মহর্ষি বেদব্যাসের লেখা মহাভারত পড়েননি এমন ভারতীয় হয়তো অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর যদি প্রশ্ন করা হয়, মহাকাব্যের প্রিয় নায়ক কে — উত্তর সাধারণত আসে, শ্রীকৃষ্ণ, নয়তো তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, আবার কখনও কর্ণ। ভীমসেনের নাম নেন খুব কম মানুষই। অথচ মহাকাব্যে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় খুব কম আত্মত্যাগ কিন্তু মানুষটা করেননি।
হস্তিনাপুরের মহারাজ পাণ্ডু তাঁর নবপরিণীতা দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে বনে চলে যান সন্ন্যাস গ্রহণ করে। কিমিন্দিম মুনির অভিশাপের ফলে তিনি সন্তান লাভে অক্ষম হন এবং রাজ্যভার দিয়ে যান বড়ভাই জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের হাতে। বনবাসে জীবন হয়তো শান্তিপূর্ণ ভাবেই কেটে যেত এই রাজর্ষির, কিন্তু বিধিবাম!
সিংহাসনের উত্তরাধিকারী দরকার ছিল, তাই দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদধন্য কুন্তী একে একে জন্ম দেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, পবনপুত্র ভীম ও ইন্দ্রপুত্র অর্জুনকে। মাদ্রী লাভ করেন যমজ পুত্র নকুল ও সহদেবকে। পবনপুত্র বলশালী ভীমের জন্মই হয়েছিল দাদা যুধিষ্ঠির তথা সমগ্র পরিবারকে রক্ষা করার জন্য।
শৈশব ও বিষমিষ্টির কাহিনি
জঙ্গলে পিতার কাছে অস্ত্র ও বিদ্যা শিক্ষা করে জীবন বেশ নিশ্চিন্তেই কেটে যাচ্ছিল বৃকোদরের। কিন্তু পিতা ও বিমাতার আকস্মিক মৃত্যু, পাঁচ নিরাশ্রয় ভাই এবং তাঁদের বিধবা মা কুন্তীকে ফেরত নিয়ে আসে হস্তিনাপুরের দরজায়। এখান থেকেই ভীমের জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ।
হস্তিনাপুর এসে প্রথম পাণ্ডবরা মুখোমুখি হন দুর্যোধন, দুঃশাসনসহ মোট একশো জন জ্ঞাতিভাইয়ের। প্রকৃতির কোলে নির্মল পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা পাঁচ ভাই মোটেও সমাদৃত হননি এই নবলব্ধ আত্মীয়ের ভিড়ে। বাকিদের তুলনায় বালক ভীম বরাবরই উপহাসিত হয়েছেন বেশি — কখনও নিজের বড়সড় চেহারার জন্য, কখনও একটু বেশি খাদ্য গ্রহণের জন্য, আবার কখনও খেলাধুলার সময় অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করার অপরাধে।
প্রথম থেকেই তাঁদের আগমন ভালো চোখে দেখেনি দুর্যোধন ও কৌরব বাহিনী। এই অপছন্দই শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন ও তার মামা শকুনিকে সাহস যোগায় এক দুঃসাহসী অপরাধের। খেলাচ্ছলে ভীমের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিষমিশ্রিত মিষ্টান্ন। বিষের জ্বালায় অচেতন হয়ে পড়া ভীমকে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ফিরে আসে কৌরব বাহিনী। ধরে নেয়, সবচেয়ে বড় শত্রুকে যখন এত সহজে সরানো গেছে, তখন বাকি ভাইগুলোকে সরাতেও বেশি সময় লাগবে না।
তবে দৈবঅনুকূল থাকায় ভীম প্রাণে বেঁচে যান। জলে ভেসে গিয়ে পড়েন নাগ উপজাতির মধ্যে। তারা বিষ নিরাময় করে চিকিৎসা করে ভীমকে সুস্থ করে আবার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়।
মজার কথা হলো, মহাকাব্যে এই হত্যাচেষ্টার কোনো প্রতিবাদ হয়নি। মহারাণী কুন্তী, যুধিষ্ঠির, পিতামহ ভীষ্ম কিংবা মহামন্ত্রী বিদুর — কেউই এগিয়ে আসেননি এই সময়ে। বরং চেষ্টা করেছেন এই জ্ঞাতিবিরোধের কথা চেপে রাখতে।
অজ্ঞাতবাস, রাক্ষসবধ ও দ্রৌপদীর আগমন
একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে বারবার। যুধিষ্ঠিরের অভিষেকের পর বারণাবতে গিয়ে পাণ্ডবরা ও কুন্তী আবার জতুগৃহে মৃত্যুর মুখোমুখি হন। কিন্তু বিদুরের সতর্কতায় তাঁরা বেঁচে যান। সেখান থেকে শুরু হয় পাঁচ ভাইয়ের নতুন জীবন — জ্ঞাতিদের চোখে ধুলো দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয়ে বেঁচে থাকা।
ভীমসেন বারবার গভীর জঙ্গলের মধ্যে কখনও মাকে, কখনও ভাইদের কাঁধে তুলে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। রাতের পর রাত নিজে না ঘুমিয়ে ঘুমন্ত পরিবারকে পাহারা দিয়েছেন, সংগ্রহ করেছেন ফলমূল, বাঁচিয়েছেন হিংস্র পশু ও রাক্ষসের আক্রমণ থেকে। এই জঙ্গলে অনার্য রাক্ষস নেতা হিরিম্বকে হত্যা করে তার বোন হিরিম্বার সঙ্গে বিবাহ করেন ভীম। তাঁদের পুত্র ঘটোৎকচ — পাণ্ডব ও রাক্ষস বংশের প্রথম মিলনসন্তান — যিনি মূল কাহিনীতে প্রায় উপেক্ষিত থেকে যান।
এই অজ্ঞাতবাসের মধ্যেই একচক্রা গ্রামে আশ্রয় নেন পাণ্ডবরা। সেখানে দুরাচারী বকরাক্ষসকে বধ করে গ্রামবাসীর প্রাণরক্ষা করেন ভীম। এরপর ব্যাসদেবের পরামর্শে পাণ্ডবরা যাত্রা করেন পাঞ্চাল দেশের উদ্দেশ্যে, দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় অংশ নিতে।
সেই সভায় অর্জুন ও দ্রৌপদীর বিবাহ সম্পন্ন হয়, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে দ্রৌপদী হন পাঁচ পাণ্ডবেরই স্ত্রী। এই অনন্য দাম্পত্য জীবনে ভীমের ভূমিকা ছিল গভীর ও নীরব। দ্রৌপদীর মনের একচ্ছত্র স্থান অর্জুন পেলেও, কর্তব্যবোধ ও প্রেমের নিঃশব্দ প্রমাণ দিয়েছেন ভীমসেনই।
রাজসূয় যজ্ঞ ও জরাসন্ধবধ
দ্রৌপদীসহ পাণ্ডবরা আত্মপ্রকাশ করলে ধৃতরাষ্ট্র রাজ্য ভাগ করে খান্ডবপ্রস্থসহ অনুর্বর অংশ পাণ্ডবদের দেন। শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সহায়তায় ময় দানব খান্ডববন পুড়িয়ে নির্মাণ করেন ইন্দ্রপ্রস্থ নগর।
এই সমৃদ্ধ নগরে রাজা হওয়ার পর যুধিষ্ঠিরের মনে রাজসূয় যজ্ঞের বাসনা জাগে। নারদমুনি জানান, যজ্ঞ করার আগে তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মগধরাজ জরাসন্ধকে দমন করতে হবে। কে করবেন? এগিয়ে এলেন ভীমসেন!
শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে মগধে গিয়ে ভীম জরাসন্ধকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানান এবং তাঁকে পরাজিত করে হত্যা করেন। রাজসূয় যজ্ঞের পথ তখন নিষ্কণ্টক হয়।
পাশা খেলা, অপমান ও প্রতিজ্ঞা
এই রাজসূয় যজ্ঞের পরই আসে পাণ্ডবদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধ অধ্যায় — দুর্যোধনের পাশা খেলার ফাঁদ।
হস্তিনাপুরের রাজসভায় শকুনির কূটচালে যুধিষ্ঠির একে একে হারান ধনরত্ন, প্রাসাদ, রাজ্য, ভাইয়েরা, এমনকি নিজের স্ত্রী দ্রৌপদীকেও। দ্রৌপদীকে পাশার দানে বস্তু হিসেবে ধরার মুহূর্তেই প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ভীম। যুধিষ্ঠিরের হাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।
রজস্বলা দ্রৌপদীকে চুলের মুঠি ধরে টেনে রাজসভায় আনা হয়। দুর্যোধন ইঙ্গিত করে তাঁর ঊরুতে বসতে। এই অকল্পনীয় অপমানে উত্তাল হন ভীম। প্রতিজ্ঞা করেন — দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করবেন এবং দুর্যোধনের ঊরু ভেঙে দেবেন। সেই নারকীয় মুহূর্তে অর্জুন বাদে একমাত্র তিনিই দ্রৌপদীর পক্ষে প্রতিবাদে মুখ খোলেন।
বনবাস ও অজ্ঞাতবাস
