কল্যাণ চৌধুরী মারা গেছেন মাস ছয়েক আগে। জীবদ্দশায় তাঁর ব্যবহার করা কোটটা আলনায় তখন থেকে ঝুলছে। বাবার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে সেটা কাউকে দেয়নি ইলোরা। এখন সেটা পরিষ্কার করে আলমারিতে তুলে রাখবে বলে মনস্থ করল সে। এই কোটটি কল্যাণের খুব প্রিয় ছিল। বাইরে কোথাও গেলে এটা তিনি হাতছাড়া করতেন না। মানুষটি চলে গেছেন। কিন্তু কোটটি অক্ষত রয়ে গেছে। সেটি ইলোরা হারাতে চায় না। বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বাকি জীবন কাটাতে চায়। বাবা তাকে খুব ভালবাসত। বাবার কাছেই মানুষ। সুখ-দুঃখের একমাত্র সাথী ছিল বাবা। আশা-আকাঙ্খা, দুঃখ-যন্ত্রণা, ভাল-মন্দ — সবই নিঃসংকোচে ব্যক্ত করতে পারত বাবার কাছে। মাকে কোনদিন দেখেনি। জ্ঞান হতে বাবাকে মায়ের কথা জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ইলোরার যখন ছ’মাস বয়স তখন সে কঠিন অসুখে মারা গেছে। পাছে মেয়ের যত্নআত্তির ঘাটতি হয় তাই মেয়ের মুখ চেয়ে তিনি আর বিয়ে করেননি। তবে বছর দুয়েক বয়স পর্যন্ত এক দূর সম্পর্কের মাসীকে কাছে রেখেছিলেন মেয়ের দেখাশোনার জন্য। একসময় সেই মাসি নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। তার আর খোঁজ রাখেননি কল্যাণ। তখন থেকে ইলোরা পুরোপুরি বাবার উপর নির্ভরশীল। বাবাকেই সে জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল মনে করে। সেই মানুষটার পছন্দের কোটটার প্রতি তার মায়া পড়ে যাবে — তাতে আর আশ্চর্য কী!
কোটটি পরিষ্কার করার জন্য আলনা থেকে নামাল ইলোরা। পকেটগুলো ভাল করে একটু দেখে নিল। যদি কিছু পকেটে থেকে যায় তাহলে জলে ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে। হাতড়াতে গিয়ে হঠাৎ একটা চিঠি নজরে পড়ল। বহু পুরানো চিঠি। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে, সেই ১৮৮৫ সালে লেখা। চিঠির নিচে তাকিয়ে দেখল, তুলিকা মুখার্জী নামে একজন মহিলা চিঠিটা লিখেছেন। উৎসুক হয়ে সে চিঠিটা পড়তে শুরু করল।
চিঠিটি আসলে একটি প্রেমপত্র। কল্যাণ চৌধুরীর প্রেমিকা তুলিকা মুখার্জী লিখেছেন। নিজের আন্তরিক প্রেম নিবেদন করে চিঠি লিখেছিলেন তুলিকা। চিঠির পরতে পরতে ভালবাসা ঝরে পড়েছিল। আবার ক্ষোভ এবং অভিমানও চাপা থাকেনি। তিনি দ্রুত বিয়ের কাজ সেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। তাই বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্য নববর্ষের দিন তিনি বাবার সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে চিঠি লিখেছেন। কল্যাণ চৌধুরী কি তাঁকে ভালবাসতেন? তিনি চিঠির উত্তরে কী লিখেছিলেন? জানে না ইলোরা। সে কোন প্রমাণ খুঁজে পায়নি। কিন্তু জানতে প্রবল ইচ্ছা করছে। তাঁদের সম্পর্কের অন্তিম পরিণতি কি হয়েছিল? জানতে খুব উৎসাহী হয়ে পড়ল ইলোরা।
ইলোরার মনে নানান প্রশ্ন। প্রকৃতই কে ছিলেন তুলিকা মুখার্জী? কেনই বা আলমারিতে গচ্ছিত না রেখে এতদিন পরেও কল্যাণ চৌধুরী কোটের পকেটে সযত্নে রেখে গেলেন সেই চিঠি? বাবা কি নিজের মৃত্যু আসন্ন বুঝতে পেরে ইচ্ছে করে চিঠিটা তার পড়ার জন্য পকেটে রেখে গিয়েছিলেন? এই চিঠি লেখার পর দু’জনের দেখা হয়েছিল কি? তুলিকার সঙ্গেই কি বাবার বিয়ে হয়েছিল? হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে আসতে লাগল ইলোরার মনের মধ্যে।
