আশ্বিনের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে। গড়িয়াহাট থেকে হাতিবাগান — সর্বত্র মানুষের ঢল, ট্রাফিকের জট আর মাইকে বিজ্ঞাপনের আওয়াজ। পুজোর আর মাত্র চার দিন বাকি। ঢাকের কাঠির হালকা আওয়াজ মাঝেমধ্যেই দূর থেকে বাতাসে ভেসে এসে বুকের ভেতর কেমন একটা দোলা দেয়।
সৌম্য তার বহুতল আবাসনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। বহুজাতিক সংস্থায় মোটা মাইনের চাকরি, শহরে সাজানো ফ্ল্যাট, আর নিজের বলতে স্ত্রী তনিষ্ঠা আর দশ বছরের ছেলে ঋত। আপাতদৃষ্টিতে কোনো কিছুরই অভাব নেই। সোফায় বসে তনিষ্ঠা তখন অনলাইনে অর্ডার দেওয়া নতুন জামাকাপড়ের কোনটা অষ্টমীর অঞ্জলির জন্য, কোনটা নবমীর ডিনারের জন্য — সে হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। ঘরের মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রকমারি শপিং ব্যাগ।
ঋত মেঝেতে বসে তার লেগো ব্লক দিয়ে আস্ত একটা শহর তৈরি করছিল। হঠাৎ সে মুখ তুলে বলল, “বাবা, আমার সেই রিমোট কন্ট্রোল ড্রোনটা কখন আসবে? তুমি তো বলেছিলে পঞ্চমীর আগেই ডেলিভারি হয়ে যাবে!”
সৌম্য হাসল। “এসে যাবে বাবা। আজকের মধ্যেই এসে যাবে।”
বলতে বলতেই কলিং বেলটা বেজে উঠল। তনিষ্ঠা উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখা গেল, বছর চব্বিশের এক তরুণ দাঁড়িয়ে। পরনে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটি টি-শার্ট, পায়ে ধুলোমাখা স্নিকার্স, কাঁধে মস্ত বড় একটা ডেলিভারি ব্যাগ। মুখটা রোদে পুড়ে কালচে হয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
“ম্যাডাম, পার্সেলটা... ওটিপি লাগবে।” ছেলেটির গলা কিছুটা ক্লান্ত।
সৌম্য ছেলেটার দিকে তাকাল। ছেলেটার মুখে একচিলতে ম্লান হাসি। সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই সৌম্য হঠাৎ কী মনে করে ডেকে উঠল, “শুনুন...”
ছেলেটি ঘুরে দাঁড়াল। “বলুন স্যার?”
“খুব দৌড়ঝাঁপ হচ্ছে মনে হয়? পুজোর সময় তো ডেলিভারির খুব চাপ থাকে, তাই না?” সৌম্য সৌজন্যের খাতিরেই জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি ঘাম মুছে একটু হাসল। “হ্যাঁ স্যার। দিনে প্রায় সত্তর-আশিটা পার্সেল দিতে হচ্ছে। সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা। পুজোর সময় ছুটি নেই আমাদের।”
“নাম কী তোমার?”
“শুভঙ্কর।”
“বাড়ি কোথায়?”
