আমাদের পাড়ার বটতলাটা ঠিক গয়ার অক্ষয়বট নয়, তবে এর মর্ত্য-মহিমায় কোনো অংশে কমও নয়। এই বটগাছের বয়স কত, তা নিয়ে পাড়ার প্রবীণতম সদস্য হারু জেঠু আর নকুড় দাদুর মধ্যে যে বিবাদ আছে, তা মেটাতে গেলে স্বয়ং কার্বন–ডেটিং হাঁপিয়ে উঠবে। তবে সেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে একজন মানুষ সেখানে অবিনশ্বর হয়ে বসে থাকেন — তিনি বেনু দা। পুরো নাম বেনুগোপাল চট্টরাজ। কিন্তু পাড়ায় তিনি কেবলই "বটতলার বেনু দা"।
বেনু দার পেশা কী, তা নিয়ে সিবিআই তদন্ত হতে পারে। তিনি কখনো বিমার দালালি করেন, কখনো পুরনো খবরের কাগজ কেনাবেচার সিন্ডিকেট চালান, আবার কখনো শোনা যায় তিনি নাকি কোনো এক নিগূঢ় তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছেন। তবে তাঁর আসল পরিচয় হলো — তিনি এই তল্লাটের প্রধান "তথ্য কমিশনার"। বটতলার ভাঙা সিমেন্টের বেদিতে পা তুলে বসে তিনি যে পরিমাণ ভুবনজোড়া জ্ঞান বিলি করেন, তাতে গুগল ম্যাপ থেকে শুরু করে উইকিপিডিয়া — সবই ফ্যাকাশে মনে হয়।
সেদিন বিকেলে আমি একটু মনমরা হয়ে বটতলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। অফিসে বসের নিত্যনৈমিত্তিক তর্জন-গর্জন আর পকেটে মাসের শেষে শূন্যতার হাহাকার — সব মিলিয়ে মেজাজটা ঠিক "আনন্দবাজার"-এর সম্পাদকীয়র মতো গুমোট হয়ে ছিল।
বেনু দা আমায় দেখেই ডাক পাড়লেন, "এই যে বিষ্ণু! মুখখানা ওরকম পোড়া বেগুনের মতো করে কোথায় যাচ্ছিস রে? আয়, একটু জ্ঞানের সলতেটা উসকে দিয়ে যা।"
আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেনু দার পাশে গিয়ে বসলাম। বেনু দা একটা আস্ত খৈনি মুখে পুরে দিয়ে বললেন, "বুঝলি বিষ্ণু, জীবনটা হলো একটা ইলাস্টিক। যত টানবি তত বাড়বে, আর এক চিলতে বেশি টানলেই পটাস!"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "আমার ইলাস্টিকটা বোধহয় পচে গেছে বেনু দা, টানের আগেই ছিঁড়ে যাচ্ছে।"
বেনু দা হাসলেন। সে হাসি দেখলে মনে হয় মোনালিসার হাসিটাও স্রেফ দাঁতের ব্যথার ছটফটানি। তিনি বললেন, "তোর সমস্যাটা কী জানিস? তুই ঘাস দেখতে পাচ্ছিস, কিন্তু ঘাসের তলায় যে মাটির সোঁদা গন্ধ আছে, সেটা শুঁকতে ভুলে গেছিস। তোর বস তোকে বকেছে? বকবে তো! তাকে তো মাইনে দেওয়া হয় তোর রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য। তুই এক কাজ কর, কাল গিয়ে বসকে বলবি — ‘স্যার, আপনার মাথার তালুটা তো ঠিক যেন মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধ, উজ্জ্বল কিন্তু জনমানবহীন!’"
আমি আঁতকে উঠলাম, "বলেন কী বেনু দা! চাকরিটা যাবে যে!"
"যাবে না রে পাগল, যাবে না। আত্মবিশ্বাস চাই। এই যে আমি, দেখছিস তো বটতলায় বসে রাজত্ব করছি। তোরা ভাবিস আমি বেকার। অথচ আমার এই মাথার ভেতরে কত ‘ডিলিট’ করা ফাইলের তথ্য আছে তা কি জানিস? গত পরশু আমায় দিল্লির এক নামী নেতা ফোন করেছিলেন। বললেন — ‘বেনু, নির্বাচন বৈতরণী পার হবো কী করে?’
