পঞ্চম অধ্যায়
চাইলেও নৈব্যক্তিক থাকতে পারছি না। নিজের অবিশ্বাসী মনের ভাবনা লিখে ফেলছি। সেটা আগেরদিন সবজান্তা দাদার করা মন্তব্য থেকেই বুঝেছিলাম। সুধী পাঠক পাঠিকাগন আমাকে নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। আপাতত আমরা আমাদের আলোচনায় ফিরি।
➖ প্রথম শতাব্দী, লুকান নামের একজনের বয়ান অনুসারে এক 'নেক্রোম্যান্সি'র ঘটনা পাওয়া যায়। ৪৯ বা ৪৮ খ্রিস্টপূর্ব সময়ে সিজার আর পম্পেইয়ের যুদ্ধর কী ফলাফল হবে সেটা জানার চেষ্টা করে এক থেসালিয়ান 'উইচ'। ওই সময় চলতে থাকা এক যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সেই নারী এমন এক মৃতদেহ খুঁজে নেয় যার ফুসফুসের কোনও ক্ষতি হয়নি। তাকে মন্ত্রবলে জীবিত করে সে। তারপর একের পর এক মন্ত্রের প্রয়োগ করে। জীবন্ত সাপ দিয়ে চাবুকের মতো প্রহার করে। ততক্ষণ অবধি যতক্ষণ না সেই পুনরায় জীবিত সৈন্য তার প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রাচীন গ্রীস এবং রোমের মৃতদেহকে মন্ত্র বলে জীবিত করার এই পদ্ধতিগত কিংবদন্তী থেকেই সম্ভবত পরবর্তী সময়ে 'ভ্যাম্পায়ার' এবং 'জোম্বি' জাতীয় 'ভয়ানক' চরিত্র নির্মাণ হয়েছে।
আমার মুখে একথাগুলো শুনে দাদা বললেন,
➖ এসব তথ্য যখন সামনে আসে তখন সবকিছুই খুব অদ্ভুত বা দুর্বোধ্য বলে মনে হয়, তাই না?
➖ একদম। হাজার হাজার বছর পার করে আসার পর এটা বলা খুব মুশকিল যে, ভূত বিষয়ক যে সব নথি সেইসব সময়ে লেখা হয়েছিল, সেগুলো নিছক লেখকদের কল্পনার বিকাশ বা সাহিত্য, নাকি বাস্তবিকপক্ষেই 'অ্যাপারিশন' জাতীয় কিছু ঘটেছিল।
➖ আবার দ্যাখ, চাইলেই ভূতেদের শান্ত রাখা যায় এর উল্লেখও কিন্তু নবম শতাব্দীর গ্রিক মহাকাব্য হোমার রচিত ইলিয়াডে মেলে। ওই কাব্য অনুসারে ভূতেদের সভ্যভব্য, নিষ্ক্রিয় আত্মা বলাই যায়। তারা জীবিতদের কোনোভাবে বিরক্ত করে না এবং জীবিতরাও তাদের সম্পর্কে খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। যথাযথ শেষকৃত্য এবং আচার অনুষ্ঠান পালন করা হলে তাদের আর সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না।
➖ কিন্তু শেষ বাক্য থেকে একটা অন্য অর্থ আমরা পেয়ে যাচ্ছি দাদা। শেষকৃত্য এবং আচার অনুষ্ঠান পালন করা আবশ্যিক। আর সেটাও ঠিকঠাকভাবে। অর্থাৎ ভূত বা আত্মাকে সামনে রেখে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পথ কিন্তু খুলেই রেখেছিলেন সমাজের কিছু মানুষ। যা আজও চলছে।
➖ ওসব আলোচনা থাক, চল দেখা যাক প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য অনুসারে আমারা আত্মা বিষয়ে আর কী জানতে পারছি। ওখানে বলা হচ্ছে, মৃত্যুর পরে, মৃত ব্যক্তির আত্মা হেডিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, যা পৃথিবী পৃষ্ঠের নীচে অবস্থিত এক নেতি জগত। যার শাসক দেবতা হেডিস। পৃথিবী পৃষ্ঠের কিছু ফাটল, কিছু গুহা এবং বিশেষ গোপন কিছু স্থান ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রবেশপথ।
