১
আলকাতরার কালো রঙে লেখা দেওয়ালটার সামনে দাঁড়িয়ে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিল রমেন হালদার। ভাঙাচোরা ইটের দেওয়াল, তার গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা — “ডুবুরি প্রয়োজন? যোগাযোগ করুন — ৯৭৩৩৪৫...”। নম্বরের শেষের অঙ্কগুলো একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। গত বর্ষার বৃষ্টিতে রং ধুয়ে নেমেছিল। রমেন গামছা দিয়ে হাত মুছে একবার লেখাগুলো ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিল। তার বেশি বিজ্ঞাপনের দরকার হয় না। আজও এই অঞ্চলে মানুষের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে তার পরিচয়।
নওদা থানার কেদার চাঁদপুর গ্রামের মানুষ রমেন হালদার। সাত পুরুষের ভিটে সেই গ্রামেই। মাটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রক্তের থেকেও গভীর। পূর্বপুরুষেরা চাষ করেই সংসার টেনেছেন। বাবা নিত্যানন্দ হালদার ছিলেন একসময়ের নামকরা হালকিসান। ভোরের আলো ফোটার আগেই লাঙল কাঁধে মাঠে বেরিয়ে পড়তেন। সেই মানুষটার কাছেই রমেন শিখেছিল — মাটি মানুষকে কখনও ঠকায় না, যদি মানুষ তাকে ভালোবাসতে জানে।
রমেনও চাষবাসই করে। বছরের বেশিরভাগ সময় ধান, পাট, সর্ষে আর শীতকালীন সবজি নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু তার আর-একটি পরিচয় আছে, যা তাকে আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের কাছে আলাদা সম্মান এনে দিয়েছে। সে একজন ডুবুরি। অবশ্য এই কাজ তার নিয়মিত পেশা নয়। কোথাও কোনো পুকুরে, কুয়োতে, ইদারায় কিংবা নদীর জলে মূল্যবান কিছু হারিয়ে গেলে তখনই ডাক পড়ে তার। খবর পেলেই কাজ ফেলে ছুটে যায়।
জলের নিচে নেমে কাজ করার জন্য তার কোনো বিশেষ পোশাক নেই, নেই অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা চোখে লাগানোর কাচ। খালি শরীর, বুকভরা এক নিঃশ্বাস আর অসাধারণ সাহস নিয়েই সে নেমে পড়ে অতল অন্ধকারে। জলের তলায় চোখ খুলে হাতড়ে হাতড়ে হারিয়ে যাওয়া জিনিসের সন্ধান করে। বছরের পর বছর এই অভ্যাসে তার শরীর যেন জলের ভাষা বুঝতে শিখে গেছে।
একসময় কেদার চাঁদপুরে অনেক ইদারা ছিল। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ সেই জলেই রান্না, খাওয়া আর সংসারের কাজ চালাত। অসাবধানতায় কারও বালতি, কারও পিতলের ঘটি, কারও রুপোর বাটি কিংবা সোনার নাকছাবি জলে পড়ে গেলে সবার প্রথম মনে পড়ত রমেনের কথা।
একদিন বিকেলে পাশের গ্রামের হরিপদ দৌড়ে এসে বলেছিল, “রমেন, বাঁচা রে! ইদারায় বউয়ের সোনার কানের দুল পড়ে গেছে।”
রমেন হেসে বলেছিল, “চলেন, দেখি জলটা কী লুকিয়ে রেখেছ্যে।”
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে জলের তলা থেকে দুল তুলে এনেছিল। হরিপদের স্ত্রী আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিতে গেলে রমেন নিতে চাইছিল না। শেষে জোর করেই দিয়েছিলেন। সঙ্গে গরম ভাত, ডাল আর কুমড়োবাটা খাইয়ে তবেই বিদায় করেছিলেন।
এমন ঘটনা এক-দুটি নয়, অসংখ্য। কোথাও বালতি, কোথাও শাঁখা, কোথাও আবার গহনাভরা লোহার বাক্স পর্যন্ত তুলে এনেছে সে। তাই কোনো গ্রামে জলে কিছু পড়ে গেলে মানুষ বলত, “রমেনকে খবর দাও, ও-ই পারবে।”
