Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অনুভব
হৃদয় বুদ্ধিমান ছিল, কিন্তু ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। সাধারণ সমাজের চোখে ‘অক্ষম’। আর এই অক্ষমতাকেই নিজের ক্ষমতায় রূপান্তর করেছিলেন উদয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি বোর্ডকে বোঝান — হৃদয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য নন।
অনুভব

ক্যাফে ডি প্যারিসের মালিক উদয় রায় চৌধুরীর কাছে দিনটা শুরু হয়েছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই — নিস্তরঙ্গ বিলাসে। বড়দিনের রাত মানেই তাঁর জীবনে একটাই নিয়ম — কোনো নিয়ম নেই। নাইট ক্লাব, ককটেল পার্টি, বিদেশি অতিথি, হোটেলের স্যুট — এই সবই ছিল তাঁর চেনা পৃথিবী।

উদয় কোনো সাধারণ ধনী ব্যক্তি নন। তাঁকে জমিদার বললে কম বলা হয়। বরং রাজবংশের উত্তরাধিকারী বললে বেশি মানায়। তাঁর বাবা সদয় রায় চৌধুরী ছিলেন সেই সময়ের এক প্রভাবশালী শিল্পপতি — লন্ডন আর প্যারিসে বাড়ি, ভারতে দিল্লি, রাজস্থান, ফরিদপুর, শিমলা, দার্জিলিং জুড়ে বাগানবাড়ি। কলকাতায় আজও কিছু রাস্তা তাঁদের রাজবাড়ির নাম বহন করে। উদয় লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন — ইকোনমিক্স অফ কমার্সে মাস্টার্স। দেশে ফিরে ক্যাফে ডি প্যারিস, নানা ব্যবসা, সামাজিক যোগাযোগ — সব মিলিয়ে জীবনটা ছিল ঝকঝকে। বড়দিনের রাত জ্ঞান হোটেলের একটি স্যুটে কাটানো তাঁর কাছে বিশেষ কিছু ছিল না; তিনি তো বারো মাসের জন্যই একটা স্যুট ভাড়া করে রাখতেন।

একদিন আগেই তাঁর অফিস সেক্রেটারি সাধনা সদ্য জয়েন করা এইচআর হৃষিতাকে বলেছিলেন, "মিস্টার রায় চৌধুরীর ক্যারেক্টারটা ঠিক ভালো না।" হৃষিতা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, "কেন? তোমার সঙ্গে কিছু খারাপ ব্যবহার করেছে?" সাধনা মাথা নেড়ে বলেছিল, "না, আমার সঙ্গে নয়। কিন্তু দেখলাম, কোম্পানির এক নতুন ভেঞ্চারের বিদেশি পার্টনার এসেছিলেন। অফিস দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন। শেষে ডি লা রয়্যাল হোটেলের স্যুটে চলে গেলেন। এমনটাই তাঁর স্বভাব। তবে দেখতে যা ভীষণ হ্যান্ডসাম — যেকোনো মহিলা প্রেমে পড়ে যাবে!"

এই সব কথাবার্তা উদয়ের কানে কখনো পৌঁছায়নি। পৌঁছালেও গুরুত্ব দিতেন না। কারণ নিজের জীবনধারা নিয়ে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না।

কিন্তু সেই ২৬শে ডিসেম্বরেই, হোটেল থেকে বেরোনোর সময়, উদয়ের জীবনটা বদলে যায়। লবিতে তাঁর সঙ্গে যেচে এসে কথা শুরু করেছিল এক মহিলা। বয়সে তাঁর থেকে একটু ছোট হলেও চল্লিশের কাছাকাছি হবে।
"উদয় চৌধুরী?"
"ইয়েস। আপনি?"
"আমি হৃষিতা — আপনার অফিসের নতুন এইচআর।"
উদয় একগালে টোল ফেলে হাসলেন। “আচ্ছা, কী মতলব বলুন তো? এসেই প্রমোশন বাগাবেন নাকি?”
উত্তর না দিয়েই হৃষিতা তাঁর হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিল।

খামের ভেতরে ছিল একটা পুরনো, হলদেটে কাগজে লেখা চিঠি। ১৯৮৫ সালের তারিখ দেওয়া। উদয় দেখেই চিনে ফেললেন — এটা তাঁর বাবার হাতের লেখা।

রানু,

তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার বৌ আছে, দুই ছেলে আছে, সামাজিক সম্মান আছে — সব নষ্ট হয়ে যাবে। আমি তোমার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারব না। কিন্তু আমাদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে যাব।

তুমি কোম্পানির উকিল বিভূতি চন্দ্রর সঙ্গে দেখা করো। ওনাকে সব নির্দেশ দেওয়া আছে। মাসিক পঞ্চাশ হাজার টাকা — যার পরিমাণ প্রতি বছর পাঁচ হাজার করে বাড়বে। ভবিষ্যতে আমার মৃত্যুর পর আমার সম্পত্তি সমান তিন ভাগ হবে — এক ভাগ আমার ছেলে হৃদয়, এক ভাগ আমার দত্তক পুত্র উদয়, আর এক ভাগ আমাদের সন্তানের।

তুমি শুধু একবার বিভূতির সঙ্গে দেখা করো।
পারলে আমাকে ক্ষমা করো।

— সদয় রায় চৌধুরী

চিঠি পড়তে পড়তে উদয়ের মনে হলো ওনার গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে প্রশ্ন করলেন, "এতো বছর পরে এই চিঠিটা নিয়ে এসেছেন কেন? সম্পত্তির জন্য ব্ল্যাকমেল করতে চান?"

