ষষ্ঠ অধ্যায়
➖ আপনার আত্মা যদি প্রকৃতপক্ষে শুদ্ধ না হয় তাহলে এ জগতের উপরে অবস্থিত 'ইথার' জগতে সেটা যেতে পারে না। ভূগর্ভস্থ 'নরক' জগতে বাধ্য থাকে। যেখানে তাদের শুদ্ধিকরণ হয় নানা কষ্টদায়ক পদ্ধতিতে। আপনি মৃত্যুর পর যদি এই সব যন্ত্রনা ভোগ না করতে চান, তাহলে জীবনযাপন করুন শুদ্ধাচারী ভালো মানুষ রূপে।
এই কথাগুলো বিশ্বাস করত প্রাচীনকালের মানুষেরা। এটা যখন সবজান্তা দাদাকে বললাম, তখন ও বলল,
➖ জানি তো। সূচনা লগ্নের একাধিক খ্রিষ্টান লেখকও এই ভাবনায় জারিত হয়েছিলেন। শু্ধু তাই নয় এই ভাবনাকে মানুষের ভিতর ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বও তারা নিয়েছিলেন। এখান থেকেই 'পার্গেটরি' বা পরিশুদ্ধ হতে হবে ভাবনার জন্ম হয়।
➖ অর্থাৎ এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শয়তান হোক বা ভগবান তার সাহায্য নিয়ে সেই সময়ের সমাজবাদীরা এভাবেই মানুষকে ভালো হয়ে থাকার এবং সমাজকে সুস্থ করার একটা চেষ্টা করেছিলেন। যদিও এটারও প্রমাণ মেলে তারা তাদের নিজস্ব মতামত মানুষকে মানতে বাধ্য করতে গিয়ে নিজেরাই একাধিক নৃশংস পথের আশ্রয় নিতেন।
[এই বিষয় যার পারিভাষিক নাম 'ইনকুইজিশন' নিয়ে আমি 'শেষপাতে ৩৬৫' নামক বইয়ের অন্তিম তিনটে লেখায় কিছু কথা লিখেছি।]
➖ এখান থেকেই সবচেয়ে বড় একটা প্রশ্ন জন্ম নেয়। আমি কোন পথে যাব বা কী বিশ্বাস করব?
দ্যাখ সমাজের এক বিরাট অংশের মানুষ বিশ্বাস করত বা করে যে ভূত আছে এবং তারা বস্তুগত জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মৃত্যুর পর আত্মার কী হয় তার সঙ্গে তুই শুরুতে যে কথাটা বললি সেই এই বিশ্বাসের সরাসরি সম্পর্ক আছে।
➖ বুঝলাম। দাদা, মৃত্যুর পর আত্মা বিষয়ে প্রাচীন গ্রীসের কিছু বিশ্বাসের কথা পড়ছিলাম। শুনবে নাকি?
➖ এটা আবার জিগ্যেস করতে হয়। শুরু কর।
➖ ওরা বিশ্বাস করতেন মৃতদেহ এবং আত্মা সমাধির ভিতর একসঙ্গেই অবস্থান করে। এমন কিছু সমাধিস্থলের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে যেখানে জমির উপর থেকে শবাধারের ভিতর অবধি নল লাগানো আছে। যাতে মৃত ব্যক্তির জন্য পুষ্টিকর তরল পাঠানো যায়। প্রার্থনা বা 'নেক্রোম্যান্সি' জাতীয় আচার দ্বারা এইসব আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত বলেই ওরা মনে করতেন।
মৃতদেহ ত্যাগ করার পর আত্মাকে চক্রাকার যন্ত্রণাদায়ক পথ পার হয়ে হেডিসে পৌঁছতে হয়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সেখানে মনে করা হতো মৃত্যুর পরের জীবনে থাকার জন্য দুটো ভিন্ন অঞ্চল আছে। এক, সুখ-সমৃদ্ধ, মনোরম এলাকা যেখানে ধার্মিকদের আত্মা অবস্থান করে। এই স্থানকে কোথাও কোথাও 'এলিসিয়াম' নামে অভিহিত করা হয়েছে।
দুই, 'টারটারাস'। এই নামটা 'নিউ টেস্টামেন্ট' এও পাওয়া যায়। যেখানে স্থান হত দুষ্ট আত্মাদের। যেখানে তারা যন্ত্রণা ভোগ করত। এই বিশ্বাসটাই নানান ধর্মের স্বর্গ ও নরকের ভাবনার মতোই।
