About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
বিশ্বাসের গ্র্যাচুইটি
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

বিশ্বাসের গ্র্যাচুইটি

লেকটাউনের মোড় থেকে যে অটোটা সল্টলেক করুণাময়ীর দিকে যায়, তার পেছনের সিটে কোণঠাসা হয়ে বসেছিলেন মৃণালবাবু। বয়স পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই। পরনে আধময়লা, কিন্তু সযত্নে ইস্ত্রি করা শার্ট; হাতে একটা পুরোনো রেক্সিনের ব্যাগ। ব্যাগের জিপটা একটু আলগা হয়ে আছে — যেন মধ্যবিত্তের হা-করা অভাবের মতো ভেতরে উঁকি মারছে জলের বোতল আর একটা মোটা খাম।

বাইরে অবিরত ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কলকাতার এই এক সমস্যা — বৃষ্টি হলে শহরটা যেন নোংরা জল আর ঘামের গন্ধে সেদ্ধ হতে থাকে। মৃণালবাবু ঘামছেন। এসি অটো নয়, পলিথিন ঝোলানো। সেই পলিথিনের ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ায় বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের বদলে উঠে আসছে নর্দমার পচা ভ্যাপসা গন্ধ — ঠিক যেন এই সমাজের পচে যাওয়া নৈতিকতার মতো।

মৃণালবাবুর মা বলতেন, "সব সময় মনে বিশ্বাস রাখবি মিন্টু। কু-চিন্তা করবি না। সু-চিন্তা দিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারলে একদিন তুই তোর গন্তব্যে পৌঁছবিই।"

মায়ের সেই ছবিটা আজ সকাল থেকেই চোখের সামনে ভাসছে। মা গত হয়েছেন বছর দশেক। কিন্তু তাঁর "বিশ্বাস" নামক সেই প্রাচীন দাওয়াইটা মৃণালবাবু বুকে আগলে রেখেছেন। রিটায়ারমেন্টের পর যে পনেরো লক্ষ টাকা গ্র্যাচুইটি আর প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলিয়ে পেয়েছিলেন, সেটা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের তলানিতে থাকা সুদের হারে রাখতে মন সায় দেয়নি। ঠিক তখনই ভাস্কর এসেছিল।

ভাস্কর। পাশের ফ্ল্যাটের ছেলে। ছোটবেলা থেকে চোখের সামনে বড় হয়েছে। মৃণালবাবুর ছেলে বিদেশে, মেয়ে পুনেতে। ভাস্করই তো আপদে-বিপদে বাজার করে দেয়, ডাক্তার ডাকে। সেই ভাস্কর বলেছিল, "কাকু, আমার কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে ইনভেস্ট করুন। দু’বছরে ডবল নয়, তবে ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি পাবেন। আর আমি তো আছি, ঘরের ছেলে।"

মৃণালবাবু বিশ্বাস করেছিলেন। অগাধ বিশ্বাস। দলিল হয়নি, শুধু একটা স্ট্যাম্প পেপারে সই আর মুখের কথা। "দলিল তো উকিলের পেট ভরানোর ফিকির, কাকু — ওসব কেন করবেন? আমি কি পর?" — ভাস্করের এই এক কথায় মৃণালবাবু চেকটা সই করে দিয়েছিলেন। তখন তিনি বোঝেননি, ঘরের ছেলে আর ঘরের শত্রু বিভীষণের মধ্যে বানান ছাড়া আর বিশেষ কোনো তফাত নেই।

আজ দু’বছর তিন মাস অতিক্রান্ত। টাকাটা ফেরত পাওয়ার কথা ছিল গত মাসে।

অটোটা করুণাময়ী মোড়ে নামিয়ে দিল। ভাস্করের নতুন অফিস এখন সেক্টর ফাইভে — ঝাঁ-চকচকে কাঁচের বিল্ডিং। নিওন আলোয় লেখা — "স্কাইলাইন রিয়েলটি"। বাইরের চাকচিক্য দেখে বোঝার উপায় নেই — এর ভিতটা দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ওপর।