কেদার চাঁদপুর ছিল একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রাম। কাঁচা রাস্তা বর্ষায় হাঁটুসমান কাদায় ডুবে যেত। বিদ্যুতের খুঁটি তখনও পৌঁছায়নি। সন্ধ্যা নামলেই কুপির আলো কিংবা হ্যারিকেনের ভরসা। গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। পড়াশোনা করতে হলে কয়েক মাইল দূরের গ্রামে যেতে হতো। বেশিরভাগ ছেলেই তাই অল্প বয়সে মাঠে নেমে পড়ত।
গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত মানুষ ছিলেন হামিদ মাস্টার। বহু কষ্টে চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে গোরাবাজারের জমিদারিতে বাড়ি কিনে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে শিক্ষিত মানুষের অভাবে কেদার চাঁদপুর যেন আরও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তবু গ্রামের সৌন্দর্যের কোনো অভাব ছিল না। বর্ষাকালে চারদিক সবুজে ভরে উঠত। ধানের ক্ষেতে বাতাস বয়ে গেলে মনে হতো, সবুজ সমুদ্র দুলছে। ভোরবেলা কুয়াশার চাদরে ঢাকা মাঠের মাঝখান দিয়ে সরু মেঠোপথ চলে গেছে দূর পর্যন্ত। বাঁশঝাড়ে দোয়েলের ডাক, তালগাছের মাথায় শালিকের ভিড়, সন্ধ্যায় গরুর ঘণ্টার শব্দ আর দূরে শঙ্খধ্বনি — সব মিলিয়ে যেন ছবির মতো শান্ত এক গ্রাম।
সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ফিরে রমেন উঠোনে বসে বিড়ি টানছিল। স্ত্রী বিমলা জলভরা কলস নামিয়ে বলল, “শুনছ, আজও তো পাশের গিরাম থেকে তোমার খোঁজে এসেছিল?”
রমেন হেসে বলল, “শুন্যাচি। একটা পিতলের ঘটি নাকি পুখরে পড়ে গেছে। কাল সকাল হুনে যাব।”
বিমলা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি সব কাজেই ছুটে যাও। শরীলটাও তো দেখতে হবে।”
রমেন মৃদু হেসে উত্তর দিল, “মানুষ বিপদে পড়ে বুলেই তো ডাকে। যতদিন বুকের দম আছে, কাহুকে ফিরিয়ে দিতে পারব না।”
বিমলা আর কিছু বলল না। সে জানে, স্বামীর কাছে এই কাজ শুধু রোজগারের নয়, মানুষের বিশ্বাস রক্ষা করারও দায়িত্ব। আর সেই বিশ্বাসই কেদার চাঁদপুরের সাধারণ কৃষক রমেন হালদারকে আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছে এক অনন্য পরিচয় এনে দিয়েছে — সে শুধু একজন চাষি নয়, সে জলের অতল থেকে হারিয়ে যাওয়া আশা ফিরিয়ে আনা এক নিঃশব্দ ডুবুরি।
২
শ্রাবণের শেষ দিক। সকাল থেকেই আকাশে রোদ-ছায়ার লুকোচুরি। রাতের বৃষ্টিতে চারদিক ধুয়েমুছে একেবারে ঝকঝকে। রমেন হালদার তখন নিজের জমিতে ধানের চারা দেখে ফিরেছে। উঠোনে বসে কাস্তের ধার দিচ্ছিল। এমন সময় বাড়ির সামনে একটি মোটরসাইকেল এসে থামল। ধুলোমাখা জামা পরা দুজন লোক তাড়াহুড়ো করে নেমে এল।
“এটাই কি রমেন হালদারের বাড়ি?” একজন জিজ্ঞেস করল।
রমেন এগিয়ে এসে বলল, “হ্যাঁ, বলেন।”
লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমরা আমতলার গাদিগাছা রায়পুর থেকে এসেছি। সরকারবাড়িতে বড় বিপদ হয়েছে। আপনিই একমাত্র এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন। আর কোনো উপায় নেই।”
রমেন শান্ত গলায় বলল, “কী হয়েছে?”
