মূর্তিমান শয়তানের মতো প্রতিশোধের হুতাশন বুকে বয়ে বেড়িয়েছেন কিন্তু একমাত্র গান্ধারীর বড়ো দাদা — শকুনিই! তাঁর বোনকে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ, কিছুই কোনোদিন করতে দেখা যায়নি!
মহারাজ পাণ্ডুর মৃত্যুর পর পঞ্চপাণ্ডবের হাত ধরে রাজমাতা কুন্তী যখন হস্তিনাপুরের দ্বারে এসে দাঁড়ান, ঠিক তখন থেকেই শকুনি বুঝতে পারেন, এইবার তিনি তাঁর প্রতিশোধের মাধ্যম খুঁজে পেয়ে গেছেন। কৌরব এবং পাণ্ডব, দুই পক্ষের এই ভ্রাতৃবিরোধের সূত্রেই কুরুবংশের ঐক্যে ফাটল ধরানো সম্ভবপর হয়েছিল বর্তমান গান্ধাররাজের পক্ষে! প্রকৃতপক্ষে পঞ্চপাণ্ডবের বিরুদ্ধে শকুনির কিন্তু কোনোদিন কোনো বিদ্বেষ ছিল না, শকুনির প্রধান শত্রুতা ছিল ভীষ্ম পিতামহের বিরুদ্ধে তথা সমগ্র কুরুবংশের বিরুদ্ধে!
প্রতিশোধের আগুনে পুড়তে পুড়তে নিজের জন্মভূমি, নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ত্যাগ করে শকুনি বছরের পর বছর থেকে গেছেন হস্তিনাপুরের রাজসভায়। নীরবে সহ্য করেছেন অপমান এবং লাঞ্ছনা আর শুধু করে গেছেন অপেক্ষা! তার ফাঁকে ফাঁকে দুর্যোধন, দুঃশাসন থেকে শুরু করে নিজের ১০০ জন ভাগ্নের মন বিষিয়ে দেওয়ার কাজটা করে গেছেন একদম নিখুঁতভাবে। জঙ্গল থেকে সদ্য আগত পাঁচ জ্ঞাতিভাইয়ের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং অসহযোগিতার বীজ বপন করে গেছেন তিনি তাঁর ভাগ্নেদের মনে সুকৌশলে।
যার ফলশ্রুতি — ভীমকে বিষাক্ত মিষ্টি খাইয়ে হত্যার চেষ্টা, পরবর্তীকালে যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যে অভিষেকের পর বারণাবতে পঞ্চপাণ্ডব এবং তাঁদের মা কুন্তীদেবীকে পাঠিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা!
উপরন্তু ধর্মপ্রাণ পঞ্চপাণ্ডবকে ছোটো থেকে গভীরভাবে লক্ষ্য করে করে তিনি আন্দাজ করেছিলেন, দুই পক্ষে যুদ্ধ বাধলে শেষ অবধি বিনষ্ট হবে অধার্মিক, কুটিল, দুশ্চরিত্র কৌরববংশই! আর শকুনির প্রতিশোধও পূর্ণ হবে!
দুই যুযুধান জ্ঞাতি পরিবারের মধ্যে চরম মনোমালিন্য হোক এবং শেষ অবধি যুদ্ধ বাধুক — এইটুকুই ছিল শকুনির কাম্য। তাঁর ইচ্ছার ইন্ধন হয়ে এই সময় পাণ্ডবপরিবারে আবির্ভাব ঘটে পাণ্ডবঘরনি পাঞ্চালকন্যা দ্রৌপদীর! হস্তিনাপুরের দুর্গম অঞ্চল খাণ্ডবপ্রস্থে নিজেদের নতুন রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণ করিয়ে পঞ্চপাণ্ডব নিজেদের স্ত্রী এবং প্রজাদের নিয়ে সুখের নীড় গড়ে তোলেন। হয়তো ক্রমবর্ধমান জ্ঞাতিবিরোধ চরমে ওঠার আগেই শান্ত হয়ে যেত, হয়তো কুরুবংশে শেষ অবধি ধ্বংসলীলা শুরু হতো না!
কিন্তু ইন্দ্রপ্রস্থের ক্রমবর্ধমান সুনাম, পাণ্ডবদের সাফল্য, ঐশ্বর্য এবং রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের সমগ্র আর্যাবর্তের সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতিলাভকে কেন্দ্র করে পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি দুর্যোধনের তীব্র অসূয়া এরপর বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে। আর এই বিধ্বংসী আগুনে ক্রমাগত ঘৃতাহুতি দিয়ে যান শকুনি!
