Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
সূর্যের মৃত্যু — একদিন আলোই গিলে নেবে পৃথিবী
সূর্যের মৃত্যু — একদিন আলোই গিলে নেবে পৃথিবী

পৃথিবী এখনো তরতাজা, শিশিরে ভিজে আছে ঘাসের ডগা, আকাশের পূর্বদিগন্তে ভেসে উঠছে আমাদের চিরচেনা সূর্য। কোটি কোটি বছর ধরে প্রতিদিন যেমন করে সে আলো বিলিয়ে এসেছে, আজও তেমনই আলোকিত করছে ধরিত্রীকে। যেন তার মৃত্যু নামক কোনো শব্দই নেই। অথচ প্রকৃতির শাশ্বত নিয়ম এটাই — জন্ম আছে, তাই মৃত্যু আছে। মানুষ জন্মায়, মরে যায়। গাছ জন্মায়, মরে যায়। এমনকি আমাদের এই সূর্যও একদিন নিভে যাবে। আর সেই নিভে যাওয়ার গল্পটাই হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

আমাদের সূর্য একটি মাঝারি আকারের নক্ষত্র। তার বয়স আনুমানিক ৪৬০ কোটি বছর। বর্তমানে সে নিজের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তরিত করে আলো ও তাপ উৎপাদন করছে। এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। প্রতিটি সেকেন্ডে সে যে পরিমাণ শক্তি ছড়াচ্ছে, তা দিয়ে কোটি কোটি পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠতে পারে। অনেকের ধারণা সূর্য স্থির, কিন্তু বাস্তবে সূর্য স্থির নয়। শুধু সূর্য কেন — এই মহাবিশ্বে কোনো কিছুই স্থির নয়। সূর্য নিজের অক্ষে ঘূর্ণায়মানও বটে। বিষুবরেখার কাছে সে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ কিলোমিটার বেগে ঘোরে। পুরো একবার ঘুরতে সময় নেয় প্রায় ২৫ দিন। তবে মেরু অঞ্চলে এই ঘূর্ণন একটু ধীরগতি; সেখানে একবার ঘুরতে লাগে প্রায় ৩৫ দিন। আর আমাদের সূর্যও নিছক একা নয়। সে সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলেও, নিজেও ঘুরছে গোটা সৌরজগৎকে নিয়েই আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের চারদিকে সেকেন্ডে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার বেগে। বিশাল কক্ষপথে একবার পূর্ণ চক্কর দিতে সময় লাগে প্রায় ২৫ কোটি বছর।

আমরা আকাশে যে তারা দেখি সেগুলো সূর্যের মতোই নক্ষত্র। আমাদের মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে আনুমানিক ২০ হাজার কোটি থেকে ৪০ হাজার কোটি নক্ষত্র রয়েছে। আর সমগ্র মহাবিশ্বে? সেই সংখ্যা এতটাই অবিশ্বাস্য যে মানুষ ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কোটি কোটি ছায়াপথে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলছে, নিভছে, জন্ম নিচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আমাদের সূর্য তাদের ভিড়ের মধ্যে কেবল এক বিন্দু মাত্র।

সূর্যের হাইড্রোজেন ধীরে ধীরে হিলিয়ামে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে কেন্দ্রের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা বাড়বে। এর ফলে নিউক্লিয়ার ফিউশনের হার এবং উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রতি ১০০ কোটি বছরে প্রায় ১০% উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ঘটবে। এইভাবে উজ্জ্বলতা বেড়ে যাবার ফলে আগামী ১০০ কোটি বছর পরে পৃথিবীর তাপমাত্রা অনেক বেশি হয়ে যাবে। ফলে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে, সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে থাকবে। সময় যত এগোবে সূর্যের উজ্জ্বলতা প্রতি ১০০ কোটি বছরে প্রায় ১০% করে বাড়তেই থাকবে।

প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসবে। তখন সূর্যের ভেতরে এক ভয়ংকর রূপান্তর শুরু হবে। কেন্দ্র সংকুচিত হতে থাকবে, ঘনত্ব বাড়বে, তাপমাত্রা আকাশছোঁয়া হবে। আর বাইরের স্তরগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠবে বিশাল আকারে। সূর্যের ব্যাসার্ধ তখন এতটাই বাড়বে যে সে এক ভয়ংকর রূপ নেবে। এই অবস্থাকে বলে রেড জায়ান্ট বা রক্তিম দৈত্য দশা। এই দশা টিকে থাকবে প্রায় ১০০–১২০ কোটি বছর। এসময়ে সূর্য শুধু বড়ই হবে না, আরও উজ্জ্বলও হয়ে উঠবে। তার আলোয় পৃথিবী আর আশ্রয় খুঁজে পাবে না। সেই সময়কার দৃশ্য কল্পনা করুন — সমুদ্রের যেটুকু জল অবশিষ্ট আছে তা টগবগ করে ফুটে বাষ্পে রূপান্তরিত হচ্ছে। চারদিকে যেন ধোঁয়া আর মেঘের কুণ্ডলী। পৃথিবীর আকাশ কালো নয়, লাল আভায় ভরে গেছে। শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস নেই, নদী নেই, বৃক্ষ নেই, মানুষ নেই। এই প্রাণভরা পৃথিবী তখন নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

