আমি আর আমার — শব্দ দুটি আলাদা করে চিনতে শেখায় নিজেদের কাছে, আবার সমাজের কাছে। পরিচিতি না থাকলে 'আমি' শব্দে সাফল্য আসত না। সাফল্য ব্যক্তিগত স্তর থেকেই ভেসে যায় দলগত স্তরে। যেমন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার নিরিখে সেরা হতে আমি চাই, তেমনি আমার বন্ধুটিও চাইতে পারে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলিতে প্রতিযোগিতা আসে শিশুকালেই। শিশুদের মধ্যে এই ধরনের প্রতিযোগিতা আসার কারণ তাদের আশেপাশের মানুষজন। প্রথম হবার চেষ্টায় বিনষ্ট হয় আসল শিক্ষা।
ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি আছেন, যারা কোনো প্রতিযোগিতায় 'আমি'কে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টাই করেননি, অথচ কর্ম–কৃতিত্বে তারা চিরভাস্বর। শিক্ষা, অর্থ, সম্মান — সব ক্ষেত্রেই আমি, আমার, আমাদের শব্দগুলি প্রতিযোগিতা আনে। সেখানে শিখরে পৌঁছানোই লক্ষ্য — এটা আমাদের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু 'আমি' বা 'আমরা' সমাজকে অন্য দিক থেকে ঘায়েল করে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে বসে আমরা দলের কথাই ভাবি; ব্যক্তিগত ক্রিকেটারের রান বা উইকেটের সংখ্যা নিয়ে ভাবনা পরে আসে। অর্থাৎ দেশ ও দলের ভাবনা মুখ্য হয়ে ওঠে। কোনো খেলোয়াড় যদি নিজের সেঞ্চুরিকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাহলে সেটা দর্শক ভালোভাবে নিতে পারে না। শুভবুদ্ধির মানুষ ব্যক্তিগত সাফল্যকে উৎসর্গ করেন গোষ্ঠীকে।
‘আমি’ ভাবনা আপনাকে নিজেকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করে — এবং নিজের প্রতি ভালোবাসা জরুরি, কিন্তু পাশের মানুষগুলোকে অবহেলা করে নয়, অশ্রদ্ধা করে নয়। ভালোবাসলে ভালো ভাষা ও ভালো ব্যবহার আপনাআপনি আসতে থাকে। সংসার জীবনে 'আমরা' শব্দটি ব্যবহার করতে পারলে দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি মেলা সম্ভব বলে মনে করি।
যেমন — আজকাল প্রায়শই শোনা যায় "মেয়েদের নিজের কোনো ঘর নেই।" কিন্তু যদি একটু গভীরে যাই, তাহলে বুঝতে পারব যে ছেলেদের ক্ষেত্রেও বাবার বাড়ি পৈতৃক সম্পত্তি রূপে চিহ্নিত। ওপর দিকে যদি বাবামায়ের একমাত্র সন্তান হয়ে থাকেন, তবে তার ক্ষেত্রেও সেটা পৈতৃক সম্পত্তি প্রাপ্তি রূপে ধরা হয়। এমনকি বহু সন্তানের ক্ষেত্রেও পরিবারের সন্তানরা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী রূপেই চিহ্নিত হন। অনেক সময় অশান্তির কারণে কেউ যদি তার সম্পত্তির গরিমায় বিপরীতে থাকা ব্যক্তিকে গৃহত্যাগের আদেশ দেন, সেক্ষেত্রে নিম্ন ও বিকৃত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।
শিক্ষার আলোকে আলোকিত পথের পথিক আমাদের শব্দটিকেই সম্মান করে থাকবেন। সংসার, ক্লাব, সংগঠন — সবকিছুই ভাঙার অন্যতম কারণ 'আমি' শব্দের অহংবোধ।
'আমাদের' কথাটিতে যে ঐক্যবোধ আসে, তা নিঃসন্দেহে সত্য। আজকের যুগে প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে টিকে থাকতে আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে — এ কথাও অস্বীকার করার নয়।
'আমরা' ভাবনাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই শিশুকাল থেকেই দলবদ্ধ মানসিকতা তৈরি করতে হবে। দলবদ্ধ খেলা, মোবাইলে একাকি সময় কাটানো — একটি ভয়ঙ্কর একা থাকার প্রবণতা তৈরি করছে। তাই দলবদ্ধ খেলা ছাড়া অন্য খেলাগুলিকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে খাবার খাওয়া, টিফিন শেয়ার করা ইত্যাদি। আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বিজ্ঞানী এ. পি. জে. আব্দুল কালাম সাহেবের মা প্রতিদিন তাঁর সহপাঠীদের বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে একই সঙ্গে বসিয়ে খাওয়াতেন। আজকের দিনে এমন উদাহরণ বিরল। যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক কিছুই বদলে গেছে ঠিকই, কিন্তু ভাই-বোন, ঠাকুমা–দাদুদের সঙ্গে — সবসময় না হলেও — একসাথে খাওয়া-দাওয়া, গল্প করার সুযোগ করে দিতে হবে। এতে অনেক ভালো অভ্যাস তৈরি হয়।
একা থাকতে গিয়ে স্বার্থপর মানসিকতার সৃষ্টি হয়। সুস্থ সমাজের জন্য পরোপকারী না হলেও ক্ষতিকারক মানসিকতা যাতে জন্ম না নেয়, তার জন্য সন্তানকে নিয়ে পিতামাতার সময় কাটানো দরকার। সমাজে সুস্থ নাগরিক গড়তে হলে অনলাইন খেলাগুলির মন্দ দিকগুলো বিবেচনা করতে হবেই। একা খেলতে গিয়ে একা থাকার প্রবণতা যে ভাবে বাড়ছে, তাকে কমাতে হবে।