রিসেপশনে বসে থাকা মেয়েটি মৃণালবাবুকে চিনতে পারল না। পারার কথাও নয়। গত এক মাসে বার তিনেক এসেছেন, প্রতিবারই শুনেছেন — "স্যার মিটিংয়ে আছেন।" আজ আর তিনি ফিরবেন না। ব্যাগে রাখা খামটায় ভাস্করের সই করা সেই স্ট্যাম্প পেপারটা আছে। যদিও ওটার আইনি মূল্য কতটা তিনি জানেন না, তবু ওটাই তাঁর বিশ্বাসের শেষ খড়কুটো।

ঘন্টা দুয়েকের "ওয়েটিং" নামক অপমানের পর ডাক এল।

ভাস্করের কেবিনটা হিমশীতল। এসিটা বোধহয় ষোলোয় চালানো। কাঁচের ওপারে কলকাতার ধুলো-মাখা আকাশ, আর এপারে লেদারের চেয়ারে বসে ভাস্কর। শরীরে দামি পারফিউমের গন্ধ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। মৃণালবাবুকে দেখে সে চেয়ার ছেড়ে উঠল না। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার সেই পুরনো অভ্যাসটা বোধহয় এই হাই-রাইজ বিল্ডিংয়ে ওঠার সময় লিফটেই ফেলে এসেছে।

"বলো কাকু, কী খবর? শরীর ভালো?" ভাস্করের গলায় সেই পরিচিত আন্তরিকতা নেই; আছে একধরনের মসৃণ ব্যবসায়িক রুক্ষতা।

মৃণালবাবু শুকনো মুখে বললেন, "শরীর আর কী, বাবা... আসলে টাকাটার খুব দরকার ছিল। তুমি তো বলেছিলে গত মাসে..."

ভাস্কর হাসল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই; আছে একধরনের প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞা। সে টেবিলের ওপর রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। মৃণালবাবুর সামনেই ধরাল। আগে সে কখনো গুরুজনদের সামনে ধূমপান করত না। ধোঁয়াটা ছাড়ল এমনভাবে, যেন ওটা মৃণালবাবুর পাওনা টাকা — হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

"কাকু, মার্কেট খুব খারাপ। তুমি তো জানো — রিয়েল এস্টেট এখন ডাউন। তোমার টাকাটা তো প্রজেক্টে আটকে আছে।"

"কিন্তু ভাস্কর, ওটা যে আমার রিটায়ারমেন্টের সব সম্বল। কথা ছিল..."

ভাস্কর ধোঁয়া ছাড়ল। ধোঁয়াটা মৃণালবাবুর মুখের সামনে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। "কথা তো অনেক কিছুই থাকে, কাকু। বিজনেস কি কথার ওপর চলে? কথার কি পা আছে যে হেঁটে হেঁটে ব্যাংকে জমা হবে? লিগ্যাল পেপারস কিছু আছে?"

মৃণালবাবু চমকে উঠলেন। হাতটা নিজের অজান্তেই ব্যাগের চেইনটা আঁকড়ে ধরল। "তুমিই তো বলেছিলে, দলিলের দরকার নেই। তুমি ঘরের ছেলে..."

ভাস্কর এবার একটু বিরক্তি নিয়ে তাকাল। "দেখো কাকু, ইমোশন দিয়ে কবিতা লেখা যায়, ব্যালেন্স শিট মেলে না। তুমি আমাকে টাকা দিয়েছ, আমি সেটা খাটিয়েছি। লস হলে সেটা তো তোমাকেও বেয়ার করতে হবে। পার্টনারশিপ তো তাই বলে।"

"পার্টনারশিপ? আমি তো লোন দিয়েছিলাম!"

