অর্ণব একজন রাতের প্রহরী। কলকাতার বুকে বিশাল, পুরোনো একটি উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। ডিসেম্বর মাস। শহরজুড়ে কনকনে ঠান্ডা, আর পার্কজুড়ে জমাট কুয়াশার রাজত্ব। ঘড়িতে তখন রাত তিনটা। এই সময়টাতেই নিস্তব্ধতা যেন তার পূর্ণ আকার ধারণ করে — এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও অত্যন্ত জোরে মনে হয়।
অর্ণব তাঁর জ্যাকেটের কলার তুলে নিলেন। টর্চটা হাতে শক্ত করে ধরা। এটি শুধুমাত্র আলোর উৎস নয়, রাতের অন্ধকারে এটি যেন অর্ণবের একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী। রোজকার মতো তিনি টহল শুরু করলেন।
কুয়াশা আজ যেন অতিরিক্ত গাঢ়। দৃশ্যমানতা নেমে এসেছে ফুট দুয়েক দূরত্বে। সবকিছুকে আবছা, ভেজা এবং ভৌতিক দেখাচ্ছে।
“উফ, কী ঠান্ডা!” অর্ণব কাঁধ ঝাঁকালেন।
শিশুদের খেলার জায়গাটা যখন তিনি পেরোচ্ছেন, তখন তাঁর কান যেন কোনো এক অস্বাভাবিক শব্দে সজাগ হয়ে উঠল।
ঝং… ঝং… ঝং…
শব্দটা আসছে দূরের সেই মরচে ধরা দোলনাগুলো থেকে। পুরোনো ধাতব শিকলগুলোয় দুললে এমন একটানা শব্দ হয়। কিন্তু এত রাতে? পার্কে তো কেউ থাকার কথা নয়! পার্কের প্রধান ফটক সেই সন্ধ্যাতেই বন্ধ হয়ে গেছে।
অর্ণবের হৃৎপিণ্ড হঠাৎ দ্রুত তাল কাটতে শুরু করল। এমন বেমানান শব্দ সবসময়ই কোনো অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দেয়।টর্চটা তিনি সেদিকে ঘোরালেন। প্রথমবার ফোকাসটা পড়ল না। ঝংকারের গতি বাড়ছে—ঝং-ঝং-ঝং… কেউ যেন পূর্ণ শক্তিতে দোল খাচ্ছে। এবার টর্চটা ঠিক জায়গায় পড়ল।
আলোর বৃত্তে অর্ণব যা দেখলেন, তাতে তাঁর শরীর যেন এক লহমায় পাথর হয়ে গেল।
দোলনায় বসে আছে একটি ছায়ামূর্তি। সেটি স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়। কোনো শরীর নেই—শুধু একটি ছোট আকৃতির অবয়ব। যেন একটি শিশুর মতো, কিন্তু এর কোনো মুখ নেই, কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। মাথাটা শুধু কুয়াশার মতো ধোঁয়া হয়ে পাক খাচ্ছে, উপরের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। আলো যেন তার ভেতর দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে।
অর্ণবের মুখ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে গেল।
ছায়ামূর্তিটি দোল খাওয়া থামিয়ে দিল। ঝং ঝং শব্দ মিলিয়ে গেল। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সেটি ধীরে ধীরে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াল। যেন একটি অদৃশ্য শক্তি অর্ণবের দিকে তাকাল। সেই মুহূর্তে আশেপাশে এক তীব্র, অস্বাভাবিক ঠান্ডা নেমে এল—ডিসেম্বরের শীতের থেকেও লক্ষ গুণ বেশি। অর্ণবের শিরা-উপশিরায় যেন বরফ জমাট বাঁধল। ত্বক মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠল।
অর্ণব তাঁর ডিউটির কথা ভুলে গেলেন। তাঁর বহু বছরের অভিজ্ঞতা, সাহস, কর্তব্যবোধ — সবকিছুই এই অলৌকিক দৃশ্যের সামনে নতি স্বীকার করল। তিনি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, শ্বাস নিতেও ভুলে গেলেন।
ঠিক তখনই, নিস্তব্ধতার বুক চিরে, পার্কের পুরোনো লেকের দিক থেকে ভেসে এল একটি করুণ কান্নার শব্দ। যেন চাপা আর্তনাদ। বাতাস ভারী হয়ে উঠল অমানবিক বিষাদে।
কান্নার শব্দটা শুনে ছায়ামূর্তিটি তার মনোযোগ অর্ণবের দিক থেকে সরিয়ে লেকের দিকে ঘুরল। এর চলার পথে মাটি স্পর্শের কোনো শব্দ নেই — শুধু কুয়াশা যেন একটু বেশি নড়ছে। অর্ণব টর্চটা শক্ত করে ধরে আছেন, হাত কাঁপছে। মস্তিষ্ক বলছে, “দৌড়ে পালাও, এটা স্বাভাবিক নয়!” কিন্তু অর্ণবের চোখ এই দৃশ্য থেকে সরে যেতে পারছে না। এটা কি স্বপ্ন? নাকি কুয়াশা আর শীতের বিভ্রম?