➖ এই কথাগুলো যাই বলো দাদা আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এসে হাস্যকর বলেই প্রতিভাত হয়।
➖ হলেও কিছু করার নেই। মানুষের বিশ্বাস বড় সাংঘাতিক বস্তু ব্রাদার। তবে তোর আগের দিনের কথা মতোই ওইসব স্থানে সবসময় একজন পুরোহিত, বা একজন 'অর্যাকল' বা বলা ভাল আত্মা জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য একজন 'এজেন্ট' উপস্থিত থাকতেন। যারা মূল্য বিনা কিছুই করতেন না। সে মূল্য পার্থিব বা আধ্যাত্মিক যাই হোক না কেন।
ঐতিহ্যগতভাবে হোমারের দ্বারা রচিত বলেই বিখ্যাত আর এক মহাকাব্য ওডিসিতে, জাদুকরী সিরসে নায়ক ওডিসিয়াসকে নির্দেশ দিয়েছিল কীভাবে হেডিসে পৌঁছতে হবে। যাতে সে দীর্ঘকাল আগে মৃত ভাববাদী টাইরেসিয়াসের আত্মার সাথে পরামর্শ করতে পারে। সেই জাদুকরী ওডিসিয়াসকে বলেছিল, ওসিয়ানাসের জলরাশি পার হওয়ার পর পর্যাপ্ত পরিমাণে নৈবেদ্য পেশ করতে হবে এবং বলি দিতে হবে। সাথেই একটা পরিখা খনন করে সেটাকে ভর্তি করতে হবে মধু, দুধ, মদ, জল, বার্লি এবং ভেড়ার রক্তের মিশ্রণ দিয়ে। মৃতদের আত্মারা ওই পরিখার কাছে এসে উপস্থিত হবে ওই বিশেষ তরল পান করার আশায়। কিন্তু যতক্ষণ না টাইরেসিয়াসের আত্মা উপস্থিত হবে ততক্ষণ ওডিসিয়াস যেন তাদের তলোয়ার দিয়ে তাদের ভয় দেখানো থেকে বিরত না হয়।
➖ কি অদ্ভুত সব কথা! আচ্ছা, যারা মিশ্রণটা খেতে আসবে তারা তো ভূত। তাহলে তাদের তো দেহ নেই। দেহ নেই তো যেটা খাবে সেটা যাবে কোথায়? আর দেহ নেই তাহলে তরোয়াল দেখে তোমরা ভয় পাবে কেন? দুঃখিত ভূতগন, একটু ইয়ার্কি করার সুযোগ পেয়ে ছাড়তে পারলাম না। ঘাড় মটকে দিও না বাপু!
➖ তুই কি এসব কথাও লিখবি নাকি তোর নিবন্ধে?
দাদার প্রশ্নে কোনও উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসেছিলাম শুধু। চুপ করে আছি দেখে দাদা পুনরায় বলতে শুরু করেন।
➖ ওডিসিয়াস জাদুকরীর দেওয়া নির্দেশাবলী অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছিলেন। টাইরিসিয়াস সেই মিশ্রণ পান করার পর প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। ওডিসিয়াস তার মা, অ্যাকিলিস, আগামেমনন, ইডিপাসের স্ত্রী/মা এবং লেডার ভূতেদের সাথেও কথা বলেছিলেন। জানিস বোধহয়, এই লেডার সাথেই রাজহাঁসের রূপে থাকা জিউসের মিলনে জন্ম হয়েছিল বিখ্যাত 'হেলেন অফ ট্রয়' এর।
ইতিবাচকভাবে মাথা নেড়ে বলেছিলাম,
➖ ইউলিসিস ওই রকম ভূগর্ভস্থ জগতেই তো হারকিউলিসের দেখা পেয়েছিলেন, তাই না দাদা?
➖ হ্যাঁ। তবে মহাকাব্যের নায়ক ওটাকে 'ফ্যান্টম ডাবল' বা 'এইডোলন' বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কারণ আসল হারকিউলিসের আত্মা তখন দেবতাদের সাথে মাউন্ট অলিম্পাসে অবস্থান করছিলেন।
➖ আরিব্বাস! ভুতেদেরও স্টান্টম্যান!