চিঠি পড়ে ইলোরার মনে হয়েছে, তুলিকা মুখার্জী তার বাবাকে খুবই ভালবাসতেন। খুবই আন্তরিক ছিল সেই ভালবাসা। কিন্তু কল্যাণ চৌধুরী, মানে তার বাবা, কি তুলিকাকে মন থেকে ভালবাসতেন? তেমন কোন চিঠির সন্ধান পেতে ইলোরা তন্ন তন্ন করে আলমারি খোঁজা শুরু করল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও অন্য কোন চিঠির সন্ধান পাওয়া গেল না। তার বাবা বেঁচে থাকাকালীন কোনদিন তাঁর মুখ থেকে তুলিকার কথা সে শোনেনি। তুলিকার সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক সত্যিই ঠিক কেমন ছিল? এখন তুলিকা মুখার্জী বেঁচে আছেন কিনা, থাকলে কোথায়, কিভাবে আছেন — সবকিছু জানতে তৎপর হল সে। সিদ্ধান্ত নিল, আগামী নববর্ষের আগে যেভাবেই হোক, তুলিকা মুখার্জীকে খুঁজে বের করবে সে। আসল রহস্য তাকে জানতেই হবে।
অনেক খোঁজ করে ইলোরা কল্যাণ চৌধুরীর একসময়ের সমবয়সী বন্ধু রাসবিহারী মুখার্জীর নাম জানতে পারল। এও জানতে পারল, এখনও তিনি জীবিত আছেন। কলকাতায় নিজের কেনা ফ্ল্যাটে থাকেন। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটের সঠিক ঠিকানার খোঁজ না পেলে কিভাবে পৌঁছাবে সেখানে? শুরু হল আরও খোঁজ।
একসময় কল্যাণের স্কুল লাইফের সহপাঠি কমলেশ ভট্টাচার্যকে খুঁজে বের করল। তার কাছ থেকে কল্যাণের প্রেমপর্বের কথা বিশদে কিছু জানতে পারল না, কারণ স্কুল লাইফের পর কল্যাণের সঙ্গে আর তাঁর যোগাযোগ ছিল না। কলেজে পড়াশোনা করার সময় থেকে দু’জনের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তারপর কর্মসূত্রে তিনি কলকাতায় চলে যান। তখন রাসবিহারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। একই এলাকায় বাড়ি হিসেবে তখন থেকে দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। মাঝে মধ্যে দেখা হত, কথা হত। কথাবার্তার মধ্য দিয়ে রাসবিহারীর কলকাতায় বাড়ির ঠিকানা কমলেশ জেনেছিলেন। তিনি সেই ঠিকানা ইলোরাকে সবিস্তারে জানালেন। ইলোরাকে এও বলে দিলেন যে, নিজের বাড়ি ছেড়ে নতুন করে অন্য কোথাও চলে গিয়েছেন কিনা তা তিনি জানেন না। খোঁজ করে দেখতে হবে।
না, ঠিকানা পরিবর্তন হয়নি। কমলেশের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে ইলোরা রাসবিহারী মুখার্জীর দেখা পেলেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর রাসবিহারী তাঁকে বসার ঘরে ডেকে বসালেন। ইলোরা প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে আসল কথা শুরু করল।
"আমি একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে অনেক খোঁজাখুঁজি করে আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আমার আশা, বাবার বন্ধু হিসেবে আপনি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।"
"বল, তোমার কী প্রশ্ন?"
"বলছিলাম, আমি আমার মাকে কোনদিন দেখিনি। বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বলেছেন, আমার যখন ছ’মাস বয়স তখন মা মারা গেছে। আমার কথা ভেবে বাবা আর বিয়ে করেননি। ফলে আমি বাবার কাছেই মানুষ। এতদিন ধরে আমি এটাই বিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর একদিন তাঁর কোটের পকেট থেকে একটা চিঠি পাই। চিঠিটা আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের লেখা। কাগজের অবস্থা দেখেও মনে হয়, বহু পুরানো চিঠি। চিঠি দেখে আমার মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আপনার কাছে আসা।"
"চিঠিটা কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা? তাতে কী লেখা আছে? পত্রলেখক কে?"