সেই প্রথমবার কেউ শুনলো — উদয় রায় চৌধুরীর গলা কাঁপছে।

হৃষিতার চোখেমুখে কৌতুক ফুটে উঠলো। "নিজের বাবার সম্পত্তির পেতে আপনাকে ব্ল্যাকমেল করতে হবে কেন?"

উদয় রায় চোধুরী জীবনে প্রথমবার উত্তর হাতড়াচ্ছেন। হৃষিতা বলে চলে, "চিঠিটা সদ্যই খুঁজে পেয়েছি। মায়ের বাৎসরিকের কাজ সেরে তাঁর পুরোনো ট্রাঙ্কটা খুলেছিলাম। নানা জিনিষপত্রের সাথে একটা কোটও পেলাম, সম্ভবত বাবার। সঙ্গে কিছু ছবি, আর কোটের পকেটে এই চিঠিটা ছিল। মায়ের কাছে মনে হয় বাবার স্মৃতি বলতে শুধু এই কয়েকটা জিনিসই ছিল, তাই একসাথে রেখেছিলেন। কি হলো, উদয়বাবু, আপনার কি শরীর খারাপ করছে?"

উদয়ের মুখের রং সত্যিই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। যেন কেউ ব্লটিং পেপার দিয়ে তাঁর মুখের সব রক্ত শুষে নিয়েছে।

তিনি জানতেন, তাঁর বাবার দুই ছেলে — উদয় ও হৃদয়। হৃদয় বুদ্ধিমান ছেলে, কিন্তু ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। সমাজের চোখে 'অক্ষম'। আর এই অক্ষমতাকেই নিজের ক্ষমতায় রূপান্তর করেছিলেন উদয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি বোর্ডকে বোঝান — হৃদয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য নন। বোর্ড মিটিংয়ে উদয়ই কথা বলতেন। হৃদয়কে সামনে আনা হতো না। একসময় হৃদয়কে মানসিক রোগী সাজিয়ে ধীরে ধীরে ঘরবন্দি করে ফেলা হয়। উদয় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন — এটাই পৃথিবীর নিয়ম — Fortune favours the brave। তিনি জানতেন না — তিনি নিজেই দত্তক সন্তান।

একদিকে পালিত পুত্র উদয় — বিলাসবহুল জীবন।
অন্যদিকে রক্তের সন্তান হৃদয় — চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি।
আর নতুন উত্তরাধিকারী — হৃষিতা, যার অধিকার কারও চেয়ে কম নয়।

বাড়ি ফিরে উদয় পুরনো দলিলপত্র বের করলেন। একের পর এক কাগজ মিলিয়ে দেখলেন। বাবার পুরনো ডায়েরি উল্টে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল সত্যটা — হৃষিতার আনা চিঠিটা মিথ্যে নয়।

সদয় রায় চৌধুরী দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। সন্তানের আশা প্রায় শেষ। এত সম্পত্তি, এত ঐশ্বর্য — কার হাতে যাবে? সেই সময় দিলীপ আর কল্যাণী নামের এক দম্পতি তাঁর কাছে এসেছিলেন। দারিদ্র্যে জর্জরিত। নিজেদের সন্তানকে মানুষ করতে অক্ষম। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, "খেতে-পড়তে দিয়ে মানুষ করলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।" সদয় রায় চৌধুরী শিশুটির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়েছিলেন। অপূর্ব সুন্দর — রাজপুত্রের মতো। স্ত্রীকে ডেকে আনতেই তিনিও রাজি হয়ে যান। তাঁদের নির্দেশেই সেই দম্পতি এলাকা ছেড়ে চলে যান। নিয়মিত টাকা পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এক বছর বয়সে সন্টু হয়ে ওঠে জমিদার বাড়ির রাজপুত্র — উদয়। কয়েক বছর পর সদয় রায় চৌধুরীর নিজের রক্তের সন্তান জন্মায় — হৃদয়। আর এখন জানা গেল — হৃদয়ের এক সৎ বোনও আছে। আর উদয় — এই সাম্রাজ্যের আসল বহিরাগত।

দলিলগুলো দেখে উদয় বুঝে গেলেন — খুব শিগগিরই কোম্পানিতে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হতে চলেছে। সত্যটা অনুধাবন করে তাঁর শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়ল। নিজের পরিচয়, নিজের অস্তিত্ব — সবকিছুই যেন নড়ে গেল। সেদিন ক্লাবে গিয়ে বেহিসাবি মদ্যপান করে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রেম করে যাকে বিয়ে করেছিলেন — লন্ডনের সহপাঠিনী — তার সঙ্গে অনেকদিন ধরেই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, মূলত তাঁর নিজেরই চারিত্রিক দোষে।

এরপর আর কোনোদিন রাজকীয় পোশাক পরেননি। সাধারণ জামাকাপড়েই নিজেকে ঢেকে রেখেছিলেন। বাইরে থেকে জীবন চলছিল আগের মতোই, কিন্তু ভিতরে কোথাও এক গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল। তিনি নিজেকে ঘৃণা করতেন — না পালক পিতাকে, না জন্মদাতা পিতাকে, না ভাইবোনকে — সেটা তিনি নিজেও আর কোনোদিন বুঝে উঠতে পারেননি।

ছোট্ট একটি কাগজের টুকরো — আর একটি মানুষের পুরো জীবন বদলে গেল।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 1 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top