এমাসেই উদযাপন করেছি মাতৃভাষা দিবস। ভাষাদিবস নিয়ে লিখতে বসে, কেন লজ্জা পাওয়ার কথা মনে হল, সেটা বলতে গিয়ে একজনের গল্প বলতেই হয়। সুনীলবাবুর গল্প — এই সুনীলবাবু আমার, আপনার সকলের পাড়ায় থাকেন; হয়তো বা আমার-আপনার বাড়িতেই থাকেন। গল্পটা খুব চেনা লাগবে! বিশ্বাস করুন!
সুনীলবাবু এবছর প্রথমবার বইমেলায় গেছেন। তবে ঠিক ভেবে-চিন্তে যাননি। পাড়ার একটি কিশোরী, নাম প্রতিমা, যে সুনীলবাবুকে মামা ডাকে, তার সাথে ঘটনাচক্রে গিয়ে পড়েছেন। প্রথমবার বইমেলা যাওয়ার উত্তেজনা কি কম? সে এক আশ্চর্য জায়গা! সে মেলায় নাগর-দোলা থাকে না। কিন্তু, মানুষের ভিড়ে আনন্দের দোলা লাগে। বইয়ের স্টলগুলোতে ভিড় দেখে মনে হয়, যেন মৌচাকে মৌমাছি। মধুই তো বটে! দু’মলাটের মধ্যে ছাপার অক্ষরের এমন মিঠে স্বাদ যে, যুগে-যুগে সে মাধুর্যে মন বুঁদ হয়ে থাকে। সেখানে পা রাখলেই মনে পড়তে থাকে শৈশবে ফেলে আসা কত কিছু — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা, সুকুমার রায়ের কুমড়ো-পটাশ…! বইমেলার ধুলো-মাখা হাওয়া লাগে, আর মনের বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে; চড়ুই পাখির ডানার মতো ফড়-ফড় শব্দ হয়। আমাদের সুনীলবাবুরও তাই হল। তাঁর পাশ দিয়ে জনস্রোত বয়ে যায় নদীর মতো, আর তিনি বায়োস্কোপের দৃশ্যের মতো মনে মনে আওড়াতে থাকেন:
আমাদের ছোট নদী,
চলে আঁকে-বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার
হাঁটু জল থাকে।
সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক-উত্তীর্ণ প্রতিমার বয়স উনিশ; বসন্তের নতুন আমের মুকুলের মতো সে কবিতা ভালোবাসতে শিখেছে। একটু ঘুরেই সে তাই কিনে ফেলেছে কবি সুবোধ সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ওদিকে সুনীলবাবু তো থই পাচ্ছেন না। কী কিনবেন ভেবে পাচ্ছেন না। এত! এত বই!
এমন নয় যে সুনীলবাবু বই-পোকা; দিন-রাত বই পড়েন। কিন্তু আজ এই ধুলো-মাখা মাঠটায় জীবনে প্রথমবার এসে মনে হচ্ছে — এ যেন তীর্থ-ক্ষেত্র। কয়েকটা দোকানে বিষম ভিড়! সুনীলবাবুদের যৌবনে সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারে এমন ভিড় হত।
তাঁর বাড়ি বীরভূমে; কিন্তু বয়স হয়েছে বলে, কলকাতা-বাসী ছেলে বাবা-মাকে নিজের কাছে এনে রেখেছে। সে ফ্ল্যাটে সুন্দর-সুসজ্জিত বুক-শেলফ আছে। সেখানে হরেক রকম বইও সাজানো আছে। থরে-থরে সাজিয়ে রাখা আছে রবীন্দ্র রচনাবলী। কিন্তু, নাতনী নন্দিনী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। আর বউমা কস্তুরী তো বলেন: "আমার মেয়ের আর কোনো সাবজেক্ট নিয়ে চিন্তা নেই। শুধু বাঙলাটাতেই ও উইক।"
প্রতিমার কবিতার বই কেনা হয়ে গেছে। কিন্তু, সে আশা করে আছে, পাড়াতুতো হলেও মামা তাকে কিছু কিনে দেবে নিশ্চয়। কিন্তু, মামার এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশা দেখে সে সেই দুরাশা ত্যাগ করেছে। তার এবার বাড়ি ফেরার তাড়া।
ঠিক তখনই ওরা তুলি-কলম-এর স্টলের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তুলি-কলম! আহা! নামটা শুনলেই মনটা কেমন হাফ-বয়েল ডিমের কুসুমের মতো তলতলে নরম হয়ে যায়! মা নিয়ে যেতেন ছোটবেলায়; সারদা গ্রন্থাগার। আর সে বয়সেই কিনে দিয়েছিলেন পঞ্চতন্ত্রের গল্প; প্রকাশকের নাম তুলি-কলম। ক্লাস ফোরে পড়া সুনীলবাবু সে বই ঘুমোবার সময়েও হাত-ছাড়া করতেন না। পাতায়-পাতায় রঙিন ছবি! আর গল্পের সে কী টান!
আজ সেই তুলি-কলমে আবার ঢুকলেন প্রৌঢ় সুনীলবাবু। পঞ্চতন্ত্রের গল্প কিনলেন একটা; প্রতিমাকে দিলেন। কিন্তু না! একটা কিনলে তো হবে না। নাতনী নন্দিনীর জন্য কিনলেন আরও একটা। ও যে বাঙলায় উইক! না না! সে কী কথা! কৌটোর দুধ হজম না হলে ডাক্তার দেখানো যায়। কিন্তু, মাতার স্তন্য-সুধা হজম না হলে, ডাক্তার কী করবে?
এবার গন্তব্য বিশ্বভারতীর স্টল; সেখান থেকে কিনলেন সহজ পাঠ। আহা! সেই নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি। এ জিনিস হাতে পেয়েও কি কেউ বাঙলায় উইক থাকতে পারে? এও কি সম্ভব?
আমরাও একটু ভাবি! ক'দিন আগেই সাড়ম্বরে পালিত হলো ভাষাদিবস। আমি বাঙলায় গান গাই... গাইব কি শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি? সমাজ-মাধ্যমে ছবি পোস্ট করার জন্য? মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতো — সহজ-পাচ্য, পুষ্টিকর এবং অতি-প্রয়োজনীয়। সুনীলবাবুর বউমা কস্তুরীর মতো ছদ্ম-আধুনিকতা দেখাতে গিয়ে আমরা কি এই সত্যটি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব?
নাকি, একবার আবার সহজ মনে সহজ পাঠ ছুঁয়ে দেখব? সন্তানের সাথে সহজ পাঠ নিয়ে বসে নিজেদের রোদেলা শৈশব থেকে ঘুরে আসব কি একটু?
আসুন, পরের বার — "আমার ছেলে তো বাঙলাটাতেই উইক!" বলার আগে একটু লজ্জা পাই! এটাই হোক ভাষা দিবসে পুষ্পাঞ্জলি।
পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক এবং রসায়ন ও মহাকাশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর হলেও, লেখিকার সত্যিকারের অনুরাগ সাহিত্যেই। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি একক গ্রন্থ — ইংরেজি উপন্যাস Un-polluted, বাংলা কবিতার বই দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা, এবং গল্পসংকলন সাতটি তারের একতারা। বই পড়া ও লেখা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য আনন্দ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।