"চিঠিটা একটি প্রেমপত্র। বাবার উদ্দেশে লেখা। পত্রপ্রেরকের নাম লেখা আছে তুলিকা মুখার্জী। চিঠিতে পত্রলেখক নববর্ষে বাবার সঙ্গে জরুরিভাবে দেখা করার কথা লিখেছিলেন। কিন্তু তারপর সেই দেখা হয়েছিল কিনা, বাবা কিছু উত্তর দিয়েছিল কিনা, সেই প্রেমের পরিণতি কী হয়েছিল — কিছুই জানা যায়নি। সবটাই রহস্যে মোড়া। অথচ আমার সেকথা জানা ভীষণ জরুরি। সেই কৌতূহল নিরসনের উদ্দেশে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।"
সবকিছু অবগত হয়ে রাসবিহারী বললেন, "তোমার কি এসব প্রশ্নের উত্তর জানা খুব জরুরি?"
"জরুরির চেয়েও বেশি কৌতূহল। বাবার পকেটে কেন চল্লিশ বছর আগের চিঠি গচ্ছিত থাকল? কেবল ওই একটি চিঠি ছাড়া অনেক অনুসন্ধান করেও আর কোন চিঠির সন্ধান কোথাও কেন পাওয়া গেল না? ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন রহস্যময় লাগছে।"
রাসবিহারী বললেন, "তোমার হাতে সময় আছে তো কথাগুলো শোনার মতো?"
"আছে। শোনার জন্যই অনেক খোঁজ নিয়ে আজ আপনার কাছে এসেছি।"
রাসবিহারী শুরু করলেন, "তুমি ঠিকই বলেছ, তুলিকা মুখার্জীর সঙ্গে কল্যাণের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক এক সময় গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। দু’জনে একসঙ্গে পুরী বেড়াতে যায়। তখনই তুলিকার গর্ভে সন্তান চলে আসে। কল্যাণ সেই সন্তান নষ্ট করে দিতে বলে। তুলিকা রাজি হয়নি। সে কল্যাণকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতেই নববর্ষে কল্যাণের সঙ্গে তুলিকা দেখা করতে চেয়েছিল। দেখাও হয়েছিল সেদিন। কিন্তু বিয়ে হয়নি। ফলে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য চরম আকার নেয়। অনেক কথা কাটাকাটির পর কল্যাণ তুলিকাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে রাজি হয়। কিন্তু সময় চলে যায়। কল্যাণ তুলিকাকে বিয়ে করেনি। তখন আর সন্তান নষ্ট করে দেওয়ার অবস্থা ছিল না। একসময় গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ট হয়। তুলিকা সারাজীবন অবৈধ সন্তান বয়ে বেড়াতে রাজি হয়নি। কেন জানি না, কল্যাণ তুলিকাকে বিয়ে করতে না চাইলেও সন্তানের বাবার পরিচয় এবং সন্তানের দায়ভার নিতে অস্বীকার করেনি। সে তুলিকা এবং সন্তান উভয়কেই নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল। তুলিকা রক্ষিতার মতো জীবনযাপন করতে রাজি হয়নি। সে কল্যাণের কাছে নিজের সন্তানকে রেখে চলে আসে। সেই থেকে তুলিকার সঙ্গে কল্যাণের কোন যোগাযোগ নেই। তুলিকা সন্তানের অধিকার ছেড়ে দিলেও শান্তি পায়নি। কল্যাণের বিয়ে করতে অস্বীকার করাকে আজও সে ক্ষমা করতে পারেনি। তুমি কল্যাণের ঔরসজাত, তুলিকার গর্ভস্থ সেই সন্তান — কল্যাণ যাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে।"
অবাক দৃষ্টিতে রাসবিহারীর দিকে তাকিয়ে থাকল ইলোরা। তার চোখের পাতা পড়ছে না। সে জিজ্ঞাসা করল, "আপনি এত নিখুঁত বিবরণ জানলেন কী করে?"
"জানলাম, কারণ তুলিকা আমার নিজের বোন। সে সারাজীবন আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি দাদা হিসেবে তাকে ফেলতে পারিনি।"
রাসবিহারী ডাকলেন, "তুলি, একবার এখানে আয়। দেখে যা, কে এসেছে।"
তুলিকা ভিতর থেকে সব আলোচনা শুনেছেন। তিনি গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখিয়ে রাসবিহারী বললেন, "এই যে তুলিকা। ইনি তোমার মা।"
ইলোরা এবং তুলিকা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল। দু'জনেরই চোখে জল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর মা-মেয়ে পরস্পরের সম্মুখীন।