মানুষ জন্মায় একা, কিন্তু বাঁচে সম্পর্কের মধ্যে। পরিবারই মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভালোবাসার জায়গা। মা–বাবার স্নেহ, দাদু–দিদা-ঠাকুমার আদর, ভাই–বোনের হাসি, একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, দুঃখ–সুখ ভাগ করে নেওয়া — এই সব মিলিয়েই একসময় গড়ে উঠত একটি উষ্ণ সংসার। বিশেষ করে একসময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল আমাদের সমাজের শক্ত ভিত। সেখানে কয়েক প্রজন্ম একসঙ্গে থাকত, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত, একে অপরের পাশে দাঁড়াত। কিন্তু আধুনিক জীবনের স্রোতে আজ সেই পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, ভেঙে গেছে একান্নবর্তী পরিবারের কাঠামো।
একসময় একান্নবর্তী পরিবার মানেই ছিল ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রতীক। দাদু গল্প শোনাতেন, ঠাকুমা আদর করতেন, কাকু-পিসিরা পাশে থাকতেন। বাড়ির বড়রা ছোটদের পথ দেখাতেন, আর ছোটরা বড়দের সম্মান করত। পরিবারের কোনো সদস্য বিপদে পড়লে সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়াত। সংসারের আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করে নেওয়াই ছিল সেই পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কিন্তু সময় বদলেছে। আজ অধিকাংশ পরিবার ভেঙে পরিণত হয়েছে ছোট ছোট একক পরিবারে। বাবা-মা ও সন্তান নিয়ে গড়ে ওঠা এই পরিবারে আগের মতো বড়দের উপস্থিতি নেই, নেই আত্মীয়তার উষ্ণতা। একান্নবর্তী পরিবার ভাঙার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। চাকরি ও জীবিকার খোঁজে মানুষকে শহরে বা দূরে যেতে হয়। ছোট ফ্ল্যাটে বড় পরিবার রাখা সম্ভব হয় না। আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থও বেড়েছে। অনেক সময় মতের অমিল, সহনশীলতার অভাব ও অহংকারের কারণে পরিবার ভাগ হয়ে যায়।
বর্তমান সমাজে ব্যস্ততা যেন জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাবা-মা অফিসে ব্যস্ত, সন্তান পড়াশোনা ও অনলাইন জগতে ব্যস্ত, মা সংসার সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত। ফলে কারও কাছে কারও জন্য সময় থাকে না। আগে একান্নবর্তী পরিবারে কাজ ভাগাভাগি হতো, মানসিক চাপ কম থাকত। এখন ছোট পরিবারে সব দায়িত্ব কয়েকজনের ওপর এসে পড়ে। এতে মানসিক দূরত্ব বাড়ে, সম্পর্ক দুর্বল হয়।
এই দুর্বলতার সবচেয়ে বড় শিকার হয় বৃদ্ধ বাবা-মা, বাচ্চারা ও বয়োজ্যেষ্ঠরা। একসময় তারা বড় পরিবারে সবার সঙ্গে থাকতেন, আদর ও সম্মান পেতেন। আজ অনেকেই একা হয়ে পড়েছেন। সন্তানের ব্যস্ত জীবনে তারা ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হন। তাদের চোখের জল নীরবে বালিশ ভিজিয়ে দেয়, আর মুখে থাকে কৃত্রিম হাসি। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এই নিঃসঙ্গতা আরও বেড়ে গেছে।
পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতার পেছনে মূল্যবোধের পরিবর্তনও দায়ী। আজ অনেকেই মনে করে, অর্থ, পদ ও সাফল্যই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ভালো মানুষ হওয়া, সম্পর্ক রক্ষা করা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা — এসব বিষয় ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে সন্তানরা মা–বাবা ও দাদু-দিদা-ঠাকুমার অনুভূতি বুঝতে শেখে না। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে এই মূল্যবোধ শেখার জায়গাটাও অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে সমাজেও তার প্রভাব পড়ে। পরিবার যদি শক্ত না হয়, তাহলে মানুষ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। হতাশা, একাকীত্ব, অবসাদ বাড়ে। তরুণ প্রজন্ম সহজেই ভুল পথে চলে যেতে পারে। কারণ পরিবারই মানুষের প্রথম নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র। আগে একান্নবর্তী পরিবারে এই শিক্ষা স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যেত। আজ সেই জায়গাটা অনেক ক্ষেত্রে শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
তবে এই অবক্ষয় চিরস্থায়ী নয়। চাইলেই আমরা আবার সম্পর্ককে বাঁচাতে পারি। তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও আন্তরিক চেষ্টা। একান্নবর্তী পরিবার পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা হয়তো আর সম্ভব নয়, কিন্তু তার মূল্যবোধ ও আত্মিক বন্ধন ফিরিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। প্রতিদিন কিছু সময় পরিবারকে দিতে হবে। একসঙ্গে খাওয়া, কথা বলা, হাসা, দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মোবাইল ও প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যেন তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে। মা–বাবাকে শুধু দায়িত্ব হিসেবে নয়, ভালোবাসার মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করতে হবে। সন্তানদের শুধু ভবিষ্যতের যন্ত্র নয়, অনুভূতির মানুষ হিসেবে বুঝতে হবে। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি ও সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবার হলো মানুষের প্রথম আশ্রয়, শেষ ভরসা। একান্নবর্তী পরিবার ছিল আমাদের সমাজের শক্ত শিকড়। সেই শিকড় দুর্বল হয়ে গেলে গাছ যেমন নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তেমনই মানুষও ভিতর থেকে ভেঙে যায়। আধুনিকতার দৌড়ে আমরা যেন সম্পর্ক হারিয়ে না ফেলি। সময়, ভালোবাসা ও যত্ন দিয়েই পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত রাখতে হবে। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ টাকা নয়, পদ নয়, খোঁজে আপনজনের হাত।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।