আমি ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতি চর্চার সেরকম পরিবেশ পাইনি। কিন্তু কেন জানি না শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি আমাকে খুব টানতো। রাস্তাঘাটে কোথাও যদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতাম কিছুটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে যেতাম। আমাদের বাড়ির পাশে আম্বেদকর যোগেন্দ্র ভবন আছে, যেখানে ছোটবেলায় দেখতাম সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। সেই অনুষ্ঠান দেখবার জন্য চেয়ারে জায়গা হতো না, মঞ্চের সামনের ত্রিপল বিছানো থাকতো তাতেই বসতাম। বসে বসে যখন দেখতাম আমার বয়সী বা আমার থেকে দুই এক বছরের বড় কেউ হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে আর তার পাশে বসে একজন তবলা বাজাচ্ছে। তখন মনে হতো — আমিও যদি ওই দুটো জায়গার একটাতে বসতে পারতাম — কি না ভালো হতো! কিন্তু আমি কিভাবে ওখানে বসবো — ওখানে বসার জন্য তো গান শিখতে হবে, হারমোনিয়াম বাজানো শিখতে হবে — সেতো অনেক টাকার ব্যাপার, বাবা তো দিতে পারবে না।
কোন রকমে পড়াশোনা করতে পারছি এই অনেক! তার ওপরে আবার গান শেখা — ওসব বড় লোকেদের জন্য। আমাদের মত নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য ওসব নয়।
এভাবেই মনকে মানিয়ে নিতাম। কিছু করার ছিল না। বড় হয়ে যখন কলেজে পড়ছি তখন এই সংস্কৃতি আমাকে খুব টানতে লাগলো। তখন আমি নিজে নিজেই বাংলা কবিতা আবৃত্তি করা শুরু করলাম। কলেজের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে থাকলাম। আমাদের পাড়ায় পুজোর সময় দু-একটা কবিতা আবৃত্তি করতাম, কিন্তু খুব একটা ভালো হতো না। কারণ তখন আমার কাছে আবৃত্তি শেখার একমাত্র উপায় ছিল ক্যাসেট থেকে শুনে শুনে শেখা।
পরে কলেজের এক বন্ধুর সাহায্যে প্রখ্যাত আবৃত্তিকার কাজল সুর মহাশয়ের কাছে যাওয়া, সেখান থেকেই আমার আবৃত্তির হাতে খড়ি।
তারপর বহুদিন কেটে গেছে। এই কয়েক বছরে আমি রবীন্দ্র সদন, বাংলা একাডেমী, শিশির মঞ্চ, মধুসূদন মঞ্চে অনেক অনুষ্ঠান করেছি — আজও করছি। কিন্তু ছোটবেলার যেই সময় সংস্কৃতির ভিত গঠন করার কথা সে সময় আমি তা পাইনি।
আমরা স্কুলে অংক, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান পড়ি কর্ম শিক্ষা ও শরীর শিক্ষা শিখেছি। কিন্তু আমাদের স্কুলে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, নাটক এসবকিছু শেখানো হতো না — এখনো হয় না।
অংক বিজ্ঞানের মত এই বিষয়গুলো কি আমাদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পাঠ্য বিষয় করা যায় না? শুধুমাত্র যারা একটু সচ্ছল বা বাবা-মা এসব বিষয়ে চর্চা করেন, তাদের সন্তানরাই সংস্কৃতি চর্চা করার সুযোগ পাবে? আর বাকি ছেলেমেয়েরা যাদের এগুলো খুব ভালো লাগে, তারা তো এসব চর্চা করতে পারছে না — তাদের কাছে তো এসব বিলাসিতার মত!
আমার শিক্ষাব্যবস্থা, বুদ্ধিজীবী ও প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন — নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি, অভিনয়, ছবি আঁকা — এই বিষয়গুলোকে ছোটদের শ্রেণীতে পাঠ্য বিষয় করে তোলা যায় না? অনেক ভালো ভালো প্রতিভা উঠে আসতে পারে — যারা কিনা শৈশবে ঝরে পড়ে যায়।