মৃত্যুর অমোঘ মিছিল রুখে দিয়ে হাজারো আর্ত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট নারীর জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন যিনি, তিনি বঙ্গজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র অধ্যাপক ডাক্তার সুবোধচন্দ্র মিত্র। তাঁর জীবনকাহিনি কেবল একজন পেশাদার চিকিৎসকের সাফল্যের রূপকথা নয়; তা ছিল জেদ, গভীর মানবপ্রেম, সীমাহীন আত্মত্যাগ ও প্রখর বিজ্ঞানসাধনার এক অনুপম মিলনগাথা। প্রাক্স্বাধীনতা পর্বে বাংলার চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবসেবার যে মহতী ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, সুবোধচন্দ্র মিত্র ছিলেন তারই এক পরম উজ্জ্বল ও সার্থক উত্তরাধিকারী।
১৮৯৬ সালের ১ নভেম্বর যশোর জেলার নড়াইল শহরে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুবোধচন্দ্র। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরে যায় এক গভীর পারিবারিক ট্র্যাজেডির ছায়ায় — যখন তাঁর মাতৃসমা বৌদি প্রসবকালীন মারাত্মক জটিলতায় উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারান।
প্রিয়জনের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও অকালমৃত্যু দেখে কিশোর সুবোধচন্দ্রের মন গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিল। তিনি সংকল্প করেছিলেন যে ভবিষ্যতে ডাক্তার হবেন এবং পরাধীন ভারতে নারীদের স্বাস্থ্যসেবার সেই করুণ চিত্রই পরবর্তীকালে তাঁকে প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগবিদ্যাকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
কঠোর অধ্যবসায়ের পর ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে এম.বি. পাশ করেন সুবোধচন্দ্র। কিন্তু সাধারণ ডাক্তার হয়ে থেকে যাওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। ইউরোপে গিয়ে আধুনিক শল্যচিকিৎসার সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তবে তাঁর পথ মসৃণ ছিল না। বিদেশে পড়তে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাঁর পরিবারে ছিল না।
সেই সুযোগকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে সুবোধচন্দ্র মাত্র দুই বছরের মধ্যে, ১৯২৪ সালে, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অফ মেডিসিন (এম.ডি.) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর এডিনবরা থেকে এফ.আর.সি.এস. এবং পরবর্তীকালে এফ.আর.সি.ও.জি. অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন ও তৎকালীন কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, বর্তমান আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট ও রেসিডেন্ট সার্জন হিসেবে যোগ দেন।
পরের বছর বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে তিনি চিত্তরঞ্জন সেবা সদনে যোগ দেন। সেখানে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি নারীদের জননাঙ্গের ক্যান্সারের চিকিৎসায় মনোনিবেশ করেন। অসহায় রোগীদের যন্ত্রণা তাঁকে উপলব্ধি করিয়েছিল — প্রয়োজন একটি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতালের, যেখানে চিকিৎসার সঙ্গে গবেষণাও চলবে।
তৎকালীন বাংলায় জরায়ুর মুখের ক্যান্সার বা সারভিক্যাল ক্যান্সারে হাজার হাজার নারী প্রতি বছর অকালে প্রাণ হারাতেন। সেই যুগে চিকিৎসকেরা সাধারণত ‘ভার্টাইম পদ্ধতি’ অনুসরণ করে রোগীর পেট কেটে জরায়ু ও আশপাশের টিস্যু অপসারণের জটিল অস্ত্রোপচার করতেন। পাশাপাশি ‘শাউটা পদ্ধতি’তে যোনিপথে জরায়ু অপসারণও করা হতো।
কিন্তু তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সিংহভাগ নারীই চরম অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং রক্তাল্পতায় ভুগতেন। পেটে বিশাল কাটাকুটির এই মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রোপচারের ধকল সেই অত্যন্ত দুর্বল ও পুষ্টিহীন রোগীরা সামলাতে পারতেন না; ফলে অপারেশনের টেবিলেই বা অপারেশন-পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
নারীদের এই নীরব হাহাকার সুবোধচন্দ্রকে স্থির থাকতে দেয়নি। তিনি রাতদিন গবেষণা করে উদ্ভাবন করলেন এক সম্পূর্ণ নতুন শল্যচিকিৎসা পদ্ধতি, যা বিশ্বচিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘মিত্র অপারেশন’ (Mitra Operation) নামে অমর হয়ে রয়েছে।
