লেকটাউনের মোড় থেকে যে অটোটা সল্টলেক করুণাময়ীর দিকে যায়, তার পেছনের সিটে কোণঠাসা হয়ে বসেছিলেন মৃণালবাবু। বয়স পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই। পরনে আধময়লা, কিন্তু সযত্নে ইস্ত্রি করা শার্ট; হাতে একটা পুরোনো রেক্সিনের ব্যাগ। ব্যাগের জিপটা একটু আলগা হয়ে আছে — যেন মধ্যবিত্তের হা-করা অভাবের মতো ভেতরে উঁকি মারছে জলের বোতল আর একটা মোটা খাম।
বাইরে অবিরত ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কলকাতার এই এক সমস্যা — বৃষ্টি হলে শহরটা যেন নোংরা জল আর ঘামের গন্ধে সেদ্ধ হতে থাকে। মৃণালবাবু ঘামছেন। এসি অটো নয়, পলিথিন ঝোলানো। সেই পলিথিনের ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ায় বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের বদলে উঠে আসছে নর্দমার পচা ভ্যাপসা গন্ধ — ঠিক যেন এই সমাজের পচে যাওয়া নৈতিকতার মতো।
মৃণালবাবুর মা বলতেন, "সব সময় মনে বিশ্বাস রাখবি মিন্টু। কু-চিন্তা করবি না। সু-চিন্তা দিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারলে একদিন তুই তোর গন্তব্যে পৌঁছবিই।"
মায়ের সেই ছবিটা আজ সকাল থেকেই চোখের সামনে ভাসছে। মা গত হয়েছেন বছর দশেক। কিন্তু তাঁর "বিশ্বাস" নামক সেই প্রাচীন দাওয়াইটা মৃণালবাবু বুকে আগলে রেখেছেন। রিটায়ারমেন্টের পর যে পনেরো লক্ষ টাকা গ্র্যাচুইটি আর প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলিয়ে পেয়েছিলেন, সেটা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের তলানিতে থাকা সুদের হারে রাখতে মন সায় দেয়নি। ঠিক তখনই ভাস্কর এসেছিল।
ভাস্কর। পাশের ফ্ল্যাটের ছেলে। ছোটবেলা থেকে চোখের সামনে বড় হয়েছে। মৃণালবাবুর ছেলে বিদেশে, মেয়ে পুনেতে। ভাস্করই তো আপদে-বিপদে বাজার করে দেয়, ডাক্তার ডাকে। সেই ভাস্কর বলেছিল, "কাকু, আমার কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে ইনভেস্ট করুন। দু’বছরে ডবল নয়, তবে ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি পাবেন। আর আমি তো আছি, ঘরের ছেলে।"
মৃণালবাবু বিশ্বাস করেছিলেন। অগাধ বিশ্বাস। দলিল হয়নি, শুধু একটা স্ট্যাম্প পেপারে সই আর মুখের কথা। "দলিল তো উকিলের পেট ভরানোর ফিকির, কাকু — ওসব কেন করবেন? আমি কি পর?" — ভাস্করের এই এক কথায় মৃণালবাবু চেকটা সই করে দিয়েছিলেন। তখন তিনি বোঝেননি, ঘরের ছেলে আর ঘরের শত্রু বিভীষণের মধ্যে বানান ছাড়া আর বিশেষ কোনো তফাত নেই।
আজ দু’বছর তিন মাস অতিক্রান্ত। টাকাটা ফেরত পাওয়ার কথা ছিল গত মাসে।
অটোটা করুণাময়ী মোড়ে নামিয়ে দিল। ভাস্করের নতুন অফিস এখন সেক্টর ফাইভে — ঝাঁ-চকচকে কাঁচের বিল্ডিং। নিওন আলোয় লেখা — "স্কাইলাইন রিয়েলটি"। বাইরের চাকচিক্য দেখে বোঝার উপায় নেই — এর ভিতটা দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ওপর।
ঘন্টা দুয়েকের "ওয়েটিং" নামক অপমানের পর ডাক এল।
ভাস্করের কেবিনটা হিমশীতল। এসিটা বোধহয় ষোলোয় চালানো। কাঁচের ওপারে কলকাতার ধুলো-মাখা আকাশ, আর এপারে লেদারের চেয়ারে বসে ভাস্কর। শরীরে দামি পারফিউমের গন্ধ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। মৃণালবাবুকে দেখে সে চেয়ার ছেড়ে উঠল না। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার সেই পুরনো অভ্যাসটা বোধহয় এই হাই-রাইজ বিল্ডিংয়ে ওঠার সময় লিফটেই ফেলে এসেছে।
"বলো কাকু, কী খবর? শরীর ভালো?" ভাস্করের গলায় সেই পরিচিত আন্তরিকতা নেই; আছে একধরনের মসৃণ ব্যবসায়িক রুক্ষতা।
মৃণালবাবু শুকনো মুখে বললেন, "শরীর আর কী, বাবা... আসলে টাকাটার খুব দরকার ছিল। তুমি তো বলেছিলে গত মাসে..."