পাশা খেলায় হেরে পাণ্ডবরা ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যান।
বনবাসে অর্জুন দেবতাদের কাছ থেকে অস্ত্রলাভে ব্যস্ত থাকলেও, দ্রৌপদীর পাশে থেকেছেন ভীম। ফলমূল সংগ্রহ, আশ্রয় তৈরি, স্ত্রীকে সান্ত্বনা — সব কিছুতেই তিনি অটল।
এই সময়েই কৌরব ভগিনী দুঃশলার স্বামী সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে অপহরণের চেষ্টা করে। আবারও ভীম তাঁকে উদ্ধার করেন। তবে ধর্মরাজের অনুগ্রহে জয়দ্রথের প্রাণ নেননি, যার প্রতিশোধ পরে কুরুক্ষেত্রে অভিমন্যুর মৃত্যুর মাধ্যমে আসে।
অজ্ঞাতবাসে পাণ্ডবরা বিরাট রাজার রাজ্যে ছদ্মনামে বাস করেন। ভীম 'বল্লভ' নামে রাজার পাকশালায় কাজ নেন। রাজার শ্যালক কীচক দ্রৌপদীকে অপমান করলে, ভীম রাতের অন্ধকারে গিয়ে হত্যা করেন তাকে।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ও ভীমের পরিণতি
তেরো বছরের প্রবাস শেষে যুদ্ধ অনিবার্য হয়। আঠারো দিনের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভীম বধ করেন অসংখ্য কৌরব, রাক্ষস অলম্বুষ ও দুঃশাসনকে। দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করে তিনি পূরণ করেন নিজের প্রতিজ্ঞা।
যুদ্ধের শেষ দিনে দুর্যোধনের সঙ্গে গদাযুদ্ধে তাঁর ঊরু ভেঙে দেন ভীম। এইভাবে তিনি পাশা খেলার অপমানের প্রতিশোধ নেন, যদিও গদাযুদ্ধের গুরু বলরাম তাঁকে নীতিবিরুদ্ধ কাজের জন্য দোষারোপ করেন।
কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে ভীমের পুত্র ঘটোৎকচও মৃত্যুবরণ করেন কর্ণের হাতে — অনার্য রক্তের কারণে যাঁকে মহাকাব্যে উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ তিনিই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
শেষ অধ্যায়
যুদ্ধ শেষেও শান্তি আসেনি। অশ্বত্থামা রাতে পাণ্ডব শিবিরে হামলা করে হত্যা করে দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে। শোকাকুল দ্রৌপদী অশ্বত্থামার মণি আনতে ভীমকে পাঠান। ব্রহ্মশির অস্ত্রের মুখোমুখি হয়েও ভীম পিছিয়ে যাননি; শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন এসে তাঁকে বাঁচান।
যুদ্ধোত্তর কালে ধৃতরাষ্ট্র পুত্রশোকে ভীমকে আলিঙ্গন করে হত্যা করতে উদ্যত হন, কিন্তু কৃষ্ণের হস্তক্ষেপে রক্ষা পান তিনি। পরে পাণ্ডবরা পরীক্ষিতকে সিংহাসনে বসিয়ে রাজ্য চালান প্রায় চল্লিশ বছর।
দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর পাণ্ডবরা যাত্রা করেন মহাপ্রস্থানের পথে। পথে ক্লান্ত দ্রৌপদী পড়ে গেলে একমাত্র ভীম এগিয়ে আসেন সাহায্যের জন্য, কিন্তু দাদার আদেশে থেমে যান। এক এক করে সহদেব, নকুল, অর্জুন পড়ে যান; শেষে ভীম নিজেও। যুধিষ্ঠির বলেন — অতিরিক্ত খাদ্যাভিলাষের জন্য ভীম সশরীরে স্বর্গলাভ করতে পারবেন না।
উপসংহার
আশ্চর্য লাগে মহাবলী বৃকোদরের এই করুণ পরিণতিতে। যে মানুষটা সারা জীবন শুধু পরিবারকে রক্ষা করেছেন, কখনও মা ও দাদার কথার অবাধ্য হননি, আজীবন ভালোবেসেও দ্রৌপদীর মনের মানুষ হতে পারেননি — তিনি ছিলেন আদর্শ পুত্র, আদর্শ ভাই ও আদর্শ স্বামী।
তাঁকে নিয়ে আজও খুব একটা কথা হয় না। তাঁর আত্মত্যাগ উপেক্ষিত থেকে গেছে। অথচ ভীমসেন না থাকলে মহাভারত সম্পূর্ণ হত না, অর্জুন নায়ক হতে পারতেন না, দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধও অসম্ভব হতো।
তাই মহাভারতের এই নিঃশব্দ ট্র্যাজিক হিরো ভীমসেনকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা এখানেই সমাপ্ত করা হলো।