একাদশ অধ্যায়
➖ ১৯৩৭ সালে, রাশিয়ান ইলেকট্রিশিয়ান সেমিয়ন কিরলিয়ান বিদ্যুতের বিশেষ ধরনের ব্যবহার করে এক চমকপ্রদ ফটোগ্রাফের সিরিজ তৈরি করেছিলেন। কিরলিয়ান একটা ধাতব প্লেটের উপর 'আন এক্সপোজড ফটোগ্রাফিক ফিল্ম'-এর টুকরো রাখেন এবং তার উপরে রাখেন কোনও একটা ছোট বস্তু। এরপরে, উনি প্লেটের সাথে সংযুক্ত করেন 'হাই-ভোল্টেজ', 'হাই-ফ্রিকোয়েন্সি' জেনারেটর লাইনের এক প্রান্ত এবং তারের অন্য প্রান্ত স্পর্শ করান বস্তুটার গায়ে যেটার ছবি তুলবেন। 'ফিল্ম এক্সপোজড' হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওই বস্তুর চারপাশে স্বাভাবিক 'ইলেক্ট্রিক্যাল ডিসচার্জ'-এর কারণে 'ফটোগ্রাফিক পেপার' এতে রামধনুর মতো নানা রঙের এক মায়াময় চমকপ্রদ 'হ্যালো' বা 'করোনা' সৃষ্টি হয়। মূল বস্তুটা 'সিলুয়েট'-এ দেখা যায়। এই ফটোগ্রাফগুলোর বিখ্যাত উদাহরণ হল একটা হাতের ছবি। যার প্রসারিত আঙ্গুলগুলো থেকে রশ্মিরেখা বেরিয়ে যাচ্ছে নানা দিকে।
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ !!!
অনুগ্রহ করে ধাতব পাতের ওপর নিজের হাত রেখে ইলেকট্রিকের সংযোগ ঘটিয়ে এভাবে ফটো তোলার চেষ্টা করবেন না। গোটা বাড়ির ফিউজ উড়ে যাবেই। আগুনও লেগে যেতে পারে তার সঙ্গেই। নিজেও দারুন রকমের শক খাবেন! 'কিরলিয়ান ফটোগ্রাফি', এ নামেই পরিচিত এই ছবি, করা এত সহজ নয়।
➖ বাহ্ দারুণ একটা বিষয় লিখেছিস।
➖ লিখতে তো হতোই। কারণ 'প্যারানরম্যাল ফেনোমেনা'তে বিশ্বাসীরা সেইসময়ে দাবি করেছিলেন যে, 'কিরলিয়ান ফটোগ্রাফি', আসলে আত্মা বিদ্যমান এবং দেহকে ঘিরে সে আভা আকারে নিজেকে প্রকাশ করে তারই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। যদিও বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার জানিয়ে দেন কিরলিয়ান ফটোগ্রাফি আর আত্মার প্রকাশের ভেতর কোনও সম্পর্ক নেই।
➖ বেশ বেশ এবার তাহলে 'আউট অফ বডি এক্সপেরিয়েন্স' নিয়েও কিছু বল?
➖ ভূতে বিশ্বাসীদের জগতে এই 'ফেনোমেনা' পরিচিতি 'ও বি ই' নামে। 'অ্যাস্ট্রাল প্রোজেকশন', 'বাই-লোকেশন' আবার কখনও কখনও 'ই এস পি প্রোজেকশন' নামেও একে ডাকা হয়। এ এক অতি অস্বাভাবিক ঘটনা, যেখানে একজন ব্যক্তির আত্মা বা দ্বিতীয় সত্তা বা তার 'অ্যাস্ট্রাল বডি' আমাদের স্পর্শযোগ্য শারীরিক শরীর থেকে আলাদা হতে পারে। 'ও বি ই' এবং 'অ্যাস্ট্রাল প্রোজেকশন' আসলে একই ধরণের 'প্যারানরমাল' ঘটনা। পার্থক্য শুধু প্রথম ক্ষেত্রে সুক্ষ্ম দেহ শরীরের কাছে বা উপরে ভেসে থাকে আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শরীর ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে পারে।
➖ ভেবে দ্যাখ এই সব ভাবনা কতশত লেখক লেখিকাদের সাহায্য করেছে কল্পনার ডানা বিস্তার করার জন্য।
➖ এবার একটা কথা কিন্তু বলছি, এই যে শেষ ধরণের 'ও বি ই'র কথা বললি, সেটাকে কিন্তু আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যাচাই করা সম্ভব। যে কারণেই 'সাইকিক' গবেষণায় একে সবচেয়ে মূল্যবান এবং বিশ্বাসযোগ্য বলে ধরা হয়। অস্বীকার করা যায় না ওই সব তথ্য ওই মানুষটার মনে কীভাবে আসে তার কোনও যুক্তি গ্রাহ্য ব্যাখ্যাও দেওয়া সম্ভব নয়।
➖ আমার তো মনে হয় দাদা এসবই আমাদের 'জিন' [জ্বিন নয়]-এর খেলা। আমার বিশ্বাস ওই সময় কোনোভাবে আমাদের স্মৃতি কোষের কিছু কিছু অংশ বিশেষ ভাবে কার্যকরী হয়ে যায়। কীভাবে হয়? না এর উত্তর দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক উন্নতি আমরা এখনও করে উঠতে পারিনি সম্ভবত।