“এই তো, উত্তরপাড়ার দিকে। তবে এখন মেসেই থাকি, কাজের সুবিধার জন্য।”
সৌম্য একটা জলের বোতল এনে শুভঙ্করের হাতে দিল। “জলটা খেয়ে নাও।”
শুভঙ্কর কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। ঢকঢক করে প্রায় পুরো বোতলটাই শেষ করে ফেলল। তারপর বোতলটা ফেরত দিয়ে বলল, “ধন্যবাদ স্যার। যাই, এখনও তেইশটা ডেলিভারি বাকি আছে।”
শুভঙ্কর চলে গেল। সৌম্য বারান্দায় ফিরে এল বটে, কিন্তু ছেলেটার মুখের সেই ক্লান্ত অথচ বিনীত হাসিটা তার মনের মধ্যে কেমন যেন আটকে রইল।
পরের দিন চতুর্থী। বিকেলে সৌম্য আর তনিষ্ঠা বেরোল শেষ মুহূর্তের কিছু কেনাকাটার জন্য। শহরের রাস্তায় তখন থিকথিকে ভিড়। রঙিন আলোয় সাজানো হয়েছে বড় বড় গাছগুলো, চারদিকে চোখধাঁধানো আড়ম্বর। গাড়ির জানলা দিয়ে শহরের এই রঙিন রূপ দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা দৃশ্যে সৌম্যের চোখ আটকে গেল।
সিগন্যালে গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল। ফুটপাতের রেলিং ঘেঁষে জনা চারেক পথশিশু বসে আছে। তাদের পরনে মলিন কাপড়, ধুলোমাখা হাত-পা। সামনে ফুটপাতের এক দোকানি নতুন জামা বিক্রি করছে — সস্তা দামের চকচকে সিন্থেটিক জামা। সেই জামাগুলোর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে বছর ছয়েকের একটা ছোট মেয়ে। তার চোখ দুটোতে কী যেন এক অদ্ভুত আকুলতা! পাশে বসে থাকা তার মা, যার নিজের কাপড়ে অজস্র তালি মারা, মেয়েটার হাত ধরে টান দিয়ে বলল, “চল! ওসব আমাদের জন্য নয়।”
পাশে বসে তনিষ্ঠা তখন বলছিল, “জানো সৌম্য, মল্লিকবাড়ির পুজোয় এবার আমরা সপ্তমী আর নবমী দুটো দিনই যাব। ওখানে ভোগটা খুব ভালো হয়। আর ষষ্ঠীর দিন রুফটপ রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করেছি।”
সৌম্য তনিষ্ঠার দিকে তাকাল। তনিষ্ঠার চোখে উৎসবের আলো। কিন্তু সৌম্যের মনের মধ্যে ফুটপাতের সেই মেয়েটার চোখ দুটো বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
বাড়ি ফিরে সে ড্রয়িংরুমের কাচের জানলার ধারে দাঁড়াল। তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকেই একটা ছোট পুরনো দোতলা বাড়ি। সেখানে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক থাকেন। সৌম্য জানে, ভদ্রলোকের নাম অমলবাবু। বছর পাঁচেক আগে ওঁর স্ত্রী মারা গেছেন। একটিই ছেলে, সে কর্মসূত্রে বহু বছর কানাডায়। প্রথম প্রথম পুজোয় দেশে আসত, কিন্তু গত তিন-চার বছর ধরে সে আর আসে না। সৌম্য প্রায়ই দেখে, অমলবাবু একতলার বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকেন।
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তনিষ্ঠা ডিনার টেবিল সাজাতে সাজাতে ডাকল, “সৌম্য, খেতে এসো। কী ভাবছ অত?”
টেবিলে বসে সৌম্য ঠিকমতো খেতে পারছিল না। ঋত তার নতুন ড্রোন নিয়ে মেতে আছে। সৌম্য চামচটা রেখে তনিষ্ঠার দিকে তাকাল।
“তনিষ্ঠা, একটা কথা বলব?”
“কী বলো?”
“আমরা যে প্রতি বছর পুজোয় লাখখানেক টাকা খরচ করি... নতুন জামা, নামীদামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি — এতে আমাদের আনন্দটা ঠিক কতটা স্থায়ী হয় বল তো?”
তনিষ্ঠা একটু অবাক হয়ে তাকাল। “হঠাৎ এ কথা কেন বলছ? পুজো তো বছরে একবারই আসে। মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই চারটে দিনের জন্য। সবাই যেমন আনন্দ করে, আমরাও তেমনই করি।”
“হ্যাঁ তনিষ্ঠা, আমরা করি। কারণ আমাদের করার সামর্থ্য আছে। কিন্তু যাদের নেই? যারা এই চারটে দিন স্রেফ দূর থেকে এই আড়ম্বর দেখে কাটিয়ে দেয়? কিংবা যাদের সব থেকেও কেউ নেই পাশে?”
তনিষ্ঠা একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল, “সৌম্য, পৃথিবীটা তো এমনই। আমরা একা কি সবার দুঃখ দূর করতে পারব? নিজের সাধ্যমতো আমরা তো ডোনেশন দিই।”
“ডোনেশন দেওয়াটা দায় এড়ানোর মতো হয়ে যায়, তনিষ্ঠা। ওতে মানবিক ছোঁয়া থাকে না। পুজো তো শুধু আড়ম্বরের নয়, পুজো তো মিলনের।”
সৌম্য থেমে গেল। সে কোনো তর্কে যেতে চাইল না। কিন্তু তার বুকের ভেতরে একটা তাগিদ তৈরি হচ্ছিল, যা তাকে কিছুতেই শান্ত হতে দিচ্ছিল না।
পঞ্চমীর দিন সকালে সৌম্য নিচে নামল হাঁটতে। সোসাইটির গেটের কাছে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল শুভঙ্করের সঙ্গে। আজ তার পিঠে সেই ডেলিভারি ব্যাগটা নেই, কিন্তু চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তা।
“কী শুভঙ্কর, আজ ডেলিভারি নেই?” সৌম্য গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
শুভঙ্কর একটু চমকে উঠে নমস্কার করল। “না স্যার, আজ আর বেরোতে পারলাম না। আসলে...” ছেলেটা একটু ইতস্তত করল।
“কোনো সমস্যা হয়েছে?”
শুভঙ্কর মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, কাল রাতে বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। বাবার শরীরটা ভালো নেই। হাঁপানির টানটা খুব বেড়েছে। ওষুধ কেনার টাকাটুকুও ঘরে নেই। কোম্পানি থেকে পুজোর বোনাসটা কাল দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অ্যাকাউন্টে কোনো গোলমালের জন্য আটকে গেছে। আমি বাড়ি যাচ্ছি। গিয়ে দেখি, টাকাপয়সার কী ব্যবস্থা করতে পারি। কিছু মাথায় আসছে না...”
ছেলেটার গলা ধরে এল। সৌম্য এক মুহূর্তও ভাবল না। মানিব্যাগ খুলে বেশ কিছু টাকা শুভঙ্করের হাতের তালুতে গুঁজে দিল। শুভঙ্কর হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, “না না স্যার, এ আমি কী করে নিই? আপনি আমাকে ভালো করে চেনেনই না...”
সৌম্য তার কাঁধে হাত রাখল। “চেনার কী আছে ভাই? তোমার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো একই রকম অসহায় লাগত। এটা কোনো দান নয়, তোমার বাবার চিকিৎসার জন্য আমার তরফ থেকে একটু সাহায্য। আমার ফোন নম্বরটা রাখো। কোনো দরকার হলে ফোন করো। পুজোর দিনগুলোতে অন্তত মায়ের কাছে থাকো, বাবার পাশে থাকো।”
শুভঙ্কর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে তখন জলের ধারা নামছে। সে নিচু হয়ে সৌম্যের পা ছুঁতে গেল। সৌম্য পিছিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। “আরে আরে, কী করছ! শুভ পুজো, শুভঙ্কর। ভালো থেকো।”
শুভঙ্কর যখন চোখ মুছতে মুছতে পা বাড়াল, সৌম্য খেয়াল করল, তার নিজের বুকের ভেতরের ভারটা যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত অনাবিল প্রশান্তি তাকে ছুঁয়ে গেল। এই আনন্দ জামা কেনার আনন্দের চেয়ে, কোনো নামী রেস্তোরাঁয় বিল মেটানোর আনন্দের চেয়ে বহুগুণ বেশি খাঁটি।
বাড়ি ফিরে সৌম্য তনিষ্ঠাকে সবটা বলল।
তনিষ্ঠা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর সে ঋতের দিকে তাকাল, যে তার দামি ড্রোন নিয়ে খেলছে। তনিষ্ঠা সৌম্যের হাতটা ধরল। “সৌম্য, তুমি ঠিক বলেছ। উৎসবের মানে তো সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা। আমরা কি খুব স্বার্থপরের মতো বাঁচছি?”
সৌম্য মুচকি হাসল। “স্বার্থপর নয়, হয়তো আমরা অভ্যাসের বশে ভুলে যাই যে আমাদের চেনা গণ্ডির বাইরেও একটা মস্ত বড় পৃথিবী আছে।”
“তাহলে এবার পুজোটা অন্যরকম হোক?” তনিষ্ঠার চোখে এক নতুন আলো চিকচিক করে উঠল।
“কেমন অন্যরকম, তনিষ্ঠা?”
ষষ্ঠীর সকাল।
সৌম্য আর তনিষ্ঠা ঋতকে নিয়ে নিচে নামল। গাড়ির ডিকিতে রাখা হয়েছে বেশ কিছু নতুন জামাকাপড়, ছোটদের খেলনা আর মিষ্টির প্যাকেট।
প্রথম গন্তব্য উল্টোদিকের সেই পুরনো দোতলা বাড়িটা।
কলিং বেলের আওয়াজে অমলবাবু দরজা খুললেন। সৌম্যদের দেখে তিনি অবাক। “আরে সৌম্যবাবু! আপনারা? কোনো দরকার ছিল?”
“দরকার ছাড়া কি পুজোয় প্রতিবেশীর বাড়ি আসা যায় না, জেঠু?” তনিষ্ঠা হেসে বলল।
অমলবাবু যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। “আসুন, ভেতরে আসুন।”
ঘরে ঢুকে সৌম্যরা দেখল, ড্রয়িংরুমটা অসম্ভব নিস্তব্ধ। একটা টিমটিমে হলুদ আলো জ্বলছে। টেবিলে রাখা এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা। সৌম্য একটা নতুন ধুতি-পাঞ্জাবির প্যাকেট আর মিষ্টি অমলবাবুর হাতে তুলে দিল। ঋত গিয়ে অমলবাবুর হাত ধরে বলল, “দাদু, শুভ ষষ্ঠী!”
তনিষ্ঠা বলল, “আজ আর আপনাকে রান্না করতে হবে না। দুপুরে আর রাতে আমাদের ওখানেই আপনার নিমন্ত্রণ। আর শুনুন, অষ্টমীর দিন সকালে অঞ্জলি দিতে আমরা আপনাকে নিয়েই প্যান্ডেলে যাব। কোনো না শুনছি না কিন্তু!”
বৃদ্ধ মানুষটার ঠোঁট কাঁপছিল। তিনি হাত দুটো বাড়িয়ে ঋতকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর বুকের ভেতরের বহু বছরের জমে থাকা একাকিত্বটা যেন এক লহমায় গলে জল হয়ে গেল। তিনি বাষ্পরুদ্ধ গলায় বললেন, “অনেক বছর পর... সত্যি অনেক বছর পর মনে হচ্ছে পুজো এসেছে। মা দুগ্গা তোমাদের ভালো করুক, মা।”
অমলবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সৌম্যরা গাড়ি নিয়ে সোজা চলে গেল শহরের উপকণ্ঠের এক অনাথ আশ্রমে।
আশ্রমের ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, গোটা তিরিশেক বাচ্চা উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারও কারও গায়ে নতুন জামা উঠেছে, কিন্তু অনেকেরই কপালে জোটেনি। ঋত প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল। কিন্তু যখন সে দেখল, তার বয়সি কতগুলো বাচ্চা ছেঁড়া ফুটবল নিয়ে কেমন আনন্দে মেতে আছে, সে নিজেই গাড়ির ডিকি থেকে তার নতুন ড্রোনটা নিয়ে নেমে গেল।
“এই দেখো! এটা আকাশে ওড়ে!” ঋত ড্রোনটা ওড়াতে শুরু করতেই একঝাঁক শিশুর উল্লাসে আশ্রমের উঠোন গমগম করে উঠল।
তনিষ্ঠা আর সৌম্য একে একে সব বাচ্চার হাতে তুলে দিল নতুন জামা আর মিষ্টির বাক্স। যে মেয়েটির গায়ে কোনোদিন ভালো কাপড় ওঠেনি, সে যখন নতুন ফ্রকটা বুকে জড়িয়ে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাজুক হাসল, তনিষ্ঠার চোখে জল চলে এল।
ঋত তখন বাচ্চাদের মাঝে মাটিতে বসে তাদের সঙ্গে ড্রোনের রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। তার মুখে যে নিখাদ আনন্দের হাসি সৌম্য দেখল, সেই হাসি কোনো দামি মলে বা শহরের বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় সে কোনোদিন দেখেনি। ঋত কোনোদিন এভাবে অচেনা বাচ্চাদের আপন করে নিতে পারত না, যদি না আজ এখানে আসত।
আশ্রম থেকে বেরোতে বেরোতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
গাড়িতে উঠে ঋত হঠাৎ বলল, “বাবা, ড্রোনটা না আমি আশ্রমের ছোট রাজুকে দিয়ে দিয়েছি। ও খুব ভালোবাসছিল ড্রোনটা দেখতে।”
সৌম্য চমকে ছেলের দিকে তাকাল। “দিয়ে দিয়েছিস? তুই তো কতদিন ধরে ওটার জন্য অপেক্ষা করছিলি!”