ভাস্কর হাসল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই; আছে একধরনের প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞা। সে টেবিলের ওপর রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। মৃণালবাবুর সামনেই ধরাল। আগে সে কখনো গুরুজনদের সামনে ধূমপান করত না। ধোঁয়াটা ছাড়ল এমনভাবে, যেন ওটা মৃণালবাবুর পাওনা টাকা — হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
"কাকু, মার্কেট খুব খারাপ। তুমি তো জানো — রিয়েল এস্টেট এখন ডাউন। তোমার টাকাটা তো প্রজেক্টে আটকে আছে।"
"কিন্তু ভাস্কর, ওটা যে আমার রিটায়ারমেন্টের সব সম্বল। কথা ছিল..."
ভাস্কর ধোঁয়া ছাড়ল। ধোঁয়াটা মৃণালবাবুর মুখের সামনে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। "কথা তো অনেক কিছুই থাকে, কাকু। বিজনেস কি কথার ওপর চলে? কথার কি পা আছে যে হেঁটে হেঁটে ব্যাংকে জমা হবে? লিগ্যাল পেপারস কিছু আছে?"
মৃণালবাবু চমকে উঠলেন। হাতটা নিজের অজান্তেই ব্যাগের চেইনটা আঁকড়ে ধরল। "তুমিই তো বলেছিলে, দলিলের দরকার নেই। তুমি ঘরের ছেলে..."
ভাস্কর এবার একটু বিরক্তি নিয়ে তাকাল। "দেখো কাকু, ইমোশন দিয়ে কবিতা লেখা যায়, ব্যালেন্স শিট মেলে না। তুমি আমাকে টাকা দিয়েছ, আমি সেটা খাটিয়েছি। লস হলে সেটা তো তোমাকেও বেয়ার করতে হবে। পার্টনারশিপ তো তাই বলে।"
"পার্টনারশিপ? আমি তো লোন দিয়েছিলাম!"
"কাগজে কী লেখা আছে? ইনভেস্টমেন্ট। আর এই দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপারের ভ্যালু এখন কোর্টে কত জানো? ওটা দিয়ে বড়জোর ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো যায়।"
মৃণালবাবু স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের ছেলে ভাস্কর — যার জন্য তিনি নিজের ছেলের চেয়েও বেশি ভেবেছেন — সে আজ তাঁর মুখের ওপর আইনের ধারা শেখাচ্ছে। শিক্ষিত চোরেরা যে পকেট মারে না, কলম দিয়ে গলা কাটে — সেটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলেন।
তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে বললেন, "তাহলে? আমার টাকা?"
ভাস্কর ড্রয়ার খুলে একটা চেকবুক বের করল। খসখস করে সই করল। তারপর চেকটা ভিক্ষার মতো ছিঁড়ে মৃণালবাবুর দিকে ঠেলে দিল।
"দু’লাখ টাকা দিচ্ছি। এখন এটা রাখো। বাকিটা পরে দেখা যাবে।"
পনেরো লক্ষের বদলে দু’লাখ। মৃণালবাবু চেকের দিকে তাকালেন না। ভাস্করের চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো গ্লানি নেই। আছে শুধু ক্ষমতার দম্ভ। মধ্যবিত্তের নৈতিকতা এখানে অচল সিকি। এখানে যার গলা যত জোর, যার পকেটে যত জোর — সত্য তার কেনা গোলাম।
"আর বাকি তেরো লাখ?" মৃণালবাবুর গলার স্বর খাদে নেমে গেল।
ভাস্কর এবার হাসল না। কঠিন চোখে তাকাল। "কাকু, বেশি ঘাঁটাবেন না। আপনার ছেলে বিদেশে, মেয়ে পুনেতে। এখানে আপনি আর কাকিমা একা থাকেন। এই বয়সে থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি... শরীরে সইবে? তার চেয়ে এই দু’লাখ নিয়ে বাড়ি যান। শান্তিতে থাকুন। চুপ করে থাকাটাই এখনকার দিনে বুদ্ধিমানের কাজ, আর বোকারা বিপ্লব করে মরে।"
মৃণালবাবু বুঝলেন, এটা শুধু পরামর্শ নয় — এটা হুমকি। আধুনিক কলকাতার এক নীরব সন্ত্রাস। এখানে রক্তপাত হয় না, শুধু বিশ্বাসগুলো খুন হয়ে যায় প্রতিদিন।
তিনি চেকটা নিলেন না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। এসি রুমের ঠান্ডাটা হাড়ের ভেতর অবধি পৌঁছে গেছে। তিনি যখন দরজার কাছে পৌঁছালেন, ভাস্কর পেছন থেকে বলল, "চা খাবে কাকু? অর্ডার করব?"