সূর্য যখন আরও ফুলে উঠবে, তখন একে একে বুধ ও শুক্রকে গ্রাস করবে। পৃথিবীও হয়তো গ্রাস হবে, কিংবা সূর্যের ভেতরে টেনে নেওয়া হবে — বৈজ্ঞানিকরা এখনও নিশ্চিত নন। কিন্তু যদি হয়, আমাদের এই নীলাভ পৃথিবী মুহূর্তেই ঢুকে যাবে সূর্যের জ্বলন্ত পেটে। কোটি কোটি বছরের মানবসভ্যতা, গান, সাহিত্য, চোখের জল, ভালোবাসা, সমস্ত ইতিহাস তখন এক লহমায় ভস্মীভূত হবে।

এই দশার পর সূর্য প্রবেশ করবে এক অস্থায়ী অবস্থায়। সূর্যের ভরের বিশাল অংশ কার্বনে রূপান্তরিত হবে। ব্যাসার্ধ কিছুটা কমবে, উজ্জ্বলতা অর্ধেক হবে। কিন্তু এই স্থিতি বেশিদিন থাকবে না। অস্থির স্পন্দনের ফলে সূর্য বারবার ভর হারাবে। প্রতি এক লক্ষ বছর অন্তর তার আয়তন বাড়বে, আবার কমবে। এভাবেই কয়েক কোটি বছর কেটে যাবে। সূর্য তার বাহ্যিক স্তরগুলো ছুড়ে ফেলবে মহাশূন্যে। তখন গড়ে উঠবে এক অপূর্ব দীপ্তিময় গ্যাসমণ্ডল, যাকে বলে নেবুলা বা নিহীরিকা। দূর থেকে এটি হবে স্বর্গীয় রঙিন এক ফুলের মতো, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে থাকবে পৃথিবীর চিরন্তন মৃত্যু।

অবশেষে সূর্যের বাকি থাকবে শুধু তার জ্বলন্ত কেন্দ্র। ছোট্ট অথচ ভীষণ ঘন। আয়তনে পৃথিবীর মতো, কিন্তু ভর সূর্যের প্রায় অর্ধেক। এই অবস্থাকে বলে শ্বেত বামন। তখন সূর্য আর নতুন আলো উৎপন্ন করতে পারবে না। শুধু তার অতীতের উষ্ণতার অবশেষ টুকু নিয়ে ধীরে ধীরে শীতল হবে। লক্ষ লক্ষ বছর পর সে পরিণত হবে এক নিস্তেজ, অদৃশ্য অঙ্গারে। তখন তাকে আর কেউ সূর্য বলবে না, কেবল মহাকাশের এক ভুলে যাওয়া স্মৃতি হয়ে থাকবে।

প্রশ্ন জাগে, তখন কি মানবজাতি থাকবে? বিজ্ঞানীরা বলেন, হয়তো মানুষ কিংবা তার উত্তরসূরি সভ্যতা ততদিনে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে নতুন বাসস্থান খুঁজে নেবে। তারা হয়তো প্রতিবেশী প্রোক্সিমা সেন্টরি বি অথবা আরও দূরের কোনো বসবাসের উপযোগী গ্রহে বসতি গড়বে। সেখান থেকে তারা হয়তো টেলিস্কোপে দেখবে, কেমন করে তাদের পূর্বপুরুষের নীলাভ পৃথিবী সূর্যের গহ্বরে মিলিয়ে গেল। কিন্তু সেই দৃশ্য কি সহ্য করা সম্ভব হবে? একটি গ্রহের মৃত্যু মানে কেবল পাথর ও ধুলোর ধ্বংস নয়, কোটি কোটি বছরের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া, কবিতা, গান, ভালোবাসা, সংগ্রাম সব একসাথে নিভে যাওয়া। যেন মহাশূন্যের বুকে আরেকটি হৃদয়ের স্পন্দন থেমে যাওয়া`

সূর্যের মৃত্যু আসবে নিশ্চিতভাবেই। তবে সেই দিন অনেক দূরে — প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর। কিন্তু আজও যখন ভোরের সূর্য উদিত ওঠে, মনে হয় সে যেন এক স্নেহময় অভিভাবকের মতো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। হয়তো একদিন সে ক্লান্ত হবে, নিভে যাবে। কিন্তু সেই শেষ প্রহরেও সূর্য তার সন্তান পৃথিবীকে বুকে টেনে নেবে, আলোর অগ্নিকুণ্ডে ভস্মীভূত করে দেবে। এ এক ভয়াবহ অথচ হৃদয়স্পর্শী বিদায়। যেন মাতৃগর্ভে ফেরা — যেখানে জন্ম হয়েছিল, সেখানেই মৃত্যু। ততদিনে হয়তো মানুষ অন্য কোথাও গিয়ে টিকে থাকবে। কিন্তু পৃথিবী নামক এই নীলাভ রত্নটি আর থাকবে না। তখন সূর্যের মৃত্যু শুধু একটি তারকার মৃত্যু হবে না, হবে আমাদের শৈশব, নদী, পাহাড়, ভালোবাসা, আমাদের গান, আমাদের এই কাহিনি — সবকিছুর চূড়ান্ত বিলীন হয়ে যাওয়া। যে আলোয় মানুষ প্রথম স্বপ্ন দেখেছিল, সেই আলোই গিলে নেবে আমাদের শৈশব, মায়ের মুখের হাসি, সন্তানের প্রথম ডাক। সেখানে আর থাকবে না পৃথিবীর স্মৃতি। কোটি বছরের ইতিহাস ভস্ম হয়ে ছড়িয়ে যাবে মহাশূন্যে। তবু মনে পড়বে, একদিন একটি নীলাভ গ্রহ ছিল, যার নাম ছিল পৃথিবী। আর ছিল এক সূর্য, যে শেষ নিঃশ্বাসে সন্তানকে আলোর আঁচলে টেনে নিয়েছিল চিরকালের বিদায়ের পথে।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.9 32 ভোট
স্টার
guest
40 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top