প্রথম নয়টি অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
দশম অধ্যায়
➖ কি রে 'ক্রস করেসপনডেন্স' ব্যাপারে কিছু জানিস?
➖ হ্যাঁ। ভূত এবং ভূতুড়ে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামালে এ শব্দ তো চোখ পড়বেই। ১৮০০ সালের পরের সময়টাতে, অনেকে বিশ্বাস করতেন যে, 'স্পিরিচুয়ালিজম' আত্মা এবং মৃত্যুর পরে জীবনের প্রমাণ প্রদান করে। বিশেষ করে ওই 'ক্রস করেসপনডেন্স' ব্যাপারটা সেটাই প্রমাণ করে বলে মানুষের ধারণা।
➖ আরে আগে এই 'ক্রস করেসপনডেন্স' ব্যাপারটা কী সেটা তো বল।
➖ ঠিক, সোজা কথায় ভূতের লেখা। না মানে ভূত নিজে কিছু লিখবে না, ভুতের হয়ে কোনও 'মিডিয়াম' লিখবেন। আত্মাদের জগৎ থেকে নামীদামী মানুষদের ডেকে এনে তাদের দিয়ে লেখার জন্ম দেওয়ার ঘটনা আশা করছি সুধী পাঠক পাঠিকারা অনেকেই শুনেছেন বা পড়েছেন। ওই সব অশরীরীই সত্ত্বারা একটানা লিখতে পারতেন না। যা পাওয়া যেত সব টুকরো টুকরো ভাবে। তারপর সব একসাথে জুড়ে কিছু একটা মানে খাড়া করা হত।
➖ শেষ বাক্যের ইঙ্গিতটা কিন্তু ভাল ঠেকল না ব্রাদার।
➖ কিছু করার নেই দাদা। যেটা ঘটে সেটাই বললাম।
➖ ওকে। তা এই ‘ক্রস করেসপনডেন্স’ সবই কি এক ধরনের হয়?
➖ সব জেনেশুনেও আমাকে এসব প্রশ্ন করছ তাই না? ঠিক আছে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি যতটা পারছি। 'ক্রস করেসপনডেন্স' তিন ধরনের দেখা যায়।
সিম্পল — দুই বা ততোধিক 'মিডিয়াম' আলাদা আলদাভাবে 'প্রায়' একই ধরণের শব্দ বা বাক্য লেখেন। যার দ্বারা প্রমাণিত হয় এদের সবার ভিতর একই মানুষের আত্মার আগমন হয়েছিল।
কমপ্লেক্স — পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত 'মিডিয়াম'রা এখানে যে শব্দ বা বাক্যাংশ অনুভব করেন বা লেখেন সেগুলো এক্ষেত্রে একই ধরনের নাও হতে পারে।
আইডিয়াল — 'মিডিয়াম'রা এমন সব বাক্যাংশ বা শব্দ প্রাপ্ত হন যাদের ভিতর মিল জোর করে খোঁজার দরকারই পড়ে না। শুধু 'জিগ-স পাজল' এর টুকরোর মতো ওগুলোকে সাজিয়ে নিতে হয়, একটা সম্পূর্ণ বাক্য বা বার্তা নির্মাণ করার জন্য।
➖ আর এভাবেই এই পদ্ধতিতে বিশ্বাসীরা বলেন এই পদ্ধতি বা ওই সব লেখা মৃত্যুর পরে 'আত্মা'র বেঁচে থাকার প্রমাণ তাই তো?
➖ একদম। কিন্তু মাজ হলো, এখনও অবধি সেই অর্থে জোরালো কিছুই কেউ পেশ করতে পারেননি। দেখো যুক্তি হিসাবে বলতে পারি বাস্তবিকপক্ষেই যদি এটা করা সম্ভব হয়, তাহলে তো অনেক সমাধান করা সম্ভব হয়নি এমন অপরাধের বা বিশেষ ঘটনার মূল কারণ জানা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এরা এগিয়ে আসেন না কেন? উত্তর নেই।”
➖ আচ্ছা তাহলে বল কী করে এক বা একাধিক মিডিয়ামদের কাছ থেকে একই ধরণের লেখা পাওয়া যায়?
➖ ঠিক যেভাবে জাদু দেখানো হয়। 'প্যারানরমাল' চিন্তাবিদরা অবশ্য বলেছেন, যদি কোনও 'ম্যাজিক ট্রিক্স' না ব্যবহার হয়ে থাকে তাহলে এটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে ওই মিডিয়ামরা নিজেদের ভেতর 'সুপার-ই এস পি' অসচেতনভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। কী অদ্ভুত যুক্তি দেখো! এমনিতেই 'ই এস পি' প্রমাণ করা যাচ্ছে না, তারপরেও আবার 'সুপার ই এস পি'! তাও আবার অসচেতন ভাবে! সোজা কথায় এ 'ফেনোমেনা' এসব ঘটনার পিছনে লুকিয়ে আছে জটিল সব রহস্য। আমাদের মতো 'অবিশ্বাসী'দের নাগালের বাইরের বস্তু। চোখ কান বুজে বিশ্বাস করে নিলে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।
➖ বুঝলাম। আশা করি তোর লেখার পাতকেরাও ধরতে পারছেন তুই কি বলতে চাইছিস। আচ্ছা বল দেখি, জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন পদার্থবিদ, আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) এর কোন ভাবনা আবিষ্কারক থমাস আল্ভা এডিসনের (১৮৪৭-১৯৩১ ) চিন্তাভাবনার জগতে নাড়া দিয়েছিল?