মৃণালবাবু উত্তর দিলেন না। বেরিয়ে এলেন। চা খেয়ে আর কী হবে? বিষ তো আগেই খাওয়া হয়ে গেছে — বিশ্বাসের বিষ।
লিফটে নামার সময় তাঁর মনে হলো, মা ভুল বলেছিলেন। সু-চিন্তা দিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। গন্তব্যে পৌঁছাতে গেলে এখন সাপের মতো লিকলিকে মেরুদণ্ড আর হায়নার মতো হাসি দরকার।
নিচে নেমে আবার সেই বৃষ্টি। অটো স্ট্যান্ডে ভিড়। মৃণালবাবু ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন। তাঁর ব্যাগে সেই দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপারটা এখনো আছে — যেটা দিয়ে নাকি শুধু ঠোঙা বানানো যায়। তিনি ভাবলেন, বাড়ি গিয়ে ওটা ছিঁড়ে ফেলবেন। প্রমাণ রেখে কী হবে? নিজের বোকামির দলিল নিজের কাছে রাখার কোনো মানে হয় না।
পাশে এক যুবক ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে, "আরে ভাই, আমি তোকে কথা দিচ্ছি, কাজটা হয়ে যাবে। আমাকে বিশ্বাস কর!"
মৃণালবাবু যুবকটির দিকে তাকালেন। কত সহজ এই "বিশ্বাস" শব্দটা। গেমাক্সিন পাউডার যেমন পিঁপড়ে মারে, আজকের এই সমাজব্যবস্থা তেমনই মানুষের বিশ্বাসকে বিষিয়ে মেরে ফেলছে। তিনি যদি জীবনে দশজনকে বিশ্বাস করে থাকেন, আটজনই আজ তাঁর দিকে তাকিয়ে সেই বিষাক্ত হাসি হাসছে। বাকি দুজন হয়তো সুযোগ পায়নি — পেলেই হাসত।
তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। অটোতে উঠবেন না। বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরবেন। গায়ের নোংরা জামাটা ধুয়ে যাবে, কিন্তু মনের ভেতর যে ময়লাটা আজ জমল, সেটা কোনো ডিটারজেন্টেই আর পরিষ্কার হবে না।
রাস্তার ধারের একটা কুকুর ল্যাম্পপোস্টে ঠ্যাং তুলে প্রস্রাব করছে। মৃণালবাবু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে হাসলেন। কুকুরটাও জানে তার সীমানা কতটা, শুধু তিনি মানুষ হয়েও নিজের সীমানাটা চিনতে পারেননি। ভেবেছিলেন "ভালো মানুষ" হয়ে থাকাটা একটা যোগ্যতা। আসলে ওটা একটা অক্ষমতা। ভদ্রতা এখন দুর্বলতারই আরেক নাম।
বৃষ্টি বাড়ছে। কলকাতার রাস্তায় জল জমছে। সেই ঘোলা জলে মৃণালবাবুর ছায়াটা কাঁপছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "মা, তুমি ঠিকই বলেছিলে। বিশ্বাস রাখতে হয়। তবে ঈশ্বরের ওপর নয়, শয়তানের ক্ষমতার ওপর। কারণ এখন ঈশ্বরের চেয়ে শয়তানের টিআরপি বেশি।"
গেট খোলার শব্দে দারোয়ান চমকে উঠল। "কে?"
"কেউ না। আমি। একটা জ্যান্ত লাশ।"
দারোয়ান কিছু বুঝল না, শুধু স্যালুট ঠুকল। মৃণালবাবু লিফটে উঠলেন। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেখানে আর সেই বিশ্বাসের দীপ্তি নেই। আছে শুধু একরাশ ক্লান্তি আর এক গভীর অসুখের ছাপ।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শেষ হলো না। কারণ, ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মৃণালবাবু দেখলেন, টিপয়ের ওপর রাখা তাঁর চশমার খাপটা নেই। আর মনে পড়ল — ভাস্করের টেবিলে ঠিক ওমনই একটা খাপ তিনি দেখে এসেছেন। নিজের চশমাটা কি তবে ভাস্করের টেবিলে ফেলে এলেন? নাকি ভাস্কর ওটা রেখে দিল? স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে? নাকি ট্রফি হিসেবে?
তিনি জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। তিনি ঝাপসা চোখে দেখলেন —
মানুষ এখন আর মানুষকে ঠকায় না, মানুষ এখন মানুষের বিশ্বাসকে ধর্ষণ করে, তারপর লাশটা ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখে শৌখিন ফুলদানির মতো।
লেখক ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে দমদম রবীন্দ্রনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মাবধি সপরিবারে পৈতৃক বসত বাড়িতেই বসবাস করেন। পিতা স্বর্গীয় সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী এবং মাতা স্বর্গীয় বীনাপানি চক্রবর্ত্তী। বর্তমানে তাঁর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী শিবানী চক্রবর্ত্তী, কন্যা পূবালী (বিবাহিত) এবং পুত্র নবীন কুমার। 'নবু' নামে পরিচিত এই লেখক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।