প্রথম তিনটি অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
চতুর্থ অধ্যায়
সেদিন সবজান্তার দাদার সঙ্গে আলোচনায় যা কথা হয়েছিল তা আপনাদের গত তিন পর্বে আপনাদের জানিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় দাদা বলেছিল, এরপর ও আমাকে গবেষকদের মতে প্রথম বিখ্যাত ভূতের কথা শোনাবে। এ নিয়ে ওর কাছে শোনার আগে আমি একটু খোঁজখবর শুরু করেছিলাম। যা পেয়েছি সেটা আগে জানাই।
আদিকালের কিছু হিব্রু নথির খোঁজ পাওয়া গেছে, যেখানে জীবিত মানুষেরা মৃতদের সঙ্গে বা ভূতেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আগের সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম, প্রায় সব সভ্যতাই বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুর পর আত্মার কিছু একটা রূপের অস্তিত্ব আছে। সেখানে অনেকেই বলেছেন, শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া আত্মারা একটা 'ইথার' জগতে অবস্থান করে। যেখানে আমাদের চেনাজানা সময়ের পার্থিব নিয়মকানুন মেলে না। আর সেই জন্যেই যারা মারা যায় তারা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত দেখতে সক্ষম। অতএব যদি আপনি সত্যিই জানতে চান যে, আগামীকাল কী ঘটতে চলেছে, তাহলে এ ব্যাপারে যারা সবচেয়ে ভালো জানে, সেই 'তেনা'দের শরণাপন্ন হওয়াই সঠিক কাজ। কি বলেন?
আর এই কথাকেই বাস্তবে পরিণত করতে সব সমাজেই সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত, এমন সব বিশেষজ্ঞদের দেখতে পাওয়া গেছে বা যায় এবং যাবেও যারা জীবিত মানুষের সাথে আত্মার যোগাযোগ করতে সাহায্য করতে এক পা বাড়িয়ে বসে আছেন। তাদের পরিচয় আপনারা সবাই জানেন। এরা মৃতদের সাথে কথোপকথন করার জন্য এক বিশেষ ধরণের ভবিষ্যদ্বাণী বা ভাগ্য বিচার করা পদ্ধতি ব্যবহার করে। যা 'নেক্রোম্যান্সি' নামে পরিচিত। এই শব্দটির উৎপত্তি গ্রীক শব্দ 'নেক্রোম্যান্টিয়া' শব্দ থেকে। যার ভেতর আছে দুটো শব্দ 'নেক্রস' বা মৃত মানুষ এবং 'ম্যান্টেইয়া' বা ভবিষ্যত কথন।
আজ যদিও নেক্রোম্যান্সি শব্দটা 'ম্যাজিক' এর আর একটা রূপ হিসাবে ব্যবহার হয়, কিন্তু মূল শব্দর সঙ্গে কিছু পরিমাণ গুপ্ত এবং অপ্রীতিকর বিষয় মিশে আছে। একদা 'নেক্রোম্যান্সি' এই শব্দটা কেবলমাত্র মৃতের আত্মাকে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে সক্ষম বিদ্যার জন্যই ব্যবহার হত বা এই কলাবিদ্যাকেই নির্দেশ করত।
'নেক্রোম্যান্সি' বিদ্যাকে বাস্তবিকপক্ষেই যেকোনো ভাগ্য গণনাকারী, জাদুকর এবং বিশেষত মায়াবী জাদুকর বা 'সরসরার'দের জন্য এক অপরিহার্য দক্ষতা হিসাবে বিবেচনা করা হত। একটা আত্মা আহ্বান প্রক্রিয়ায় প্রকৃত জাদুকরকে যথেষ্ট কৃচ্ছসাধন করতে হত। যার ভেতর অন্যতম ছিল উপবাস । তা ছাড়াও ছিল গোপন আচারপ্রথা পালন নানা অজ্ঞাত মন্ত্র সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে শেখা। সাথেই জাদুবৃত্ত অঙ্কণ প্রণালী অধ্যয়ন। যার সামান্য মাপের গণ্ডগোলে জগত ভারসাম্যর উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্বাস করেন এই বিদ্যায় বিশ্বাসীরা।
এই অংশটুকু লিখে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম সবজান্তা দাদার কাছে। পড়ে শোনানোর পর ও আমাকে একটা প্রশ্ন করল।
➖ আচ্ছা তোর কি এরকম কিছু মনে হয় যে, বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবী জুড়ে এত অশান্তির কারণ অশিক্ষিত জাদুকরদের ভুলভাল কাজকর্ম?