হঠাৎ লাইটপোস্টগুলোয় যেন শর্ট সার্কিট হল। একে একে তারা নিভে যেতে শুরু করল — প্রথমটা, তারপর দ্বিতীয়টা, আর লেকের কাছে থাকা তৃতীয়টা যখন নিভল, তখন পুরো এলাকা গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল।
অর্ণব যেন ভয় আর কর্তব্য — এই দুইয়ের মাঝে একটি অদৃশ্য রশিতে ঝুলছেন। তিনি একজন প্রহরী। যদি কোনো সমস্যা হয়ে থাকে? যদি কোনো মানুষ বিপদে পড়ে থাকে? কিন্তু… মানুষ?
সাহস সঞ্চয় করে তিনি এক পা, তারপর আরেক পা করে ছায়াটির অনুসরণ করলেন। ঠান্ডা আরও জাঁকিয়ে বসেছে। প্রতিটি শ্বাস যেন ফুসফুসে বরফ গলা জল ঢেলে দিচ্ছে।
লেকের ধার। পার্কের এই অংশটা সবচেয়ে পুরোনো এবং ঘন গাছপালায় ঢাকা। লেকের জল কালচে, স্থির — যেন রাতের সব অন্ধকার শুষে নিয়েছে। অর্ণব টর্চের ক্ষীণ আলোয় দেখলেন, ছায়াটি লেকের ধার দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে, জলের খুব কাছাকাছি। এটি যেন হেঁটে জলের উপর দিয়েই যাচ্ছে — শিশু-সদৃশ ছায়া। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য — লেকের স্থির কালো জলে ছায়াটির কোনো প্রতিফলন নেই। ঠিক যেন শূন্যে হেঁটে যাচ্ছে সে।
অর্ণবের বিশ্বাস টলে গেল। এটা বিভ্রম নয়। এটা এমন কিছু, যা প্রকৃতির নিয়মের বাইরে।
ঠিক তখনই, কুয়াশার একটি ঘন আস্তরণ লেকের দিক থেকে ভেসে এল, অর্ণবকে প্রায় ঢেকে দিল। দৃশ্যমানতা আরও কমে গেল। এই গাঢ় কুয়াশার ফাঁক দিয়ে অর্ণব দেখলেন — শিশু ছায়াটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ছায়া।
এই দ্বিতীয় ছায়াটি আকারে বড়, একজন মেয়ের মতো অবয়ব। যেন লম্বা চুলের একজন নারী। তারও কোনো মুখ বা বৈশিষ্ট্য নেই — শুধু ধোঁয়ার এক নরম কুণ্ডলী। মেয়ে-সদৃশ ছায়াটি তার অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে যেন বাচ্চাটিকে ডাকছে। তাদের মধ্যে কোনো কথা হচ্ছে না, কিন্তু তাদের উপস্থিতি যেন এক নীরব, মর্মান্তিক কথোপকথন তৈরি করছে।
অর্ণবের ভেতরে থাকা চাপা আবেগটা যেন এবার জেগে উঠল। বাতাসের একটি তীব্র ঢেউ সবকিছু কাঁপিয়ে দিল। কুয়াশা দ্রুত গতিতে পাক খেতে শুরু করল। অর্ণব তাঁর চোখ সরাতে পারলেন না। এক সেকেন্ডের মধ্যে, দুজন ছায়াই যেন দ্রুতগতিতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেল, এবং পরের মুহূর্তেই তারা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
অর্ণব সেই জায়গায় পৌঁছে গেলেন। তীব্র ঠান্ডা তখনও রয়েছে, কিন্তু কুয়াশা একটু হালকা হয়েছে। তিনি টর্চটা মাটিতে নামিয়ে ধরলেন। যেখানে ছায়া দুটি দাঁড়িয়েছিল, ঠিক সেই ভেজা মাটি আর পাথরের ওপর পড়ে আছে একটি ছেঁড়া স্কুলব্যাগ — হালকা সবুজ রঙের। বৃষ্টি বা শিশিরে ভিজে ব্যাগের রং প্রায় ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে। নরম মাটিতে একটি ভেজা ছোট জুতোর ছাপ — একটি শিশুর জুতোর ছাপ — পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ছাপটি লেকের দিকে নেমে গেছে, যেখানে ছায়াটি ছিল।
অর্ণবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এটা কোনো কল্পনা নয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে ফোন করলেন। তাঁর গলা কাঁপছে। “স্যার, আমি অর্ণব সেন, ময়ূখ উদ্যান থেকে বলছি। অস্বাভাবিক ঘটনা। একজন শিশু… লেকের ধারে কিছু একটা ঘটেছে। ব্যাগ আর জুতোর ছাপ…”
কিন্তু কী বলবেন তিনি?