"কাগজে কী লেখা আছে? ইনভেস্টমেন্ট। আর এই দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপারের ভ্যালু এখন কোর্টে কত জানো? ওটা দিয়ে বড়জোর ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো যায়।"

মৃণালবাবু স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের ছেলে ভাস্কর — যার জন্য তিনি নিজের ছেলের চেয়েও বেশি ভেবেছেন — সে আজ তাঁর মুখের ওপর আইনের ধারা শেখাচ্ছে। শিক্ষিত চোরেরা যে পকেট মারে না, কলম দিয়ে গলা কাটে — সেটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলেন।

তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে বললেন, "তাহলে? আমার টাকা?"

ভাস্কর ড্রয়ার খুলে একটা চেকবুক বের করল। খসখস করে সই করল। তারপর চেকটা ভিক্ষার মতো ছিঁড়ে মৃণালবাবুর দিকে ঠেলে দিল।

"দু’লাখ টাকা দিচ্ছি। এখন এটা রাখো। বাকিটা পরে দেখা যাবে।"

পনেরো লক্ষের বদলে দু’লাখ। মৃণালবাবু চেকের দিকে তাকালেন না। ভাস্করের চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো গ্লানি নেই। আছে শুধু ক্ষমতার দম্ভ। মধ্যবিত্তের নৈতিকতা এখানে অচল সিকি। এখানে যার গলা যত জোর, যার পকেটে যত জোর — সত্য তার কেনা গোলাম।

"আর বাকি তেরো লাখ?" মৃণালবাবুর গলার স্বর খাদে নেমে গেল।

ভাস্কর এবার হাসল না। কঠিন চোখে তাকাল। "কাকু, বেশি ঘাঁটাবেন না। আপনার ছেলে বিদেশে, মেয়ে পুনেতে। এখানে আপনি আর কাকিমা একা থাকেন। এই বয়সে থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি... শরীরে সইবে? তার চেয়ে এই দু’লাখ নিয়ে বাড়ি যান। শান্তিতে থাকুন। চুপ করে থাকাটাই এখনকার দিনে বুদ্ধিমানের কাজ, আর বোকারা বিপ্লব করে মরে।"

মৃণালবাবু বুঝলেন, এটা শুধু পরামর্শ নয় — এটা হুমকি। আধুনিক কলকাতার এক নীরব সন্ত্রাস। এখানে রক্তপাত হয় না, শুধু বিশ্বাসগুলো খুন হয়ে যায় প্রতিদিন।

তিনি চেকটা নিলেন না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। এসি রুমের ঠান্ডাটা হাড়ের ভেতর অবধি পৌঁছে গেছে। তিনি যখন দরজার কাছে পৌঁছালেন, ভাস্কর পেছন থেকে বলল, "চা খাবে কাকু? অর্ডার করব?"

মৃণালবাবু উত্তর দিলেন না। বেরিয়ে এলেন। চা খেয়ে আর কী হবে? বিষ তো আগেই খাওয়া হয়ে গেছে — বিশ্বাসের বিষ।

লিফটে নামার সময় তাঁর মনে হলো, মা ভুল বলেছিলেন। সু-চিন্তা দিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। গন্তব্যে পৌঁছাতে গেলে এখন সাপের মতো লিকলিকে মেরুদণ্ড আর হায়নার মতো হাসি দরকার।

নিচে নেমে আবার সেই বৃষ্টি। অটো স্ট্যান্ডে ভিড়। মৃণালবাবু ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন। তাঁর ব্যাগে সেই দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপারটা এখনো আছে — যেটা দিয়ে নাকি শুধু ঠোঙা বানানো যায়। তিনি ভাবলেন, বাড়ি গিয়ে ওটা ছিঁড়ে ফেলবেন। প্রমাণ রেখে কী হবে? নিজের বোকামির দলিল নিজের কাছে রাখার কোনো মানে হয় না।

পাশে এক যুবক ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে, "আরে ভাই, আমি তোকে কথা দিচ্ছি, কাজটা হয়ে যাবে। আমাকে বিশ্বাস কর!"