এই পদ্ধতিতে পেটে বড় কাটার পরিবর্তে যোনিপথে অস্ত্রোপচার করে অতি সূক্ষ্মভাবে ক্যান্সারের উৎস উপড়ে ফেলা হতো এবং পেটের ভেতরে না ঢুকে বাইরের অংশে এক্সট্রাপেরিটোনিয়াল পদ্ধতিতে লিম্ফ নোডগুলো কেটে বাদ দেওয়া হতো। ফলে রক্তক্ষরণ হতো অত্যন্ত কম এবং রোগীদের ওপর অস্ত্রোপচারের ধাক্কাও কম পড়ত। ফলাফল হয়েছিল অবিশ্বাস্য — যেখানে আগে অপারেশনের সময় মৃত্যুর হার ছিল ৩০ শতাংশেরও বেশি, সেখানে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে সুবোধচন্দ্র ও তাঁর সহকর্মীদের করা ২১৬টি ‘মিত্র অপারেশন’-এর ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার একধাক্কায় নেমে এসেছিল মাত্র ৩.৬ শতাংশে।
এই উদ্ভাবনের পেছনে ছিল ধাপে ধাপে পদ্ধতিকে উন্নত করার চেষ্টা। ১৯৪৯ সালে লন্ডনে এবং ১৯৫০ সালে নিউ ইয়র্কে তিনি এই পরিবর্তিত পদ্ধতির কথা উপস্থাপন করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত নিজের গবেষণাপত্রে সুবোধচন্দ্র জানান, প্রথমে তিনি যোনিপথে জরায়ু অপসারণের প্রায় তিন সপ্তাহ পরে আলাদা অস্ত্রোপচারে পেলভিক লিম্ফ নোড বাদ দিতেন। পরবর্তীকালে দুই অংশকে একই অস্ত্রোপচারে সম্পন্ন করার পদ্ধতি গড়ে তোলেন।
এই অলৌকিক সাফল্য বিশ্বের চিকিৎসাজগৎকে চমকে দিয়েছিল।
১৯৫২ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বিখ্যাত ফ্রেডরিক শাউটার ক্লিনিকে সারা বিশ্বের বিশিষ্ট চিকিৎসকদের সামনে সুবোধচন্দ্র নিজে হাতে এই অস্ত্রোপচার করে দেখান। অধ্যাপক শাউটার এতটাই বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় অভিভূত হন যে তিনি নিজের প্রকাশিত বিখ্যাত পাঠ্যপুস্তকে এই পদ্ধতিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিত্র অপারেশন’ নামে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীকালে লন্ডনের বিখ্যাত গাইজ হাসপাতাল এবং নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে তিনি বিশেষ আমন্ত্রণ পান। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আন্তর্জাতিক মনোগ্রাফ ‘Mitra Operation for Cancer of the Cervix’। বইটি যুক্তরাষ্ট্রে Charles C. Thomas, কানাডায় Ryerson Press এবং ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে Blackwell Scientific Publications থেকে প্রকাশিত হয়।
কিন্তু কেবল একজন সফল শল্যচিকিৎসক বা গবেষক হিসেবেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি ডাঃ মিত্র। সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি আজীবন লালন করতেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজের বেতন থেকে মাসে ১০০ টাকা করে সঞ্চয় শুরু করেছিলেন। হাসপাতালের তহবিল গড়তে সচ্ছল রোগীদের বিনা ফি-তে চিকিৎসা করে তাঁদের অনুদান দিতেও উৎসাহিত করতেন।
নিজের সারাজীবনের অর্জিত অর্থ, সমস্ত চিকিৎসা ফি ও সঞ্চয়ের সিংহভাগ তিনি দান করে দিয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্মৃতির উদ্দেশ্যে গঠিত ট্রাস্টে। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগে ১৯৫০ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল’। সুবোধচন্দ্রের বিশেষ আমন্ত্রণে এই হাসপাতালের শুভ উদ্বোধন করতে কলকাতায় এসেছিলেন বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনন্য নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মাদাম কুরীর কন্যা, স্বয়ং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আইরিন জোলিও-কুরী।
চিকিৎসার পাশাপাশি ক্যান্সারের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে মৌলিক গবেষণার প্রয়োজনও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার’। পরবর্তীকালে হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রের সম্মিলিত ধারাতেই গড়ে ওঠে আজকের চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট।
পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ সামলেছেন এবং চিকিৎসাশিক্ষার প্রসারে ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ মেডিসিন’ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁর কাজ কেবল সারভিক্যাল ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারে সীমাবদ্ধ ছিল না; গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা, টক্সিমিয়া এবং ক্যান্সারের মৌলিক গবেষণাতেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। ইংরেজি ও জার্মান ভাষার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলে তিনি লাভ করেছিলেন অগাধ খ্যাতি ও সম্মান।
অধ্যাপক ডাঃ সুবোধচন্দ্র মিত্র কেবল একজন সফল চিকিৎসক নন; তিনি ভারতের চিকিৎসা-ইতিহাসের এক চিরভাস্বর ধ্রুবতারা, যাঁর দূরদৃষ্টি ও মানবসেবার আদর্শ আজও অসংখ্য নারীর জীবন বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার বয়ে নিয়ে চলেছে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।