➖ আইনস্টাইন বলেছিলেন, শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। একে কেবলমাত্র এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত করা যায় বা রূপান্তরিত হতে পারে। এটা এডিশনকে প্রভাবিত করেছিল নিঃসন্দেহে। কর্মজীবনের শেষের দিকে এডিশন আত্মা শনাক্তকরণ ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এ্কটা যন্ত্র বানানোর কাজ শুরু করেছিলেন। এডিসন যখন এ জগতে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন তখন স্পিরিচুয়ালিজমের সুদিন চলছে। যৌবনে, উনি নিঃসন্দেহে খবর রাখতেন যে, 'মিডিয়াম'রা তথাকথিত আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
➖ একদম। এডিসন নিজে বিশ্বাসও করতেন, আত্মার মত কিছু একটা মৃত্যুর পরেও থেকে যায়। যাকে উনি বলতেন 'লাইফ ইউনিটস'। তাঁর ভাবনা অনুসারে, যেকোনও ধরণের জীব, স্টারফিস থেকে মানুষ, 'মাইক্রোস্কোপিক লাইফ ইউনিট' দিয়ে গঠিত। যারা নিজেদেরকে বিভিন্ন ধরণে সাজাতে পারে। আর এভাবেই নানান প্রজাতির জীব জন্মায়।
➖ উনি বিশ্বাস করতেন, 'লাইফ ইউনিট'গুলো একসঙ্গে থাকে বলেই যথেষ্ট শক্তিশালী স্মৃতির অধিকারী। যখন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার জন্ম হয়, তখন তারা চারদিকে ছড়িয়ে যায় এবং অন্য প্রাণীদের মধ্যে নিজেদের সংস্থাপিত করে।
➖ দাদা এটাই কি তাহলে ভুতে ধরা? মানে ওই সব টুকরোটাকরা স্মৃতি তখন ভুতে ধরা মানুষটার আচরণে প্রকাশিত হয়?
➖ এর উত্তর জানতে হলে 'মিডিয়াম'দের দরকার। 'ক্রস করেসপনডেন্স' করে হয়তো জানা যেত পারে। তবে উনি বলতেন এই গ্রহে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লাইফ ইউনিট রয়েছে এবং সেই সংখ্যা কখনও বাড়েও না কমেও না।
➖ আরিব্বাস! তাহলে তো মনে হচ্ছে ব্যপারটা ভুতে ধরা নয়। মানুষ থেকে মানবেতর প্রানীতে পরিণত হওয়া। এই জন্যেই এত মশা মাছি পোকামাকড়! নাকি জন সংখ্যা বৃদ্ধি? এডিসন স্যার? শুনতে পাচ্ছেন? উত্তর দিন প্লিজ!
➖ সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে হাসিঠাট্টা করা ভালো না। ভূতে ধরবে কিন্তু!!!
➖ সরি দাদা। সোজা কথায় ওইসব 'লাইফ ইউনিট'গুলো তার মানে অবিনাশী সত্ত্বা। যে কারণে ওরা নিশ্চিতভাবে শরীরের মৃত্যুর প্রভাব থেকে বেঁচে যায়।
➖ এই বিশ্বাস নিয়েই তো এডিসন সাহেব বছরের পর বছর ধরে এমন একটা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরির জন্য কাজ করে চলছিলেন যা এই ‘লাইফ ইউনিট’দের সনাক্ত করতে পারে। সঠিকভাবে এই যন্ত্র ব্যবহার করা গেলে, শরীরের মৃত্যু ঘটার পর অতি সূক্ষ্ম 'লাইফ ইউনিট'কেও চিহ্নিত করতে পারত।
➖ বৈজ্ঞানিক মানুষ এডিসন কিন্তু মিডিয়ামদের কাজ কর্মকে একদম বিশ্বাস করতেন না। ঠিক এই কারণেই উনি এমন এক যন্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা মৃত ব্যক্তির আত্মার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। আসলে, উনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের মৃত্যুর পরেও তার ব্যক্তিত্বর অস্তিত্ব থেকে যায়। আর ঠিক সে কারণেই যারা এই পৃথিবী থেকে অন্য জগতে চলে যায় তারা তাদের ফেলে যাওয়া আত্মীয়স্বজনের সাথে যোগাযোগ রাখতে চায়। উনি মনে করতেন এই কাজ সুগম করতে সর্বোত্তম অনুমানযোগ্য উপায় নির্মাণ করা তার উচিত। যাতে ‘তেনাদের’ সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের একটা পথ খুলে যায়। তারপর কী হবে সে নিয়ে আগে থেকে ভেবে লাভ নেই!
➖ জীবদ্দশায়, মিস্টার এডিসন শত শত পেটেন্ট পেয়েছিলেন তার নানাবিধ আবিষ্কারের। বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়েছিল বৈদ্যুতিক লাইট বাল্ব, ফোনোগ্রাফ এবং মোশন-পিকচার প্রজেক্টর। দুর্ভাগ্যবশত, তার 'লাইফ-ইউনিট ডিটেক্টর' এবং তার ভূ্তেদের সাথে যোগাযোগ করার যন্ত্রটা বানানোর কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
➖ তোর কি মনে হয়, ওই মানুষটা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পেলে ওই যন্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারতেন?
➖ এর উত্তর তো সেই 'ক্রস করেসপন্ডেনস' করেই খুঁজতে হবে দাদা। কেন যে কেউ তার সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করল না এটা জানার খুব ইচ্ছে আমার।
দশম অধ্যায় উপভোগ করেছেন? একাদশ অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।