যজ্ঞের অনতিকাল পরেই হস্তিনাপুরে আয়োজিত পাশা খেলার আসরে, প্রিয় ভাগ্নের ইচ্ছানুসারে নিজের পিতার উরুর অস্থি দিয়ে প্রস্তুত মন্ত্রপূত পাশা ব্যবহার করে শকুনি পঞ্চপাণ্ডবের কাছ থেকে একে একে তাঁদের সাম্রাজ্য, সিংহাসন, সম্পত্তি থেকে শুরু করে পাঁচ ভাই এবং সব শেষে তাঁদের স্ত্রী দ্রৌপদীকে জিতে নেন! আর পাশার দান হিসেবে রাজবধূ দ্রৌপদীকে জিতে নেওয়াটাই ছিল শকুনির প্রতিশোধযজ্ঞের শেষ আহুতি।
দুশ্চরিত্র ভাগ্নেদের হাতে পড়ে রাজবধূ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণরূপী মহা-অপমানকর নাটকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর শকুনি একরকম নিশ্চিন্ত হয়ে যান যে, হ্যাঁ, এতদিনে তাঁর পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। কুরুবংশ ধ্বংস করার যে আয়োজন তিনি এতদিন ধরে তিলতিল করে করে এসেছেন, এই এত বছর পর অবশেষে তা পূর্ণতা পাবে এবার। সুদীর্ঘ ১৩ বছরব্যাপী বনবাস আর অজ্ঞাতবাস সেরে ফিরে এসে পাণ্ডবরা যে আর ভদ্রভাবে চুপ করে বসে থাকবেন না, হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রত্যাঘাত করবেনই, একথা শকুনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই এতদিন পর অবশেষে একটু শান্তি পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন এই মূর্তিমান শয়তান তথা কুরুবংশের কাল!
কুরুক্ষেত্রের ১৮ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষ প্রান্তে এসে যখন পাণ্ডবভ্রাতাদের জয় সুনিশ্চিত হয়ে গেছে এবং কৌরবপক্ষের প্রায় ৯৯ শতাংশ বীরই নিহত, তখন মাদ্রীতনয় সহদেবের হাতে মৃত্যুবরণ করেন গান্ধাররাজ শকুনি। তার আগে অবশ্য এই মহাযুদ্ধে শেষ আহুতি হিসেবে নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র উলুকের প্রাণও বলিদান দিয়ে ফেলেছেন শকুনি। নিজের চোখের সামনে নিজের পুত্রের মৃত্যু দেখেও নিজের প্রতিশোধস্পৃহা থেকে শেষ মুহূর্ত অবধি সরে আসেননি গান্ধাররাজ!
মহাভারত পড়া শেষ করলে মনে এই ধারণাই তৈরি হয় — এই মহাযুদ্ধের পিছনে নিয়ন্ত্রক শক্তি ছিলেন দুই ব্যক্তি — প্রভু শ্রীকৃষ্ণ এবং গান্ধাররাজ শকুনি। রাজনীতির ক্ষেত্রে একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ ছিলেন এই দুই ব্যক্তি! শ্রীকৃষ্ণ চিরদিন ধর্মের পথে থাকা পাণ্ডবদের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থেকেছেন। অপরপক্ষে শকুনি আপাতদৃষ্টিতে কৌরবদের সহায়ক হিসেবে থাকলেও তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কৌরবদের ধ্বংস, যা পরোক্ষভাবে পাণ্ডবদের বিজয়ী হতেই সাহায্য করেছে দিনের শেষে! এই দুই মহারথীর উদ্দেশ্য আদতে পরস্পরবিরোধী নয়, পরস্পরের সমার্থকই ছিল চিরকাল!
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্য সত্যিই অসীম! যুদ্ধ শেষের সঙ্গে সঙ্গে দ্বাপরযুগের অবসান এবং কলিযুগের সূচনা ঘটে। উপরন্তু সমগ্র আর্যাবর্তের অধিকাংশ রাজবংশ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে প্রবীণ নেতাদের হাত থেকে নবীন তরুণ শক্তির হাতে! দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞাতিবিরোধের অবসান হয়ে অবশেষে শান্তি ফিরে আসে মানবজীবনে! আর এই সমস্ত ধ্বংসলীলার তথা পরিবর্তনের অন্যতম কাণ্ডারি কিন্তু এই প্রতিহিংসাপিপাসু গান্ধাররাজ শকুনি!
আর একবার জ্বলে ওঠার পর সেই আগুন শুধু তার চারপাশের মানুষগুলিকে নয়, শকুনিকেও একইভাবে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে! কেড়ে নিয়েছে তাঁর মনের সুখ, শান্তি, প্রেম, ভালোবাসা থেকে শুরু করে সমস্ত সুকুমার প্রবৃত্তিকে!
মনে তাই প্রশ্ন জেগে ওঠে, মহাভারতের মূর্তিমান শনি তাহলে প্রকৃতপক্ষে কে? যিনি আগুন ধরিয়ে দিয়ে বংশের বিনাশকে ত্বরান্বিত করলেন, তিনি? নাকি যিনি সারাজীবন সেই আগুনকে বুকে বয়ে বেড়ালেন আর পরিশেষে নিজেও দগ্ধ হলেন, সেই তিনি?!
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।