মৃণালবাবু যুবকটির দিকে তাকালেন। কত সহজ এই "বিশ্বাস" শব্দটা। গেমাক্সিন পাউডার যেমন পিঁপড়ে মারে, আজকের এই সমাজব্যবস্থা তেমনই মানুষের বিশ্বাসকে বিষিয়ে মেরে ফেলছে। তিনি যদি জীবনে দশজনকে বিশ্বাস করে থাকেন, আটজনই আজ তাঁর দিকে তাকিয়ে সেই বিষাক্ত হাসি হাসছে। বাকি দুজন হয়তো সুযোগ পায়নি — পেলেই হাসত।

তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। অটোতে উঠবেন না। বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরবেন। গায়ের নোংরা জামাটা ধুয়ে যাবে, কিন্তু মনের ভেতর যে ময়লাটা আজ জমল, সেটা কোনো ডিটারজেন্টেই আর পরিষ্কার হবে না।

রাস্তার ধারের একটা কুকুর ল্যাম্পপোস্টে ঠ্যাং তুলে প্রস্রাব করছে। মৃণালবাবু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে হাসলেন। কুকুরটাও জানে তার সীমানা কতটা, শুধু তিনি মানুষ হয়েও নিজের সীমানাটা চিনতে পারেননি। ভেবেছিলেন "ভালো মানুষ" হয়ে থাকাটা একটা যোগ্যতা। আসলে ওটা একটা অক্ষমতা। ভদ্রতা এখন দুর্বলতারই আরেক নাম।

বৃষ্টি বাড়ছে। কলকাতার রাস্তায় জল জমছে। সেই ঘোলা জলে মৃণালবাবুর ছায়াটা কাঁপছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "মা, তুমি ঠিকই বলেছিলে। বিশ্বাস রাখতে হয়। তবে ঈশ্বরের ওপর নয়, শয়তানের ক্ষমতার ওপর। কারণ এখন ঈশ্বরের চেয়ে শয়তানের টিআরপি বেশি।"

ফ্ল্যাটের নিচে এসে যখন দাঁড়ালেন, দেখলেন দারোয়ান গেট বন্ধ করে ঘুমে ঢুলছে। মৃণালবাবু ডাকলেন না। পকেট থেকে চাবি বের করতে গিয়ে দেখলেন হাত কাঁপছে। আজ থেকে তিনি আর কাউকে বিশ্বাস করবেন না — এমনকি নিজেকেও না। কারণ, এই মৃণালবাবু নামের লোকটা বড্ড বোকা, বড্ড ভালো। একে হত্যা না করলে এই শহরে বেঁচে থাকা যাবে না।

গেট খোলার শব্দে দারোয়ান চমকে উঠল। "কে?"

"কেউ না। আমি। একটা জ্যান্ত লাশ।"

দারোয়ান কিছু বুঝল না, শুধু স্যালুট ঠুকল। মৃণালবাবু লিফটে উঠলেন। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেখানে আর সেই বিশ্বাসের দীপ্তি নেই। আছে শুধু একরাশ ক্লান্তি আর এক গভীর অসুখের ছাপ।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শেষ হলো না। কারণ, ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মৃণালবাবু দেখলেন, টিপয়ের ওপর রাখা তাঁর চশমার খাপটা নেই। আর মনে পড়ল — ভাস্করের টেবিলে ঠিক ওমনই একটা খাপ তিনি দেখে এসেছেন। নিজের চশমাটা কি তবে ভাস্করের টেবিলে ফেলে এলেন? নাকি ভাস্কর ওটা রেখে দিল? স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে? নাকি ট্রফি হিসেবে?

তিনি জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। তিনি ঝাপসা চোখে দেখলেন —

মানুষ এখন আর মানুষকে ঠকায় না, মানুষ এখন মানুষের বিশ্বাসকে ধর্ষণ করে, তারপর লাশটা ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখে শৌখিন ফুলদানির মতো।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

এই সংখ্যায় প্রযোজ্য নিয়ম

একজন পাঠক এই সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই প্রতিক্রিয়া এই সংখ্যার অন্য কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা। দ্রষ্টব্য: আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যা থেকে এই নিয়ম আরও সহজ ও উদার করা হয়েছে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।