একটু আধটু লেখা লিখি করি, তাই মনে হল এটা বেশ ভালো একটা গল্পের প্লট। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা দাদা বলা কথার ভিত্তিতে যেকোনও সমস্যা তা সে ছোটো হোক বা বড়, সামজিক হোক বা রাজনৈতিক, এই একটা যুক্তিতেই সমাধান করে দেওয়া যায়। এসব কথা যখন ভাবছি শুনতে পেলাম দাদার গলা,
➖ কি রে কী এত ভাবছিস? তোর ওই 'নেক্রোম্যান্সি'র সঙ্গে 'উইচক্র্যাফট' নামক একটা শব্দের যোগাযোগ আছে জানিস তো?
➖ হ্যাঁ, জানি। সোজা কথায় যাকে বলে ডাইনি বিদ্যা। যোগাযোগ থাকাটাই স্বাভাবিক, মৃতের মুখ থেকে কথা শোনা আর শয়তানি জগতের সঙ্গে যোগাযোগ তো ডাইনি চর্চার একটা অঙ্গ।
➖ বেশ। তা, প্রাচীন যুগের উইচক্র্যাফটের প্রামান্য নথি বিষয়ে কিছু জানা আছে তোর?
➖ 'নেক্রোম্যান্সি'র ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত নথিভুক্ত ঘটনা হল, 'উইচ অফ এন্ডোর'-এর কাছ থেকে সাউলের পরামর্শ নেওয়া। যা পবিত্র বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে পাওয়া যায়। প্রথম স্যামুয়েলের পুস্তক: ২৮-৭১৬ তে এর উল্লেখ আছে। মোজেসের প্রচলিত আইন অনুসারে 'নেক্রোম্যান্সি' এবং জাদুবিদ্যা ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল সেই সময়ে।
"তোমার বেঁচে থাকার জন্য কোনও 'উইচ'কে কষ্ট পেতে দেওয়া চলবে না।" এক্সোডাস ২২:১৮ তে কথাটা পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। অর্থাৎ নিজে ভালোভাবে বাঁচার জন্য কাউকে 'উইচক্র্যাফট' বিদ্যার জন্য উৎসাহিত করা যাবে না।
"যে পুরুষ বা মহিলার পরিচিত বা অধীনস্থ আত্মা বা যে জাদুকর থাকবে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে।" এটা লেখা আছে লেভিটিকাস ২০:২৭ এ।
আবার ডিউটেরোনমি ১৮:১০১৩ তে পাওয়া যাচ্ছে, "তোমাদের মধ্যে যেন এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া না যায়, যে ভবিষ্যদ্বাণী করে [সুথসেয়ার] বা একজন জাদুকর বা একজন 'আউগার' [এরা কোনও একটা ছোটো জন্তু কেটে তার আঁতড়ি বা নাড়িভুড়ির অবস্থান দেখে ভাগ্য বিচার করতেন] বা একজন মায়াবী জাদুকর [সরসরার] বা একজন 'চার্মার' বা একজন 'মিডিয়াম' বা 'উইজার্ড' বা 'নেক্রোম্যান্সার' এর জীবনধারণ করে বেঁচে আছে। যে কেউ এই কাজগুলো করে সে মহান প্রভুর কাছে একজন ঘৃণ্য সত্তা রুপে বিবেচিত।"
সাউল নিজেই ইস্রায়েলীয়দের মধ্যে জাদুবিদ্যাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, যারা পরিচিত বা অধীনস্থ আত্মার সাহায্য যে নেবে বা জাদুর চর্চা করবে, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে। তবুও, অবস্থার বিপাকে পড়ে সেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজাই একজন 'নেক্রোম্যান্সার' এর সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন।
➖ কেন?
