যুবসমাজ একটি দেশের প্রাণশক্তি। তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, উদ্যম, নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে জাতির ভবিষ্যৎ। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আর একই সঙ্গে বৃহত্তম যুবসমাজের দেশ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশই ৩৫ বছরের নিচে। এর মানে দাঁড়ায় — ভারতের রাজনীতি, সমাজ এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্ব এই তরুণ প্রজন্মের কাঁধেই বর্তাবে।
প্রতিটি নির্বাচনে কোটি কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়, যাদের বড় অংশই তরুণ। তাই এদের ভূমিকা নির্বাচনের ফলাফলের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। তবে কেবল ভোটার হিসেবে নয়, নেতৃত্বের আসনেও তরুণদের উপস্থিতি প্রয়োজন। আজকের দিনে প্রশ্ন হচ্ছে — ভারতের তরুণরা কি কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তারা নেতৃত্ব, নীতি নির্ধারণ এবং সামাজিক পরিবর্তনের আসল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে?
ইতিহাসে যুবাদের রাজনৈতিক ভূমিকা
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণ প্রজন্মের অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েই এর নজির আমরা দেখতে পাই —
🔹 স্বাধীনতা সংগ্রামে যুবাদের আত্মত্যাগ: ভগৎ সিং মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য প্রাণ দেন। খুদিরাম বসু ১৮ বছর বয়সেই আত্মাহুতি দেন। সুভাষচন্দ্র বসু যুব বয়সেই দেশকে স্বাধীন করার জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন। এরা প্রমাণ করেছেন যে বয়স কোনো বাধা নয়, বরং তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহস সমাজকে নাড়া দিতে পারে।
🔹 বাংলার ছাত্র আন্দোলন: স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন বারবার রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের নকশাল আন্দোলন, কিংবা ১৯৭০-এর দশকের জরুরি অবস্থার সময় ছাত্রদের প্রতিবাদ — সব ক্ষেত্রেই তরুণরা ছিল অগ্রগণ্য। বিশেষত বাংলার ছাত্র রাজনীতি বহুবার ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছে।
🔹 জরুরি অবস্থার সময়ে তরুণদের প্রতিরোধ: ১৯৭৫–৭৭ সালের জরুরি অবস্থায় ছাত্র-যুব সমাজের প্রতিবাদ সরকারকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। তারা শুধু শ্লোগান দেয়নি, বরং সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র রক্ষার ডাক দিয়েছিল।
ইতিহাস প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়ে তরুণদের ভূমিকা অপরিহার্য।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে যুবাদের রাজনৈতিক ভূমিকা
আজকের দিনে তরুণরা নানা উপায়ে রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে —
🔹 ভোটার হিসেবে শক্তি: প্রতি নির্বাচনে কোটি কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়, যার মধ্যে বিশাল অংশ তরুণ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ১.৫ কোটিরও বেশি প্রথমবার ভোটদানকারী ছিলেন। তাদের ভোট সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। নতুন প্রজন্মকে আকর্ষণ করাই এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম কৌশল।
🔹 ছাত্র ও যুব সংগঠন: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন (যেমন ABVP, SFI, AISF, TMCP, Student Front ইত্যাদি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সক্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব তৈরির সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে।
🔹 ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম: আজকের তরুণরা শুধু রাস্তায় নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলছে। সিএএ–এনআরসি আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন কিংবা পরিবেশ আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। ফেসবুক লাইভ, টুইটার ট্রেন্ড বা ইনস্টাগ্রাম ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তারা জনমত তৈরি করছে।
🔹 নেতৃত্বে প্রবেশ: স্থানীয় পঞ্চায়েত, পৌরসভা থেকে শুরু করে বিধানসভা ও সংসদ পর্যন্ত তরুণদের উপস্থিতি বেড়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী, তবু শিক্ষিত ও সাধারণ তরুণদেরও ধীরে ধীরে আগমন ঘটছে।
যুবাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে বেশ কিছু গুরুতর বাধা রয়েছে —
🔹 অর্থের প্রভাব ও কর্পোরেট রাজনীতি: আজকের নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। ব্যানার, পোস্টার, মিছিল, ডিজিটাল প্রচার—সব জায়গায় বিপুল অর্থ প্রয়োজন। সাধারণ তরুণদের পক্ষে এত অর্থ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা রাজনীতিতে পিছিয়ে যায়, আর সুবিধা নেয় মূলত ধনী প্রার্থীরা বা কর্পোরেট সমর্থিত দলগুলো।
🔹 বংশানুক্রমিক রাজনীতি: ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোতে পরিবারতন্ত্র খুবই শক্তিশালী। নেতৃত্ব অনেক সময় কেবল নির্দিষ্ট পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে নতুন তরুণ নেতৃত্ব গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
🔹 বেকারত্ব ও হতাশা: প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়ছে না। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা যখন বেকার থাকে, তখন রাজনীতির প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। অনেকে মনে করে রাজনীতি শুধু ক্ষমতা ও দুর্নীতির খেলা, বাস্তব সমস্যার সমাধান নয়।
🔹 দুর্নীতি, সহিংসতা ও অপরাধীকরণ: রাজনীতিতে দুর্নীতি এখন প্রকাশ্য সমস্যা। অনেক প্রার্থী নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে রাজনীতি ব্যবহার করে। নির্বাচনী সহিংসতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, টাকা বা মদ বিলি — এসব প্রবণতা তরুণদের নিরুৎসাহিত করে। পরিষ্কার–সৎ রাজনীতির জায়গায় ভয়ের রাজনীতি কুপ্রভাব ফেলে।