বেনু দার এই "গুল"গুলো হলো আমাদের পাড়ার অক্সিজেন। তিনি যখন বলেন, তখন চারপাশের বাতাসটাও যেন থমকে যায়। কিন্তু সেদিন একটা কাণ্ড ঘটলো। পাড়ার নতুন প্রোমোটার হাবুল ভটচাজ ল্যান্ডরোভারে করে বটতলায় এসে নামলেন। হাবুল ইদানীং খুব ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। গায়ে একটা সাহেবি জ্যাকেট, চোখে মূল্যবান চশমা। সে এসেই বেনু দাকে তাচ্ছিল্য করে বলল, "বেনু দা, এই বটগাছটা কাটা পড়বে। এখানে একটা বারো তলা শপিং মল হবে। আপনি বরং আপনার এই আস্তানাটা একটু সরিয়ে নিন।"
পুরো বটতলা নিস্তব্ধ। আমরা যারা আড্ডা দিচ্ছিলাম, সবার বুক কেঁপে উঠল। এই বটগাছটা নেই মানে পাড়ার আত্মাটা নেই। বেনু দা কিন্তু অবিচল। তিনি খৈনিটা এক পাশে সরিয়ে দিয়ে ধীর স্বরে বললেন, "হাবুল, গাছ কাটা খুব সোজা। কিন্তু ওই গাছের শেকড় যেখানে পাতাল পর্যন্ত গেছে, সেখান থেকে জল আনতে গেলে কিন্তু তোকে ড্রিল মেশিন দিয়ে নিজেকেই ফুটো করতে হবে। মন খারাপের মিস্ত্রি দিয়ে ঘর বানানো যায় না রে পাগলা।"
হাবুল অবজ্ঞার হাসি হেসে চলে গেল। কিন্তু আসল খেলা শুরু হলো পরের দিন থেকে। পাড়ায় চাউর হয়ে গেল — বেনু দা নাকি বটের তলায় ধ্যান করে জেনেছেন, এই গাছের নিচে এক প্রাচীন ধনভাণ্ডার আছে, যা এক অভিশপ্ত যক্ষ পাহারা দিচ্ছে। যে গাছ কাটবে, তার বংশে বাতি দেওয়ার কেউ থাকবে না।
রম্যরচনার মজাই হলো এখানে। ঘটনাটা যে কতদূর অবান্তর হতে পারে, তার কোনো সীমা নেই। তিন দিনের মাথায় দেখা গেল, হাবুল প্রোমোটারের লিভারে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ডাক্তাররা কিছু ধরতে পারছে না। হাবুল শেষ পর্যন্ত সাদা ধুতি পরে, কপালে তিলক কেটে বটতলায় বেনু দার পায়ে এসে পড়ল।
"বেনু দা, বাঁচান! আমি মল বানাবো না, আমি বরং এখানে একটা ফোয়ারা করে দেব। আমার লিভারটা ঠিক করে দিন।"
বেনু দা গম্ভীর হয়ে বললেন, "লিভারের সমস্যা তো তোর মনে রে হাবুল। গাছ কাটবি না বলছিস? ঠিক আছে, যা কাল থেকে তিন বেলা বটতলার মাটিতে গড়াগড়ি খাবি আর এই গাছের পাতায় একটু করে গঙ্গার জল ছিটাবি। তোর পিত্তথলির যক্ষ শান্ত হবে।"
আশ্চর্যের বিষয়, সপ্তাহখানেক পর হাবুল সুস্থ হয়ে গেল। বটতলা রক্ষা পেল। আমরা যখন বেনু দাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বেনু দা, সত্যি কি যক্ষ ছিল?"
বেনু দা খিকখিক করে হেসে বললেন, "আরে না রে পাগলা! ওটা হলো সাইকোলজিক্যাল ট্যাকটিকস। হাবুল রোজ রাতে বিরিয়ানি আর উল্টোপাল্টা পানীয় খেত, তাই লিভার ফুটে গিয়েছিল। আমি ওকে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে বললাম মানে — ওর শারীরিক পরিশ্রম বাড়ল, আর গঙ্গার জলের বাহানায় গাছটাকেও সেবা করা হলো। প্রকৃতির সেবা করলে শরীর তো ভালো হবেই! রবীন্দ্রনাথ কি সাধে লিখেছিলেন — ‘ফিরে চল মাটির টানে’?"