পরের এক ঘণ্টা চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে কাটল। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে এল। কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। মর্নিং ওয়াকাররা পার্কে ঢুকতে শুরু করেছেন, ভিড় জমছে। অর্ণব ঘটনাটা খুলে বললেন — দোলনার ঝংকার, মুখহীন ছায়া, তীব্র ঠান্ডা, কান্নার শব্দ এবং অবশেষে লেকের ধারে দুজন ছায়ার মিশে যাওয়া। তাঁর কথায় কেউ বিশ্বাস করল না।
পুলিশ অফিসার রুদ্র মিত্র, একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি অর্ণবের দিকে কৌতূহল আর সন্দেহের মিশ্রণে তাকিয়ে বললেন, “অর্ণববাবু, আপনি খুব টেনশনে ছিলেন মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শীত, কুয়াশা — অনেক সময় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মানসিক চাপও কাজ করে।“
কিন্তু ব্যাগটা সত্যিই পাওয়া গেল। সবুজ স্কুলব্যাগ, ভেতরের জিনিসপত্র ভিজে সপসপে। রুদ্র মিত্র নিজের হাতে ব্যাগটা তুলে নিলেন। এটা প্রমাণ করে যে রাতে কেউ না কেউ এখানে ছিল। কিন্তু কেন?
“ব্যাগটা ফরেনসিকের জন্য পাঠানো হচ্ছে,” রুদ্র মিত্র বললেন, “আপনি বাড়ি যান। বিশ্রাম নিন।“
কিন্তু অর্ণবের চোখে লেগে থাকা সেই দৃশ্য কিছুতেই মন থেকে মুছে গেল না।
পরের দিন। রবিবার। অর্ণব বিছানায় শুয়েও শান্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি জানেন — তিনি যা দেখেছেন, তা সত্যি। শুধু ব্যাগের অস্তিত্ব সেই সত্যিটাকে প্রমাণ করে না। তিনি আরও কিছু খুঁজছিলেন।
সকাল দশটায় চায়ের দোকানে এসে তিনি সংবাদপত্রের পাতা ওল্টাতে শুরু করলেন। বড় বড় খবরগুলোয় চোখ বোলাচ্ছেন। পুলিশের তরফ থেকে কোনো খবর নেই — এটাই স্বাভাবিক। তারা হয়তো তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। হঠাৎই ভেতরের একটি ছোট কলামে তাঁর চোখ আটকে গেল।
শিরোনাম — ময়ূখ উদ্যান : ফিরে দেখা এক মর্মান্তিক স্মৃতি
খবরে লেখা — ‘গতকাল ময়ূখ উদ্যানের লেকের ধার থেকে একটি পুরোনো স্কুলব্যাগ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় পুলিশ একটি পুরোনো ফাইলের পাতা ওল্টাচ্ছে। ঠিক পাঁচ বছর আগে, ডিসেম্বরের এমনই এক কনকনে রাতে, এই লেকেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। একজন হতাশাগ্রস্ত মা তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে লেকের জলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। ছেলের স্কুলব্যাগ, যেটি তার কাঁধে ছিল, সেটি পাওয়া গিয়েছিল লেকের ধারেই। মর্মান্তিক এই ঘটনা সেই সময় পুরো শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। মা ও সন্তানের দেহ প্রায় এক সপ্তাহ পরে উদ্ধার হয়।‘
অর্ণবের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। পাঁচ বছর আগে… এই লেকেই ডুবে মারা গিয়েছিল এক মা ও তার সন্তান। ছায়া দুটি কি তাহলে তারাই ছিল? রাতের সেই দুই ছায়া… তারা কি সত্যিই ফিরে এসেছিল?
নাকি সবটাই অর্ণবের কল্পনা?