🔹 প্রতিনিধিত্বের অভাব: সংসদ ও বিধানসভায় তরুণ প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তারা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে খুব কম সুযোগ পায়। নীতি–আলোচনায় প্রবীণ নেতৃত্ব আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে তরুণদের চিন্তা–ভাবনা বাস্তব নীতি প্রণয়নে প্রতিফলিত হয় না।
নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক ভিন্ন —
🔹 উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি: তারা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল চায়। রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান — এসবেই তাদের জোর।
🔹 সমতা ও মানবাধিকার: ধর্ম, জাতপাত, লিঙ্গের ভিত্তিতে বিভাজন তারা মানতে চায় না। সমান সুযোগ ও অধিকার তাদের প্রধান চাহিদা।
🔹 নারী নিরাপত্তা ও লিঙ্গ সমতা: মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ দেওয়া এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তারা রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখে।
🔹 পরিবেশ সচেতনতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ রোধের দাবি আজকের তরুণরা খুব গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে। তারা চায় রাজনীতি পরিবেশবান্ধব হোক।
🔹 ডিজিটাল স্বচ্ছতা: তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চায়। দুর্নীতি ঢাকতে আর অর্ধসত্য প্রচার করতে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।
অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, বরং সুশাসন ও উন্নয়নের বাস্তব প্রক্রিয়া।
ডিজিটাল যুগে যুবরাজনীতি
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরন বদলে দিয়েছে প্রযুক্তি —
🔹 সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা: ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এখন রাজনৈতিক আলোচনার মূল প্ল্যাটফর্ম। আন্দোলন সংগঠিত করা, প্রতিবাদ জানানো বা সরকারের সমালোচনা করা—সবকিছু তারা এখানে করে।
🔹 হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ: প্রতিটি রাজনৈতিক দল এখন ভোটারদের প্রভাবিত করতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করছে। তরুণরা এগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
🔹 মিম–কালচার: রাজনৈতিক সমালোচনা এখন শুধু ভাষণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মিমের মাধ্যমে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের কাছে এটি প্রতিবাদের নতুন হাতিয়ার।
🔹 ইউটিউব ও পডকাস্ট: তরুণ বিশ্লেষকরা নিজেদের কণ্ঠ প্রকাশ করতে ইউটিউব ও পডকাস্ট ব্যবহার করছে। অনেক সময় এগুলো মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও প্রভাবিত করছে।
এইভাবে, ডিজিটাল যুগে রাজনীতি তরুণদের হাত ধরে আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠছে।
সুযোগ ও সম্ভাবনা
চ্যালেঞ্জ থাকলেও তরুণদের সামনে সম্ভাবনা অসীম —
🔹 প্রযুক্তির শক্তি: ই-গভর্নেন্স, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্টার্টআপ সংস্কৃতি — এসব তরুণদের সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে।
🔹 শিক্ষার প্রসার: উচ্চশিক্ষার ফলে তারা এখন আরও সচেতন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ — এসব বিষয় নিয়ে তাদের আগ্রহ অনেক বেশি।
🔹 সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব: দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, জলবায়ু আন্দোলন, নারী অধিকারের আন্দোলন — সব জায়গায় তরুণদের নেতৃত্ব চোখে পড়ছে।
🔹 নারী ও প্রান্তিক যুবদের সক্রিয় অংশগ্রহণ: নারী ও লিঙ্গ-বৈচিত্র্যসম্পন্ন যুবসমাজ এখন রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এর ফলে ভবিষ্যতের রাজনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠবে।
ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও যুবাদের ভূমিকা
আগামী দিনের ভারত তরুণদের হাতেই গড়ে উঠবে —
🔹 অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র: শুধু ভোট দেওয়াই নয়, নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের যুক্ত করা দরকার।
🔹 সৎ নেতৃত্ব: তরুণরা যদি দুর্নীতির বাইরে থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তবে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
🔹 নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি: তারা যদি উন্নয়ন, সমতা, পরিবেশ ও প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে রাজনীতি চালায়, তবে ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমূল বদলাবে।
🔹 নাগরিক দায়িত্ব: শুধু অধিকার ভোগ নয়, দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই তরুণরা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সবশেষে বলতে হয়, "যুবাই দেশের ভবিষ্যৎ" — এটা শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব সত্য। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম যুবসমাজের দেশ। তাই গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
যদি তরুণরা কেবল দর্শক না হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, দুর্নীতি ও বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়ন, সমতা ও মানবাধিকারের পথ বেছে নেয়, তবে ভারতীয় গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আগামী দিনের নেতৃত্ব তরুণদের হাতেই। তাদের দ্বারাই তৈরি হবে যুবসমাজ ও রাজনীতির অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত।
লেখক রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ইউজিসি নেট ও ডব্লিউবি সেট উত্তীর্ণ একজন স্বাধীন গবেষক। তিনি একজন প্রকাশিত কবি ও How to Destroy Your Life শীর্ষক আত্মোন্নয়নমূলক গ্রন্থের লেখক। তাঁর হিন্দি ও উর্দু কবিতায় ভালোবাসা, হারানো ও মানবিক সহনশীলতার সুর প্রতিধ্বনিত হয়, এবং সেগুলি ভারতের বিভিন্ন জাতীয় সংকলনে স্থান পেয়েছে। লেখালেখির জগতে তিনি ‘মোহিবুল জজবাত’ নামেই পরিচিত।