এই হলো আমাদের বেনু দা। তাঁর কাছে বিজ্ঞানের থেকে বড় হলো কাণ্ডজ্ঞান, আর যুক্তির থেকে বড় হলো কল্পনা।
বেনু দা মাঝে মাঝে মাঝরাতে একা বটতলায় বসে কবিতা লেখেন। তাঁর একটা কবিতা আমার ডায়েরিতে লেখা আছে —
জীবন মানেই বটতলার আড্ডা,
হার মানা সব মানুষের জয়গান,
পিচঢালা পথে যে শ্যাওলা জমে,
সেখানেই লুকিয়ে থাকে অভিমান।
বেনু দার কোনো সংসার নেই। একটা জীর্ণ ঘরে থাকেন, যেখানে বইয়ের স্তূপ আর পুরনো খবরের কাগজই তাঁর শয্যাসঙ্গী। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বিয়ে-থা করলেন না কেন?"
বেনু দা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, "একজনকে ভালোবেসেছিলাম রে বিষ্ণু। সে বলেছিল — ‘বেনু, তোমার এই বটতলার মন নিয়ে আমার ফ্ল্যাটবাড়িতে জায়গা হবে না।’ তাই সে চলে গেল উচ্চবিত্তের এসিতে, আর আমি রয়ে গেলাম এই মুক্ত বাতাসের বটতলায়। আসলে কী জানিস? কিছু মানুষের জন্মই হয় অন্যদের ছায়া দেওয়ার জন্য, নিজের ঘর বাঁধার জন্য নয়।"
কথাটা শুনে সেদিন কেন জানি না আমার চোখটা একটু ভিজে গিয়েছিল। আমরা তথাকথিত সফল মানুষরা কত কী পেয়েছি — গাড়ি, বাড়ি, প্রমোশন। কিন্তু বেনু দার মতো এমন অজাতশত্রু শান্ত মন কি পেয়েছি? বেনু দা এই সমাজের সেই অপ্রয়োজনীয় "অ্যাপেন্ডিক্স", যা না থাকলেও চলে, কিন্তু থাকলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে।
সেদিন রাতে ফিরবার পথে দেখলাম বেনু দা একাই বসে আছেন। ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু মাথার ওপর বটের পাতার খসখস শব্দ। আমি বললাম, "বাড়ি যাবেন না বেনু দা?"
আমি হাঁটতে শুরু করলাম। পিছু ফিরে দেখলাম, বটতলার অন্ধকারে বেনু দা যেন সেই প্রাচীন বটগাছেরই একটা অংশ হয়ে গেছেন। যে ডালপালাগুলো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, অথচ যার শেকড় এই মাটির মায়ার গভীরে প্রোথিত।
পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো শ্রেষ্ঠ পত্রিকার রবিবাসরীয় পাতায় বেনু দারা আজ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। আমাদের চারপাশের কংক্রিটের জঙ্গলে এমন "রম্য" চরিত্ররা হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও কোনো এক নিঝুম দুপুরে বটতলার ধার দিয়ে গেলে আজও কানে ভাসে — "এই যে বিষ্ণু, আয়! এক ছিলিম জ্ঞান নিয়ে যা..."
বেনু দারা হেরে যাননি। তাঁরা কেবল আমাদের মতো তথাকথিত সভ্য মানুষদের ভিড়ে একটু আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন। বটতলার সেই ছায়া আর বেনু দার সেই মিথ্যে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর সত্যটাই হলো আসল সাহিত্য। এই বাংলার প্রতিটি পাড়ায় যেন একটা করে বটতলা থাকে, আর সেই তলায় যেন চিরকাল বিরাজ করেন একজন করে বেনু দা। আসলে আধুনিকতা আমাদের জুতো পরতে শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাটির স্পর্শ থেকে আমাদের চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে।
লেখক ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে দমদম রবীন্দ্রনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মাবধি সপরিবারে পৈতৃক বসত বাড়িতেই বসবাস করেন। পিতা স্বর্গীয় সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী এবং মাতা স্বর্গীয় বীনাপানি চক্রবর্ত্তী। বর্তমানে তাঁর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী শিবানী চক্রবর্ত্তী, কন্যা পূবালী (বিবাহিত) এবং পুত্র নবীন কুমার। 'নবু' নামে পরিচিত এই লেখক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।