➖ মানুষের বিশ্বাস অনুসারে মহান প্রভু তথা ঈশ্বর ডেভিডকে সাউলের উত্তরসূরি হিসাবে অভিষিক্ত করেছিলেন। যার প্রস্তুতি হিসাবে ডেভিড শাসকের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী গঠন শুরু করেন। এমতাবস্থায় সাউলের পরামর্শ প্রয়োজন ছিল এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় ততই ভালো। ফলে নিজেই অবৈধ ঘোষনা করা 'নেক্রোম্যান্সি'র সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আপাতত কী করবেন এটা জানার জন্য তিনি স্যামুয়েলের আত্মাকে ডেকে আনার কথা ভাবেন। খোঁজখবর নিয়ে সাউল জানতে পারেন এন্ডোর শহরে এরকম একজন আছেন যিনি এই নিষিদ্ধ কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম।
যাতে তাকে কেউ চিনতে না পারে তার জন্য সাউল ছদ্মবেশ ধারণ করেন এবং তথাকথিত 'উইচ অফ এন্ডোর' এর কাছে যান। ওই 'নেক্রোম্যান্সার' রাজা স্যামুয়েলের আত্মাকে জাগ্রত করেওছিলেন। কিন্তু মৃত রাজা এই ঘটনায় এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে উনি সাউলকে সাহায্য বা পরামর্শ দিতে অস্বীকার করেন। যার ফলস্বরুপ যুদ্ধে ডেভিডের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন সাউল।
➖ বাহ্, ভালোই পড়াশোনা করছিস মনে হচ্ছে। যাকগে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে ওই 'উইচ অফ এন্ডোর' সম্ভবত সেই অর্থে ডাইনী বা জাদুকর ছিলেন না। বরং বলা যেতে পারে প্রাচীন গ্রীসের 'অর্যাকল' জাতীয় কিছু একটা ছিলেন। প্রসঙ্গত জানাই, প্রাচীন গ্রীসের এই 'অর্যাকল'রা ভবিষ্যতের খবর সংগ্রহ করতেন দেবতাদের কাছ থেকে। কখনও সে কাজে তারা মৃতদেহের সাহায্য নিতেন।
➖ হ্যাঁ 'অর্যাকল'দের বিষয়েও পড়ছিলাম। ডেলফিতে এ্যাপোলোর মন্দিরের 'অর্যাকল' ছিলেন সেই সময়ের অসংখ্য 'অর্যাকল'দের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত । এই 'অর্যাকল'রা প্রায় সবাই মহিলা ছিলেন। যারা প্রাচীন গ্রীসে মন্দিরেই বসবাস করতেন। 'অর্যাকল'-এর সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য, প্রার্থনাকারীকে পর্যাপ্ত 'নৈবেদ্য' পেশ করতে হত। তবেই সুযোগ পাওয়া যেত ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার। দেবতাদের সঙ্গে পরামর্শ করার আগে 'অর্যাকল'দের 'ভর' বা 'ট্রান্স' হত বা উঠত বলাই ভালো। ঠিক যেমনটা আমাদের নানান পুজোর সময় দেখতে পাওয়া যায়। প্রয়োজনে 'অর্যাকল'রা আন্ডারওয়ার্ল্ডে বাস করা আত্মাদের সঙ্গেও কথা বলতেন। একজন 'অর্যাকল' সর্বদা তার উত্তর ধাঁধার মতো ছন্দে সাজিয়ে দিতেন । সেই উত্তরের আসল অর্থ প্রশ্নকারীকে নিজেকেই বুঝে নিতে হত।
➖ একদম ঠিক। আধুনিক বাইবেলের গবেষক পণ্ডিতরা জানিয়েছেন যে, হিব্রু গ্রন্থের গ্রিক সেপ্টুয়াজিন্ট অনুবাদে 'নেক্রোম্যান্সার' কে 'উইচ' এর পরিবর্তে 'বেলি-টকার' হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ হল এই বিদ্যায় শিক্ষিত মানুষেরা 'গ্যাস্ট্রোম্যান্সি' অনুশীলন করে নিজের কণ্ঠস্বর এবং মাত্রাকে এতটাই নামিয়ে উচ্চারণ করতে সক্ষম ছিলেন যে সেটা শুনে মনে হত মাটির তলা বা কবরের ভিতর থেকে শব্দ উঠে আসছে। আর যদি এই তথ্য সত্যি হয় তাহলে বলতেই হবে, 'উইচ অফ এন্ডোর' কোনও মায়াবী জাদুকর ছিলেন না। বরং উনি ছিলেন এই বিশ্বের আদিযুগের একজন 'ভেন্ট্রিলোকুইস্ট'!
➖ দাদা, এসব নিয়ে বিতর্ক থাকবেই বা হবেই। তবুও একটা কথা ঠিক, ধর্ম বলো বা ভূতপ্রেত সব নিয়েই কিছু স্বার্থান্বেষী বিশেষ বিদ্যায় দক্ষতা সম্পন্ন মানুষ চিরটাকাল মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেয়ে চলেছে।
➖ কথাটা ১০০ শতাংশ সত্যি। তুই ভূতপ্রেতে বিশ্বাসীকে অবিশ্বাসী যে করতে আগ্রহী সেটা এই কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
চতুর্থ অধ্যায় উপভোগ করেছেন? পঞ্চম অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।