➖ একদম ঠিক। মোটামুটি প্রায় সব আত্মা বিশ্বাসী মানুষ মনে করেন আত্মা শরীর ত্যাগ করে এক আধ্যাত্মিক জগতে চলে যায়। যা এক ইথারের জগত, অবস্থান পৃথিবীর উপরে। যেখানে গিয়ে এই আত্মারা স্রষ্টা বা চূড়ান্ত সত্ত্বার সঙ্গে মিশে যায়। এটাও বিশ্বাস করত, করত বলছি কেন এখনও করা হয়, আত্মাকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো যায় এবং শাস্তি হিসেবে সেখানে তাকে মানবেতর রূপে জীবনযাপন করতে হতেও পারে।
➖ তারমানে দেহের মৃত্যুর সঙ্গেই আত্মার মৃত্যু হয়। 'এপিকিউরিয়ান'দের দ্বারা সমর্থিত, এই ভাবনা নিশ্চিতভাবেই সেসময় কম জনপ্রিয় ছিল।
➖ হ্যাঁ। শোন অনেক তথ্য কচকচি হলো। চল তোর পাঠক পাঠিকাদের জন্য প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান আমলের ভূতের গল্প জগতটায় একটু ঘুরে আসা যাক।
➖ দারুণ হবে।
➖ দ্যাখ, এই ধরনের গল্পগুলো রহস্য ভিত্তিক সাহিত্য কল্পনা বলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। 'মার্চেন/মার্কেন স্টোরি' নামে পরিচিত এই গল্পগুলোর প্রমাণ ভিত্তিক নির্ভরযোগ্যতা ছিল অতি সামান্য। সাধারণভাবে এগুলোকে কাল্পনিক বলেই ধরে নেওয়া হয়। অন্যদিকে 'সেজেন লিজেন্ড' জাতীয় লেখাগুলোকে সত্যি ঘটনার সঙ্গে আলঙ্কারিক সাহিত্য মিশিয়ে নির্মাণ করা হত বলেই গবেষকেরা মনে করেন। তুই কি জানিস, ভূতুড়ে বাড়ি সংক্রান্ত সর্বপ্রথম লেখাটা কে লিখেছিলেন?
➖ হ্যাঁ আগে জানতাম না দুদিন আগেই একটা লেখা পড়তে গিয়ে জানলাম সম্ভবত ওটা লিখেছিলেন রোমান লেখক, রাজনীতিক, এবং বাগ্মী প্লিনি দ্য ইয়াঙ্গার [৬২? – ১১৩ খ্রীষ্টাব্দ]। একটা চিঠিতে উনি তার পৃষ্ঠপোষক, লুসিয়াস সুরাকে লিখেছেন এথেন্সের এক ভিলা সম্পর্কে। কেউ ওই ভিলা ভাড়া নিতে চাইছিল না, কারণ ওখানে ভূত আছে। অগভীর রাতে ওই ভিলায় ভয়াবহ সব আওয়াজ শোনা যায়। ভেসে আসতে থাকে শিকলের ঝনঝনানি, যার শব্দমাত্রা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। হঠাৎ হঠাৎ একজন নোংরা এবং দরিদ্র বৃদ্ধের ভয়াবহ অশরীরীর আবির্ভাব হয়। যার লম্বা দাড়িতে জট পড়ে গেছে। মাথায় অবিন্যস্ত সাদা চুল। পায়ে বাঁধা আছে ভারী লোহার পাত। যা ওই অশরীরী আর্তনাদ সহযোগে অতি কষ্টে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। বৃদ্ধর দুই হাতের কব্জিতে আটকানো আছে শিকল সহ হাতকড়া। মাঝে মাঝেই চরম ক্রোধে উনি দুহাত ওপরের দিকে তুলে ওই শিকল বাঁধা হাত ঝাঁকাতে থাকেন। একবার, কয়েকজন অতি সাহসী সন্দেহবাদী ওই ভিলায় রাত কাটায়। সকালে সবাইকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। যারাই ওই সন্ধ্যার পরে ওই অভিশপ্ত বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে হয় তারাই বিচ্ছিরিরকমভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা মারা গিয়েছেন।
➖ অর্থাৎ দ্যাখ সেই কবেই ক্ল্যাসিক ভূতের গল্পের পটভূমি লেখা হয়ে গিয়েছিল। যার কাঠামো আজও ব্যবহার হয়ে চলেছে। তারপর কী হলো জানিস আশা করি?