ঋত খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “তাতে কী হয়েছে বাবা? আমার তো আরও কত খেলনা আছে ঘরে। কিন্তু রাজুর তো কিচ্ছু নেই। ও খেললে আমার বেশি আনন্দ হবে।”
সৌম্য তনিষ্ঠার দিকে তাকাল। তনিষ্ঠার চোখে তখন গর্ব আর ভালোবাসার জল। সৌম্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
অষ্টমীর সকালে অমলবাবুকে নিয়ে মণ্ডপে যাওয়া, অঞ্জলির পর পাড়ার সেই মানুষগুলোকে মিষ্টিমুখ করানো, যাদের খবর কেউ রাখে না — পুজোটা যেন অন্য এক সুর ধরে এগোতে লাগল। কোনো ভিড়ের ক্লান্তি নেই, কোনো কৃত্রিম আড়ম্বর নেই। যা আছে, তা হলো বুকের গভীরে এক অপার শান্তি।
দশমীর দিন বিকেলে সৌম্যদের আবাসনের মণ্ডপে তখন সিঁদুর খেলা চলছে, বিসর্জনের বাদ্যি বাজছে। ‘আসছে বছর আবার হবে’ রবে বাতাস ভারী। অমলবাবু দাঁড়িয়ে আছেন সৌম্যদের পাশেই, তাঁর মুখে এক শান্ত, তৃপ্ত হাসি।
এমন সময় সৌম্যের ফোনে একটা মেসেজ এল। মেসেজটা শুভঙ্করের। সে লিখেছে, “স্যার, বাবার চিকিৎসা শুরু হয়েছে। বাবা এখন অনেকটাই ভালো আছেন। মা আপনার জন্য মা দুর্গার কাছে অনেক প্রার্থনা করেছে। এই পুজোয় আমি যদি বাড়ি ফিরতে না পারতাম, হয়তো বাবাকে বাঁচানোই যেত না। আপনি শুধু টাকা দেননি স্যার, আমাদের পুরো পরিবারটাকে পুজোর আলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। শুভ বিজয়া স্যার। প্রণাম নেবেন।”
সৌম্য আকাশের দিকে তাকাল। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলোয় ভেসে যাচ্ছে দশমীর আকাশ। প্রতিমাকে তখন বরণের শেষে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। ঢাকের কাঠিতে বিসর্জনের বিষাদ।
যে সংসারে আলো আছে, সেই আলোটুকু যদি পাশের অন্ধকার ঘরের উঠোনে সামান্যও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবেই তো উৎসব সার্থক। মায়ের আশীর্বাদ কোনো নির্দিষ্ট মণ্ডপে নয়, ঝরে পড়ুক সেইসব খোলা হৃদয়ে — যেখানে অন্যের চোখের জল মোছানোর ইচ্ছেটুকু বেঁচে থাকে।
সৌম্য তনিষ্ঠা আর ঋতের হাত শক্ত করে ধরল। সিঁদুরের লাল আর ঢাকের বোলের মাঝে শহরটা যেন এক নতুন আলোয় ভরে উঠল। এ আলো আড়ম্বরের নয়, এ আলো প্রাণের, এ আলো মিলনের।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।