লোকটি এক নিঃশ্বাসে সব খুলে বলল। সরকারবাড়ির বড় বউ প্রতিদিনের মতো দুপুরবেলা পুকুরে গা ধুতে নেমেছিলেন। স্নান শেষে ঘাটে উঠে এসে গলায় হাত দিতেই টের পান, দেড় ভরি সোনার হারটি নেই। কোথায় যে জলের মধ্যে খুলে পড়েছে, তিনি বুঝতেই পারেননি। প্রথমে বাড়ির লোকেরা ভেবেছিল, ঘাটের সিঁড়ির আশপাশেই পড়ে থাকবে। সবাই নেমে অনেক খুঁজেছে। গ্রামের ছেলেরা বারবার ডুব দিয়েছে। বাঁশ দিয়ে খোঁচানো হয়েছে, এমনকি জালও ফেলা হয়েছে। কিন্তু হারের কোনো সন্ধান মেলেনি।
রমেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “চলেন। তবে আগে একটা কথা বুলে রাখি, জলের নিচে কী আছে, সেটা আগে থেকে কেহু বুলতে পারে না। চেষ্টা করব, বাকিটা আপনাদের ভাগ্য।”
বিমলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “খেয়েদেয়্যে যাইও।”
রমেন মাথা নেড়ে বলল, “ফিরে এসে খাব। মানুষ বিপদে আছে।”
প্রায় এক ঘণ্টা পরে তারা পৌঁছাল গাদিগাছা রায়পুরের সরকারবাড়িতে। বিশাল দোতলা বাড়ি। সামনে আম, জাম, কাঁঠাল আর ঘোড়ানিমের গাছ। উঠোনজুড়ে মানুষের ভিড়। সকলের মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। বড় বউয়ের চোখ কান্নায় লাল। তিনি রমেনকে দেখেই এগিয়ে এসে বললেন, “হারটার দাম যত না, তার চেয়ে বড় কথা, এটা আমার শাশুড়িমার আশীর্বাদ। বিয়ের পর নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন। যদি না পাওয়া যায়, সারাজীবন কষ্ট থেকে যাবে।”
রমেন নরম গলায় বলল, “আপনি ভয় পাবেন না। আগে দেখিয়ে দেন, কতি চান করেছিলেন।”
বড় বউ ঘাটে নিয়ে গিয়ে সব দেখালেন। কোথায় দাঁড়িয়ে মাথায় জল দিয়েছিলেন, কোথায় সাবান মেখেছিলেন, সব মন দিয়ে শুনল রমেন। তারপর সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে পুকুরের জল লক্ষ করল। বাতাসের দোলায় ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। পুকুরের তলায় পুরু কাদা, তার ওপর শ্যাওলার আস্তরণ।
গামছা খুলে ঘাটে রেখে স্বল্প পোশাকে রমেন দু-তিনবার গভীর শ্বাস নিল। চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এল। সে জলের কাছে নেমে গেল। তারপর এক লাফে জলের ভেতর ডুব দিল।
এক মিনিট... দুমিনিট...
ওপরে শুধু গোল গোল বুদবুদ ভেসে উঠছে। উপস্থিত লোকজনের বুক ধড়ফড় করছে। কেউ বলল, “এতক্ষণ হয়ে গেল!”
হঠাৎ রমেন ওপরে উঠে এল। মাথা নেড়ে বলল, “না, আরও একবার দেখতে হবে।”
সে আবার ডুব দিল। এবার আরও গভীরে। জলের তলায় হাত দিয়ে ধীরে ধীরে কাদা সরাতে লাগল। হঠাৎ আঙুলে যেন শক্ত কিছু ঠেকল। কাদার ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে টেনে বের করতেই মুঠোর মধ্যে ধরা পড়ল ভারী ধাতুর স্পর্শ। বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠলেও সে শান্তভাবেই ওপরে উঠে এল।
জল ভেঙে ঘাটে উঠে ডান হাতের মুঠো খুলতেই সূর্যের আলোয় ঝলমল করে উঠল দেড় ভরি সোনার হার।
মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে আনন্দধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল।
“পেয়েছে! পেয়েছে!”
বড় বউ ছুটে এসে হারটি দুহাতে তুলে নিয়ে কপালে ঠেকালেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি আবেগে বললেন, “আজ আপনি শুধু একটা হার ফেরাননি, আমার শাশুড়িমার স্মৃতিটাও ফিরিয়ে দিলেন।”
সরকারবাড়ির কর্তা রমেনের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, “আপনার ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।”
রমেন হেসে উত্তর দিল, “ঋণ লয়, ইটা আমার কাজ।”
রমেন প্রথমে নিতে চাইছিল না। “এত টাকা আমার দরকার নাই।”
কর্তা মৃদু হেসে বললেন, “এটা মজুরি নয়, আপনার দক্ষতা আর সততার সম্মান। আপনি না এলে এই হার আর কোনোদিন ফিরে আসত না।”
শেষ পর্যন্ত খামটি গ্রহণ করল রমেন। ফেরার পথে গোধূলির আলোয় পুকুরের জলে নিজের ছায়া দেখে তার মনে হল, মানুষ তাকে ডুবুরি বলে চেনে ঠিকই, কিন্তু আসলে সে শুধু হারানো জিনিস খুঁজে আনে না — মানুষের মুখের হারিয়ে যাওয়া হাসিটাও ফিরিয়ে আনে। সেই তৃপ্তির মূল্য কোনো টাকায় মাপা যায় না।
৩
সময়ের স্রোত কারও জন্য থেমে থাকে না। একদিন যে রমেন হালদার বুকভরা দম নিয়ে একের পর এক পুকুর, নদী আর ইদারার অতলে নেমে হারিয়ে যাওয়া জিনিস তুলে আনতেন, সেই রমেন আজ প্রায় সত্তরের দোরগোড়ায়। চুলে পাক ধরেছে, মুখের চামড়ায় বয়সের ভাঁজ। আগের মতো আর জোরে হাঁটতেও পারেন না। মাঠে গেলেও একটু পরপর বিশ্রাম নিতে হয়। গভীর শ্বাস নিলেই বুকটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
ডুবুরির কাজ তিনি এখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। গ্রামের মানুষ এখনও ডাকতে আসে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ফিরিয়ে দেন।
স্ত্রী বিমলা প্রায়ই বলেন, “সারাজীবন অনেক করেচো। এব্যার লিজের কথা ভাবো।”
ছেলে গোপাল আরও কড়া গলায় বলে, “এখুন আর জলে নামার বয়স নেই বাবা। তুমার বুকের দোম আগের মুতু নাই। যদি কিছু হয়্যে যায়?”
ছেলের বউও যোগ করে, “লাতিটা সারাদিন তুমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। আর কুনু ঝুঁকি লিও না।”
রমেন শুধু মৃদু হেসে চুপ করে থাকেন। তিনি জানেন, তাদের কথাগুলো অকারণ নয়। সত্যিই এখন আর আগের মতো এক নিঃশ্বাসে দীর্ঘক্ষণ জলের নিচে থাকতে পারেন না। মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে ভাবেন, মানুষের শরীর একদিন নিজের নিয়মেই হার মানে। কিন্তু মনটা এখনও মানতে চায় না। জল দেখলেই মনে হয়, অতল থেকে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে।
সেদিনও ছিল এমনই একটি দুপুর। ভ্যাপসা গরম। খাওয়াদাওয়া সেরে রমেন উঠোনের আমগাছের নিচে মাদুর পেতে একটু শুয়েছিলেন। এমন সময় গ্রামের মোড়ল আব্দুল করিম দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “রমেনদা, একবার চলুন। বড় বিপদ!”
রমেন উঠে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
“মহুলার ঘাটে সিনান করতে যেয়ে তেরো বছরের একটা ছেলে তলিয়ে গেছে। ভাগীরথীর সঙ্গে লাগোয়া নয়ানজুলিতে। মাঝিরা জাল ফেলেছে, সবাই খুঁজছে, কিন্তুক কিছুই পাওয়া যেচ্ছে না।”
বিমলার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “তুমি যাবা না। অন্য কাহুকে ডাকুক।”
রমেন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “যদি ছেলেটা আমার লিজের লাতি হতো, তখুনও কি বসে থাকত্যাম?”