➖ সবকিছুতে এত ইয়ার্কি ভালো নয় কিন্তু! এবার তোকে সত্যি সত্যি ভুতে ঢিল মারবে।
➖ মারুক। তাহলে তো অন্তত প্রমাণ পাব যে ভূত বলে কিছু আছে। অবশ্য সেটা কোনও 'মানুষ-ভূত' করলে কিছু বলার নেই। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
➖ এবার থাম। শোন, বর্ণনা অনুসারে হেডিসে যে আত্মাদের দেখা গিয়েছিল তারা ছিল অস্থির প্রকৃতির এবং ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছিল; অন্যথায়, ওদের নিরীহই বলা যায়। ওদের অবয়ব বিশেষ কোনও পদার্থ দ্বারা গঠিত ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, যখন ইউলিসিস তার মাকে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করেছিল, তার হাত কোনও কিছুকেই স্পর্শ করতে পারেনি। ফাঁকা স্থানে হাত নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়েছিল তার।
➖ অর্থাৎ আত্মা বা ভুতেদের দেহ বলতে কিছু থাকে না। সবটাই একটা 'থ্রিডি হলোগ্রাম' এর মতো।
➖ বুঝতেই পারছি তোর মাথায় কোনও দুষ্টু বুদ্ধির চিন্তা নাচছে। দয়া করে সেটা বলবি বা লিখবি না। আমরা আমাদের আলোচনার প্রবাহেই থাকি আপাতত।
দাদার কথা মেনে কিছুই বলিনি। লিখলাম না। সমঝদার পাঠক বুঝতে পারলে বুঝে নেবেন। সবজান্তা দাদা বলে চলেন,
➖ হোমারের সময়কাল অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী থেকে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সময়কালে যখন আমরা পৌঁছাই দেখা যায় ভূত এবং তাদের প্রকৃতি সম্পর্কের বিশ্বাসে একটা বড়সড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। এ সময় ভূতেদের সহায়ক এবং সান্ত্বনাদায়ক রূপ দেখতে পাওয়া গিয়েছে। তার মানে অবশ্য এই নয় তারা কোনও ক্ষতি করছে না। এই সময়ের বিশ্বাস অনুসারে মনে করা হতো যে, ভূতেরা শোরগোল করতে ভালোবাসে, প্রকৃতি অস্থির এবং যারা তাদের বিরক্ত করে বা যারা খুব কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে তাদের ওরা তাদের আঘাত বা হত্যা করতে সক্ষম।
বিগত শতাব্দীগুলোতে 'ওঝা' জাতীয় মানুষেরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে। এবার দেখা গেল ভূতেরাও মানুষের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার দাবি জানানো শুরু করেছে! এই সময় বলা হচ্ছে, যারা অকালে বা বিশেষ করে হিংস্রতার কারণে মারা গেছে তাদের ভূত বিপজ্জনক।
➖ হ্যাঁ, ওই সময়ের মানুষ মনে করত, মৃত ব্যক্তির আত্মা তার কবরের আশেপাশেই অবস্থান করে। বিশেষত করে যারা আত্মহত্যা করে বা কারও দ্বারা খুন হয় বা অকালে মারা যায়। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্ব) তার 'ফ্যাডো' নামক লেখায় লিখে গিয়েছেন — "সমাধিস্থল এবং শবাধারের আশেপাশে চৌর্যবৃত্তির আকাঙ্ক্ষায় যারা ঘুরে বেড়ায়, তারা বলেছে, ওই স্থানে ভূতুড়ে চেহারাদের আবির্ভূত হতে দেখা যায়। ওই সব আত্মারা শুদ্ধ না হওয়ার কারণে এ জগত থেকে বিদায় নিতে পারেনি।" অথচ মজার ব্যাপার আধুনিক যুগের কোনও কবর চোর আজ অবধি ভূতের পাল্লায় পড়ে প্রাণ হারিয়েছে বলে শোনা যায়নি। যা রটে তার কিছু কিছু সত্যি বটে। মোটেই না, সবকিছুই ঘটে, উর্বর মস্তিষ্কের লেখকের কল্পজগতের পটে।
পঞ্চম অধ্যায় উপভোগ করেছেন? ষষ্ঠ অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।