➖ হ্যাঁ, ভিলাটার ওই কুখ্যাতি থাকা সত্বেও আরেক এথেনীয় দার্শনিক এথেনোডোরাসকে ওই ভিলা ভাড়া নেওয়া থেকে কেউ বিরত করতে পারেনি। আসলে ওই ভুতুড়ে কুখ্যাতির কারণে ভাড়া অত্যন্ত কম থাকায় এবং নিজের খুব বেশি আর্থিক সামর্থ না থাকায় কিছুটা বাধ্য হয়েই এথেনোডোরাস ওই স্থান ইজারা নিতে বাধ্য হন।
প্লিনির মতে, এথেনোডোরাস ভিলায় প্রথম রাতেই ভূতের দেখা পেয়েছিলেন। অস্পষ্ট শিকলের শব্দ ভেসে আসে সবার আগে। তারপরেই আবির্ভূত হন সেই বৃদ্ধ। তাঁর দেখানো পথে যাওয়ার জন্য দার্শনিক এথেনোডোরাসকে ইশারা করে সেই ভৌতিক অবয়ব। এথেনোডোরাস সেটা করতে না চাইলে বৃদ্ধ রাগের চোটে জোরে জোরে শিকল ঝাঁকাতে থাকেন। যতক্ষণ না দার্শনিক ওঁর সঙ্গে যেতে রাজি হলেন ততক্ষণ উনি একভাবে শিকল নাড়িয়ে গিয়েছিলেন। অশরীরী বৃদ্ধ এথেনোডোরাসকে ভিলা সংলগ্ন বাগানে নিয়ে যায় এবং একটা বিশেষ জায়গার দিকে ইশারা করে অদৃশ্য হয়ে যায়।
পরের দিন, এথেনোডোরাস তার অভিজ্ঞতার গল্প স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানান। ওরা বাগানের ওই নির্দিষ্ট স্থান খনন করেন। পাওয়া যায় শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটা মানুষের কঙ্কাল। সেই কঙ্কালে টিকে থাকা অবশিষ্ট হাড়গুলোকে সঠিক নিয়ম মেনে সমাধিস্থ করা হয় । বাড়িটাকেও প্রচলিত আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে শুদ্ধ করা হয়। এরপর আর ওই বৃদ্ধের ভূতকে ওখানে কোনও দিন দেখা যায়নি।
➖ অর্থাৎ তুই যা বলেছিলি আগে সেটাই হয়েছিল। ভূতের সূত্রে কিছু মানুষের আর্থিক রোজগার। একই সঙ্গে গল্পের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া যে, ভূতের হাত থেকে বাঁচতে হলে আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি পালন করতে হবে। অতএব বিশ্বাস করি বা না করি, ভূতের ভাবনা মানুষের মনে জন্ম নেয় গল্প কাহিনীর সূত্রেই। একটা শিশুকে যদি ছোটো থেকে ভূতের গল্প শোনানো না হয় সে কোনোদিনই ভুতকে ভয় পাবে না। বিশ্বাস করার তো দুরের কথা।
কোনও উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসলাম।
ষষ্ঠ অধ্যায় উপভোগ করেছেন? সপ্তম অধ্যায় পড়তে ক্লিক করুন
লেখক বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ নিবাসী। পেশা ও নেশায় তিনি চিত্রশিল্পী। ২০১০ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত পাখি আঁকার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর তুলিতে ফুটে উঠেছে ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। চিত্রকলার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনূদিত প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ।