মহিষাসুর পরমপিতা ব্রহ্মার কাছে শুধু পুরুষের অবধ্য থাকার বর-ই প্রাপ্ত হননি; পেয়েছিলেন ইচ্ছানুসারে রূপ পরিবর্তনের অলৌকিক শক্তিও। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুর মর্দিনী শোনার জন্য ভোর চারটেয় উঠে পড়ে না, এমন বাঙালী আছে কি? সেখানে শুনি: ‘দেবীর সঙ্গে মহিষাসুরের প্রবল সংগ্রাম আরম্ভ হল…মহিষাসুর ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে নানা কৌশল বিস্তার করলে।‘
বছরের পর বছর এটি শুনি আর কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়। ধান ভানতে শিবের গীতের মত শোনালেও, এই ছোট ছোট গল্প দুটিতেই সেই প্রশ্ন আর তার বিশ্লেষণ লুকিয়ে আছে।
গল্প এক
আমার পরিচিত এক জ্যেঠু আছেন, তাঁর সুপুত্র পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কর্মরত ছিল কোনো এক আই.টি কোম্পানিতে। সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে এখন যোগ দিয়েছে এমন একটি সংস্থায়, যেখানে জীবনে কীভাবে ভালভাবে বাঁচা যেতে পারে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শুনেছি, সে ছেলে প্রথমে সেখানে অনুগামী হিসাবে যাতায়াত করত; পরে নাকি সে নিজেই সেখানে প্রশিক্ষক হয়ে বসেছে। ভদ্রলোক বিপত্নীক, একা থাকেন; তাই আমার বাবা মাঝে মাঝে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসেন। আমিও গেছি কখনও কখনও বাবার সাথে। একবার কোনো এক রবিবারে গিয়ে পড়েছিলাম, দেখেছিলাম তাঁর ছেলে সপ্তাহান্তে বাড়ি আসত। নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে আসতে না পারলেও, আসত ঠিকই। আমার সাথেও দেখা হয়ে গেছে দু’একবার। তখন অবশ্য সে ঐ মহতী সংস্থায় যোগ দেয়নি, যে সংস্থা মানুষকে জীবন-শৈলীর শিক্ষা দেওয়ার মহান ব্রত নিয়েছে।
কিছুদিন আগে শুনলাম, সেই ভদ্রলোক দুঃসহ একাকিত্ব কাটাতে, বিড়াল পুষেছেন অনেকগুলি; তাদের সাথেই সময় কাটান আজকাল। হয়তো বুঝেছেন, ঐ মার্জার শাবকগুলিকে জীবন-শৈলীর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হয় না; ওরা এমনি-এমনিই প্রতিপালককে ভালবাসতে জানে।
জীবন-শৈলীর সেই শিক্ষার আদর্শ ও রহস্য- দুইই বোঝা দুষ্কর, যে শিক্ষা নিজের বৃদ্ধ বাবাকে এমন চূড়ান্ত একাকিত্বের দিকে ঠেলে দিতে শেখায়।
গল্প দুই
কলেজে পড়তে যে আমার প্রিয় বান্ধবী ছিল, আমাদের ঘনিষ্ঠতা দেখে আমার মা অন্তত তাই মনে করতেন, কলেজ-বেলায় তার আমাদের বাড়িতে নিত্য যাতায়াত ছিল। আমার থেকেও বেশী গল্প চলত মায়ের সাথে। পরবর্তীকালে আমরা দুজনেই প্রবেশ করেছি কর্মজীবনে। কিন্তু যখন আমার মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন, তখন দেখলাম, একসময়ের প্রিয় বন্ধু কীভাবে অবলীলায় নিরুত্তাপ প্রস্তরখণ্ডে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আমার মা বার-বার তার খোঁজ করতেন; আমি লজ্জায় বলতে পারিনি সেই তথাকথিত বন্ধুটি তখন তার সদ্য কেনা ফ্ল্যাটের অন্দরসজ্জা নিয়ে ভীষণই ব্যস্ত ছিল। এতটাই ব্যস্ত যে ক্যান্সার-আক্রান্ত কাকিমার ডাকে সাড়া দেবার তার সময় হয়নি।
খোঁজ অবশ্য সে নিয়েছিল। মা চলে গেছেন অনেকদিন হল। ওয়টস্ অ্যাপে সুদৃশ্য ছবি পাঠিয়ে বিজয়া সম্ভাষণ পাঠিয়েছে সে এ বছর; অনেক দিন পর। হয়তো, ফ্ল্যাটের অন্দরসজ্জা এতদিনে ঠিক মনের মত হয়েছে। শুভ বিজয়ার ছবির সাথে সে লিখেছে: ‘নতুন ফ্ল্যাট নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম রে; তারপর জানিস তো! ওর অফিস থেকে নিউ ইয়র্ক ট্যুরে পাঠিয়েছিল; সপরিবার! তাই খোঁজই নেওয়া হয়নি। সরি রে! কাকিমা কেমন আছে?’ তাকে জানালাম: মা আর নেই, অপেক্ষা করে করে, চিরশান্তির দেশে চলে গেছেন।
খুব যত্ন করে লেখা মেসেজটি পড়ে, দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি: ‘তোমাদের সময়েও কি প্রিয় বন্ধু এমনটাই হত?’ ছবি তো উত্তর দেয় না। আমি নিজেই ভাবতে বসি —
কলেজ বেলার কাকিমার ডাক কয়েক বছর পরে আর শুনতে পাওয়া যায় না! বাবার হাত ধরার সময় মেলে না অন্যদের জীবন-শৈলীর শিক্ষা দিতে গিয়ে! এও তো একধরণের রূপ পরিবর্তনের গল্পই! নয় কি?
মহিষাসুর কি শুধুই একটি পৌরাণিক চরিত্র মাত্র? মহিষাসুর, আমার মনে হয়েছে, অনেক নেতিবাচকতার মূর্ত প্রতীক। প্রথমত, তার ভোগলিপ্সার শেষ নেই, তাই সে অমর হতে চায়। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা হাতে পেয়েই সে অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তোলে মর্ত্যবাসীকে; অর্থাৎ সে অত্যাচারী শাসক। তৃতীয়ত, সে নারীকে হেয়জ্ঞান করে। ব্রহ্মা যখন তাকে বললেন যে, অমরত্ব দেওয়া যাবে না, কিন্তু কোনো পুরুষ তাকে বধ করতে পারবে না, তখন মহিষাসুরের যে অট্টহাসি, সেটাই তো প্রমাণ করে: নারীকে সে তার সমকক্ষ যোদ্ধার মর্যাদা দিতেই রাজী নয়; কারণ, নারী অবলা, শক্তিহীনা।
মহালয়ার ভোরে প্রতিবছর সেই অসুর পরাজিত হয় দেবীর কাছে। আমরা মাতৃ-আরাধনা করি; কিন্তু অসুরের ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তনের নেতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটিকে নিজেদের অজান্তেই আপন করে নিচ্ছি না তো?
পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক এবং রসায়ন ও মহাকাশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর হলেও, লেখিকার সত্যিকারের অনুরাগ সাহিত্যেই। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি একক গ্রন্থ — ইংরেজি উপন্যাস Un-polluted, বাংলা কবিতার বই দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা, এবং গল্পসংকলন সাতটি তারের একতারা। বই পড়া ও লেখা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য আনন্দ।