বিমলার চোখ ভিজে উঠল। এ কথায় কষ্ট পেলেন। “আমার খুব ভয় করছে।”
রমেন আর কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু পুরনো গামছাটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
মহুলার ঘাটে পৌঁছে তিনি দেখলেন শতাধিক মানুষের ভিড়। কেউ কাঁদছে, কেউ প্রার্থনা করছে। ছেলেটির মা বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন। বাবা নির্বাক হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন। চারদিকে এক চাপা আতঙ্ক।
নয়ানজুলির জল স্থির নয়। ওপর থেকে শান্ত মনে হলেও নিচে ভয়ংকর স্রোত। বর্ষার জল এসে ভাগীরথীর সঙ্গে মিশে এখানে ঘূর্ণি তৈরি করে। স্থানীয় মাঝিরা বহুবার জাল ফেলেছে। কয়েকজন যুবক ডুবও দিয়েছে। কিন্তু দেহের কোনো সন্ধান মেলেনি।
একজন মাঝি এসে বলল, “রমেনদা, আর কাউকে ভরসা করতে পারছি না। আপনি একবার দেখুন।”
রমেন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে যেন নিজের মনেই বললেন, “আজ যদি পারি, একটা মায়ের বুকের আগুন অন্তত একটু কমবে।”
তিনি ধীরে ধীরে জামাকাপড় খুলে শুধু গামছা পরে জলে নামলেন। দু-তিনবার গভীর শ্বাস নিয়ে বুক ভরে নিলেন। তারপর এক নিঃশ্বাসে ডুব দিলেন।
জল নিস্তব্ধ।
মিনিটখানেক পরে তিনি উঠে এলেন। মুখে ক্লান্তি। “লিচে ঘূর্ণি আছে। আরও একবার নামতে হবে।”
দ্বিতীয়বার আরও গভীরে গেলেন। অনেকক্ষণ পরে উঠে এসে শুধু মাথা নাড়লেন। “আরও লিচে চল্যা গেইছে নাকি, দেখতে হবে।”
লোকজন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে। বিমলার কথা বারবার কানে বাজছে, তবু রমেন যেন নিজের সঙ্গে লড়াই করছেন। তিনি জানেন, এটাই হয়তো শেষ চেষ্টা।
তৃতীয়বার তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে জলের অতলে চলে গেলেন। সময় যেন থেমে গেল। এক মিনিট... তিন মিনিট... পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... কেউ আর তাঁকে ভেসে উঠতে দেখল না।
ঘাটে কান্নার রোল উঠল। মাঝিরা তড়িঘড়ি জাল ফেলল। আশপাশের আরও কয়েকজন দক্ষ সাঁতারু জলে নামল। ঘণ্টাখানেক ধরে চলল নিরন্তর অনুসন্ধান।
শেষ বিকেলে, যখন সূর্যের আলো নদীর জলে রক্তিম হয়ে এসেছে, তখন জালের টানে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল দুটি নিথর দেহ। একটি তেরো বছরের সেই কিশোরের। আর অন্যটি রমেন হালদারের।
ঘাটজুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেই মানুষটিই সেদিন নিজের জীবন ফিরিয়ে আনতে পারলেন না।
রমেন হালদারের মৃত্যুর পর কেদার চাঁদপুরে শোকের ছায়া নেমে এল। তাঁর শেষযাত্রায় শুধু নিজের গ্রামের মানুষ নয়, আশপাশের বহু গ্রামের লোক ভিড় করেছিল। কেউ বলেছিল, “তিনি ডুবুরি ছিলেন।” কেউ বলেছিল, “তিনি মানুষ বাঁচানোর কারিগর।” আবার কেউ চোখ মুছে বলেছিল, “এমন মানুষ আর হবে না।”
আজ বহু বছর কেটে গেছে। নতুন প্রজন্মের হাতে মোবাইল এসেছে, আধুনিক উদ্ধারকারী দল এসেছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার এসেছে। কিন্তু কেদার চাঁদপুরের প্রবীণ মানুষেরা এখনও বর্ষার সন্ধ্যায় গল্প করতে বসলে রমেন হালদারের কথা বলেন। তাঁরা বলেন, ডুবুরি হওয়া শুধু জলের নিচে নামার বিদ্যা নয়; মানুষের বিপদের মুহূর্তে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার নামই প্রকৃত ডুবুরি।
আর মহুলার সেই নয়ানজুলির ঘাটে আজও কেউ ফুল ভাসিয়ে দিলে গ্রামের বৃদ্ধেরা নিঃশব্দে বলেন — “জল যাকে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে দিল, সে হারিয়ে যায়নি। মানুষের কৃতজ্ঞতার জলে রমেন হালদার আজও অমর হয়ে আছেন।”
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।