➖ অনেকেই বলেছেন, ওই সুক্ষ্ম শরীর অন্য ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হতে পারে। 'পার্সিপিয়েন্ট' [শব্দটা ভুলে যাননি আশা করি] এর কাছে ওই শরীরের আবির্ভাব ভূতের মত আবছাভাবে বা রক্ত-মাংস দ্বারা গঠিত শরীর সমেত হতে পারে বলে মনে করা হয়। 'সাইকিক' গবেষক হর্নেল নরিস হার্ট (১৮৬১-১৯৬৭) তাঁর ১৯৫৬ সালের গবেষণা 'আবির্ভাবের ছয় তত্ত্ব'তে জানিয়েছেন সুক্ষ্ম শরীরের আবির্ভাব এবং মৃত মানুষের আত্মার আবির্ভাব 'চরিত্র এবং পদার্থগত' দিক থেকে মূলত একই রকম।
➖ নিজ নিজ ভাবনার কথা তো অনেক মানুষই বলে চলেছেন বা লিখে রেখে গিয়েছেন। তবে একটা বিষয়কে আমি সম্মান করি, আর সেটা হলো 'প্যারানরমাল' গবেষনার জগতে থাকা বেশীরভাগ মানুষ জোর করে 'সাহিত্য' নির্মাণ করে এসব তত্ত্ব প্রমাণ করার গর্ব সেই অর্থে করে না। যেটা অন্ধবিশ্বাসীরা করে থাকেন।
➖ জানিস বোধহয় ইচ্ছাকৃতভাবে 'অ্যাস্ট্রাল প্রোজেকশন'-এর বেশ কিছু পরীক্ষা বা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি নিজের 'অ্যাস্ট্রাল সেলফ'কে অন্য জায়গায় বা কোনও এক নির্দিষ্ট মানুষের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। যদিও এ বিষয়ে সাফল্যের খুব একটা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
➖ দাদা সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এবং লোককথায় অজস্র সুক্ষ্ম শরীরের আবির্ভাবের উদাহরণ পাওয়া যায়। কিন্তু অদ্ভুত লাগে যখন জানা যায় ১৯ শতকের আগে অবধি সেভাবে 'আউট অফ বডি' ভিজ্ঞতা জাতীয় 'প্যারানরমাল' ঘটনা সেভাবে গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষাই করা হয়নি।
➖ ঠিক বলেছিস। ডক্টর রবার্ট ক্রুকল, প্রাথমিক পর্বের 'প্যারানরমাল' তদন্তকারীদের মধ্যে একজন। যিনি সারা জীবন এই 'ও বি ই' বিষয়ক 'প্যারানরমাল' গবেষণায় উৎসর্গ করেছিলেন। লিখেছিলেন ১০টার বেশি বই। তবে সেখানে লেখা সব ঘটনা উনি মোটেই নিজে পরীক্ষা করে দেখেননি। তার লিখিত বেশিরভাগ উদাহরণই একবারই মাত্র ঘটেছিল। ফলে ২য় বার পরীক্ষার সুযোগ হয়নি। অবশ্য 'ও বি ই' বারবার ঘটবে এটা আশা করাটাও হয়ত একটু বেশি মাত্রায় চাওয়া।
➖ একদম। সারা পৃথিবী জুড়ে যদি 'অ্যাস্ট্রাল প্রোজেকশন'-এর প্রতিবেদনগুলোকে যাচিয়ে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই যিনি অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তিনি নিজে ঘটনার কথা বলছেন না। তার কাছে শুনে বা তার হয়ে অন্য কেউ সে গল্প শোনাচ্ছে। আর সেখানেই তো আমার মতো অবিশ্বাসীর মাথার পোকা নড়ে ওঠে।
➖ সেটা এ নিয়ে তোর সঙ্গে আলোচনা করতে করতে বুঝে গিয়েছি। যাকগে কট্টরপন্থী আদর্শবাদী ইনক্রিজ ম্যাথার [১৬৩৯-১৭২৩] এর নাম শুনেছিস?
➖ ১৬৯২ সালের সালেম উইচক্র্যাফট ঘটনার সুত্রে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়া সেই 'বিখ্যাত' রেভারেন্ড কটন ম্যাথার নামক মানুষটার বাবা?
➖ হ্যাঁ । উনি বিশ্বাস করতেন যে 'অ্যাপারিশন', 'পোল্টাগাইস্ট' ক্রিয়াকলাপ এবং অন্যান্য নানা ধরনের অদ্ভুত কার্যকলাপ প্রকৃতপক্ষেই ঘটে। সব বাস্তব সম্মত ব্যাপার। উনি নিজে এরকম অনেক আবির্ভাবের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিলেন। যেখানে উনি এমন অনেক ঘটনার কথা লিখেছেন যেখানে দেখা গিয়েছে, একজন মানুষকে যখন অন্য আর একটা স্থানে দেখা যাচ্ছে তখন সেই মানুষটা ওই মুহূর্তে নিজের বাড়িতে ছিলেন। তার মতানুসারে এসবই ছিল শয়তানের কার্যকলাপ। ১৬৮৪ সালে তার লেখা 'অ্যান এসে ফর দ্যা রেকর্ডিং অফ ইলাস্ট্রিয়াস প্রভিডেন্সেস' অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।
একাদশ অধ্যায় উপভোগ করেছেন? দ্বাদশ অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।