শীতের রাত কলকাতাকে এক অদ্ভুত নীরবতায় ভরিয়ে তোলে। দিনের হৈচৈ, গাড়ির আওয়াজ, মানুষের চিৎকার — সব কিছু ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। কুয়াশা যখন রাস্তায় নেমে আসে, শহরটা যেন নিজের ভেতরের সত্যটা প্রকাশ করে। এই শহরের প্রতিটি মোড়, প্রতিটি গলি মুখস্থ সোমনাথ — একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার, যে শীতের রাতেই কাজ করতে সবচেয়ে বেশি শান্তি পায়। কিন্তু সেই রাতে শান্তির বদলে কিছু অদ্ভুত অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দেড়টা ছুঁইছে। সোমনাথ দাঁড় করিয়েছিল তার হলুদ অ্যাম্বাসাডরটাকে গড়িয়াহাট ক্রসিং-এর একটু পাশে। ঠান্ডায় দু'হাত ঘষছে, আর ভাবছে — এখনই হয়তো বাড়ি ফিরে যাবে। ঠিক তখনই — টক্ টক্। কেউ জানালায় নক করল। একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা শাল জড়ানো, চুল একটু ভেজা, যেন অনেকটা রাস্তা হেঁটে এসেছে কুয়াশার ভিতর দিয়ে। আশ্চর্য — এতো ঠান্ডা, অথচ তার গায়ে শিরশির ভাবের কোনো চিহ্ন নেই।
মহিলা খুব শান্ত স্বরে বললেন, "রবীন্দ্র সরোবর... লেকের ধারে যাবে?" সোমনাথ অবাক হল। এই রাতে লেক? সে বলল, "সময়টা দেখছেন, দিদি? রাত তো অনেক হয়েছে... ওইদিকে —" মহিলা বললেন, "যেতে হবে। দয়া করে।" সুরের মতো নরম কণ্ঠ। পরিচিতও মনে হল, অথচ মনে পড়ল না কোথায় শুনেছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে দরজা খুলে দিল সে। মহিলা পিছনের সিটে বসে পড়লেন — কিন্তু বসার কোনো শব্দ হলো না। যেন ওজনহীন।
গাড়ি কুয়াশার মধ্যে চলতে লাগল। হেডলাইটের আলো কয়েক ফুট গিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ঘন সাদার ভেতর। মহিলা হঠাৎ বললেন, "আপনি কি প্রতিদিন এই সময় ড্রাইভ করেন?" সোমনাথ বলল, "এই রাতে ভাড়া ভালো মেলে। ট্রাফিকও কম।" তিনি ধীরে বললেন, "মানুষও কম।" সোমনাথ জিজ্ঞেস করল, "কি বললেন, দিদি?" তিনি চুপ। সোমনাথ রিয়ারভিউ মিররে তাকাল। মহিলা বাইরে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু তার প্রতিচ্ছবি নেই। মিরর মুছে আবার তাকাল — পেছনের সিট খালি।
হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। "দিদি!" ঠিক পিছন থেকেই শান্ত গলা শোনা গেল, "কেন থামলেন? আমরা পৌঁছে গেছি প্রায়।" সোমনাথ পিছনে তাকাল। তিনি বসে আছেন, যেন কিছুই হয়নি। তিনি বললেন, "চালান।"
রবীন্দ্র সরোবর রাতে অন্যরকম। আলো কুয়াশায় গিলে যায়, গাছেরা দাঁড়িয়ে থাকে নিরব সাক্ষীর মতো, আর লেকটা যেন এক গভীর অন্ধকার চোখ। গাড়ি থামতেই মহিলা নামলেন। বললেন, "একটু অপেক্ষা করুন।" সোমনাথ বলল, "দিদি… কেন এলেন এখানে? এই সময়টা ঠিক না।" তিনি মৃদু হেসে বললেন, "অনেকদিন আগে এখানেই কিছু ফেলে গিয়েছিলাম।" তিনি হাঁটলেন লেকের দিকে। পায়ের কোনো শব্দ নেই। শালটা এখন আর সাদা নয় — ভেজা, ভারী, গাঢ় দাগে ভরা। সোমনাথের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
সে দৌড়ে বলল, "দিদি! দাঁড়ান! কি হচ্ছে?" তিনি লেকের ধারে দাঁড়িয়ে বললেন, "আপনি তো সবটা দেখেন, তাই না?" তারপর কানে এলো জলের শব্দ — ছলাৎ ছলাৎ। এক স্মৃতি। তিন বছর আগে, আরেক শীতের রাত। একই শাল, একই গান, একই সিট। তিনি নেমেছিলেন এখানেই। পরদিন খবর — মেয়েটি নিখোঁজ। শাল ভেসে পাওয়া গেছে। পুলিশ জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলেছিল, "মনে নেই।" আসল সত্য — সে ভুলতে চেয়েছিল।
মহিলাটি ফিরে তাকালেন। "আপনি চলে গিয়েছিলেন," তিনি বললেন। "আমি তখনো সিঁড়ির কাছে ছিলাম।" সোমনাথ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। "আমি ভুল করেছি... দিদি... ক্ষমা করবেন... " তিনি বললেন, "কি হত, আপনি যদি অপেক্ষা করতেন? আমিও জানি না। আপনি-ও জানেন না।" কুয়াশা আরও হিমেল হয়ে উঠল।
তিনি কাছে এসে বললেন, "একটা কাজ করবেন?" সোমনাথ বলল, "যা বলবেন..." তিনি বললেন, "মাকে বলবেন — আমি দুর্বল বলে দুঃখিত।" তিনি একটি ছোট রুপোর লকেট দিলেন। ভেতরে তাঁর আর বৃদ্ধা মায়ের ছবি। সোমনাথ তাকাল — তিনি নেই। শুধু কুয়াশা।
ঠিকানা যেন নিজে থেকেই মনে এলো। লেক গার্ডেন্সে বাড়ি। বৃদ্ধা দরজা খুলতেই লকেট দেখে কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, "আমার মেয়ে... ফিরল?" সোমনাথ বলল, "ফিরেছে... নিজের মতো করে।"
ট্যাক্সিতে ফিরে দেখল, পেছনের সিটে একটি ভেজা পদচিহ্ন। কুয়াশা ধীরে সরে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের লাল আলো আকাশে জ্বলে উঠছে। সোমেনাথ স্টিয়ারিং ধরে বুঝল — আজকের রাত তাকে এমন এক সত্য দিল, যার জন্য সে কোনোদিনই প্রস্তুত ছিল না।